রাতুল আল আহমেদ

গতকাল ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ এক ‘সৃজনশীল’ কাজের দেখা পেলাম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩ সালের যুগান্তকারী কালি-কলমে আঁকা দুর্ভিক্ষ সিরিজকে তুলে আনা হয়েছে নেকলেসে। ক্লে-এর ওপর অ্যাক্রিলিকে আঁকা, তাতে রেজিনের প্রলেপ, আর সঙ্গত দিচ্ছে কাঠের পুঁতি। আজকের পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এ অবশ্য নতুন কিছু নয়! ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ হোক কি গুস্তাভ ক্লিমটের ‘দ্য কিস’, সবই এখন শাড়ি থেকে শুরু করে পাপোশে বসিয়ে দেদার বিক্রিবাট্টা চলছে। কিন্তু শিল্পের এহেন অবস্থাকে আমরা কীভাবে রিড করব? শিল্প কি এর মধ্য দিয়ে মানুষের আরও নিকটবর্তী হয়ে উঠছে, নাকি ঘটছে ঠিক উল্টোটা? চলুন, সেটাই অ্যানালাইসিসের চেষ্টা করে দেখা যাক।
যিনি নেকলেসটি বানিয়েছেন, তিনি ক্যাপশনে লিখেছেন (অবশ্যই ইংরেজিতে, যার ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়): ‘আমার কাজের দর্শন অনুযায়ী, শিল্পকে যখন প্রদর্শন করা হয় তখনই তা সবচেয়ে সার্থক হয়ে ওঠে। জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকা এক সংগ্রামের বিষয়কে যখন আমার কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ এল, তখন আমি অত্যন্ত গর্বিত হয়েছিলাম। একজন কিংবদন্তির অনুপ্রেরণায় এমন কিছু তৈরি করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি, যা আমাদের গড়ে তোলার পেছনের সংগ্রামের একটি প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছে।’

এখান থেকেই কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক। জয়নুল আবেদিন দুর্ভিক্ষের সিরিজ আঁকেন পঞ্চাশের মন্বন্তরের পরিপ্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ সেনাদের জন্য খাদ্য মজুত করার ফলে কেবল বাংলাতেই ত্রিশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। স্পষ্টই, এটি কোনো জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম ছিল না। কিন্তু ওই ক্যাপশন পড়লে কি আমাদের সে কথা মনে পড়ে? বরং মনে হয় অত্যন্ত জেনেরিক কিছু বাক্য।
জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলোকে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম বা গর্বের মোড়কে উপস্থাপন করা ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের সেই বিখ্যাত সতর্কবার্তাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়— ‘সভ্যতার এমন কোনো দলিল নেই, যা একই সাথে বর্বরতার দলিল নয়।’ এই গড়পড়তা ক্যাপশনটি ঠিক সেই কাজটাই করছে। দুর্ভিক্ষকে একটি সরলরৈখিক ইতিহাসের অংশ বানানো হয়। যাকে বেঞ্জামিন হোমোজেনাস ও এম্পটি টাইম হসেবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে অন্তত ত্রিশ লাখ মানুষের অনাহারে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মৃত্যু কেবলমাত্র একটি নেশনের ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাকগ্রাউন্ড হয়ে রয়।

এই অন্তঃসারশূন্য বাক্যগুলোর মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে অতীতের প্রকৃত যন্ত্রণা ও রাজনৈতিক সত্য ঢাকা পড়ে যায়। জয়নুলের প্রতিবাদের শিল্পকে স্রেফ ফ্লন্টিংয়ের বস্তুতে পরিণত করে তার ভেতরের ঔপনিবেশিক শোষণের নগ্ন ইতিহাসকে রেজিনের পরত দিয়ে আড়াল করে দেওয়া হচ্ছে। বেঞ্জামিনের মতে, ইতিহাসকে ‘উল্টো পিঠ থেকে’ পড়তে হয়, যাতে শোষিতের হাহাকার শোনা যায়। আর এখানে দুর্ভিক্ষকে জাতীয় অনুপ্রেরণার একটি জেনারেলাইজড বয়ানে আটকে ফেলে সেই মৃত মানুষগুলোকে যেন আরও একবার মেরে ফেলা হচ্ছে তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণকে মুছে ফেলার মাধ্যমে।
তাত্ত্বিক কাঁটাছেঁড়ায় আরও এগিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের বোঝা দরকার আসলে ঠিক কী রূপান্তরিত হচ্ছে। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো যখন ১৯৪৩-এর বাংলায় তৈরি হয়েছিল, তখন সেগুলো কোনো গ্যালারি বা ড্রয়িংরুমের দেয়ালের শোপিস হিসেবে আঁকা হয়নি। জয়নুল সস্তা কাগজে কালি আর তুলির দ্রুত টানে এই হাড়জিরজিরে শরীরগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ছবিগুলো যে কেবল কালির আঁচড়ে আঁকা, তা কিন্তু জয়নুলের কোনো রঙের সংকটের কারণে ঘটেনি। বরং, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে শিল্পীরা প্রায়ই রঙের জৌলুস বর্জন করে চরম রূঢ়তাকে ফুটিয়ে তুলতে চান। যেমনটা আমরা দেখি পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত ‘গুয়ের্নিকা’ চিত্রে। জীবনের এই নগ্ন নির্মমতা ও হাহাকার ব্যাখ্যা করতে সাদা-কালোকেই সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন কালজয়ী শিল্পীরা।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ যে পুরোপুরি মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। জয়নুলের স্কেচগুলো ছিল সেই শোষণের বিরুদ্ধে পৃথিবীর মানুষের কাছে এক জ্বলন্ত অভিযোগনামা। কিন্তু ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো এই নেকলেসটিতে ঘটেছে ঠিক তার উল্টোটা। পেন্ডেন্টটি দুর্ভিক্ষের চরিত্রগুলোকে তুলে নিয়ে রেজিনের নিচে বন্দী করেছে, যোগ করেছে কাঠের পুঁতি, একে বানিয়েছে ক্রাফট, দিয়েছে এস্থেটিক রূপ। এই বস্তুটি জয়নুলের কাজগুলোর স্রেফ নকলই করেনি, বরং যে রাজনৈতিক দর্শনের ওপর ছবিগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, তাকেই পুরোপুরি গায়েব করে দিয়েছে।

এ অবস্থাকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায় মিলান কুন্ডেরার ‘ট্রমা কিচ’ বা যন্ত্রণার পরিপাটি সংস্করণের ধারণা দিয়ে। কিচ হলো এমন এক ধরনের শিল্প, যা বাস্তবতার যাবতীয় কদর্যতা বা অস্বস্তিকর সত্যকে অস্বীকার করে তাকে একটি মোলায়েম আর গ্রহণযোগ্য মোড়কে পেশ করে। কিচ এর কাজ হলো পৃথিবীকে এমনভাবে দেখানো যা আমাদের মনকে শান্ত রাখবে। জয়নুল আবেদিনের স্কেচগুলোর মূল শক্তিই ছিল এর কদর্যতায়—খোলা ড্রেন, কাক-কুকুরের সঙ্গে মানুষের উচ্ছিষ্টের লড়াই আর অনাহারী উলঙ্গ শরীর। কিন্তু এই নেকলেসটিতে সেই ট্রমাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আক্ষরিক অর্থেই ‘কিচায়ন’ করা হয়েছে। যখন ট্রমা ‘কিচ’ হয়ে ওঠে, তখন ক্রেতার আর কোনো অস্বস্তি থাকে না; বরং তিনি একধরনের বিবেকের দংশন থেকে দায়মুক্তি পান। একেই বলা যায় ‘ট্রমা কিচ’—যেখানে মৃত্যু আর হাহাকার কেবল একটা কিউট ফ্যাশন এক্সেসরিজ। এই নেকলেসটি পরার মাধ্যমে মানুষ আসলে ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে সম্মান জানাচ্ছে না, বরং ট্র্যাজেডির ভয়াবহতাকে একধরনের পপ-কালচার গ্ল্যামারে ঢেকে দিচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আধুনিক ভোগবাদী সমাজে মানুষ কেবল পণ্য কেনে না, বরং সেই পণ্যের মাধ্যমে নিজের একটি আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচয় তৈরি করে। সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়োর ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ ধারণার আলোকে ব্যাখ্যা করলে এই নেকলেসটি কেবল একটি গহনা থাকে না। এটি বরং যে পরছে তাঁর রুচি, শিক্ষা এবং প্রগতিশীলতার সার্টিফিকেট হয়ে গলায় ঝুলে থাকে। যিনি এটি পরছেন, তিনি নিজের চারপাশের মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে তিনি সাধারণ বা সস্তা কোনো গহনা পরেন না; তিনি এমন কিছু পরেন যার পেছনে একটি ইতিহাস আছে, নন্দনতাত্ত্বিক গভীরতা আছে। অর্থাৎ, নিজের আর্থিক সক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়েও এখানে বেশি জরুরি হয়ে ওঠে নিজের বৌদ্ধিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে হাইলাইট করা। মোরাল স্ট্যাটাস সিগন্যালিং বা ভার্চু সিগন্যালিং মূলত এই কাজটাই করে। এটি মূলত অন্যের চোখে নিজেকে একজন সংবেদনশীল ও উচ্চমার্গীয় মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক সুচতুর কৌশল।
এখান থেকেই উন্মোচিত হয় এই সিগন্যালিংয়ের সবচেয়ে নির্মম দিকটি। একটি মন্বন্তর, যেখানে ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হয়ে ত্রিশ লাখ মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মরেছে, সেই চরমতম হাহাকার এখানে পরিণত হচ্ছে ড্রয়িংরুম বা আর্ট গ্যালারির আড্ডায় কনভারসেশন স্টার্টার হিসেবে। আশঙ্কা করি, ‘বাহ, তোমার নেকলেসটা তো খুব সুন্দর, জয়নুলের স্কেচ না?’— হ্যাংআউটে এ ধরনের সম্ভাব্য প্রশংসা ও দেখনদারির জন্যই মূলত পণ্যটি কেনা হতে পারে। এখানে ক্রেতা দুর্ভিক্ষের প্রকৃত যন্ত্রণাকে নিজের ভেতর ধারণ করছেন না, বরং সেই ইতিহাসকে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিজেকে একজন ইতিহাস-সচেতন ও প্রগতিশীল নাগরিক হিসেবে পারফর্ম করছেন। এটি একধরনের মেকি সংবেদনশীলতা, যেখানে সহানুভূতির কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই, আছে কেবল সহানুভূতির দেখনদারি। এই পারফরম্যান্সের জন্য অন্যের চরমতম দুর্দশাকে ব্যবহার করাটাই একধরনের কাঠামোগত নৈতিক দেউলিয়াত্ব। যে ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর পরনে এক টুকরো সুতা ছিল না, জয়নুলের কলমের আঁচ আসা তাঁদের সেই কঙ্কালসার শরীরগুলো হয়ত ব্যবহার হবে শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা এলিট শ্রেণির সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে। শোষিতের যন্ত্রণাকে পুঁজি করে বর্তমানের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি নিজেদের জন্য মোরাল হাইগ্রাউন্ড তৈরি করছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জয়নুল আবেদিনের স্কেচগুলো তার আদি রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষাটি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে এবং চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে পরিধানকারীর ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং বা ইমেজ নির্মাণের কাছে।
সবশেষে, প্রশ্নটি কেবল আর আসলে একটি নেকলেসের নয়। মূলত স্মৃতি, শিল্প এবং নৈতিকতার। কোনো ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে শিল্পের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ বা পুনর্ব্যবহার করাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমস্যাজনক নয়। সমস্যাটি শুরু হয় তখনই, যখন সেই শিল্প তার ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শোষণের সাক্ষ্য বহনের দায় হারিয়ে কেবল নান্দনিক ভোগের বস্তু বা ব্যক্তিগত নৈতিক পরিচয় প্রদর্শনের অনুষঙ্গে পরিণত হয়। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলোর শক্তি ছিল ক্ষুধার্ত মানুষের হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ায়, দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে ঔপনিবেশিক সহিংসতার মুখোমুখি দাঁড় করানোয়। যদি সেই অস্বস্তিই রেজিনের চকচকে আবরণে ঢাকা পড়ে যায়, তবে আমরা শিল্পকে নয়, শিল্পের স্মৃতিকেই ভোগ করছি। যে ইতিহাস আমাদের বিবেককে বিচলিত করার কথা, সেটিই যদি শেষ পর্যন্ত আমাদের রুচি ও সংবেদনশীলতার অলংকারে পরিণত হয়, তাহলে প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে ওঠে: আমরা কি সত্যিই অতীতকে স্মরণ করছি, নাকি তাকে স্রেফ পণ্য বানাচ্ছি?

গতকাল ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ এক ‘সৃজনশীল’ কাজের দেখা পেলাম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩ সালের যুগান্তকারী কালি-কলমে আঁকা দুর্ভিক্ষ সিরিজকে তুলে আনা হয়েছে নেকলেসে। ক্লে-এর ওপর অ্যাক্রিলিকে আঁকা, তাতে রেজিনের প্রলেপ, আর সঙ্গত দিচ্ছে কাঠের পুঁতি। আজকের পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এ অবশ্য নতুন কিছু নয়! ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ হোক কি গুস্তাভ ক্লিমটের ‘দ্য কিস’, সবই এখন শাড়ি থেকে শুরু করে পাপোশে বসিয়ে দেদার বিক্রিবাট্টা চলছে। কিন্তু শিল্পের এহেন অবস্থাকে আমরা কীভাবে রিড করব? শিল্প কি এর মধ্য দিয়ে মানুষের আরও নিকটবর্তী হয়ে উঠছে, নাকি ঘটছে ঠিক উল্টোটা? চলুন, সেটাই অ্যানালাইসিসের চেষ্টা করে দেখা যাক।
যিনি নেকলেসটি বানিয়েছেন, তিনি ক্যাপশনে লিখেছেন (অবশ্যই ইংরেজিতে, যার ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়): ‘আমার কাজের দর্শন অনুযায়ী, শিল্পকে যখন প্রদর্শন করা হয় তখনই তা সবচেয়ে সার্থক হয়ে ওঠে। জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকা এক সংগ্রামের বিষয়কে যখন আমার কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ এল, তখন আমি অত্যন্ত গর্বিত হয়েছিলাম। একজন কিংবদন্তির অনুপ্রেরণায় এমন কিছু তৈরি করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি, যা আমাদের গড়ে তোলার পেছনের সংগ্রামের একটি প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছে।’

এখান থেকেই কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক। জয়নুল আবেদিন দুর্ভিক্ষের সিরিজ আঁকেন পঞ্চাশের মন্বন্তরের পরিপ্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ সেনাদের জন্য খাদ্য মজুত করার ফলে কেবল বাংলাতেই ত্রিশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। স্পষ্টই, এটি কোনো জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম ছিল না। কিন্তু ওই ক্যাপশন পড়লে কি আমাদের সে কথা মনে পড়ে? বরং মনে হয় অত্যন্ত জেনেরিক কিছু বাক্য।
জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলোকে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম বা গর্বের মোড়কে উপস্থাপন করা ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের সেই বিখ্যাত সতর্কবার্তাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়— ‘সভ্যতার এমন কোনো দলিল নেই, যা একই সাথে বর্বরতার দলিল নয়।’ এই গড়পড়তা ক্যাপশনটি ঠিক সেই কাজটাই করছে। দুর্ভিক্ষকে একটি সরলরৈখিক ইতিহাসের অংশ বানানো হয়। যাকে বেঞ্জামিন হোমোজেনাস ও এম্পটি টাইম হসেবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে অন্তত ত্রিশ লাখ মানুষের অনাহারে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মৃত্যু কেবলমাত্র একটি নেশনের ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাকগ্রাউন্ড হয়ে রয়।

এই অন্তঃসারশূন্য বাক্যগুলোর মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে অতীতের প্রকৃত যন্ত্রণা ও রাজনৈতিক সত্য ঢাকা পড়ে যায়। জয়নুলের প্রতিবাদের শিল্পকে স্রেফ ফ্লন্টিংয়ের বস্তুতে পরিণত করে তার ভেতরের ঔপনিবেশিক শোষণের নগ্ন ইতিহাসকে রেজিনের পরত দিয়ে আড়াল করে দেওয়া হচ্ছে। বেঞ্জামিনের মতে, ইতিহাসকে ‘উল্টো পিঠ থেকে’ পড়তে হয়, যাতে শোষিতের হাহাকার শোনা যায়। আর এখানে দুর্ভিক্ষকে জাতীয় অনুপ্রেরণার একটি জেনারেলাইজড বয়ানে আটকে ফেলে সেই মৃত মানুষগুলোকে যেন আরও একবার মেরে ফেলা হচ্ছে তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণকে মুছে ফেলার মাধ্যমে।
তাত্ত্বিক কাঁটাছেঁড়ায় আরও এগিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের বোঝা দরকার আসলে ঠিক কী রূপান্তরিত হচ্ছে। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো যখন ১৯৪৩-এর বাংলায় তৈরি হয়েছিল, তখন সেগুলো কোনো গ্যালারি বা ড্রয়িংরুমের দেয়ালের শোপিস হিসেবে আঁকা হয়নি। জয়নুল সস্তা কাগজে কালি আর তুলির দ্রুত টানে এই হাড়জিরজিরে শরীরগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ছবিগুলো যে কেবল কালির আঁচড়ে আঁকা, তা কিন্তু জয়নুলের কোনো রঙের সংকটের কারণে ঘটেনি। বরং, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে শিল্পীরা প্রায়ই রঙের জৌলুস বর্জন করে চরম রূঢ়তাকে ফুটিয়ে তুলতে চান। যেমনটা আমরা দেখি পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত ‘গুয়ের্নিকা’ চিত্রে। জীবনের এই নগ্ন নির্মমতা ও হাহাকার ব্যাখ্যা করতে সাদা-কালোকেই সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন কালজয়ী শিল্পীরা।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ যে পুরোপুরি মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। জয়নুলের স্কেচগুলো ছিল সেই শোষণের বিরুদ্ধে পৃথিবীর মানুষের কাছে এক জ্বলন্ত অভিযোগনামা। কিন্তু ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো এই নেকলেসটিতে ঘটেছে ঠিক তার উল্টোটা। পেন্ডেন্টটি দুর্ভিক্ষের চরিত্রগুলোকে তুলে নিয়ে রেজিনের নিচে বন্দী করেছে, যোগ করেছে কাঠের পুঁতি, একে বানিয়েছে ক্রাফট, দিয়েছে এস্থেটিক রূপ। এই বস্তুটি জয়নুলের কাজগুলোর স্রেফ নকলই করেনি, বরং যে রাজনৈতিক দর্শনের ওপর ছবিগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, তাকেই পুরোপুরি গায়েব করে দিয়েছে।

এ অবস্থাকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায় মিলান কুন্ডেরার ‘ট্রমা কিচ’ বা যন্ত্রণার পরিপাটি সংস্করণের ধারণা দিয়ে। কিচ হলো এমন এক ধরনের শিল্প, যা বাস্তবতার যাবতীয় কদর্যতা বা অস্বস্তিকর সত্যকে অস্বীকার করে তাকে একটি মোলায়েম আর গ্রহণযোগ্য মোড়কে পেশ করে। কিচ এর কাজ হলো পৃথিবীকে এমনভাবে দেখানো যা আমাদের মনকে শান্ত রাখবে। জয়নুল আবেদিনের স্কেচগুলোর মূল শক্তিই ছিল এর কদর্যতায়—খোলা ড্রেন, কাক-কুকুরের সঙ্গে মানুষের উচ্ছিষ্টের লড়াই আর অনাহারী উলঙ্গ শরীর। কিন্তু এই নেকলেসটিতে সেই ট্রমাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আক্ষরিক অর্থেই ‘কিচায়ন’ করা হয়েছে। যখন ট্রমা ‘কিচ’ হয়ে ওঠে, তখন ক্রেতার আর কোনো অস্বস্তি থাকে না; বরং তিনি একধরনের বিবেকের দংশন থেকে দায়মুক্তি পান। একেই বলা যায় ‘ট্রমা কিচ’—যেখানে মৃত্যু আর হাহাকার কেবল একটা কিউট ফ্যাশন এক্সেসরিজ। এই নেকলেসটি পরার মাধ্যমে মানুষ আসলে ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে সম্মান জানাচ্ছে না, বরং ট্র্যাজেডির ভয়াবহতাকে একধরনের পপ-কালচার গ্ল্যামারে ঢেকে দিচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আধুনিক ভোগবাদী সমাজে মানুষ কেবল পণ্য কেনে না, বরং সেই পণ্যের মাধ্যমে নিজের একটি আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচয় তৈরি করে। সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়োর ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ ধারণার আলোকে ব্যাখ্যা করলে এই নেকলেসটি কেবল একটি গহনা থাকে না। এটি বরং যে পরছে তাঁর রুচি, শিক্ষা এবং প্রগতিশীলতার সার্টিফিকেট হয়ে গলায় ঝুলে থাকে। যিনি এটি পরছেন, তিনি নিজের চারপাশের মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে তিনি সাধারণ বা সস্তা কোনো গহনা পরেন না; তিনি এমন কিছু পরেন যার পেছনে একটি ইতিহাস আছে, নন্দনতাত্ত্বিক গভীরতা আছে। অর্থাৎ, নিজের আর্থিক সক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়েও এখানে বেশি জরুরি হয়ে ওঠে নিজের বৌদ্ধিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে হাইলাইট করা। মোরাল স্ট্যাটাস সিগন্যালিং বা ভার্চু সিগন্যালিং মূলত এই কাজটাই করে। এটি মূলত অন্যের চোখে নিজেকে একজন সংবেদনশীল ও উচ্চমার্গীয় মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক সুচতুর কৌশল।
এখান থেকেই উন্মোচিত হয় এই সিগন্যালিংয়ের সবচেয়ে নির্মম দিকটি। একটি মন্বন্তর, যেখানে ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হয়ে ত্রিশ লাখ মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মরেছে, সেই চরমতম হাহাকার এখানে পরিণত হচ্ছে ড্রয়িংরুম বা আর্ট গ্যালারির আড্ডায় কনভারসেশন স্টার্টার হিসেবে। আশঙ্কা করি, ‘বাহ, তোমার নেকলেসটা তো খুব সুন্দর, জয়নুলের স্কেচ না?’— হ্যাংআউটে এ ধরনের সম্ভাব্য প্রশংসা ও দেখনদারির জন্যই মূলত পণ্যটি কেনা হতে পারে। এখানে ক্রেতা দুর্ভিক্ষের প্রকৃত যন্ত্রণাকে নিজের ভেতর ধারণ করছেন না, বরং সেই ইতিহাসকে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিজেকে একজন ইতিহাস-সচেতন ও প্রগতিশীল নাগরিক হিসেবে পারফর্ম করছেন। এটি একধরনের মেকি সংবেদনশীলতা, যেখানে সহানুভূতির কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই, আছে কেবল সহানুভূতির দেখনদারি। এই পারফরম্যান্সের জন্য অন্যের চরমতম দুর্দশাকে ব্যবহার করাটাই একধরনের কাঠামোগত নৈতিক দেউলিয়াত্ব। যে ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর পরনে এক টুকরো সুতা ছিল না, জয়নুলের কলমের আঁচ আসা তাঁদের সেই কঙ্কালসার শরীরগুলো হয়ত ব্যবহার হবে শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা এলিট শ্রেণির সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে। শোষিতের যন্ত্রণাকে পুঁজি করে বর্তমানের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি নিজেদের জন্য মোরাল হাইগ্রাউন্ড তৈরি করছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জয়নুল আবেদিনের স্কেচগুলো তার আদি রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষাটি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে এবং চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে পরিধানকারীর ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং বা ইমেজ নির্মাণের কাছে।
সবশেষে, প্রশ্নটি কেবল আর আসলে একটি নেকলেসের নয়। মূলত স্মৃতি, শিল্প এবং নৈতিকতার। কোনো ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে শিল্পের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ বা পুনর্ব্যবহার করাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমস্যাজনক নয়। সমস্যাটি শুরু হয় তখনই, যখন সেই শিল্প তার ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শোষণের সাক্ষ্য বহনের দায় হারিয়ে কেবল নান্দনিক ভোগের বস্তু বা ব্যক্তিগত নৈতিক পরিচয় প্রদর্শনের অনুষঙ্গে পরিণত হয়। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলোর শক্তি ছিল ক্ষুধার্ত মানুষের হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ায়, দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে ঔপনিবেশিক সহিংসতার মুখোমুখি দাঁড় করানোয়। যদি সেই অস্বস্তিই রেজিনের চকচকে আবরণে ঢাকা পড়ে যায়, তবে আমরা শিল্পকে নয়, শিল্পের স্মৃতিকেই ভোগ করছি। যে ইতিহাস আমাদের বিবেককে বিচলিত করার কথা, সেটিই যদি শেষ পর্যন্ত আমাদের রুচি ও সংবেদনশীলতার অলংকারে পরিণত হয়, তাহলে প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে ওঠে: আমরা কি সত্যিই অতীতকে স্মরণ করছি, নাকি তাকে স্রেফ পণ্য বানাচ্ছি?
.png)

হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন সেই ২০১২ সালে। কোনো রাইটার মইরা যাওয়ার পরে ইউজুয়ালি তার লিটারেরি জনরার সার্কুলেশনে একটা ন্যাচারাল ডিজরাপশন আসে। কিন্তু মারা যাওয়ার ১৪ বছর পরেও দেখা যাইতেছে, বাংলাদেশের কালচারাল পেরিফেরিতে 'হুমায়ূনীয়' লিটারেরি জনরার সার্কুলেশন বহাল তবিয়তেই আছে।
২৩ জুন ২০২৬
‘সোবার’ পেজটার সাথে আমার প্রথম পরিচয় তাদের ‘সুগারবেবি দীপ্তি সিরিজ’ এর থ্রুতে! সামাজিক অবক্ষয়ের নানা রকম আলামত তাদের পেজের মোটামুটি সকল কন্টেন্টে না চাইতেও উইঠা আসে। ফলে অল্প দিনেই আমি তাদের ফ্যান হয়ে যাই। আমি তাদের পডকাস্ট ‘লয় ভাগছে’ নিয়ে আবছা জানতাম, কিন্তু কোনোদিনও সেই সমন্ধে আমার আগ্রহ আসে নাই।
৩০ এপ্রিল ২০২৬
আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠছিলাম, ‘ডিশের লাইনের’ মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল ফ্রেন্ডস, সাইনফিল্ড, ম্যালকম ইন দ্য মিডল, স্ক্রাবসের মতো বহু সিটকম। প্রায় কুড়ি বছর পর, ১০ এপ্রিল ম্যালকম ইন দ্য মিডলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে চার পর্বের মিনিসিরিজ হিসেবে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হুলুতে মুক্তি পাওয়ার প্রথম ত
২৬ এপ্রিল ২০২৬
সম্প্রতি নেটস্ফিয়ার থিকা পলিটিক্যাল স্ফিয়ার–মোটামুটি সব জায়গাতেই একটা শব্দ প্রচুর শোনা যাইতেছে। সেই শব্দটা হইতেছে ‘গুপ্ত’।
২৫ এপ্রিল ২০২৬