ভোজনরসিকদের খুবই প্রিয় একটি খাবার ‘লবস্টার’। ইদানীং ‘লাক্সারি ফুড’ হিসেবে ফাইন ডাইন রেস্টুরেন্টগুলোতে এর চাহিদা ব্যাপক।
একটি গলদা চিংড়িকে ফুটন্ত পানিতে দেওয়া হলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেটি লাফায়, ছটফট করে এবং এক সময় নিস্তেজ হয়ে যায়। বহুদিন ধরে এই দৃশ্যকে মানুষ স্বাভাবিক রান্নার অংশ হিসেবেই দেখেছে। কারণ এতদিন পর্যন্ত প্রচলিত ধারণা ছিল, এরা ব্যথা অনুভব করে না। তাদের প্রতিক্রিয়া কেবল যান্ত্রিক।
কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল প্রাণীবিজ্ঞানী গত ১৩ এপ্রিল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করেছেন, গলদা চিংড়িও মানুষের মতো স্নায়ুবিক যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে। শুধু গলদা নয়, কাঁকড়া, বাগদা চিংড়ি ও অন্যান্য দশপদী খোলসযুক্ত প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য হতে পারে।
গবেষণাটিতে মোট ১০৫টি পুরুষ নরওয়ে লবস্টার ব্যবহার করা হয়েছিল। গবেষকেরা লবস্টারগুলোকে সাতটি আলাদা দলে ভাগ করেন এবং প্রতিটি দলে ১৫টি করে লবস্টার রাখেন। এরপর তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, গবেষকেরা লবস্টারগুলোর শরীরে হালকা বৈদ্যুতিক শক দেন—যে মাত্রার শক মানুষের জন্যও অস্বস্তিকর। শক পাওয়ার পর লবস্টারগুলো দ্রুত লেজ উলটে পালানোর চেষ্টা করে। এই আচরণকে বলা হয় ‘টেইল-ফ্লিপ এস্কেপ রেসপন্স’। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা এটিকে বিপদ থেকে পালানোর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে জানতেন। তবে নতুন গবেষণার মূল গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
গবেষকেরা এবার লবস্টারগুলোকে ব্যথানাশক দেন। তারপর আবার একই মাত্রার শক দেওয়া হলে দেখা যায়, তাদের ছটফটানি ও পালানোর প্রতিক্রিয়া আগের তুলনায় কমে গেছে। অর্থাৎ, ব্যথানাশক তাদের আচরণে প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণা প্রবন্ধের অন্যতম লেখক এলেফথেরিওস ক্যাসিউরাস বলেন, মানুষের জন্য তৈরি ব্যথানাশক যেহেতু লবস্টারের শরীরেও কাজ করছে, সেহেতু তাদের স্নায়ুতন্ত্রকে আদিম বা পুরোনো ধাঁচের বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি প্রমাণ করে তাদের স্নায়ুতন্ত্র বেশ ‘উন্নত’।
কাঁকড়া বা গলদা চিংড়িকে দীর্ঘদিন ‘কম অনুভূতিশীল’ প্রাণি হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ তাদের চিৎকার বা ব্যথা প্রকাশের মাধ্যম নেই। ফলে তাদের যন্ত্রণাও দৃশ্যমান নয়। তবে বিজ্ঞান এখন বলছে, যন্ত্রণা অনুভবের জন্য মানুষের মতো মুখভঙ্গি থাকা জরুরি নয়।
এখানেই আসে ‘সেন্টিয়েন্স’ বা অনুভবক্ষমতার প্রশ্ন। কোনো প্রাণি কি ভয়, যন্ত্রণা বা অস্বস্তি অনুভব করতে পারে? যদি পারে, তাহলে মানুষ তার সঙ্গে কেমন আচরণ করবে?
ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ জীবন্ত গলদা চিংড়ি সেদ্ধ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার মতো দেশে প্রাণি কল্যাণ আইনের আওতায় এ ধরনের রান্না পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কোথাও কোথাও রান্নার আগে প্রাণীকে অজ্ঞান করার নিয়মও চালু হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বহু জায়গায় এখনও জীবন্ত কাঁকড়া বা চিংড়ি ফুটন্ত পানিতে ফেলে রান্না করা হয়। কারণ এটি ‘তাজা’ রান্নার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অনেক শেফের যুক্তি, এতে স্বাদ ভালো থাকে।
একসময় মাছ ব্যথা অনুভব করে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। এখন সেই বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। একইভাবে গলদা চিংড়ি নিয়ে নতুন এই গবেষণাও হয়তো ভবিষ্যতে খাদ্যশিল্প, আইন এবং প্রাণি কল্যাণের ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।