
তীব্র তাপদাহে সড়কের ক্ষতি ঠেকাতে অভিনব উপায় বের করেছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্য। আবর্জনায় ফেলে দেওয়া প্লাস্টিককে নতুন কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। পরিবেশের ক্ষতি কমাতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমাধান হতে পারে এই উদ্যোগ।
এই পদ্ধতিতে অ্যাসফাল্ট বা পিচের সঙ্গে গলিত প্লাস্টিক মেশানো হয়। এর মিশ্রণ রাস্তাকে নমনীয় এবং তাপপ্রতিরোধী করে তোলে। প্রচণ্ড গরমেও রাস্তায় সহজে ফাটল ধরে না। গ্রীষ্মকালের চরম উত্তাপের কারণে টেক্সাসের সড়কগুলো দিন দিন বড় বিপদের মুখে পড়ছে। বাতাসে তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে পিচের রাস্তার তাপমাত্রা আরও অনেক বেশি বেড়ে যায়।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পিচ নরম হয়ে যায়। ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে নরম রাস্তা সহজে ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত চাপে রাস্তা দেবে যায় এবং বড় বড় গর্ত বা ফাটল তৈরি হয়।
২০২৩ সালের রেকর্ড গরমে টেক্সাসের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছেছিল। ওই চরম বৈরী আবহাওয়ায় রাস্তাঘাট দুমড়েমুচড়ে ফেটে গিয়েছিল।
ল্যাবের গবেষণা থেকে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা
পিচের সঙ্গে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক মেশানোর এই পদ্ধতি বের করেছেন ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট আর্লিংটনের (ইউটিএ) গবেষকরা। তারা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কিং লটে এই উপাদান দিয়ে রাস্তা বানিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন। ডালাসের কাছে রকওয়াল শহরের প্রায় এক মাইল দীর্ঘ সড়কে এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ হয়েছে। ওই সড়কে প্রায় সাড়ে চার টন প্রক্রিয়াজাত প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে প্লাস্টিক ভালোভাবে পরিষ্কার করে ছোট টুকরো করা হয়। উচ্চ তাপমাত্রায় পিচের সঙ্গে ওই টুকরোগুলো মেশানো হয়। প্লাস্টিক গলে গিয়ে বিটুমিন নামক আঠালো কালো উপাদানের সঙ্গে শক্ত বন্ধন তৈরি করে। প্রক্রিয়াজাত এই প্লাস্টিক মোট বিটুমিনের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ জায়গা দখল করে।
ঢাকার রাজপথেও সফল পরীক্ষা
রকওয়ালের পরীক্ষামূলক সড়কটি দারুণ ফলাফল দেখিয়েছে। ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রাতেও রাস্তায় কোনো ক্ষতি বা ফাটল দেখা যায়নি। তবে দীর্ঘ সময় ব্যবহারে রাস্তাটি কেমন থাকবে, তা নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে।
ইউটিএ গবেষক দল বাংলাদেশের ঢাকায় পিচ ও প্লাস্টিক দিয়ে পরীক্ষামূলক রাস্তা নির্মাণ ও মূল্যায়নে সহায়তা করেছে। ২০২৩ সালে ঢাকায় নির্মিত ওই রাস্তাটি নিয়মিত উচ্চ তাপমাত্রা ও বিপুল যানজটের মুখোমুখি হলেও অক্ষত আছে। বিপরীতে আশপাশের অন্যান্য সাধারণ রাস্তা গরমে ভেঙেচুরে নষ্ট হয়েছে।
প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক সুবিধা
সাফল্য পাওয়ার পর গবেষক দল এই প্রযুক্তি অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। উপাদানকে আরও টেকসই করতে তারা বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের মিশ্রণ নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন। খরচের পরিমাণ এবং পরিবেশগত প্রভাবও খতিয়ে দেখছেন।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের। ইতিমধ্যে তারা পেটেন্টের আবেদন জমা দিয়েছেন।
আবর্জনার ভাগাড়ে জমা হওয়া প্লাস্টিক ব্যবহার করার কারণে কেবল রাস্তা টেকসই হচ্ছে না। বিটুমিনের বদলে প্লাস্টিক ব্যবহারের ফলে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদাও কমে যাবে। রাস্তা দীর্ঘদিন ভালো থাকলে ঘন ঘন মেরামতের খরচ কমে যাবে।
প্লাস্টিকের রাস্তায় ভারতের দুই দশকের অভিজ্ঞতা
প্লাস্টিক দিয়ে রাস্তা বানানোর পরীক্ষায় টেক্সাস বা বাংলাদেশ একমাত্র উদাহরণ নয়। ভারত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সড়ক নির্মাণে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার করে আসছে।
ভারতের কাজের ধরন টেক্সাসের চেয়ে কিছুটা আলাদা। গলিত প্লাস্টিক সরাসরি বিটুমিনে মেশানোর বদলে ভারত শুষ্ক পদ্ধতি (ড্রাই প্রসেস) ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের টুকরোগুলো পাথরের খোয়ার সঙ্গে গরম করা হয়। প্লাস্টিক গলে পাথরের গায়ে আস্তরণ তৈরি করার পর তার সঙ্গে বিটুমিন মেশানো হয়।
পুরো ভারতে এই পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের আওতায় ২০২৫ সালের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত প্রায় ৪৩ হাজার ৭০০ কিলোমিটার রাস্তায় প্লাস্টিক বর্জ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
সরকারি মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাধারণ সড়কের তুলনায় প্লাস্টিক মেশানো রাস্তায় ফাটল ও গর্ত অনেক কম হয়। ভারতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এই রাস্তাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডারের কিছুটা অভাব রয়েছে।
অনলাইনভিত্তিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম বিজিআর থেকে অনূদিত
.png)
-3f0d26.jpeg)





