উত্তরের জনপদ নাটোর। কৃষি, শিল্প ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিনের কিছু অমীমাংসিত সংকট এখন নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) আসনের নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনের ভোটারদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে গ্যাস সংযোগের বঞ্চনা, কৃষি পণ্যের সংরক্ষণাগার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘নীরব’ চাঁদাবাজির অবসান।
নাটোর সদর আসনের মানুষের দীর্ঘ দেড় দশকের আক্ষেপ—গ্যাস সংযোগ। ভোটারদের মতে, জমি সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও শুধু গ্যাসের অভাবে জেলা সদরে বড় কোনো বিনিয়োগ আসেনি। নাটোরের ওপর দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করে পাশের জেলা রাজশাহীতে শিল্পায়ন হলেও নাটোরে জ্বালানি খরচ ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বার্থে এবার গ্যাসকেই প্রধান নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে দেখছেন ভোটাররা।
স্থানীয় ভোটার আশরাফ আলী বলেন, রাজশাহীর লোকজন গ্যাস পেলেও আমরা পাই না। সহজে গ্যাস পেলে এখানে অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠত এবং কর্মসংস্থান তৈরি হতো।
নলডাঙ্গা উপজেলার বিশাল হালতি বিল এলাকার অর্থনীতি মূলত ধান ও পেঁয়াজ নির্ভর। তবে উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার বা সংরক্ষণাগার না থাকায় কৃষকদের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে। এছাড়া আবাদ মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট, ডিজেলের বাড়তি দাম এবং সেচ সংকট স্থানীয় কৃষকদের দিশেহারা করে তুলেছে।
কৃষক আবেদ মন্ডল জানান, সারের সংকট, ডিজেলের দাম বেশি—সব মিলিয়ে কৃষকেরা বেশ বিপদে আছেন।
শহরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘নীরব চাঁদাবাজি’ এখন প্রকট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শহরের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা নতুন করে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা মুখ না খুললেও এবারের ভোটে তারা এমন নেতৃত্ব চান যারা এই জুলুম থেকে তাদের মুক্তি দেবেন।
শহরের কানাইখালি এলাকার ব্যবসায়ী শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা চাই না এমপির নাম ভাঙিয়ে কেউ আমাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলুক। জুলুমবাজদের জনগণ গ্রহণ করবে না।’
নির্বাচনি আলোচনায় লক্ষ্মীপুর খোলবাড়িয়ার ঔষধি গ্রাম ও চকবৈদ্যনাথের চামড়া মোকামের সমস্যার সমাধানও উঠে এসেছে। ভেষজ অর্থনীতি ও চামড়া সংরক্ষণে লবণের সহজলভ্যতার দাবি অনেকদিনের। এছাড়া নারদ নদ রক্ষা, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহ এবং হয়রানিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি চান ভোটাররা।
নাটোর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৬ জন প্রার্থী থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে সরব রয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের দুই হেভিওয়েট প্রার্থী।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে এবং বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে নাটোরবাসীকে গ্যাস দিতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশে ব্যবসায়ীরা নির্ভয়ে ব্যবসা করবেন। দলের কেউ দখল বা নৈরাজ্যে জড়িত থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক ইউনুস আলী বলেন, ‘জামায়াত প্রতিষ্ঠিত ইনসাফের ওপর। কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না। আমরা শুধু গ্যাস নয়, নাগরিক জীবনের সব নাগরিক সুবিধার ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করব। ভেষজ পণ্য যেমন অ্যালোভেরা রপ্তানিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আমরা কাজ করব।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘ভোটারা এখন অনেক সচেতন। লবনের সহজলভ্যতা, সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সহজলভ্যতা, ইত্যাদি নাগরিক সেবা এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। যিনিই এমপি নির্বাচিত হোন, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থবিরোধী কাজ বন্ধ করাই হবে তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ।’