অধ্যাদেশ বিতর্ক

উপস্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপিতেও অসন্তোষ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৪২
সংবিধানে এটা আছে, ওটা নেই। সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না– এসব বক্তব্যে মানুষ নেতিবাচক বার্তা পেয়েছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব অধ্যাদেশ বাতিলে হয়েছে, সেগুলোকে যৌক্তিক মনে করেন বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মী। তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল ও সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে দলটিতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা বলছেন, অধ্যাদেশগুলো বাতিলে যৌক্তিক কারণ থাকলেও সংসদে পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি দায়িত্বশীলরা। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে যেমন আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন বিরোধী দলের নেতারা, তেমনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

গত ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা হয়। সভা সূত্র জানায়, সেখানে সংসদ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়– বাতিল ও সংশোধনের জন্য থাকা অধ্যাদেশগুলো নিয়ে কেউ যেন নেতিবাচক বক্তব্য না দেন। বরং কৌশল হিসেবে সবাইকে ‘অধিকতর যাচাই-বাছাই’ করে এগুলোর ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে– এমন বক্তব্য দিতে বলা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বৈধতা প্রশ্নে জাতীয় সংসদের সাংবিধানিক নিষ্পত্তির কাজ শেষ হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ছয় দিনে মোট ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছে। এর মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশকে ৮৭টি বিল পাসের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর যেগুলো আইনে পরিণত হবে।

চারটি পৃথক রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। সংসদে বিল আকারে অনুমোদন না পাওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশ বাস্তবায়নের পথে। যে চারটি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলো অবশ্যই আরও পর্যালোচনা করা হবে। যেকোনো বিষয়ের একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। এসব অধ্যাদেশ নিয়েও বিভিন্ন পক্ষ তাদের অবস্থান থেকে কথা বলছে, এটিতে আমরা ইতিবাচকভাবে নিয়েছি।

কথায় কথায় সংবিধান টানা নিয়ে অসন্তোষ

সরকার গঠনের পরে গত ৭ এপ্রিল প্রথম বৈঠক করে স্থায়ী কমিটি। সেখানে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করা হয়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা করেন তারা। সংকট মোকাবিলায় শুরুতে মন্ত্রী-এমপিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়হীনতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে যে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষণ দেন নেতারা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভালো করার জন্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নতুন কমিটির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্র জানায়, একপর্যায়ে তিনি সিনিয়র নেতা সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ উপস্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন– যেভাবে কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল ও সংশোধনের সুপারিশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এই কারণে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে কিনা, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নেতারা। পরে পুরো পরিস্থিতি বিবেচনায় দলীয় সংসদ সদস্যদের অধ্যাদেশগুলোর ব্যাপারে সচেতনভাবে মন্তব্য করার নির্দেশনা দেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য স্ট্রিমকে বলেন, চলমান ইস্যুতে জামায়াতসহ বিরোধী দলের আন্দোলনকে আমরা পাত্তা দিচ্ছি না। কারণ, আমরা জুলাই সনদ কিংবা অধ্যাদেশের কি কি বাস্তবায়ন করব, তা নির্বাচনের আগেই জনগণকে জানিয়েছি।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনা তাঁর শাসনকালের নানা অনিয়ম জায়েজ করতেন। অধ্যাদেশ নিয়ে কয়েক মন্ত্রী-এমপির সংসদে দেওয়া বক্তব্য মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। বিশেষ করে সংবিধানে এটা আছে, ওটা নেই। সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না– এসব বক্তব্যে মানুষ নেতিবাচক বার্তা পেয়েছে। সংসদে তাদের উপস্থাপন প্রক্রিয়া নিয়ে দলের ভেতরেও যে অসন্তোষ রয়েছে, তা বৈঠকে আলোচনা করা হয়।

গণভোট, গুম ও পুলিশ কমিশন নিয়ে অনিশ্চয়তা

সংসদে না তোলায় কার্যকারিতা হারিয়েছে যে ১৩টি অধ্যাদেশ, সেগুলো হলো– গণভোট অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ।

এসব অধ্যাদেশের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর আইনি পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে হওয়া কার্যক্রম, গুমবিরোধী কাঠামো বা পুলিশ সংস্কার কমিশন-সংক্রান্ত উদ্যোগগুলোর অবস্থান এখন আলাদা আইনি ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যদিও সংসদে বিতর্কের সময় আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনেই বলেছেন, বিশেষ কমিটির সুপারিশে যেসব অধ্যাদেশ এখন বিল আকারে তোলা হয়নি, সেগুলো ভবিষ্যতে আবার আনা হবে। তাদের ভাষ্য, ‘ল্যাপস’ মানেই আলোচনার সমাপ্তি নয়; প্রয়োজনে নতুন বিল আকারে সেগুলো আবার সংসদে আসতে পারে।

এসব অধ্যাদেশের বিষয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বেশির ভাগ অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে পাস করার পক্ষে আমরা এবং সেটিই হচ্ছে। তবে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগ সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট চারটি অধ্যাদেশ সংশোধন ছাড়া পাস হলে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। ফলে এগুলো আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুনভাবে আনা দরকার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিব স্ট্রিমকে বলেছেন, এগুলো সরকারের বিষয়। তাই দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাই সতর্ক। তবে এটি স্পষ্ট, অন্তর্বর্তী সরকারের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ হুবহু বাস্তবায়ন করা হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে।

তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছর সবচেয়ে বেশি হয়রানি ও অন্যায়ের শিকার হয়েছে আমাদের নেতাকর্মী। আমরা সব সময় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু বিচার বিভাগ সম্পর্কিত কাঠামোগত পরিবর্তনের অধ্যাদেশ পর্যাপ্ত আলোচনার মাধ্যমে হয়নি। এগুলো নিয়ে আরও পর্যালোচনা হওয়া দরকার। আমরা মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু অতিরিক্ত ক্ষমতা দিলে সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

সম্পর্কিত