স্ট্রিম ডেস্ক

মহাকাশে গেলে শুধু শরীরই নয়, মানুষের মস্তিষ্কেও পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞানীদের মতে, নভোচারীদের মস্তিষ্কে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে চাঁদের বাইরের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রায় ৪০০ কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠেছে। তাই মহাকাশযুগের শুরুতে পৃথিবী ছেড়ে ওজনহীন পরিবেশে যাওয়ার আগে মানুষের মনে নানা আশঙ্কা ছিল। রক্ত কি জমাট বেঁধে যাবে? হাড় কি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে? অণুমাধ্যাকর্ষণে কি মস্তিষ্ক বিস্ফোরিত হবে?
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে ইঁদুর, মাকড়সা এবং পরে কুকুর নিয়ে পরিচালিত ধারাবাহিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, প্রাণীরা মহাকাশে বেঁচে থাকতে পারে। পরে মানুষের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, মানুষ শুধু টিকেই থাকে না, বরং নতুন পরিবেশের সঙ্গে সফলভাবে মানিয়েও নিতে পারে।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস)-এ প্রশিক্ষণ চলাকালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) নভোচারী লুকা পারমিতানো বলেন, এটি এমন এক ধরনের অভিযোজন, যা অনেক দিক থেকেই একটি রূপান্তরের মতো মনে হয়। কয়েক সপ্তাহ পর আপনার শরীর পৃথিবীতে যেমন ছিল, তেমন থাকে না। আপনি নিজের শরীরের পরিবর্তন দেখতে ও অনুভব করতে পারেন। আপনার পা আরও চিকন হয়ে যায় এবং মুখ গোলাকার হয়ে ওঠে।
ইতালীয় বিমানবাহিনীর সাবেক পাইলট পারমিতানোকে সম্প্রতি আর্টেমিস–৩ অভিযানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা থাকা এই মিশনে চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে চন্দ্র অবতরণযান ও মহাকাশ পোশাকের পরীক্ষা চালানো হবে।
পারমিতানো বলেন, মানবজাতি পৃথিবীতে এত সফল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অভিযোজনের ক্ষমতা। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মহাকাশে শরীরের এমন পরিবর্তন দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি নিজেকে কতটা ভিন্ন অনুভব করছিলাম। আমার নতুন শরীরটি যে পরিবেশে ছিল, তার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে মানিয়ে নিয়েছিল।
গত প্রায় ৭০ বছরে মানবদেহে মহাকাশযাত্রার প্রভাব— পেশী থেকে হাড়, এমনকি সাইনাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ভালোভাবেই নথিভুক্ত হয়েছে। তবে শূন্য মাধ্যাকর্ষণ মানুষের মস্তিষ্কে কী প্রভাব ফেলে, সে সম্পর্কে তুলনামূলক কম জানা গেছে।
মহাকাশে প্রতিটি নড়াচড়ায় শরীরকে আর মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয় না। ফলে শরীরের ওজন বহনকারী হাড় এবং যেসব পেশী দিয়ে আমরা তুলতে, বহন করতে, হাঁটতে ও দৌড়াতে পারি, সেগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে। মহাকাশে মাত্র কয়েক দিন থাকার পরই হাড় থেকে ক্যালসিয়াম কমতে থাকে এবং পেশীর ক্ষয় শুরু হয়। যার মধ্যে হৃদযন্ত্রের পরিবর্তনও রয়েছে। মাধ্যাকর্ষণের টান না থাকায় শরীরের তরল পদার্থ ওপরে জমা হয় বলেই নভোচারীদের মুখ ফুলে যায়।
নভোচারীরা যদি সারা জীবন মহাকাশেই কাটাতেন, তাহলে এটি কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরতে হলে তাদের কঠোর ব্যায়ামের নিয়ম মেনে চলতে হয়। সাধারণত মহাকাশ স্টেশনের জিমে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করতে হয়। তারপরও মাত্র ছয় মাস মহাকাশে থাকার পর পৃথিবীতে ফিরে এলে তাদের মহাকাশযান থেকে কোলে করে নামিয়ে স্ট্রেচারে শুইয়ে নেওয়া হয়। হাড় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে নভোচারীদের মস্তিষ্কে কী ঘটে, সে সম্পর্কে ধারণা এখনো সীমিত। আর সেটিই হতে পারে বড় সমস্যা।
ইএসএর ফ্লাইট সার্জন আলেসান্দ্রো আলচিবিয়াদে বলেন, মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আপনি যদি একটি কার্যকর ও সঠিকভাবে কাজ করা মস্তিষ্ক নিয়ে মহাকাশে যেতে না পারেন, তাহলে অন্য সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে।
মস্তিষ্কে মহাকাশযাত্রার প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখন পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি মিশনে অংশ নেওয়া অল্প কয়েকজন নভোচারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। উদাহরণ হিসেবে স্কট কেলি এক বছর মহাকাশে ছিলেন। তাঁর যমজ ভাই মার্ক কেলি পৃথিবীতে ছিলেন। গবেষণায় দেখা যায়, মিশনের সময় স্কটের মানসিক সক্ষমতায় তেমন পরিবর্তন আসেনি। তবে পৃথিবীতে ফেরার প্রায় ছয় মাস পর তাঁর সেই সক্ষমতা কিছুটা কমে যায়।
যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেকের বিজ্ঞানীরা ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় ৩৭৭ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা ১৫টি ব্রেইন-ইমেজিং গবেষণার ফলাফল একত্র করেছেন। এতে নভোচারীদের পাশাপাশি পৃথিবীতে মহাকাশযাত্রার অনুকরণে পরিচালিত বেডরেস্ট গবেষণায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকেরাও ছিলেন।
এই তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মনে করছেন, অণুমাধ্যাকর্ষণের সংস্পর্শে এলে মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে, তা তাঁরা শনাক্ত করতে পেরেছেন।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক এলিসা রাফায়েলা ফেরে বলেন, এটি এক অসাধারণ নিউরোপ্লাস্টিসিটি। আমরা দেখেছি, মস্তিষ্কে গঠনগত ও কার্যগত উভয় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। আমরা মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ শনাক্ত করেছি, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে পরিবর্তন ঘটে।
অর্থাৎ, মহাকাশে যেমন শরীর বদলে যায়, তেমনি মস্তিষ্কও মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশের সঙ্গে শারীরিকভাবে নিজেকে মানিয়ে নেয় এবং নতুন পরিবেশের উপযোগী করে স্নায়বিক সংযোগ পুনর্গঠন করে।
গবেষণাপত্রের সহলেখক সিলভিয়া সেগেজ্জি বলেন, আমরা মস্তিষ্কের যেসব অংশ চলাফেরা, ভারসাম্য এবং শরীর সম্পর্কে সচেতনতা নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোতে পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি। পাশাপাশি অপারকুলামেও পরিবর্তন দেখা গেছে। এখানেই বিভিন্ন সংকেত একত্রিত হয় এবং বহু-ইন্দ্রিয়ভিত্তিক উপায়ে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর অর্থ হলো, বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক মাধ্যাকর্ষণ অনুভব করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
ফেরে বলেন, আমরা যেভাবে রঙ, আলো, তাপমাত্রা বা শব্দের পরিবর্তন উপলব্ধি করি, মাধ্যাকর্ষণকে সেভাবে উপলব্ধি করি না। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশের এমন একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের মস্তিষ্ক ক্রমাগত গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করে।
তিনি আরও বলেন, আপনি যদি বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভাবতে চান, তাহলে মাধ্যাকর্ষণকে বিকাশমান ভ্রূণের প্রাপ্ত প্রথম সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। অর্থাৎ, আমাদের মস্তিষ্ক মাধ্যাকর্ষণ শনাক্ত করার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে।
একটি কফির কাপ তুলে নেওয়ার উদাহরণ দিয়ে ফেরে বলেন, আমরা এটি কোনো পরিশ্রম ছাড়াই করতে পারি। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেশীগুলোকে পরিচালনা করে।
বাহ্যিকভাবে এটি নভোচারীদের জন্য সুখবর। কারণ, মানুষের মস্তিষ্ক যদি মহাকাশে গিয়ে অভিযোজিত হতে না পারত, তাহলে তাদের নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হতো, এমনকি কফির কাপ সামলাতেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। তবে প্রশ্ন হলো, এই স্নায়বিক পুনর্গঠন কত দ্রুত ঘটে।
ফেরে বলেন, চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটতে থাকা অ্যাপোলো নভোচারীদের দেখুন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখতে তাঁরা কতটা সমস্যায় পড়ছিলেন। এর কারণ শুধু তাঁদের পোশাক খুব ভারী ছিল তা নয়, বরং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় তাদের ভারসাম্য ও চলাফেরার পুরো ব্যবস্থা বদলে গিয়েছিল। এর অর্থ এই নয় যে, মস্তিষ্ক নিজেকে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। তবে এতে সময় লাগে।
আমরা দেখেছি, মস্তিষ্কে গঠন ও কার্যগত- উভয় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ শনাক্ত করেছি, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ, মহাকাশে যেমন শরীর বদলে যায়, তেমনি মস্তিষ্কও নতুন পরিবেশের উপযোগী করে স্নায়বিক সংযোগ পুনর্গঠন করে। এলিসা রাফায়েলা ফেরে, বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কগনিটিভের নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক
বিজ্ঞান কল্প কাহিনিতে, যেমন 2001: A Space Odyssey বা The Martian সিনেমায় এই সমস্যার সমাধান হিসেবে সাধারণত একটি সেন্ট্রিফিউজ বা বিশাল চাকা দেখানো হয়েছে, যা কৃত্রিমভাবে মাধ্যাকর্ষণের অনুকরণ তৈরি করে।
এ বিষয়ে আলচিবিয়াদে বলেন, এটাই হবে সবচেয়ে ভালো সমাধান। এটি হাড় ও পেশীর ক্ষয়রোধ করবে এবং মস্তিষ্কের অভিযোজনেও সহায়তা করবে। তাহলে আমরা এমনটা করি না কেন? কারণ এর খরচ অনেক বেশি। শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করে ভরের ওপর, আর মহাকাশ অভিযানে ভর মানেই অর্থ।
ফেরেও এই বিষয়ে একমত। তিনি বর্তমানে মস্তিষ্কের যেসব অংশ মাধ্যাকর্ষণ অনুভব করে, সেখানে ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যবহার করে উদ্দীপনা দেওয়ার নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন, মাধ্যাকর্ষণের পরিবর্তনের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার উপায় বিজ্ঞানীরা অবশ্যই খুঁজে বের করবেন। তিনি বলেন, মহাকাশযাত্রা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু এটি আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে বোঝার একটি অসাধারণ সুযোগও দিতে পারে, যা পৃথিবীতে থেকে আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

মহাকাশে গেলে শুধু শরীরই নয়, মানুষের মস্তিষ্কেও পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞানীদের মতে, নভোচারীদের মস্তিষ্কে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে চাঁদের বাইরের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রায় ৪০০ কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠেছে। তাই মহাকাশযুগের শুরুতে পৃথিবী ছেড়ে ওজনহীন পরিবেশে যাওয়ার আগে মানুষের মনে নানা আশঙ্কা ছিল। রক্ত কি জমাট বেঁধে যাবে? হাড় কি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে? অণুমাধ্যাকর্ষণে কি মস্তিষ্ক বিস্ফোরিত হবে?
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে ইঁদুর, মাকড়সা এবং পরে কুকুর নিয়ে পরিচালিত ধারাবাহিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, প্রাণীরা মহাকাশে বেঁচে থাকতে পারে। পরে মানুষের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, মানুষ শুধু টিকেই থাকে না, বরং নতুন পরিবেশের সঙ্গে সফলভাবে মানিয়েও নিতে পারে।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস)-এ প্রশিক্ষণ চলাকালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) নভোচারী লুকা পারমিতানো বলেন, এটি এমন এক ধরনের অভিযোজন, যা অনেক দিক থেকেই একটি রূপান্তরের মতো মনে হয়। কয়েক সপ্তাহ পর আপনার শরীর পৃথিবীতে যেমন ছিল, তেমন থাকে না। আপনি নিজের শরীরের পরিবর্তন দেখতে ও অনুভব করতে পারেন। আপনার পা আরও চিকন হয়ে যায় এবং মুখ গোলাকার হয়ে ওঠে।
ইতালীয় বিমানবাহিনীর সাবেক পাইলট পারমিতানোকে সম্প্রতি আর্টেমিস–৩ অভিযানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা থাকা এই মিশনে চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে চন্দ্র অবতরণযান ও মহাকাশ পোশাকের পরীক্ষা চালানো হবে।
পারমিতানো বলেন, মানবজাতি পৃথিবীতে এত সফল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অভিযোজনের ক্ষমতা। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মহাকাশে শরীরের এমন পরিবর্তন দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি নিজেকে কতটা ভিন্ন অনুভব করছিলাম। আমার নতুন শরীরটি যে পরিবেশে ছিল, তার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে মানিয়ে নিয়েছিল।
গত প্রায় ৭০ বছরে মানবদেহে মহাকাশযাত্রার প্রভাব— পেশী থেকে হাড়, এমনকি সাইনাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ভালোভাবেই নথিভুক্ত হয়েছে। তবে শূন্য মাধ্যাকর্ষণ মানুষের মস্তিষ্কে কী প্রভাব ফেলে, সে সম্পর্কে তুলনামূলক কম জানা গেছে।
মহাকাশে প্রতিটি নড়াচড়ায় শরীরকে আর মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয় না। ফলে শরীরের ওজন বহনকারী হাড় এবং যেসব পেশী দিয়ে আমরা তুলতে, বহন করতে, হাঁটতে ও দৌড়াতে পারি, সেগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে। মহাকাশে মাত্র কয়েক দিন থাকার পরই হাড় থেকে ক্যালসিয়াম কমতে থাকে এবং পেশীর ক্ষয় শুরু হয়। যার মধ্যে হৃদযন্ত্রের পরিবর্তনও রয়েছে। মাধ্যাকর্ষণের টান না থাকায় শরীরের তরল পদার্থ ওপরে জমা হয় বলেই নভোচারীদের মুখ ফুলে যায়।
নভোচারীরা যদি সারা জীবন মহাকাশেই কাটাতেন, তাহলে এটি কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরতে হলে তাদের কঠোর ব্যায়ামের নিয়ম মেনে চলতে হয়। সাধারণত মহাকাশ স্টেশনের জিমে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করতে হয়। তারপরও মাত্র ছয় মাস মহাকাশে থাকার পর পৃথিবীতে ফিরে এলে তাদের মহাকাশযান থেকে কোলে করে নামিয়ে স্ট্রেচারে শুইয়ে নেওয়া হয়। হাড় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে নভোচারীদের মস্তিষ্কে কী ঘটে, সে সম্পর্কে ধারণা এখনো সীমিত। আর সেটিই হতে পারে বড় সমস্যা।
ইএসএর ফ্লাইট সার্জন আলেসান্দ্রো আলচিবিয়াদে বলেন, মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আপনি যদি একটি কার্যকর ও সঠিকভাবে কাজ করা মস্তিষ্ক নিয়ে মহাকাশে যেতে না পারেন, তাহলে অন্য সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে।
মস্তিষ্কে মহাকাশযাত্রার প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখন পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি মিশনে অংশ নেওয়া অল্প কয়েকজন নভোচারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। উদাহরণ হিসেবে স্কট কেলি এক বছর মহাকাশে ছিলেন। তাঁর যমজ ভাই মার্ক কেলি পৃথিবীতে ছিলেন। গবেষণায় দেখা যায়, মিশনের সময় স্কটের মানসিক সক্ষমতায় তেমন পরিবর্তন আসেনি। তবে পৃথিবীতে ফেরার প্রায় ছয় মাস পর তাঁর সেই সক্ষমতা কিছুটা কমে যায়।
যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেকের বিজ্ঞানীরা ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় ৩৭৭ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা ১৫টি ব্রেইন-ইমেজিং গবেষণার ফলাফল একত্র করেছেন। এতে নভোচারীদের পাশাপাশি পৃথিবীতে মহাকাশযাত্রার অনুকরণে পরিচালিত বেডরেস্ট গবেষণায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকেরাও ছিলেন।
এই তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মনে করছেন, অণুমাধ্যাকর্ষণের সংস্পর্শে এলে মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে, তা তাঁরা শনাক্ত করতে পেরেছেন।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক এলিসা রাফায়েলা ফেরে বলেন, এটি এক অসাধারণ নিউরোপ্লাস্টিসিটি। আমরা দেখেছি, মস্তিষ্কে গঠনগত ও কার্যগত উভয় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। আমরা মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ শনাক্ত করেছি, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে পরিবর্তন ঘটে।
অর্থাৎ, মহাকাশে যেমন শরীর বদলে যায়, তেমনি মস্তিষ্কও মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশের সঙ্গে শারীরিকভাবে নিজেকে মানিয়ে নেয় এবং নতুন পরিবেশের উপযোগী করে স্নায়বিক সংযোগ পুনর্গঠন করে।
গবেষণাপত্রের সহলেখক সিলভিয়া সেগেজ্জি বলেন, আমরা মস্তিষ্কের যেসব অংশ চলাফেরা, ভারসাম্য এবং শরীর সম্পর্কে সচেতনতা নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোতে পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি। পাশাপাশি অপারকুলামেও পরিবর্তন দেখা গেছে। এখানেই বিভিন্ন সংকেত একত্রিত হয় এবং বহু-ইন্দ্রিয়ভিত্তিক উপায়ে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর অর্থ হলো, বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক মাধ্যাকর্ষণ অনুভব করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
ফেরে বলেন, আমরা যেভাবে রঙ, আলো, তাপমাত্রা বা শব্দের পরিবর্তন উপলব্ধি করি, মাধ্যাকর্ষণকে সেভাবে উপলব্ধি করি না। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশের এমন একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের মস্তিষ্ক ক্রমাগত গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করে।
তিনি আরও বলেন, আপনি যদি বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভাবতে চান, তাহলে মাধ্যাকর্ষণকে বিকাশমান ভ্রূণের প্রাপ্ত প্রথম সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। অর্থাৎ, আমাদের মস্তিষ্ক মাধ্যাকর্ষণ শনাক্ত করার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে।
একটি কফির কাপ তুলে নেওয়ার উদাহরণ দিয়ে ফেরে বলেন, আমরা এটি কোনো পরিশ্রম ছাড়াই করতে পারি। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেশীগুলোকে পরিচালনা করে।
বাহ্যিকভাবে এটি নভোচারীদের জন্য সুখবর। কারণ, মানুষের মস্তিষ্ক যদি মহাকাশে গিয়ে অভিযোজিত হতে না পারত, তাহলে তাদের নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হতো, এমনকি কফির কাপ সামলাতেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। তবে প্রশ্ন হলো, এই স্নায়বিক পুনর্গঠন কত দ্রুত ঘটে।
ফেরে বলেন, চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটতে থাকা অ্যাপোলো নভোচারীদের দেখুন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখতে তাঁরা কতটা সমস্যায় পড়ছিলেন। এর কারণ শুধু তাঁদের পোশাক খুব ভারী ছিল তা নয়, বরং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় তাদের ভারসাম্য ও চলাফেরার পুরো ব্যবস্থা বদলে গিয়েছিল। এর অর্থ এই নয় যে, মস্তিষ্ক নিজেকে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। তবে এতে সময় লাগে।
আমরা দেখেছি, মস্তিষ্কে গঠন ও কার্যগত- উভয় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ শনাক্ত করেছি, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ, মহাকাশে যেমন শরীর বদলে যায়, তেমনি মস্তিষ্কও নতুন পরিবেশের উপযোগী করে স্নায়বিক সংযোগ পুনর্গঠন করে। এলিসা রাফায়েলা ফেরে, বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কগনিটিভের নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক
বিজ্ঞান কল্প কাহিনিতে, যেমন 2001: A Space Odyssey বা The Martian সিনেমায় এই সমস্যার সমাধান হিসেবে সাধারণত একটি সেন্ট্রিফিউজ বা বিশাল চাকা দেখানো হয়েছে, যা কৃত্রিমভাবে মাধ্যাকর্ষণের অনুকরণ তৈরি করে।
এ বিষয়ে আলচিবিয়াদে বলেন, এটাই হবে সবচেয়ে ভালো সমাধান। এটি হাড় ও পেশীর ক্ষয়রোধ করবে এবং মস্তিষ্কের অভিযোজনেও সহায়তা করবে। তাহলে আমরা এমনটা করি না কেন? কারণ এর খরচ অনেক বেশি। শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করে ভরের ওপর, আর মহাকাশ অভিযানে ভর মানেই অর্থ।
ফেরেও এই বিষয়ে একমত। তিনি বর্তমানে মস্তিষ্কের যেসব অংশ মাধ্যাকর্ষণ অনুভব করে, সেখানে ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যবহার করে উদ্দীপনা দেওয়ার নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন, মাধ্যাকর্ষণের পরিবর্তনের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার উপায় বিজ্ঞানীরা অবশ্যই খুঁজে বের করবেন। তিনি বলেন, মহাকাশযাত্রা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু এটি আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে বোঝার একটি অসাধারণ সুযোগও দিতে পারে, যা পৃথিবীতে থেকে আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
.png)

দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়তে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। মঙ্গলবার (১৬ জুন) খুলনায় বাংলাদেশ ক্যাবল শিল্প লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি।
১৬ জুন ২০২৬
প্রতিবন্ধীদের জন্য ডিজিটাল সেবা সহজ করতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
২১ মে ২০২৬
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস’ (বেসিস) নির্বাচনে ‘ব্রিফকেস কোম্পানি’র আড়ালে ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
২১ মে ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন ধরেই মায়েদের ‘ব্রেস্টফিডিং’ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে, নানা কারণে মায়েরা তাদের শিশুদের ব্রেস্টফিডিং করান না। ফলে শিশুরা সংক্রামকসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন এই দুটি ধারণাই ভুল।
১৯ মে ২০২৬