সমাপ্তির পথে এ বছরের রমজান। আর মাত্র দুই দিন বা তিন দিন পরই শেষ হবে এই বরকতময় মাস। প্রকৃতির বসন্ত যেমন একসময় ফুরিয়ে যায়, তেমনি মানুষের অন্তরের বসন্তও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একজন মুমিনের জন্য অন্তরের সেই বসন্তের নাম—‘রমজান’।
বসন্ত এলে প্রকৃতিতে যেমন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়, গাছপালা সবুজে ভরে ওঠে, তেমনি রমজান এলেও মানুষের অন্তর নতুন প্রাণ পায়। রোজা, তারাবি, কোরআন তেলাওয়াত এবং দানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়। তাকওয়ার অনুশীলনে মুমিনের অন্তর যেন এক নির্মল সরোবরে অবগাহন করে।
রোজা পালনে বাহ্যিক কষ্ট থাকলেও অধিকাংশ মুমিনের কাছে রমজানের প্রতিটি দিনই এক ধরনের আনন্দের। কারণ এ সময় তারা খাদ্য-পানীয় ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি গোনাহ, অন্যায় ও অনাচার থেকেও নিজেদের সংযত রাখার চেষ্টা করে। আল্লাহর আদেশ পালন করার এই আত্মিক প্রশান্তিই রমজানকে তাদের কাছে আনন্দময় করে তোলে।
কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সময় মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত এবং সৎকর্মে অভ্যস্ত মানুষদের কাছে রমজানের বিদায় বেদনাদায়ক। তারা ভাবতে থাকে—বরকতের সেই দিনগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। মসজিদে ভিড়, ইবাদতের পরিবেশ, মানুষের দানশীলতা—সব মিলিয়ে যে আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়েছিল রমজান উপলক্ষে, তা যেন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। তাই তারা পরবর্তী রমজানের অপেক্ষায় থাকে।
অন্যদিকে আরেক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা রমজানকে এক ধরনের বাধা বা ভার মনে করে। রমজান শেষ হলেই তারা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। অথচ তারা বুঝতে পারে না, এই মাসটিই ছিল তাদের আত্মশুদ্ধি ও পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ।
আসলে রমজানের আসল শিক্ষা এখানেই। এক মাসের এই অনুশীলনের উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনা। রমজানে মানুষ যে সংযম ও নৈতিকতার চর্চা করে, সেটাই যেন বছরের বাকি সময়েও বজায় থাকে।
ধরা যাক, একজন ধূমপায়ী ব্যক্তি। রমজানের দিনে সে দীর্ঘ সময় ধূমপান থেকে বিরত থাকে। এতে তার শরীরেরও উপকার হয়। তাহলে সে চাইলে তো এই অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারে।
আবার একজন ব্যবসায়ীকে দেখা যায়, রমজানে ক্রেতাদের ঠকাতে ভয় পায়, ওজনে কম দেয় না, দ্রব্যমূল্যে কিছুটা ছাড় দেয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় গরিবদের সাহায্যও করে। যদি এই মানসিকতা সারা বছর বজায় থাকে, তাহলে তার ব্যবসায় যেমন বরকত আসবে, তেমনি সমাজেও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠিত হবে।
একইভাবে একজন চাকুরিজীবী বা পেশাজীবী রমজানে ইবাদতের জন্য কিছু সময় বের করে। একজন বিত্তশালী ব্যক্তি রোজার কারণে ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে গরিব মানুষের কথা ভাবতে শেখে এবং দানের হাত প্রসারিত করে। এই অভ্যাসগুলো যদি রমজানের পরও অব্যাহত থাকে, তাহলে সমাজে একটি মানবিক ও নৈতিক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
সুতরাং রমজান কেবল একটি মাসের নাম নয়; এটি আত্মসংযম ও চরিত্র গঠনের এক প্রশিক্ষণকাল। এই মাস মানুষকে শেখায় কীভাবে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলতে হয়।
যদি আমরা রমজানের এই শিক্ষাকে সারা বছর আমাদের জীবনে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের জীবনই হয়ে উঠতে পারে রমজানময়। তখন রমজানের বিদায় আর বেদনার কারণ হবে না; বরং তা হবে এক মাসের সফল সাধনার পর আনন্দের উপলক্ষ।
- মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা