সালেহ ফুয়াদ

সংসদ নির্বাচনের পরে ইসলামপন্থী দলগুলো নারী উইংয়ে জোর দিয়েছে। নিষ্ক্রিয়দের সচল ও নতুন করে শাখা গঠন করছে। এর মাধ্যমে সারা দেশে নারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৎপরতা বাড়াতে চায় তারা।
দলগুলোর নেতারা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ভালো সাফল্যে মহিলা শাখা ও ছাত্রীসংস্থার অবদান স্বীকৃত। দেশজুড়ে নারীদের মধ্যে তাদের প্রচার কৌশল দারুণ প্রভাব তৈরি করেছিল। এজন্য স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে তারাও এই কৌশল কাজে লাগাতে চাইছেন।
ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ সব সময় কম। অনেকে তো দল গঠনের বহু বছর পরেও নারীদের জন্য কোনো কার্যক্রম রাখেনি। ভোটের রাজনীতি হলেও, নারীদের সামনে আনাকে ইতিবাচক বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ স্ট্রিমকে বলেছেন, নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক– গণঅভ্যুত্থানের পরে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর এই মনোভাবে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নারীরা যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বর্গ হয়ে উঠেছে, তারা এটি আর অস্বীকার করতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, এসব বিষয় ভালো বুঝেছে জামায়াত। তারা যেমন ইসলামপন্থী অন্যান্য দলের বন্ধু, তেমন প্রতিদ্বন্দ্বীও। নারী উইং সক্রিয় করার ক্ষেত্রে এটিও প্রভাবক। কিছুটা হলেও নারীদের রাজনীতিতে টানতে পারা ইতিবাচক। তবে সংগঠিত করলেও নারীদের সমান মনে না করা নেতিবাচক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে, দেশে মোট নারী ৮ কোটি ৭৩ লাখ ৯০ হাজার; পুরুষ ৮ কোটি ৪২ লাখ। দেশে পুরুষের চেয়ে প্রায় ৩২ লাখ নারী বেশি। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যে, মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ ও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন।
বিপুলসংখ্যক নারী ভোটার মাথায় রেখে নির্বাচনের বছরখানেক আগে নারী কর্মীদের মাঠে নামায় জামায়াত। মহিলা শাখা ও ছাত্রীসংস্থার সক্রিয় ভূমিকা সারা দেশেই নজর কাড়ে। শেষ পর্যন্ত জামায়াতের নির্বাচনে সাফল্যেও এটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তুলনায় ইসলামপন্থী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নারীদের নির্বাচনী মাঠে সেভাবে দেখা যায়নি। তবে নির্বাচনের পরে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সম্প্রতি নারী ও ছাত্রী বিভাগের সদস্য আহ্বান করে ফরম ছেড়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় সিকি শতক ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় ‘মহিলা মজলিস’ সক্রিয় করা হচ্ছে। শিগগির নারী শাখাকে পুনর্গঠন এবং ছাত্রী শাখার কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনাও রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ‘মহিলা ইউনিট’ চালু করে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে মাঠে ছিলেন এই শাখার নেতাকর্মী। নির্বাচনের পরে দলের আমিরের উপস্থিতিতে এক বৈঠকে ‘ছাত্রী উইং’ খোলার ব্যাপারেও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। এরপর সম্ভাব্য কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করে। খুব শিগগির এই কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
এর বাইরে আবদুল বাছিত আজাদ ও আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসের নারী শাখা ‘বাংলাদেশ ইসলামী মহিলা মজলিস’ এবং ছাত্রী শাখা ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী মজলিস’ আগেই সক্রিয়। যদিও নারীদের এখনই সরাসরি রাজনীতির মাঠে আনছে চায় না ১১-দলীয় ঐক্যের দুই শরিক বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং হাফেজ্জি হুজুরের দল বলে পরিচালিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। তারা নারীদের অভ্যন্তরীণ দাওয়াতি কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়।
কৌশলে সফল জামায়াতের নারীরা
জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বিভিন্ন সময় বলেছেন, নারী-পুরুষ মিলে সারা দেশে তাদের ১০ লাখের বেশি কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে ৬ লাখ পুরুষ; বাকিরা নারী। অর্থাৎ মোট কর্মীর ৪০ শতাংশ নারী। রুকন, কর্মী ও সহযোগী সদস্য মিলে বিপুলসংখ্যক নারী মহিলা বিভাগে সক্রিয়। বিশাল জনবল মফস্বল থেকে রাজধানীর সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই কর্মীরাই বিভিন্ন এলাকায় ‘গেম চেঞ্জার’ এর ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করা হয়।
জামায়াতের মহিলা বিভাগের নেতাকর্মী দীর্ঘদিন একান্ত সাংগঠনিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত নীতিগত সিদ্ধান্ত বদল করে। তালিম আর নারীবান্ধব সেবার বাইরে এনে নারীদের প্রকাশ্য মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ ও গণমাধ্যমে সক্রিয় করে। দেশ-বিদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক পর্যন্ত করেন মহিলা জামায়াতের নেতারা। শুধু তাই নয়, প্রথা ভেঙে এসব বৈঠকের ছবি ও খবর জামায়াতের সামাজিক মাধ্যমে ফলাও করে তুলে ধরে।
এই ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘নারী ভোটাররাই জামায়াতকে বেশি ভোট দেবেন।’
ইসলামপন্থী অন্যান্য দলেও তৎপরতা
গত ৯ মে নির্বাহী পরিষদের বৈঠক থেকে দলের নারী শাখা পুনর্গঠনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এক সময় সক্রিয় থাকলেও, দুই দশকের বেশি নারী শাখা ‘মহিলা মজলিস’ নিষ্ক্রিয়। বর্তমানে এর কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই। নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে নারী শাখাকে পুনর্গঠন এবং প্রাথমিকভাবে দেশব্যাপী ‘দাওয়াতি’ কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ১৫ মে রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদের নিয়ে প্রথম বৈঠক করেন দলটির আমির মাওলানা মামুনুল হক। বছিলার তারবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসায় আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের নামাজের আগে পর্যন্ত ওই বৈঠকে নারী শাখা গঠনের গুরুত্ব ও সংগঠনের কাঠামো তুলে ধরেন আমির। দলের একমাত্র নারী সংসদ সদস্য মাহবুবা হাকিম, মামুনুল হকের স্ত্রীসহ অর্ধশতাধিক নারী বৈঠকে ছিলেন।
নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক– গণঅভ্যুত্থানের পরে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর এই মনোভাবে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নারীরা যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বর্গ হয়ে উঠেছে, তারা এটি আর অস্বীকার করতে পারছে না আলতাফ পারভেজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
গত ২১ মে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে মামুনুল হক লেখেন, চার ধাপে ইসলামকে বিজয়ী করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোতে চান। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন, সমষ্টিগত জীবনে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠা, আধিপত্যবাদী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠা। এর অংশ হিসেবে নারীদের দায়িত্ব, অধিকার ও দ্বীনি সচেতনতা আরও সংহত ও সংগঠিত করতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী ও ছাত্রী বিভাগের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই পোস্টে নারী বিভাগে যুক্ত হওয়ারও আহ্বান জানান মামুনুল হক।
প্রায় চার দশকের পুরোনো দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কমিটি গঠনের মাধ্যমে নারী শাখার কার্যক্রম শুরু করে। কার্যক্রম জোরদারে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের আদলে ছাত্রী আন্দোলন গঠনের কথা জানিয়েছে দলটি। শিগগির চরমোনাই পীরের ছাত্রী সংগঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন নেতারা।
কাটছে না সরাসরি নির্বাচনের অনিশ্চয়তা
সংখ্যায় ও সক্রিয়তায় এগিয়ে থাকা জামায়াতের কোনো নারীকে জাতীয় নির্বাচনে কখনো প্রার্থী করা হয়নি। তবে উপজেলা নির্বাচনে ২০১৪ সালে জামায়াত মনোনীত ৩৬ নারী ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হয়ে জামায়াতের মহিলা বিভাগের অনেকেই সংসদে গেছেন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শরিক দল জামায়াতের চারজন, তার আগে ১৯৯৬ সালে দুজন এবং এবার দলটির মনোনয়নে ১৩ নারী সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ইসলামপন্থী দলগুলোর নারীদের শীর্ষ পদে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরেও কোনো ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল নারীকে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুননিসা সিদ্দীকা বলেছিলেন, ‘ইসলামে আছে নারীরা সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসতে পারেন না– আমরা এটি মেনে নিয়েছি। নারীরা জামায়াতের আমির হতে পারবেন না। আমরা একটি ইসলামী দল। আসলে পুরুষই নারীর পরিচালক, এটা মেনে নিয়েই রাজনীতিতে এসেছি।’
ইসলামপন্থী অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই ব্যাপারে অভিন্ন মত পাওয়া গেছে। যদিও জামায়াতের মহিলা বিভাগের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান হাবিবা চৌধুরী সুইট স্ট্রিমকে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী হওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। সব দিক বিবেচনায় জামায়াত শুধু স্থানীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী দিচ্ছে। উপযুক্ত সময়ে সংসদ নির্বাচনেও নারী প্রার্থী দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ স্ট্রিমকে বলেন, অনেক দিন ধরেই নারীদের মাঝে কাজ করার প্রয়োজন আমরা অনুভব করছিলাম। নির্বাচনের সময় এটা আরও বেশি উপলব্ধি করলাম। দেশে নারী তো অর্ধেকের বেশি। আমরা দেখলাম, পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করতে গেলে নারীদের ভিন্ন রেখে সম্ভব নয়।
নারী সংগঠনের কাজের ধরন কেমন হবে– প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছু কাজ অনলাইনভিত্তিক; কিছু অফলাইনে। অনেকটা তাবলিগের মাস্তুরাত জামাতের (নারী শাখা) আদলে শুরু করা হবে। নারী শাখাকে আপাতত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক রূপ দেওয়া হবে না।

সংসদ নির্বাচনের পরে ইসলামপন্থী দলগুলো নারী উইংয়ে জোর দিয়েছে। নিষ্ক্রিয়দের সচল ও নতুন করে শাখা গঠন করছে। এর মাধ্যমে সারা দেশে নারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৎপরতা বাড়াতে চায় তারা।
দলগুলোর নেতারা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ভালো সাফল্যে মহিলা শাখা ও ছাত্রীসংস্থার অবদান স্বীকৃত। দেশজুড়ে নারীদের মধ্যে তাদের প্রচার কৌশল দারুণ প্রভাব তৈরি করেছিল। এজন্য স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে তারাও এই কৌশল কাজে লাগাতে চাইছেন।
ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ সব সময় কম। অনেকে তো দল গঠনের বহু বছর পরেও নারীদের জন্য কোনো কার্যক্রম রাখেনি। ভোটের রাজনীতি হলেও, নারীদের সামনে আনাকে ইতিবাচক বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ স্ট্রিমকে বলেছেন, নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক– গণঅভ্যুত্থানের পরে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর এই মনোভাবে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নারীরা যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বর্গ হয়ে উঠেছে, তারা এটি আর অস্বীকার করতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, এসব বিষয় ভালো বুঝেছে জামায়াত। তারা যেমন ইসলামপন্থী অন্যান্য দলের বন্ধু, তেমন প্রতিদ্বন্দ্বীও। নারী উইং সক্রিয় করার ক্ষেত্রে এটিও প্রভাবক। কিছুটা হলেও নারীদের রাজনীতিতে টানতে পারা ইতিবাচক। তবে সংগঠিত করলেও নারীদের সমান মনে না করা নেতিবাচক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে, দেশে মোট নারী ৮ কোটি ৭৩ লাখ ৯০ হাজার; পুরুষ ৮ কোটি ৪২ লাখ। দেশে পুরুষের চেয়ে প্রায় ৩২ লাখ নারী বেশি। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যে, মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ ও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন।
বিপুলসংখ্যক নারী ভোটার মাথায় রেখে নির্বাচনের বছরখানেক আগে নারী কর্মীদের মাঠে নামায় জামায়াত। মহিলা শাখা ও ছাত্রীসংস্থার সক্রিয় ভূমিকা সারা দেশেই নজর কাড়ে। শেষ পর্যন্ত জামায়াতের নির্বাচনে সাফল্যেও এটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তুলনায় ইসলামপন্থী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নারীদের নির্বাচনী মাঠে সেভাবে দেখা যায়নি। তবে নির্বাচনের পরে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সম্প্রতি নারী ও ছাত্রী বিভাগের সদস্য আহ্বান করে ফরম ছেড়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় সিকি শতক ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় ‘মহিলা মজলিস’ সক্রিয় করা হচ্ছে। শিগগির নারী শাখাকে পুনর্গঠন এবং ছাত্রী শাখার কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনাও রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই ‘মহিলা ইউনিট’ চালু করে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে মাঠে ছিলেন এই শাখার নেতাকর্মী। নির্বাচনের পরে দলের আমিরের উপস্থিতিতে এক বৈঠকে ‘ছাত্রী উইং’ খোলার ব্যাপারেও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। এরপর সম্ভাব্য কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করে। খুব শিগগির এই কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
এর বাইরে আবদুল বাছিত আজাদ ও আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসের নারী শাখা ‘বাংলাদেশ ইসলামী মহিলা মজলিস’ এবং ছাত্রী শাখা ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী মজলিস’ আগেই সক্রিয়। যদিও নারীদের এখনই সরাসরি রাজনীতির মাঠে আনছে চায় না ১১-দলীয় ঐক্যের দুই শরিক বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং হাফেজ্জি হুজুরের দল বলে পরিচালিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। তারা নারীদের অভ্যন্তরীণ দাওয়াতি কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়।
কৌশলে সফল জামায়াতের নারীরা
জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বিভিন্ন সময় বলেছেন, নারী-পুরুষ মিলে সারা দেশে তাদের ১০ লাখের বেশি কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে ৬ লাখ পুরুষ; বাকিরা নারী। অর্থাৎ মোট কর্মীর ৪০ শতাংশ নারী। রুকন, কর্মী ও সহযোগী সদস্য মিলে বিপুলসংখ্যক নারী মহিলা বিভাগে সক্রিয়। বিশাল জনবল মফস্বল থেকে রাজধানীর সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই কর্মীরাই বিভিন্ন এলাকায় ‘গেম চেঞ্জার’ এর ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করা হয়।
জামায়াতের মহিলা বিভাগের নেতাকর্মী দীর্ঘদিন একান্ত সাংগঠনিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত নীতিগত সিদ্ধান্ত বদল করে। তালিম আর নারীবান্ধব সেবার বাইরে এনে নারীদের প্রকাশ্য মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ ও গণমাধ্যমে সক্রিয় করে। দেশ-বিদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক পর্যন্ত করেন মহিলা জামায়াতের নেতারা। শুধু তাই নয়, প্রথা ভেঙে এসব বৈঠকের ছবি ও খবর জামায়াতের সামাজিক মাধ্যমে ফলাও করে তুলে ধরে।
এই ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘নারী ভোটাররাই জামায়াতকে বেশি ভোট দেবেন।’
ইসলামপন্থী অন্যান্য দলেও তৎপরতা
গত ৯ মে নির্বাহী পরিষদের বৈঠক থেকে দলের নারী শাখা পুনর্গঠনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এক সময় সক্রিয় থাকলেও, দুই দশকের বেশি নারী শাখা ‘মহিলা মজলিস’ নিষ্ক্রিয়। বর্তমানে এর কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই। নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে নারী শাখাকে পুনর্গঠন এবং প্রাথমিকভাবে দেশব্যাপী ‘দাওয়াতি’ কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ১৫ মে রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদের নিয়ে প্রথম বৈঠক করেন দলটির আমির মাওলানা মামুনুল হক। বছিলার তারবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসায় আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের নামাজের আগে পর্যন্ত ওই বৈঠকে নারী শাখা গঠনের গুরুত্ব ও সংগঠনের কাঠামো তুলে ধরেন আমির। দলের একমাত্র নারী সংসদ সদস্য মাহবুবা হাকিম, মামুনুল হকের স্ত্রীসহ অর্ধশতাধিক নারী বৈঠকে ছিলেন।
নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক– গণঅভ্যুত্থানের পরে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর এই মনোভাবে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নারীরা যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বর্গ হয়ে উঠেছে, তারা এটি আর অস্বীকার করতে পারছে না আলতাফ পারভেজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
গত ২১ মে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে মামুনুল হক লেখেন, চার ধাপে ইসলামকে বিজয়ী করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোতে চান। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন, সমষ্টিগত জীবনে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠা, আধিপত্যবাদী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠা। এর অংশ হিসেবে নারীদের দায়িত্ব, অধিকার ও দ্বীনি সচেতনতা আরও সংহত ও সংগঠিত করতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী ও ছাত্রী বিভাগের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই পোস্টে নারী বিভাগে যুক্ত হওয়ারও আহ্বান জানান মামুনুল হক।
প্রায় চার দশকের পুরোনো দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কমিটি গঠনের মাধ্যমে নারী শাখার কার্যক্রম শুরু করে। কার্যক্রম জোরদারে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের আদলে ছাত্রী আন্দোলন গঠনের কথা জানিয়েছে দলটি। শিগগির চরমোনাই পীরের ছাত্রী সংগঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন নেতারা।
কাটছে না সরাসরি নির্বাচনের অনিশ্চয়তা
সংখ্যায় ও সক্রিয়তায় এগিয়ে থাকা জামায়াতের কোনো নারীকে জাতীয় নির্বাচনে কখনো প্রার্থী করা হয়নি। তবে উপজেলা নির্বাচনে ২০১৪ সালে জামায়াত মনোনীত ৩৬ নারী ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হয়ে জামায়াতের মহিলা বিভাগের অনেকেই সংসদে গেছেন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শরিক দল জামায়াতের চারজন, তার আগে ১৯৯৬ সালে দুজন এবং এবার দলটির মনোনয়নে ১৩ নারী সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ইসলামপন্থী দলগুলোর নারীদের শীর্ষ পদে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরেও কোনো ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল নারীকে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুননিসা সিদ্দীকা বলেছিলেন, ‘ইসলামে আছে নারীরা সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসতে পারেন না– আমরা এটি মেনে নিয়েছি। নারীরা জামায়াতের আমির হতে পারবেন না। আমরা একটি ইসলামী দল। আসলে পুরুষই নারীর পরিচালক, এটা মেনে নিয়েই রাজনীতিতে এসেছি।’
ইসলামপন্থী অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই ব্যাপারে অভিন্ন মত পাওয়া গেছে। যদিও জামায়াতের মহিলা বিভাগের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান হাবিবা চৌধুরী সুইট স্ট্রিমকে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী হওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। সব দিক বিবেচনায় জামায়াত শুধু স্থানীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী দিচ্ছে। উপযুক্ত সময়ে সংসদ নির্বাচনেও নারী প্রার্থী দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ স্ট্রিমকে বলেন, অনেক দিন ধরেই নারীদের মাঝে কাজ করার প্রয়োজন আমরা অনুভব করছিলাম। নির্বাচনের সময় এটা আরও বেশি উপলব্ধি করলাম। দেশে নারী তো অর্ধেকের বেশি। আমরা দেখলাম, পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করতে গেলে নারীদের ভিন্ন রেখে সম্ভব নয়।
নারী সংগঠনের কাজের ধরন কেমন হবে– প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছু কাজ অনলাইনভিত্তিক; কিছু অফলাইনে। অনেকটা তাবলিগের মাস্তুরাত জামাতের (নারী শাখা) আদলে শুরু করা হবে। নারী শাখাকে আপাতত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক রূপ দেওয়া হবে না।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিএনপির উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের আর কোনো নেতাকর্মীর ওপর হামলা হলে, রাজনৈতিকভাবে মিলেমিশে থাকার চুক্তি থেকে বেরিয়ে পড়ব। আমরা আমাদের পদ্ধতি জানি, কীভাবে সন্ত্রাসীদের শায়েস্তা করতে হয়।
২১ ঘণ্টা আগে
সীমান্তে ভারতের পুশইন সমস্যার সমাধানে সরকারকে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। শনিবার (৬ জুন) দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার ঈদ পুনর্মিলনীতে মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমদ এই দাবি জানান।
১ দিন আগে
জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। গণসংহতি আন্দোলন আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় এই সংকট কাটাতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে।
১ দিন আগে
ইসলামী ব্যাংক সবার ব্যাংক উল্লেখ করে গ্রহণযোগ্য কেউকে নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু।
১ দিন আগে