গবেষণা

স্ক্রিন টাইম যেভাবে বদলে দিচ্ছে শিশুর মস্তিষ্ক

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

বর্তমানে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে মোবাইল, ট্যাবলেট ও টিভি যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

বিশ্বায়নের যুগে বর্তমানে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে মোবাইল, ট্যাবলেট ও টিভি যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন অধিকাংশ পরিবারই শিশুকে খাওয়ানো থেকে শুরু করে শান্ত রাখা পর্যন্ত নানা কাজে স্ক্রিন ব্যবহার করে। খেলার মাঠ, বই কিংবা সামাজিক মেলামেশার পাশাপাশি স্ক্রিনও এখন তাদের শেখা ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম।

কিন্তু সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাগুলো বলছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের ধরন বদলে দিতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতায় পড়তে পারে।

সম্প্রতি নিউরোসায়েন্স নিউজে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের প্রথম দিকের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর মস্তিষ্কে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারে যা ভবিষ্যতে উদ্বেগ ও কগনিটিভ বা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণাটি দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দুই বছর বয়সের আগেই শিশু বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করলে শিশুর মস্তিষ্কের যে স্বাভাবিক বৃদ্ধি সেটি ব্যাহত হয় এবং মস্তিষ্ক অপরিপক্ক হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে যা মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক (কগনিটিভ) সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

প্রাথমিক শৈশবেই পরিবর্তন শুরু

২০২৫ সালে নেচারের প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বই পড়া ও স্ক্রিনে গল্প দেখার সময় শিশুদের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ফাংশনাল নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কপি’ (এফএনআইআরএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন, বই পড়ার সময় শিশুদের মস্তিষ্কে ‘শেয়ারড অ্যাটেশন’ বা যৌথ মনোযোগ তৈরি হয়, যা সামাজিক মনোযোগ, আবেগ ও ভাষা প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে সেগুলোর কার্যক্রম একমুখী হয়ে পড়ে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি গ্রোয়িং আপ ইন সিঙ্গাপুর টুওয়ার্ডস হেলথ আউটকামস শীর্ষক গবেষণায় গবেষকরা বলছেন, যেসব শিশুর বয়স ১-২ বছরের মধ্যে এবং যাদের স্ক্রিন টাইম বেশি ছিল, তাদের মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল প্রসেসিং ও কগনিটিভ কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক দ্রুত ‘স্পেশালাইজড’ হয়ে যায়।

স্বাভাবিক বিকাশে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বিভিন্ন সংযোগ তৈরি করতে শেখে ও অভিযোজিত হয়। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন একধরনের তীব্র উদ্দীপনা তৈরি করে, যার ফলে কিছু নেটওয়ার্ক বা সংযোগ খুব দ্রুত পরিপক্ব হয়ে গেলেও তারা প্রয়োজনীয় ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা নমনীয়তা হারায়।

গবেষকরা এটিকে ‘দ্রুত পরিপক্কতা’ বা স্বাভাবিক সময়ের আগেই মানসিকভাবে পরিপক্ক হওয়া বলছেন। শুনতে ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তবে এটি ভবিষ্যতের জটিল চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

কেন প্রথম দুই বছর এত গুরুত্বপূর্ণ

গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্ক্রিন টাইমের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় জীবনের প্রথম দুই বছরে। এই সময়টিকে বলা হয় ‘সেনসিটিভ পিরিয়ড’ অর্থাৎ মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে দ্রুত ও সংবেদনশীল ধাপ। এই সময়ে মস্তিষ্কের নিউরাল সংযোগ তৈরি হয় অত্যন্ত দ্রুত এবং পরিবেশগত প্রভাব খুব শক্তভাবে কাজ করে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি

নিউরোসায়েন্স নিউজে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, মস্তিষ্ক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল দেখা যায় শিশুদের কগনিটিভ টেস্টে। ৮–৯ বছরের যেসব কিশোর-কিশোরী ছোটবেলায় বেশি স্ক্রিনে সময় দিত, তারা সিদ্ধান্ত নিতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। এর মানে, মস্তিষ্ক দ্রুত শিখে ফেললেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে না। গবেষকরা মনে করেন, এটি শিশুর জ্ঞানীয় দক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং শিশুর সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

শুধু মনোযোগ নয়, আচরণগত পরিবর্তনের দিকেও নজর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ৬ থেকে ৩৬ মাস বয়সী শিশুদের ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের মনোযোগ দক্ষতা ও সামাজিক আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কিশোর বয়সে উদ্বেগের ঝুঁকি

নিউরোসায়েন্স নিউজে প্রকাশিত গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। দেখা গেছে, যারা শিশুকালে বেশি স্ক্রিনে সময় দিয়েছে, তাদের কিশোর বয়সে উদ্বেগজনিত লক্ষণ বেশি দেখা গেছে।

গবেষকরা বলছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধীরতা এবং মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি ‘স্নায়ুবৈজ্ঞানিক চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ-উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

ঘুমের ওপর স্ক্রিনের প্রভাব

শিশুর ঘুমের ওপরও স্ক্রিনের বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের ৩ হাজারের বেশি পরিবারের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুই বছর বয়সী একটি শিশু প্রতিদিন ডিভাইসে পেছনে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা সময় কাটালে তার ঘুম প্রায় ৩০ মিনিট দেরিতে আসে।

অস্ট্রেলিয়ান গবেষক ড. ক্যাসান্দ্রা প্যাটিনসন বলেন, ‘শৈশবে নিয়মিত ঘুম কমে গেলে তা জ্ঞানীয় বিকাশ, আচরণ ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।’

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘুম ও মস্তিষ্কের বিকাশের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিশুর মস্তিষ্ক দিনের শেখা তথ্য ঘুমের সময় প্রক্রিয়াজাত করে। ফলে ঘুম কমে গেলে শেখার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কীভাবে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব

সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিউরোসায়েন্স নিউজের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরোধমূলক উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা–মা যদি শিশুদের সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাহলে স্ক্রিন টাইমের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটা কমে যায়।

যৌথ পাঠ বা প্যারেন্ট-চাইল্ড রিডিং শিশুকে শুধু ভাষা শেখায় না, বরং সামাজিক ও আবেগীয় সংযোগও তৈরি করে, যা স্ক্রিনের ‘প্যাসিভ ভিউয়িং’ থেকে পাওয়া যায় না।

২০২৫ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে শূন্য থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের স্ক্রিন টাইম কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে বলা হয়, পরিবারভিত্তিক রুটিন, বাইরে খেলাধুলা এবং অভিভাবকের অংশগ্রহণ স্ক্রিন টাইম কমাতে কার্যকর হতে পারে।

ফরাসি পাঁচটি স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি ছয় বছরের নিচের শিশুদের জন্য স্ক্রিন ব্যবহারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। তাদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ‘ভাষা শেখা, স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী প্রভাব’ ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

তবে গবেষকরাই এ বিষয়ে একমত যে, স্ক্রিন মানেই ক্ষতি এমন ভাবা ঠিক নয়। বরং বয়স, ব্যবহারের ধরন এবং সময়কাল অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। তবে জীবনের প্রথম দুই বছরে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

তারা আরও বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার আধুনিক জীবনের অংশ হলেও শিশুর বিকাশের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা, খেলা, এবং মানবিক যোগাযোগ অপরিহার্য।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘জামা পেডিয়াট্রিকসের’ প্রকাশিত আগের এক গবেষণাতেও বলা হয়েছে, বেশি স্ক্রিন টাইম ভাষা, স্মৃতি ও সামাজিক দক্ষতার বিকাশকে ধীর করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা তাই এখন ‘ডিজিটাল ব্যালান্স’ বা ভারসাম্যের ওপর জোর দিচ্ছেন। শিশুদের জন্য প্রযুক্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে, বয়স অনুযায়ী সীমা নির্ধারণ, ঘুমের আগে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা, বাইরে খেলাধুলা বাড়ানো এবং পরিবারে মুখোমুখি সময় বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সম্পর্কিত