leadT1ad

সৈয়দপুরে নির্বাচনী প্রচারে উর্দু: বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তির রাজনীতি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নীলফামারী

সৈয়দপুরে নির্বাচনী প্রচারণায় উর্দু ভাষায় মাইকিং করা হচ্ছে। স্ট্রিম ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের মতো নীলফামারীর নির্বাচনী এলাকাগুলোও এখন সরগরম। তবে উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারীর সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত নীলফামারী-৪ আসনে এবার এক ভিন্নধর্মী নির্বাচনী সংস্কৃতির দেখা মিলছে। এখানে অটোরিকশায় প্রচার মাইক বেঁধে প্রার্থীদের যে গান বা ভোট প্রার্থনা শোনা যাচ্ছে, তা কেবল বাংলায় নয়, সমানতালে চলছে উর্দু ভাষায়।

প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে এবং তাদের মন জয় করতে উর্দুকে এক কৌশলগত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও, সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা একে দেখছেন সৈয়দপুরের দীর্ঘদিনের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবে।

ভাষাগত বৈচিত্র্য: সৈয়দপুরের ঐতিহাসিক পরম্পরা

সৈয়দপুরে নির্বাচনী প্রচারণায় উর্দুর ব্যবহার কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি এই শহরের দেড়শ বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্যের ফসল। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৭০ সালে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বৃহত্তম ওয়ার্কশপ। এই শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে উত্তর ভারত (বিহার, উত্তর প্রদেশ), মাড়ওয়ার, আসাম, কাবুল, কাশ্মীর এমনকি উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আসা দক্ষ কারিগর, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই শহর।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই এখানে বাংলা, উর্দু, ভোজপুরি, মাড়ওয়ারি এবং আঞ্চলিক বাহে ভাষার এক অনন্য সহাবস্থান তৈরি হয়েছিল। ১৯৭১ পূর্ববর্তী সময়ে সৈয়দপুর ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। আজকের এই প্রচারণায় উর্দুর ব্যবহার মূলত সেই ভাষাগত বৈচিত্র্যেরই একটি ধারাবাহিকতা, যেখানে ভোটারদের নিজস্ব ভাষায় বার্তা পৌঁছানোকে একটি গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভোট রাজনীতির সমীকরণ ও জীবনমানের লড়াই

বর্তমানে সৈয়দপুর পৌরসভায় প্রায় ৬০ হাজার উর্দুভাষী ভোটার রয়েছেন। এই সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। এই ভোটব্যাংক যেকোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক। অতীতে ২২টি ক্যাম্পের এই ভোটাররা ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়েছেন, যা বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।

বরাবরের মতো এবারও প্রার্থীরা ক্যাম্পগুলোতে গিয়ে উর্দুর পাশাপাশি বাংলায় বক্তব্য রাখছেন। তবে ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি ও ক্ষোভ কাজ করছে। হাতিখানা বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা মুন্না মিয়া ও আমেরিকান ক্যাম্পের বাসিন্দা গুড্ডু আলীর কণ্ঠে ফুটে উঠেছে একই হাহাকার—‘ভোটের সময় প্রার্থীরা আসেন, প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু আমাদের জীবনমানের পরিবর্তন হয় না।’ দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক অবহেলা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবই এখন তাঁদের মূল চিন্তার বিষয়।

বিতর্ক বনাম গণতান্ত্রিক অধিকার

ফেব্রুয়ারি মাস চলায় এবং ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে উর্দুর ব্যবহার নিয়ে কিছু মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলার দেশে উর্দুতে প্রচারণা অনুভূতির ওপর আঘাত। তবে সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, ১৯৫২-এর আন্দোলন ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার অধিকার আদায়ের লড়াই, অন্য কোনো ভাষা নিষিদ্ধ করার জন্য নয়। ২০২৪-২৫ এর বর্তমান বাংলাদেশে এই উর্দুভাষীরাও পূর্ণ নাগরিক এবং ভোটার। ফলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের জন্য তাদের বোধগম্য ভাষায় প্রচারণা কোনোভাবেই অসাংবিধানিক নয়।

সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিলার মতে, নির্বাচনী আইনে প্রার্থীদের নিজস্ব কৌশলে প্রচারণার সুযোগ রয়েছে, যতক্ষণ তা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে না।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ

সৈয়দপুর এক অবহেলিত শিল্প শহর। স্বাধীনতার পর অনেক বড় বড় শহর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনে রূপান্তরিত হলেও সৈয়দপুর তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। এর একটি বড় কারণ ভাষাগত ও জাতিগত মেরুকরণ এবং সামাজিক বিচ্যুতি।

সৈয়দপুর উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল মনে করেন, নির্বাচনী প্রচারণা কেবল ভাষার ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং উর্দুভাষীদের মূলধারার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ভোটের এই মরসুমে সৈয়দপুরের অলিগলিতে উর্দু গানের সুর কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রে বৈচিত্র্যই শক্তি। যদি এই ভাষা ব্যবহার কেবল ভোট পাওয়ার হাতিয়ার না হয়ে সামাজিক সংহতি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার মাধ্যম হয়, তবেই সৈয়দপুর আবারও তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত