মোহাম্মদ আজমের প্রতিক্রিয়া

তিনি আমাদের মাঝে জাগ্রত বিবেকের মতো সক্রিয় ছিলেন

স্ট্রিম গ্রাফিক

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা একাডেমিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি প্রায়ই একাডেমিতে আসতেন এবং আমাদের বহু অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতেন। সুতরাং বলতেই হয়, একজন বুদ্ধিজীবী ও লেখক হিসেবে তিনি যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি জনসংযোগও বেশ পছন্দ করতেন। তাঁর কাছে প্রচুর মানুষের যাতায়াত ছিল। এসব দিক থেকে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার প্রায় ৩০-৩১ বছরের সম্পর্ক। পরবর্তী সময়ে তিনি আমার সহকর্মীও হয়েছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কটা ছিল মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক, খুব বেশি ব্যক্তিগত নয়। ব্যক্তিগত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তিনি সাধারণত কথা বলতেন না বা আলাপ করতে পছন্দ করতেন না। তিনি কথা বলতেন দেশ, দশ, জাতি ও রাজনীতি নিয়ে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ও সচেতন বুদ্ধিজীবিতা বলতে আমরা যা বুঝি, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তার এক অসামান্য উদাহরণ।

ষাটের দশকে রাজনৈতিক সক্রিয়তা, ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক চৈতন্য এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে মানুষদের বিকাশ ঘটেছিল, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাঁদের শেষ প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধি। বর্তমানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ হয়তো আরও দু-একজন বেঁচে আছেন, তবে আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এই প্রজন্মের শেষ দিককার অন্যতম ব্যক্তি।

অন্যান্য অনেক বুদ্ধিজীবী বা সাহিত্যসেবীর সঙ্গে তাঁর একটি বড় পার্থক্য ছিল এই যে, তিনি আগাগোড়া একজন রাজনীতিমনস্ক মানুষ ছিলেন। তাঁর চিন্তাধারার মূল ভিত্তিই ছিল এটি—তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনীতি, রাজনৈতিক সংগঠন, দল গঠন এবং নেতৃত্বের বিকাশ ছাড়া বৃহত্তর জনসমষ্টির কল্যাণ হতে পারে না।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি বৃহত্তর পরিসরে বা জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবতে পছন্দ করতেন। তাঁর চিন্তাধারায় সবসময়ই একটি গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান ছিল। পাশাপাশি কল্যাণবোধ, শ্রেয়োবোধ এবং বুদ্ধির মুক্তির মতো বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কথা বলতে পছন্দ করতেন এবং এ বিষয়ে প্রচুর লিখেছেনও। আমি যতদিন ধরে তাঁকে দেখেছি, সবসময় তাঁকে এই চর্চার মধ্যেই নিমগ্ন থাকতে দেখেছি। এর কোনো ব্যতিক্রম চোখে পড়েনি। এর আগে যাঁরা তাঁকে ছয় দশক ধরে চিনতেন, তাঁরাও একই কথা বলেছেন। তিনি পত্রিকা প্রকাশ করতেন, লেখালেখি করতেন, বক্তৃতা দিতেন এবং ক্লাসে পড়াতেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সব কাজের একটাই লক্ষ্য ছিল— মানুষের মধ্যে শুভবোধ ও শ্রেয়োবোধের জাগরণ ঘটানো। তাঁর লেখালেখির মূল উদ্দেশ্যও ছিল দেশ ও মানুষের কল্যাণ সাধন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সম্ভব। অন্যান্য অনেক বুদ্ধিজীবী বা সাহিত্যসেবীর সঙ্গে তাঁর একটি বড় পার্থক্য ছিল এই যে, তিনি আগাগোড়া একজন রাজনীতিমনস্ক মানুষ ছিলেন। তাঁর চিন্তাধারার মূল ভিত্তিই ছিল এটি—তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনীতি, রাজনৈতিক সংগঠন, দল গঠন এবং নেতৃত্বের বিকাশ ছাড়া বৃহত্তর জনসমষ্টির কল্যাণ হতে পারে না। দেশ ও দশের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ, সচেতন এবং অত্যন্ত চরিত্রবান এই মানুষটি আমাদের মাঝে শেষ পর্যন্ত এক জাগ্রত বিবেকের মতো সক্রিয় ছিলেন।

গত দেড় বছরে তিনি বাংলা একাডেমির অনেকগুলো সভায় সভাপতিত্ব করেছেন এবং তখন সবাই লক্ষ করেছেন যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় বা রাজনীতিতে কারা প্রভাবশালী কিংবা সমাজে কাদের আধিপত্য রয়েছে। সেসব দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে দেশ ও জাতির জন্য যা কল্যাণকর মনে করেছেন, তিনি সর্বদা নিঃসঙ্কোচে সেই কথাগুলোই উচ্চারণ করে গেছেন। আজ তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। আমরা বলব, তাঁর এই প্রয়াণ আমাদের জন্য এক বিশাল জাতীয় ক্ষতি।

  • মোহাম্মদ আজম: মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি
Ad 300x250

সম্পর্কিত