রাহাত মিনহাজ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নিঃসঙ্গ শেরপা তাজউদ্দীন আহমদ। যাঁর প্রজ্ঞা, পারদর্শিতা, দরকষাকষির ক্ষমতা, তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা এবং কুশলী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছিল। যদিও প্রায় সময়ই তিনি থেকেছেন পাদপ্রদীপের আড়ালে, মূল মঞ্চে পেছনের চেয়ারে, অনেক সময় পর্দার আড়ালে। কিন্তু তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও যুগান্তকারী।
১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ১ মার্চ উত্তাল অসহযোগ শুরু হলে শেখ মুজিবুর রহমানের পর তিনিই ছিলেন প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র। এছাড়া ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র তৈরির অতি গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষিতে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার ভুট্টোর পরামর্শকদের সঙ্গে আলোচনায় তিনিই ছিলেন অন্যতম মুখ্য চরিত্র। আবার রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন কর্মসূচি ও দেশ পরিচালনার বিভিন্ন নির্দেশনাও জারি হতো তাজউদ্দীন আহমদের নামেই। চলুন একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে তাজউদ্দীন আহমদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতি। যার ভিত্তিতেই রচিত হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবের দাবির মুখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে ৩ মার্চ। যদিও ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টোর জমিদার বাড়ি লারকানায় হাঁস শিকার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছায় ইয়াহিয়া-ভুট্টো-পাকিস্তানি সামরিক অভিজাতরা।
বাঙালি প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে ইয়াহিয়া খানের অনাগ্রহের বিষয়টি নির্বাচনের পর থেকেই আলোচনায় ছিল; যা বাস্তবে রূপ পায় পয়লা মার্চ বেলা ১টা ৫ মিনিটে পাকিস্তান রেডিওতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার ঘোষণার মাধ্যমে। এই ঘোষণা ইয়াহিয়া খান সরাসরি দেননি। একজন রেডিও ঘোষক প্রেসিডেন্টের নামে ঘোষণাটি পাঠ করেন। এতেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো বাংলা। বাংলার পথে-প্রান্তরে, শহরে-বন্দরে, হাটে-বাজারে, রাজপথ থেকে গলি পথে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব জাগরণ। বাঙালির অভূতপূর্ব সেই অসহযোগে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রধান মুখপাত্র ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সামনে ছিলেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক মস্তিষ্ক ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। যার প্রতিফলন ছিল সেই সময়ের সংবাদপত্রে।

গণহত্যা বন্ধ কর
পহেলা মার্চ গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার পর থেকেই মূলত বাংলাদেশের ওপর পুরো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ ও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার। এ সময় শুধু সেনানিবাস ও কিছু সরকারি দপ্তর ছাড়া কোথাও পাকিস্তানিদের কর্তৃত্ব ছিল না। যদিও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে পাকিস্তানি সেনাদের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। সারা দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচার গুলিও চালাচ্ছিল। এ সময় ৬ মার্চ ১৯৭১ বাংলাদেশের সব সংবাদপত্রে তাজউদ্দীনের আহ্বান সংবলিত প্রধান সংবাদ প্রকাশিত হয়। যার প্রধান আহ্বান ছিল—বাংলায় গণহত্যা বন্ধ কর।
৬ মার্চ ১৯৭১ দৈনিক ইত্তেফাক এ প্রধান সংবাদে তাজউদ্দীনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দিন আহমদ গতকাল (শুক্রবার) বলেন যে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট এবং বাংলা দেশের অন্যান্য স্থানে মিলিটারীর বুলেটে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের ধরাশায়ী করা হইতেছে। অবিলম্বে এই নরহত্যা বন্ধ করিতে হইবে। যাহারা এই ঘটনার জন্য দায়ী, তাহাদের জানা উচিত যে, নির্বিচারে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
এক বিবৃতিতে জনাব তাজউদ্দিন বলেন যে, বাংলা দেশের মানুষকে মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করা এবং বাংলা দেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের উপনিবেশ ও বাজার হিসাবে শোষণের গূঢ় রাজনৈতিক মতলবে বেসামরিক অধিবাসীকে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করা হইতেছে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ মার্চ ১৯৭১)

শুধু গণহত্যা বন্ধ ও নানা ধরনের আলোচনার অগ্রগতির তথ্যই নয়, ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের নানা নির্দেশনাও ধারাবাহিকভাবে দিয়ে গেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। যা প্রতিফলিত হয়েছিল সংবাদপত্রে।
এবার আসা যাক অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে দলের অন্যতম প্রধান আলোচক হিসেবে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে দরকষাকষির আলোচনায়। ১ মার্চ গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার পর পুরো পূর্ব পাকিস্তানের ওপর থেকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ হারায় ইয়াহিয়া খানের প্রশাসন। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে ৫ মার্চ আবার গণপরিষদ অধিবেশনের নতুন তারিখ ২৫ মার্চ ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। আর ৭ মার্চের ভাষণের পর অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়িমড়ি করে ১৫ মার্চ ঢাকায় চলে আসেন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট। এ সময় ইয়াহিয়া খান একটি বিশেষজ্ঞ দল সঙ্গে নিয়ে আসেন। যাদের মধ্যে ছিলেন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল পীরজাদা, জাস্টিস কর্নেলিয়াস ও এম এম আহমেদ।
এদিকে শাসনতন্ত্র নিয়ে তাঁদের সাথে আওয়ামী লীগের একটি দল আপোস-মীমাংসার আলোচনায় যুক্ত ছিলেন। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এছাড়াও এই দলে ছিলেন নজরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলাম ও কামাল হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন। এই দলটি ধারাবাহিকভাবে ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধি পরিষদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছার চেষ্টা করে। যদিও তাজউদ্দীন আহমদসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য আলোচকরা খুব পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধিরা ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ভিন্ন।
এদিকে এই আলোচনার মধ্যেই ২১ মার্চ বিকেলে ঢাকা আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ঘটনাবহুল ২২ মার্চে ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টোর মধ্যেও। এরপর ২৩ মার্চেও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। এদিন গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়েছিলেন তাজউদ্দীনরা। এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অর্থনৈতিক বিষয়ক পরামর্শক এম এম আহমদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক বিষয়ক পরামর্শ কমিটির আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তাজউদ্দীন ও প্রতিনিধি দলের সদস্যরা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, শুধু সময় ক্ষেপণ এই সভাগুলোর প্রধান লক্ষ্য। যার ভেতর দিয়ে বাংলার মাটিতে এক ভয়াবহ গণহত্যার শেষ প্রস্তুতি সারছিল পাকিস্তানি জেনারেলরা।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। মার্চের অসহযোগ আন্দোলন শুরুর আগে তাজউদ্দীন আহমদ আরও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমাপ্ত করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে ড. কামাল হোসেনের বাংলাদেশ: কোয়েস্ট ফর ফ্রিডম এ্যান্ড জাস্টিস নামের একটি সুলিখিত গ্রন্থ আছে। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিয়ে একটি অসাধারণ বর্ণনা রয়েছে। ড. কামাল হোসেন উল্লেখ করেছেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির কাজ শুরু হয় ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। যখন শাসনতন্ত্র নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে দরকষাকষি চলছে। ড. কামাল হোসেন উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাধীনতার সম্ভাব্য ঘোষণা নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলত। এরকম একটি বৈঠকে একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা (Unilateral declaration of independence) নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীনের ভাবনা ছিল, গণপরিষদের অধিবেশন বসতে আরও দেরি হলে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হবে।
এমনই এক প্রেক্ষিতে তাজউদ্দীন আহমদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আইনসিদ্ধ একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ড. কামাল হোসেনকে। টানা দুই দিন মতিঝিলের শরীফ ম্যানশনের অফিসে তাজউদ্দীন আহমদের তত্ত্ববাধায়নে এই ঘোষণাপত্র তৈরি করেন ড. কামাল। উল্লেখ্য এই ঘোষণাপত্রে ড. কামাল হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে ভিত্তি হিসেবে ধরেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যেমন ব্রিটিশ রাজ পরিবারের শোষণ, নির্যাতন ও অবিচারের চিত্র ছিল ঠিক তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা হয় পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ, শোষণ, নির্যাতন ও বঞ্চনার চিত্র। যে কাজে প্রধান পরামর্শক ও নির্দেশদাতার ভূমিকা পালন করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নিঃসঙ্গ শেরপা তাজউদ্দীন আহমদ। যাঁর প্রজ্ঞা, পারদর্শিতা, দরকষাকষির ক্ষমতা, তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা এবং কুশলী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছিল। যদিও প্রায় সময়ই তিনি থেকেছেন পাদপ্রদীপের আড়ালে, মূল মঞ্চে পেছনের চেয়ারে, অনেক সময় পর্দার আড়ালে। কিন্তু তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও যুগান্তকারী।
১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ১ মার্চ উত্তাল অসহযোগ শুরু হলে শেখ মুজিবুর রহমানের পর তিনিই ছিলেন প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র। এছাড়া ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র তৈরির অতি গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষিতে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার ভুট্টোর পরামর্শকদের সঙ্গে আলোচনায় তিনিই ছিলেন অন্যতম মুখ্য চরিত্র। আবার রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন কর্মসূচি ও দেশ পরিচালনার বিভিন্ন নির্দেশনাও জারি হতো তাজউদ্দীন আহমদের নামেই। চলুন একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে তাজউদ্দীন আহমদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতি। যার ভিত্তিতেই রচিত হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবের দাবির মুখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে ৩ মার্চ। যদিও ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টোর জমিদার বাড়ি লারকানায় হাঁস শিকার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছায় ইয়াহিয়া-ভুট্টো-পাকিস্তানি সামরিক অভিজাতরা।
বাঙালি প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে ইয়াহিয়া খানের অনাগ্রহের বিষয়টি নির্বাচনের পর থেকেই আলোচনায় ছিল; যা বাস্তবে রূপ পায় পয়লা মার্চ বেলা ১টা ৫ মিনিটে পাকিস্তান রেডিওতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার ঘোষণার মাধ্যমে। এই ঘোষণা ইয়াহিয়া খান সরাসরি দেননি। একজন রেডিও ঘোষক প্রেসিডেন্টের নামে ঘোষণাটি পাঠ করেন। এতেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো বাংলা। বাংলার পথে-প্রান্তরে, শহরে-বন্দরে, হাটে-বাজারে, রাজপথ থেকে গলি পথে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব জাগরণ। বাঙালির অভূতপূর্ব সেই অসহযোগে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রধান মুখপাত্র ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সামনে ছিলেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক মস্তিষ্ক ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। যার প্রতিফলন ছিল সেই সময়ের সংবাদপত্রে।

গণহত্যা বন্ধ কর
পহেলা মার্চ গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার পর থেকেই মূলত বাংলাদেশের ওপর পুরো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ ও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার। এ সময় শুধু সেনানিবাস ও কিছু সরকারি দপ্তর ছাড়া কোথাও পাকিস্তানিদের কর্তৃত্ব ছিল না। যদিও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে পাকিস্তানি সেনাদের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। সারা দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচার গুলিও চালাচ্ছিল। এ সময় ৬ মার্চ ১৯৭১ বাংলাদেশের সব সংবাদপত্রে তাজউদ্দীনের আহ্বান সংবলিত প্রধান সংবাদ প্রকাশিত হয়। যার প্রধান আহ্বান ছিল—বাংলায় গণহত্যা বন্ধ কর।
৬ মার্চ ১৯৭১ দৈনিক ইত্তেফাক এ প্রধান সংবাদে তাজউদ্দীনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দিন আহমদ গতকাল (শুক্রবার) বলেন যে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট এবং বাংলা দেশের অন্যান্য স্থানে মিলিটারীর বুলেটে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের ধরাশায়ী করা হইতেছে। অবিলম্বে এই নরহত্যা বন্ধ করিতে হইবে। যাহারা এই ঘটনার জন্য দায়ী, তাহাদের জানা উচিত যে, নির্বিচারে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
এক বিবৃতিতে জনাব তাজউদ্দিন বলেন যে, বাংলা দেশের মানুষকে মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করা এবং বাংলা দেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের উপনিবেশ ও বাজার হিসাবে শোষণের গূঢ় রাজনৈতিক মতলবে বেসামরিক অধিবাসীকে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করা হইতেছে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ মার্চ ১৯৭১)

শুধু গণহত্যা বন্ধ ও নানা ধরনের আলোচনার অগ্রগতির তথ্যই নয়, ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের নানা নির্দেশনাও ধারাবাহিকভাবে দিয়ে গেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। যা প্রতিফলিত হয়েছিল সংবাদপত্রে।
এবার আসা যাক অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে দলের অন্যতম প্রধান আলোচক হিসেবে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে দরকষাকষির আলোচনায়। ১ মার্চ গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার পর পুরো পূর্ব পাকিস্তানের ওপর থেকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ হারায় ইয়াহিয়া খানের প্রশাসন। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে ৫ মার্চ আবার গণপরিষদ অধিবেশনের নতুন তারিখ ২৫ মার্চ ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। আর ৭ মার্চের ভাষণের পর অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়িমড়ি করে ১৫ মার্চ ঢাকায় চলে আসেন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট। এ সময় ইয়াহিয়া খান একটি বিশেষজ্ঞ দল সঙ্গে নিয়ে আসেন। যাদের মধ্যে ছিলেন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল পীরজাদা, জাস্টিস কর্নেলিয়াস ও এম এম আহমেদ।
এদিকে শাসনতন্ত্র নিয়ে তাঁদের সাথে আওয়ামী লীগের একটি দল আপোস-মীমাংসার আলোচনায় যুক্ত ছিলেন। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এছাড়াও এই দলে ছিলেন নজরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলাম ও কামাল হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন। এই দলটি ধারাবাহিকভাবে ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধি পরিষদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছার চেষ্টা করে। যদিও তাজউদ্দীন আহমদসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য আলোচকরা খুব পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধিরা ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ভিন্ন।
এদিকে এই আলোচনার মধ্যেই ২১ মার্চ বিকেলে ঢাকা আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ঘটনাবহুল ২২ মার্চে ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টোর মধ্যেও। এরপর ২৩ মার্চেও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। এদিন গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়েছিলেন তাজউদ্দীনরা। এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অর্থনৈতিক বিষয়ক পরামর্শক এম এম আহমদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক বিষয়ক পরামর্শ কমিটির আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তাজউদ্দীন ও প্রতিনিধি দলের সদস্যরা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, শুধু সময় ক্ষেপণ এই সভাগুলোর প্রধান লক্ষ্য। যার ভেতর দিয়ে বাংলার মাটিতে এক ভয়াবহ গণহত্যার শেষ প্রস্তুতি সারছিল পাকিস্তানি জেনারেলরা।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। মার্চের অসহযোগ আন্দোলন শুরুর আগে তাজউদ্দীন আহমদ আরও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমাপ্ত করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে ড. কামাল হোসেনের বাংলাদেশ: কোয়েস্ট ফর ফ্রিডম এ্যান্ড জাস্টিস নামের একটি সুলিখিত গ্রন্থ আছে। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিয়ে একটি অসাধারণ বর্ণনা রয়েছে। ড. কামাল হোসেন উল্লেখ করেছেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির কাজ শুরু হয় ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। যখন শাসনতন্ত্র নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে দরকষাকষি চলছে। ড. কামাল হোসেন উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাধীনতার সম্ভাব্য ঘোষণা নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলত। এরকম একটি বৈঠকে একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা (Unilateral declaration of independence) নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীনের ভাবনা ছিল, গণপরিষদের অধিবেশন বসতে আরও দেরি হলে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হবে।
এমনই এক প্রেক্ষিতে তাজউদ্দীন আহমদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আইনসিদ্ধ একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ড. কামাল হোসেনকে। টানা দুই দিন মতিঝিলের শরীফ ম্যানশনের অফিসে তাজউদ্দীন আহমদের তত্ত্ববাধায়নে এই ঘোষণাপত্র তৈরি করেন ড. কামাল। উল্লেখ্য এই ঘোষণাপত্রে ড. কামাল হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে ভিত্তি হিসেবে ধরেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যেমন ব্রিটিশ রাজ পরিবারের শোষণ, নির্যাতন ও অবিচারের চিত্র ছিল ঠিক তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা হয় পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ, শোষণ, নির্যাতন ও বঞ্চনার চিত্র। যে কাজে প্রধান পরামর্শক ও নির্দেশদাতার ভূমিকা পালন করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
.png)

কল্পনা করুন, আপনি স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় হাঁটছেন কিংবা কোনো যানবাহনে করে কোথাও যাচ্ছেন। এমন সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে থামালেন। তাঁর সন্দেহ, আপনার কাছে মাদক থাকতে পারে। শুরু হলো তল্লাশি। ব্যাগের প্রতিটি অংশ, পকেট, সবকিছু খুঁজে দেখা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো মাদক পাওয়া গেল না।
২ ঘণ্টা আগে
জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নতুন সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচন সব সময়ই একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিফলন নয়, বরং নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক চর্চা ও সদিচ্ছার একটি অগ্নিপরীক্ষা।
২ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন মেজর পদবির সেনা অফিসারকে গ্রেপ্তার করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই মেজরের বিরুদ্ধে ১৯৮১ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে সংঘটিত সেনা বিদ্রোহে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে; যে ঘটনায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমা
১৬ ঘণ্টা আগে
দেশে গ্যাস পরিস্থিতি কতটা খারাপ, সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। এ খাতে আমরা ক্রমে আরও আমদানিনির্ভর হচ্ছি। বাড়ছে এলএনজি-নির্ভরতা। ইরান যুদ্ধে জ্বালানি খাত অস্থির হওয়ায় এলএনজির দামও অনেক বেড়ে যায়। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ব্যয় বাড়ার এটা অন্যতম কারণ।
১৬ ঘণ্টা আগে