লেখা:

আর্জেন্টিনা যদি ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে চায় এবং বিশ্বের তৃতীয় দল হিসেবে তা করতে পারে, তাহলে সেই কৃতিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে যে আবারও লিওনেল মেসিই থাকবেন, তা প্রায় নিশ্চিত।
৩৯ বছরে পা দেওয়া মেসি এবার খেলছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এর মাধ্যমে তিনি পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন।
বেশিরভাগ ফুটবলারের পারফরম্যান্স বয়সের সঙ্গে কমে যায়। তবে সেরা খেলোয়াড়রা নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলে টিকে থাকেন। যেমন গতি কমে যাওয়ার পর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নিজেকে বদলে নিয়েছেন পেনাল্টি বক্সের ভেতরের নিখুঁত গোলশিকারিতে।
কিন্তু মেসির গল্পটা ভিন্ন। তিনি শুধু বয়সজনিত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেননি, তিনি নিজেকে এমনভাবে রূপান্তর করেছেন, যাতে তিনি এখনও খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পারেন।
১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে হোসে মরিনহোর পোর্তোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক হয়েছিল মেসির। তখন তিনি ডান দিকে খেলতেন, ড্রিবলিং করতেন। সেই সময় থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির বর্তমান মেসি হয়ে ওঠার পথে তিনি অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন। আর প্রতিবারই সেই পরিবর্তন তাঁকে আরও পরিণত, কার্যকর ও নিখুঁত ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তখনকার বিশ্বের অন্যতম সেরা ও সবচেয়ে পরিচিত ফুটবলার রোনালদিনহো প্রথমবার লিওনেল মেসিকে অনুশীলন করতে দেখে বলেছিলেন, ‘ওই একদিন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হবে।’
দুই বছর পর ২০০৫ সালের আগস্টে জুভেন্টাসের বিপক্ষে জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে বিশ্ব ফুটবলে নিজের আগমনের ঘোষণা দেন ১৮ বছর বয়সী মেসি। সেই ম্যাচে মেসির খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন জুভেন্টাসের তৎকালীন কোচ ফাবিও ক্যাপেলো যে, তিনি নাকি সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
২১ বছর বয়সে পৌঁছানোর সময় রোনালদিনহোর প্রভাব কমতে শুরু করে এবং দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব ধীরে ধীরে মেসির কাঁধে এসে পড়ে। তখন বার্সেলোনার কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড বুঝতে পেরেছিলেন, দলের জন্য মেসিকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মাঠের কেন্দ্রবিন্দুতে।
রাইকার্ড বলেছিলেন, ‘মেসিকে খেলার কেন্দ্রেই থাকতে হবে। সে যত বেশি বল ছুঁবে, দলের জন্য ততই ভালো হবে।’
২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস মেসি মূলত ডান উইং থেকেই খেলতেন। সেটিই ছিল তার গোলের পথে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে পরিচিত করিডর।
তবে গার্দিওলা শুরু থেকেই জানতেন, শেষ পর্যন্ত মেসির আসল জায়গা হবে মাঠের একেবারে কেন্দ্র। সেখান থেকেই তিনি দলের আক্রমণ পরিচালনা করবেন। এই ভাবনাকে সামনে রেখেই গার্দিওলা পুরো দলকে নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন। আর সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ও সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর জন্ম দেয়।
২০০৯ সালের ২ মে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদ। লা লিগার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ।
সেদিন বার্সেলোনার কোচ পেপ গার্দিওলা একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লিওনেল মেসিকে ডান দিক থেকে সরিয়ে আক্রমণের মাঝখানে রাখলেন। তবে প্রচলিত স্ট্রাইকারের মতো নয়, বরং এমন এক ভূমিকায় যেখানে তাঁকে বারবার নিচে নেমে বল নিতে, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং আক্রমণের দিক নির্ধারণ করতে বলা হয়।
ডান দিকে খেলেন স্যামুয়েল এতো, বাম দিকে থিয়েরি অঁরি। আর মেসির দায়িত্ব ছিল নিচে নেমে বল গ্রহণ করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আক্রমণ সাজানো।
ম্যাচ শেষে স্কোরলাইন ছিল ৬-২। সেদিনই যেন আধুনিক ফুটবলে ‘ফলস নাইন’ কৌশলের নতুন জন্ম হয়।
অবশ্য এই ধারণা একেবারে নতুন ছিল না। ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ডকে ৬-৩ গোলে হারানোর ঐতিহাসিক ম্যাচে হাঙ্গেরির কোচ গুস্তাভ সেবেস একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। তিনি স্ট্রাইকার নান্দর হিদেগকুতিকে বারবার মাঠের মাঝখানে নামিয়ে এনেছিলেন। এতে ইংল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাকরা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন এবং সেই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে ফেরেঙ্ক পুসকাস ও শান্দোর কচিস আক্রমণ চালিয়েছিলেন।
পরে নেদারল্যান্ডসের ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শনের অধীনে কোচ রিনুস মিখেলসের সময় ইয়োহান ক্রুইফও একই ধরনের স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করা ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় খেলেছিলেন।
গার্দিওলার পরিকল্পনায় মেসি দ্রুতই প্রতিপক্ষের জন্য এমন এক সমস্যায় পরিণত হন, যার কার্যকর সমাধান ছিল না।

মেসি যখন মাঠের মাঝখানে ও রক্ষণভাগের মাঝের ফাঁকা জায়গায় নেমে আসতেন, তখন রিয়াল মাদ্রিদের সেন্টার-ব্যাকদের সামনে দুটি কঠিন সিদ্ধান্ত থাকত তারা কি মেসিকে অনুসরণ করে নিজেদের অবস্থান ছাড়বে, নাকি জায়গায় থেকে মেসিকে বল নিয়ে ঘোরার সুযোগ দেবে?
দুই সিদ্ধান্তের কোনোটিই কার্যকর হয়নি। মেসি সহজেই ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে এগিয়ে যেতেন। তার পেছনে ছিলেন জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও ইয়ায়া তোরে। অন্যদিকে থিয়েরি অঁরি ও স্যামুয়েল এতো দুই দিকে রক্ষণভাগকে ছড়িয়ে রাখতেন। ফলে প্রতিপক্ষ যে সিদ্ধান্তই নিত, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের বিপক্ষে যেত।
কয়েক সপ্তাহ পর গার্দিওলা একই কৌশল ব্যবহার করেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে মেসি মাথা দিয়ে গোল করে বার্সেলোনার জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে লা লিগায় মাত্র ৬৯ ম্যাচে মেসি করেন অবিশ্বাস্য ৯৬ গোল।
২০০৯ সালে প্রথমবার জেতা ব্যালন ডি’অর এরপর যেন তার স্থায়ী সম্পদে পরিণত হয়। তিনি ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৯ সালেও এই পুরস্কার জেতেন। পরে তার মোট ব্যালন ডি’অরের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে। প্রথমটি জিতেছিলেন ২২ বছর বয়সে, আর সর্বশেষটি ৩৬ বছর বয়সে।
২০২৪ সালে সাংবাদিক হুয়ান পাবলো ভারস্কিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘আগে আমি কৌশলগত বিষয়গুলো খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না। কিন্তু গার্দিওলার অধীনে আমি অসাধারণ অনেক কিছু শিখেছি। মাঠের ফাঁকা জায়গা কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, কীভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হয় এবং আসলে ফুটবল কীভাবে পরিচালিত হয় এসব তখনই সত্যিকার অর্থে বুঝতে শুরু করি।’
২০১৫ সালে জাভি বার্সেলোনা ছাড়েন। তিন বছর পর বিদায় নেন ইনিয়েস্তাও। এরপর থেকেই দলটির ভেতরে এক বড় পরিবর্তন শুরু হয়। লিওনেল মেসি বরাবরই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু তখন তাঁকে শুধু গোল করার দায়িত্ব নয়, পুরো দলের আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার দায়িত্বও নিতে হয়।
যে মিডফিল্ড একসময় তাঁকে নিরাপত্তা দিত, যারা বলের দখল ধরে রাখত, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করত এবং তাঁর জন্য জায়গা তৈরি করত, তারা আর দলে ছিলেন না। ফলে একসময় মেসির কাছ থেকে একই সঙ্গে জাভি, ইনিয়েস্তা এবং দলের প্রধান গোলদাতার ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। বাস্তবে এটি ছিল যেকোনো ফুটবলারের জন্যই অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মেসি আবারও নিজের খেলার ধরন বদলে নেন। গোলদাতা, নাম্বার টেন বা ‘ফলস নাইন’ থেকে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ‘এনগানচে’ অর্থাৎ এমন একজন প্লেমেকার, যিনি মাঝমাঠে নেমে খেলাকে জমিয়ে তোলেন, যিনি খেলা শুরু করেন এবং অনেক সময় নিজেই সেটি শেষ করেন।
এর ফলে তার পরিসংখ্যানে গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৯-২০ মৌসুমে লা লিগার ৩৩ ম্যাচে তিনি করেন ২৫ গোল এবং ২২টি অ্যাসিস্ট।
বার্সেলোনায় নিজের শেষ মৌসুমে (২০২০-২১) তিনি আবারও দুর্দান্ত গোলস্কোরিং ছন্দে ফেরেন। ওই মৌসুমে ৩৫ লা লিগা ম্যাচে করেন ৩০ গোল, সঙ্গে ছিল ১১টি অ্যাসিস্ট।
তবে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনে (পিএসজি) তার প্রথম মৌসুমেই এই রূপান্তর সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৪ ম্যাচে তিনি করেন ১১ গোল এবং ১৫টি অ্যাসিস্ট। ক্লাব ক্যারিয়ারে এই প্রথম কোনো মৌসুমে তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা গোলের চেয়ে বেশি ছিল।
একজন আর্জেন্টাইন ফুটবল বিশ্লেষক এই পরিবর্তনকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে ‘যিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত গোলস্কোরার, তিনি ধীরে ধীরে আরেকজন ইনিয়েস্তায় পরিণত হয়েছেন।’
মাঠের কৌশলগত বিবর্তনের পাশাপাশি আরেকটি গল্পও চলছিল, যার সমাধান হতে আরও বেশি সময় লেগেছে। সেটি ছিল আর্জেন্টিনার কাছে লিওনেল মেসির প্রকৃত পরিচয় কী?
২০১১ সালের আগস্টে মেসি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হন। এরপরই শুরু হয় একের পর এক হৃদয়ভাঙার গল্প।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে মারাকানায় অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে টাইব্রেকারে চিলির কাছে পরাজয়। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও আবার একই প্রতিপক্ষ চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার।
টানা তিন বছরে তিনটি ফাইনাল কিন্তু প্রতিবারই শূন্য হাতে ফিরতে হয়। প্রতিটি পরাজয়ের সঙ্গে মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার মানুষের প্রত্যাশার চাপ আরও বাড়তে থাকে।
২০১৬ সালের সেই পরাজয়ের পর মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। এর আগেও তিনি দুবার এমন চিন্তা করেছিলেন। পরে অবশ্য তিনি ফিরে আসেন। তবে সেই মেসি আর আগের মতো ছিলেন না।
২০১৯ সালের কোপা আমেরিকায় স্বাগতিক ব্রাজিলের কাছে বিতর্কিত সেমিফাইনাল হারের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনফেডারেশনের কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি সেই মেসি ছিলেন না, যিনি একসময় আর্জেন্টিনার জার্সির চাপের কাছে নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। তিনি এমন এক নেতা হয়ে উঠেছিলেন, যিনি ঠিক করেছিলেন কী জিততে পারেননি, সেটি দিয়ে আর নিজেকে বিচার করতে দেবেন না।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকাই ছিল সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। মারাকানার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপার অপেক্ষার আবসান ঘটায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের আগে সতীর্থদের উদ্দেশ্যে মেসির দেওয়া অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে ড্রেসিংরুমের অনেকেই আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন। আর ২০২২ বিশ্বকাপের মেসি যেন ছিলেন তার পুরো ক্যারিয়ারের এক পরিপূর্ণ রূপ।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে যশকো গভার্দিওলকে দুর্দান্ত গতিতে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে যেন ২০০৯ সালের তরুণ উইঙ্গার মেসিকে আবার দেখা গিয়েছিল।
অন্যদিকে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে দেখা যায় তার অসাধারণ দূরদর্শিতা ও নিখুঁত পাসিং। নাহুয়েল মোলিনাকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সঠিক জায়গায় দৌড়ে গিয়ে রিবাউন্ড আদায় করা, আর চরম চাপের মুহূর্তে নির্ভুলভাবে পেনাল্টি নেওয়া সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন দলের প্রকৃত নেতা।
২০২৩ সালে জিনেদিন জিদানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘ফুটবল অনেক বদলে গেছে। খেলার ধরন, কৌশল, সবকিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। এখনকার ফুটবল আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলনির্ভর ও শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। আগে মাঠে অনেক বেশি ফাঁকা জায়গা পাওয়া যেত।’
কথাগুলো তিনি বলেছিলেন একেবারেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। যেন এমন একজন ফুটবলারের অভিজ্ঞতার কথা, যিনি আধুনিক ফুটবলের তিনটি ভিন্ন যুগে খেলেছেন শক্তিশালী মিডফিল্ডের যুগ, পজিশনভিত্তিক পাসিং ফুটবলের স্বর্ণসময় যুগ এবং পেপ গার্দিওলার পর দ্রুত রূপান্তরনির্ভর কৌশলগত ফুটবলের যুগ। আর প্রতিটি যুগেই নিজেকে সেরাদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ইন্টার মায়ামিতে এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকায় লিওনেল মেসিকে এখন প্রায়ই দেখা যায় দৌড়ানোর চেয়ে বেশি হাঁটতে। একসময় সমালোচকেরা এটিকেই তার দুর্বলতা হিসেবে দেখতো। কিন্তু এখন সেটিই তার দক্ষতার পরিচায়ক বলে মনে হচ্ছে। তিনি খেলা বুঝে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের জন্য শক্তি সঞ্চয় করছেন।
‘শেষের মেসিই সবসময় সেরা মেসি,’ তার শৈশবের আদর্শ পাবলো আইমার একবার বলেছিলেন। সম্ভবত এখনো সেই কথাই সত্যি।
দুই দশকজুড়ে মেসির অর্জন শুধু ট্রফি বা পরিসংখ্যানের ভাণ্ডার নয়। এটি হলো একজন ফুটবলারের বারবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার গল্প। ক্যারিয়ারের প্রতিটি পর্যায়ে নতুন রূপে নিজেকে আবিষ্কার করা।
তিনি ছিলেন কিশোর উইঙ্গার, যিনি ফাবিও কাপেলোকে মুগ্ধ করেছিলেন। পরে হয়েছেন ‘ফলস নাইন’, যিনি ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশলগত ধারা বদলে দিয়েছেন। এরপর হয়েছেন ‘এনগানচে’ যিনি অন্যদের আরও ভালো খেলোয়াড় বানাতে শিখেছেন।
তিনি হয়েছেন অধিনায়ক, যিনি অবশেষে নিজের দেশকে বিশ্বকাপ জয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন এক ধরনের ‘কোয়ার্টারব্যাক’ ভূমিকায়। আর এখন তিনি এমন এক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, যিনি খুব বেশি না দৌড়ালেও খেলার সবকিছু আগে থেকেই বুঝে ফেলেন।
বিশ্বকাপ মেসিকে নিয়ে অনেক ধরনের প্রশংসা ও অতিরঞ্জিত মন্তব্য নিয়ে আসবে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই মূল বিষয়টি ধরতে পারেনি। আসল বিষয় হলো, তিনি কতটা ভালো মানুষ তা নয়, বরং তাঁর ক্যারিয়ারে কতবার তাঁকে নতুনভাবে পরিপূর্ণ একজন খেলোয়াড় হয়ে উঠতে হয়েছে।
(বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

আর্জেন্টিনা যদি ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে চায় এবং বিশ্বের তৃতীয় দল হিসেবে তা করতে পারে, তাহলে সেই কৃতিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে যে আবারও লিওনেল মেসিই থাকবেন, তা প্রায় নিশ্চিত।
৩৯ বছরে পা দেওয়া মেসি এবার খেলছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এর মাধ্যমে তিনি পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন।
বেশিরভাগ ফুটবলারের পারফরম্যান্স বয়সের সঙ্গে কমে যায়। তবে সেরা খেলোয়াড়রা নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলে টিকে থাকেন। যেমন গতি কমে যাওয়ার পর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নিজেকে বদলে নিয়েছেন পেনাল্টি বক্সের ভেতরের নিখুঁত গোলশিকারিতে।
কিন্তু মেসির গল্পটা ভিন্ন। তিনি শুধু বয়সজনিত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেননি, তিনি নিজেকে এমনভাবে রূপান্তর করেছেন, যাতে তিনি এখনও খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পারেন।
১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে হোসে মরিনহোর পোর্তোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক হয়েছিল মেসির। তখন তিনি ডান দিকে খেলতেন, ড্রিবলিং করতেন। সেই সময় থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির বর্তমান মেসি হয়ে ওঠার পথে তিনি অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন। আর প্রতিবারই সেই পরিবর্তন তাঁকে আরও পরিণত, কার্যকর ও নিখুঁত ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তখনকার বিশ্বের অন্যতম সেরা ও সবচেয়ে পরিচিত ফুটবলার রোনালদিনহো প্রথমবার লিওনেল মেসিকে অনুশীলন করতে দেখে বলেছিলেন, ‘ওই একদিন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হবে।’
দুই বছর পর ২০০৫ সালের আগস্টে জুভেন্টাসের বিপক্ষে জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে বিশ্ব ফুটবলে নিজের আগমনের ঘোষণা দেন ১৮ বছর বয়সী মেসি। সেই ম্যাচে মেসির খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন জুভেন্টাসের তৎকালীন কোচ ফাবিও ক্যাপেলো যে, তিনি নাকি সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
২১ বছর বয়সে পৌঁছানোর সময় রোনালদিনহোর প্রভাব কমতে শুরু করে এবং দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব ধীরে ধীরে মেসির কাঁধে এসে পড়ে। তখন বার্সেলোনার কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড বুঝতে পেরেছিলেন, দলের জন্য মেসিকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মাঠের কেন্দ্রবিন্দুতে।
রাইকার্ড বলেছিলেন, ‘মেসিকে খেলার কেন্দ্রেই থাকতে হবে। সে যত বেশি বল ছুঁবে, দলের জন্য ততই ভালো হবে।’
২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস মেসি মূলত ডান উইং থেকেই খেলতেন। সেটিই ছিল তার গোলের পথে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে পরিচিত করিডর।
তবে গার্দিওলা শুরু থেকেই জানতেন, শেষ পর্যন্ত মেসির আসল জায়গা হবে মাঠের একেবারে কেন্দ্র। সেখান থেকেই তিনি দলের আক্রমণ পরিচালনা করবেন। এই ভাবনাকে সামনে রেখেই গার্দিওলা পুরো দলকে নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন। আর সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ও সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর জন্ম দেয়।
২০০৯ সালের ২ মে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদ। লা লিগার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ।
সেদিন বার্সেলোনার কোচ পেপ গার্দিওলা একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লিওনেল মেসিকে ডান দিক থেকে সরিয়ে আক্রমণের মাঝখানে রাখলেন। তবে প্রচলিত স্ট্রাইকারের মতো নয়, বরং এমন এক ভূমিকায় যেখানে তাঁকে বারবার নিচে নেমে বল নিতে, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং আক্রমণের দিক নির্ধারণ করতে বলা হয়।
ডান দিকে খেলেন স্যামুয়েল এতো, বাম দিকে থিয়েরি অঁরি। আর মেসির দায়িত্ব ছিল নিচে নেমে বল গ্রহণ করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আক্রমণ সাজানো।
ম্যাচ শেষে স্কোরলাইন ছিল ৬-২। সেদিনই যেন আধুনিক ফুটবলে ‘ফলস নাইন’ কৌশলের নতুন জন্ম হয়।
অবশ্য এই ধারণা একেবারে নতুন ছিল না। ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ডকে ৬-৩ গোলে হারানোর ঐতিহাসিক ম্যাচে হাঙ্গেরির কোচ গুস্তাভ সেবেস একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। তিনি স্ট্রাইকার নান্দর হিদেগকুতিকে বারবার মাঠের মাঝখানে নামিয়ে এনেছিলেন। এতে ইংল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাকরা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন এবং সেই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে ফেরেঙ্ক পুসকাস ও শান্দোর কচিস আক্রমণ চালিয়েছিলেন।
পরে নেদারল্যান্ডসের ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শনের অধীনে কোচ রিনুস মিখেলসের সময় ইয়োহান ক্রুইফও একই ধরনের স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করা ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় খেলেছিলেন।
গার্দিওলার পরিকল্পনায় মেসি দ্রুতই প্রতিপক্ষের জন্য এমন এক সমস্যায় পরিণত হন, যার কার্যকর সমাধান ছিল না।

মেসি যখন মাঠের মাঝখানে ও রক্ষণভাগের মাঝের ফাঁকা জায়গায় নেমে আসতেন, তখন রিয়াল মাদ্রিদের সেন্টার-ব্যাকদের সামনে দুটি কঠিন সিদ্ধান্ত থাকত তারা কি মেসিকে অনুসরণ করে নিজেদের অবস্থান ছাড়বে, নাকি জায়গায় থেকে মেসিকে বল নিয়ে ঘোরার সুযোগ দেবে?
দুই সিদ্ধান্তের কোনোটিই কার্যকর হয়নি। মেসি সহজেই ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে এগিয়ে যেতেন। তার পেছনে ছিলেন জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও ইয়ায়া তোরে। অন্যদিকে থিয়েরি অঁরি ও স্যামুয়েল এতো দুই দিকে রক্ষণভাগকে ছড়িয়ে রাখতেন। ফলে প্রতিপক্ষ যে সিদ্ধান্তই নিত, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের বিপক্ষে যেত।
কয়েক সপ্তাহ পর গার্দিওলা একই কৌশল ব্যবহার করেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে মেসি মাথা দিয়ে গোল করে বার্সেলোনার জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে লা লিগায় মাত্র ৬৯ ম্যাচে মেসি করেন অবিশ্বাস্য ৯৬ গোল।
২০০৯ সালে প্রথমবার জেতা ব্যালন ডি’অর এরপর যেন তার স্থায়ী সম্পদে পরিণত হয়। তিনি ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৯ সালেও এই পুরস্কার জেতেন। পরে তার মোট ব্যালন ডি’অরের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে। প্রথমটি জিতেছিলেন ২২ বছর বয়সে, আর সর্বশেষটি ৩৬ বছর বয়সে।
২০২৪ সালে সাংবাদিক হুয়ান পাবলো ভারস্কিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘আগে আমি কৌশলগত বিষয়গুলো খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না। কিন্তু গার্দিওলার অধীনে আমি অসাধারণ অনেক কিছু শিখেছি। মাঠের ফাঁকা জায়গা কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, কীভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হয় এবং আসলে ফুটবল কীভাবে পরিচালিত হয় এসব তখনই সত্যিকার অর্থে বুঝতে শুরু করি।’
২০১৫ সালে জাভি বার্সেলোনা ছাড়েন। তিন বছর পর বিদায় নেন ইনিয়েস্তাও। এরপর থেকেই দলটির ভেতরে এক বড় পরিবর্তন শুরু হয়। লিওনেল মেসি বরাবরই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু তখন তাঁকে শুধু গোল করার দায়িত্ব নয়, পুরো দলের আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার দায়িত্বও নিতে হয়।
যে মিডফিল্ড একসময় তাঁকে নিরাপত্তা দিত, যারা বলের দখল ধরে রাখত, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করত এবং তাঁর জন্য জায়গা তৈরি করত, তারা আর দলে ছিলেন না। ফলে একসময় মেসির কাছ থেকে একই সঙ্গে জাভি, ইনিয়েস্তা এবং দলের প্রধান গোলদাতার ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। বাস্তবে এটি ছিল যেকোনো ফুটবলারের জন্যই অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মেসি আবারও নিজের খেলার ধরন বদলে নেন। গোলদাতা, নাম্বার টেন বা ‘ফলস নাইন’ থেকে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ‘এনগানচে’ অর্থাৎ এমন একজন প্লেমেকার, যিনি মাঝমাঠে নেমে খেলাকে জমিয়ে তোলেন, যিনি খেলা শুরু করেন এবং অনেক সময় নিজেই সেটি শেষ করেন।
এর ফলে তার পরিসংখ্যানে গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৯-২০ মৌসুমে লা লিগার ৩৩ ম্যাচে তিনি করেন ২৫ গোল এবং ২২টি অ্যাসিস্ট।
বার্সেলোনায় নিজের শেষ মৌসুমে (২০২০-২১) তিনি আবারও দুর্দান্ত গোলস্কোরিং ছন্দে ফেরেন। ওই মৌসুমে ৩৫ লা লিগা ম্যাচে করেন ৩০ গোল, সঙ্গে ছিল ১১টি অ্যাসিস্ট।
তবে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনে (পিএসজি) তার প্রথম মৌসুমেই এই রূপান্তর সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৪ ম্যাচে তিনি করেন ১১ গোল এবং ১৫টি অ্যাসিস্ট। ক্লাব ক্যারিয়ারে এই প্রথম কোনো মৌসুমে তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা গোলের চেয়ে বেশি ছিল।
একজন আর্জেন্টাইন ফুটবল বিশ্লেষক এই পরিবর্তনকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে ‘যিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত গোলস্কোরার, তিনি ধীরে ধীরে আরেকজন ইনিয়েস্তায় পরিণত হয়েছেন।’
মাঠের কৌশলগত বিবর্তনের পাশাপাশি আরেকটি গল্পও চলছিল, যার সমাধান হতে আরও বেশি সময় লেগেছে। সেটি ছিল আর্জেন্টিনার কাছে লিওনেল মেসির প্রকৃত পরিচয় কী?
২০১১ সালের আগস্টে মেসি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হন। এরপরই শুরু হয় একের পর এক হৃদয়ভাঙার গল্প।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে মারাকানায় অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে টাইব্রেকারে চিলির কাছে পরাজয়। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও আবার একই প্রতিপক্ষ চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার।
টানা তিন বছরে তিনটি ফাইনাল কিন্তু প্রতিবারই শূন্য হাতে ফিরতে হয়। প্রতিটি পরাজয়ের সঙ্গে মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার মানুষের প্রত্যাশার চাপ আরও বাড়তে থাকে।
২০১৬ সালের সেই পরাজয়ের পর মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। এর আগেও তিনি দুবার এমন চিন্তা করেছিলেন। পরে অবশ্য তিনি ফিরে আসেন। তবে সেই মেসি আর আগের মতো ছিলেন না।
২০১৯ সালের কোপা আমেরিকায় স্বাগতিক ব্রাজিলের কাছে বিতর্কিত সেমিফাইনাল হারের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনফেডারেশনের কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি সেই মেসি ছিলেন না, যিনি একসময় আর্জেন্টিনার জার্সির চাপের কাছে নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। তিনি এমন এক নেতা হয়ে উঠেছিলেন, যিনি ঠিক করেছিলেন কী জিততে পারেননি, সেটি দিয়ে আর নিজেকে বিচার করতে দেবেন না।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকাই ছিল সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। মারাকানার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপার অপেক্ষার আবসান ঘটায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের আগে সতীর্থদের উদ্দেশ্যে মেসির দেওয়া অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে ড্রেসিংরুমের অনেকেই আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন। আর ২০২২ বিশ্বকাপের মেসি যেন ছিলেন তার পুরো ক্যারিয়ারের এক পরিপূর্ণ রূপ।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে যশকো গভার্দিওলকে দুর্দান্ত গতিতে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে যেন ২০০৯ সালের তরুণ উইঙ্গার মেসিকে আবার দেখা গিয়েছিল।
অন্যদিকে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে দেখা যায় তার অসাধারণ দূরদর্শিতা ও নিখুঁত পাসিং। নাহুয়েল মোলিনাকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সঠিক জায়গায় দৌড়ে গিয়ে রিবাউন্ড আদায় করা, আর চরম চাপের মুহূর্তে নির্ভুলভাবে পেনাল্টি নেওয়া সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন দলের প্রকৃত নেতা।
২০২৩ সালে জিনেদিন জিদানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘ফুটবল অনেক বদলে গেছে। খেলার ধরন, কৌশল, সবকিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। এখনকার ফুটবল আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলনির্ভর ও শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। আগে মাঠে অনেক বেশি ফাঁকা জায়গা পাওয়া যেত।’
কথাগুলো তিনি বলেছিলেন একেবারেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। যেন এমন একজন ফুটবলারের অভিজ্ঞতার কথা, যিনি আধুনিক ফুটবলের তিনটি ভিন্ন যুগে খেলেছেন শক্তিশালী মিডফিল্ডের যুগ, পজিশনভিত্তিক পাসিং ফুটবলের স্বর্ণসময় যুগ এবং পেপ গার্দিওলার পর দ্রুত রূপান্তরনির্ভর কৌশলগত ফুটবলের যুগ। আর প্রতিটি যুগেই নিজেকে সেরাদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ইন্টার মায়ামিতে এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকায় লিওনেল মেসিকে এখন প্রায়ই দেখা যায় দৌড়ানোর চেয়ে বেশি হাঁটতে। একসময় সমালোচকেরা এটিকেই তার দুর্বলতা হিসেবে দেখতো। কিন্তু এখন সেটিই তার দক্ষতার পরিচায়ক বলে মনে হচ্ছে। তিনি খেলা বুঝে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের জন্য শক্তি সঞ্চয় করছেন।
‘শেষের মেসিই সবসময় সেরা মেসি,’ তার শৈশবের আদর্শ পাবলো আইমার একবার বলেছিলেন। সম্ভবত এখনো সেই কথাই সত্যি।
দুই দশকজুড়ে মেসির অর্জন শুধু ট্রফি বা পরিসংখ্যানের ভাণ্ডার নয়। এটি হলো একজন ফুটবলারের বারবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার গল্প। ক্যারিয়ারের প্রতিটি পর্যায়ে নতুন রূপে নিজেকে আবিষ্কার করা।
তিনি ছিলেন কিশোর উইঙ্গার, যিনি ফাবিও কাপেলোকে মুগ্ধ করেছিলেন। পরে হয়েছেন ‘ফলস নাইন’, যিনি ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশলগত ধারা বদলে দিয়েছেন। এরপর হয়েছেন ‘এনগানচে’ যিনি অন্যদের আরও ভালো খেলোয়াড় বানাতে শিখেছেন।
তিনি হয়েছেন অধিনায়ক, যিনি অবশেষে নিজের দেশকে বিশ্বকাপ জয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন এক ধরনের ‘কোয়ার্টারব্যাক’ ভূমিকায়। আর এখন তিনি এমন এক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, যিনি খুব বেশি না দৌড়ালেও খেলার সবকিছু আগে থেকেই বুঝে ফেলেন।
বিশ্বকাপ মেসিকে নিয়ে অনেক ধরনের প্রশংসা ও অতিরঞ্জিত মন্তব্য নিয়ে আসবে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই মূল বিষয়টি ধরতে পারেনি। আসল বিষয় হলো, তিনি কতটা ভালো মানুষ তা নয়, বরং তাঁর ক্যারিয়ারে কতবার তাঁকে নতুনভাবে পরিপূর্ণ একজন খেলোয়াড় হয়ে উঠতে হয়েছে।
(বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে বুধবার (২৫ জুন) মাঠে নামবে ব্রাজিল। মায়ামিতে গ্রুপ ‘সি’র এই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড। ম্যাচটির আগে সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানান, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামবে সেলেসাওরা। দলে ফিরবেন নেইমার।
৮ মিনিট আগে
আফ্রিকার দেশ ঘানার অতি-রক্ষণাত্মক কৌশলে হোঁচট খেয়েছে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল ইংল্যান্ড। মঙ্গলবার রাতে বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘এল’-এর ম্যাচে ঘানার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে ‘থ্রি লায়ন্স’রা।
৪ ঘণ্টা আগে
ডালাসে একটি গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়, টেক্সাস স্টেডিয়ামের (ডালাস শহরের ঠিক বাইরে) ছাদে একটি বিশাল ছিদ্র ছিল, যাতে ঈশ্বর তাঁর প্রিয় ফুটবল দলের খেলা দেখতে পারেন।
৪ ঘণ্টা আগে
মাঠে নামার আগেও চলছিল রোনালদোর সমালোচনা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির পাশাপাশি বর্তমান তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ডরা যখন মাঠ কাঁপাচ্ছেন তখন রোনালদো কী করছেন তা নিয়ে চলছিল আলোচনা।
৪ ঘণ্টা আগে