দ্বিতীয় পর্বচর্যাপদ থেকে চব্বিশ: আলাওল থেকে আল মাহমুদ—ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয় সাংস্কৃতিক শক্তিবাংলা ভাষার প্রাচীন থেকে নবীন সকল কবি সাহিত্যিক প্রমাণ করেছেন যে ভাষা হলো জাতির ভিতরের শক্তি যা মানুষের মধ্যে চিন্তা, অনুভূতি ও প্রতিরোধ জাগায়। এটি শুধুই সাহিত্যিক সৌন্দর্য নয়; ভাষা নিজেই একটি সাংস্কৃতিক অস্ত্র, যা জাতিকে অদৃশ্যভাবে সংযুক্ত রাখে।
তোমাক ভালোবাসি ফেলচোম...হারিয়ে যাচ্ছে গাইবান্ধার এই আঞ্চলিক ভাষা‘যেদিন মুই তোমাক পতথম দেখচোম, সেইদিন থাইকেই মুই তোমাক ভালোবাসি ফেলচোম...’—গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষার এমন মায়াবী আর আবেগময় প্রকাশ আজ আর আগের মতো শোনা যায় না। আধুনিকতা, শহরমুখী জীবনযাত্রা আর প্রমিত বাংলার প্রভাবে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে রংপুরি বা কামতাপুরি উপ-ভাষার এই স্বতন্ত্র রূপটি। সচেতন মহল মনে করছেন,
প্রথম পর্বচর্যাপদ থেকে চব্বিশ: ভাষা যখন জাতির আত্মার প্রথম স্থাপত্যভাষা কখনও নিছক যোগাযোগের উপায় নয়। ভাষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি জাতির ইতিহাস, স্মৃতি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের বিন্যাস। ভাষা যখন আঘাতপ্রাপ্ত হয়, জাতির আত্মাও আহত হয়। আবার ভাষা যখন জাগ্রত হয়, তখন জাতিসত্তা শক্তিরূপে উদ্ভাসিত হয়।
অমর একুশে•চোখের সামনেই হারিয়ে যাচ্ছে ভাষা, স্মৃতিকাতর শেষ ২ কথকমৌলভীবাজারের একটি চা বাগানে বাস দুই বোন– ভেরোনিকা কেরকেটা ও খ্রিস্টিনা কেরকেটার। তাদের আরেক পরিচয়– ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ‘খাড়িয়ার’ শেষ দুই কথক। তাঁদের কণ্ঠ থেমে গেলে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে ভাষাটি। কারণ, চেষ্টা করেও কাউকে শেখাতে পারেননি ভাষাটি।
সর্বস্তরে ভাষা চর্চার অধিকারে সংহত হবে একুশরাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ অনেকের আত্মত্যাগ মলিন হতে বসেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা।
কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের বিপন্ন ভাষাবিশ্বজুড়ে ভাষার তালিকা বা ক্যাটালগ তৈরি করা সংস্থা এথনোলগের তথ্যমতে, ইংরেজি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কথিত ভাষা। ১৮৬টি দেশে প্রায় দেড় শ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে দুজন মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষ একে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।
ভাষার গল্প - কর্নিশভাষা একবার মরে গেলে আর ফিরে আসে না—এমনটাই মনে করতেন ভাষাবিজ্ঞানীরা। অর্থাৎ কোনো ভাষার শেষ মাতৃভাষী মানুষটি মারা গেলে, সেই ভাষা চিরতরে হারিয়ে যায়। কিন্তু এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে ইংল্যান্ডের কর্নওয়াল অঞ্চলের একটি ভাষা—কর্নিশ।
শব্দেরও আছে গল্পভাষা প্রবহমান নদীর মতো; সময়ের আবর্তে শব্দের আভিধানিক অর্থ বদলে যাওয়া ভাষার চিরায়ত বাস্তবতা। আমরা প্রতিদিন হাজারও শব্দ ব্যবহার করি, যার কোনোটি আমাদের দক্ষতাকে প্রকাশ করে, কোনোটি লজ্জাকে আবার কোনোটি আমাদের শারীরিক অসুস্থতাকে।
অমর একুশে•থার ভাষার সন্ধানেভাষা শুধু মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, ভাষা একটি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও আত্মপরিচয়ের ধারক। ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকে একটি জনগোষ্ঠীর শতাব্দী-প্রাচীন স্মৃতি, বিশ্বাস, লোকজ জ্ঞান, জীবনবোধ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন।
অমর একুশে•বাংলাদেশে রাজনীতির ভাষা: শব্দ, ভয় ও চুপ থাকার ব্যাকরণএ লেখাটি লেখার আগে সচেতনভাবে কখনো খেয়ালই করিনি, এখন আমরা কথা বলার আগে একটু থেমে যাই। এটা এতটাই স্বাভাবিক যে, আমরা আর প্রশ্নই করি না, এই ‘থামা’ কবে থেকে আমাদের স্বভাব হয়ে গেল
ভাষা একবার মরলে আর ফেরে না—এই ধারণা ভুল?ভাষাবিজ্ঞানের চিরায়ত ধারণায় বলা হতো, কোনো ভাষা একবার তার শেষ স্থানীয় বক্তা বা নেটিভ স্পিকাকে হারালে, অর্থাৎ মৃত বা বিলুপ্ত হলে, তা আর কখনোই স্বাভাবিক কথ্যরপে ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু গত শতকে ইউরোপের একটি প্রান্তিক ভাষা এই অসম্ভবকে সম্ভব করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।
অমর একুশে•ডিজিটাল দুনিয়ায় বাংলা ভাষার চ্যালেঞ্জচর্যাপদের সেই প্রাচীন পঙ্ক্তি থেকে শুরু করে আজকের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চ্যাটবক্স—বাংলা ভাষার এই দীর্ঘ পরিক্রমা শুধু সময়ের বিবর্তন নয়, এক মহাকাব্যিক রূপান্তর।