বাব এল-মান্দেবে উত্তেজনা/জ্বালানি নিরাপত্তা ও রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সংকটের আভাস

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করছে।

ভারত মহাসাগর-ভূমধ্যসাগর রুটে সমুদ্র পরিবহনে বাব এল-মান্দেব একটি গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট। আরব সাগর ও এডেন সাগর পেরিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশে এই জলপথের বিকল্প নেই। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলমান স্থবিরতায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতে বাব এল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাব এল-মান্দেবের নতুন অস্থিরতায় মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তবে ইউরোপ ও আমেরিকায় বাংলাদেশের মূল রপ্তানির ওপর তাৎক্ষণিকভাবে তেমন প্রভাব পড়বে না। কারণ ২০২৩ সালের শেষদিকে হুতিদের হামলা শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্য এল-মান্দেব এড়িয়ে আফ্রিকার উপকূল ঘুরে যাচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময় এরই মধ্যে বেড়েছে। নতুন করে এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে আমদানি বাণিজ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে তেল আমদানিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।’

জ্বালানি আমদানিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ

বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসেরও (এলএনজি) বড় অংশ আমদানিনির্ভর। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও এলএনজি সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

বাংলাদেশের সব জ্বালানিবাহী চালান সরাসরি বাব এল-মান্দেব দিয়ে আসে না। তবে এই প্রণালিতে সৃষ্ট অস্থিরতা অপরিশোধিত ও পরিশোধিত—উভয় জ্বালানির বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে। এতে জাহাজভাড়া, বিমার প্রিমিয়াম ও যুদ্ধঝুঁকি-সংক্রান্ত ব্যয় বেড়ে যাবে। এছাড়া আগের চেয়ে বেশি জাহাজকে দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এই দীর্ঘ যাত্রার প্রত্যক্ষ প্রভাব এরই মধ্যে দেখা গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য জ্বালানি তেল নিয়ে এমটি নিনেমিয়া নামের একটি ট্যাংকার গত ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা করে। বাব এল-মান্দেব হয়ে এলে জাহাজটির বাংলাদেশে পৌঁছতে প্রায় ১৬ দিন লাগত। কিন্তু হামলার ঝুঁকি এড়াতে ট্যাংকারটি এই প্রণালি ব্যবহার না করে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা উপকূল ঘুরে গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। জাহাজটির যাত্রাপথ ৪ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল থেকে বেড়ে প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইলে দাঁড়ায়। এতে সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার দ্রুত প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে পড়ে। অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এই দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বেশি থাকলে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, অপরিশোধিত তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে বাড়তি ডলার ব্যয় করতে হবে।

পরিবহন ও শিল্পখাতের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়বে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, সেচ ব্যয় ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচে। ফলে জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য ও সমুদ্র পরিবহনে ব্যয়বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী ব্যয়চাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো এলএনজি আমদানিনির্ভরতা। কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আসা অনেক চালান আগে হরমুজ প্রণালিনির্ভর ছিল। কিন্তু প্রণালিটির অস্থিরতায় কাতার এরই মধ্যে ফোর্স মেজারের আওতায় বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। ফলে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। তবে সেইও এরই মধ্যে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

আফ্রিকা উপকূল ঘুরে চলাচলে জাহাজগুলোর যাত্রাপ্রতি সময় বেড়ে যাবে। ফলে নতুন চালানের জন্য খালি ট্যাংকার পাওয়া যাবে কম। এর সঙ্গে বাড়তি পরিবহন ব্যয় যোগ হলে দেশে এলএনজি আনার খরচ আরও বাড়বে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ কঠিন হয়ে উঠবে। যেটুকু সরবরাহ হবে, তাতেও এলএনজির বাড়তি দামের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে।

নতুন নয়, সংকট চলছে আগে থেকেই

জাহাজের যাত্রাপথ যত বেশি হয়, জ্বালানি খরচ তত বাড়ে। এছাড়া একই জাহাজ নির্দিষ্ট সময়ে কমসংখ্যক ট্রিপ সম্পন্ন করতে পারে। এতে কন্টেইনার পরিবহনে ভাড়া বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এর সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকি বিমা, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়, বিলম্বজনিত স্টোরেজ ও ডিটেনশন চার্জ এবং কন্টেইনারের টার্ন অ্যারাউন্ড সময় বেড়ে যায়। বাব এল-মান্দেব সংকট দীর্ঘায়িত হলে এসব খরচ আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা সেলের কনভেনার মেহেদী হাসান স্ট্রিমকে বলেন, ‘গত আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে বাব এল-মান্দেব এড়িয়ে চলার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে। সময়ও ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি লাগছে। নতুন উত্তেজনায় তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে এই রুট দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি হয়। ফলে তেলের বাজারে এর বড় প্রভাব পড়বে। আর তেলের বাজারের অস্থিরতার প্রভাব সব খাতেই পড়বে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খরচও বাড়বে।’

রপ্তানি ও তৈরি পোশাকে বাড়তি সময়ের চাপ

বাংলাদেশের রপ্তানি অনেকটাই তৈরি পোশাকনির্ভর। এরই মধ্যে জ্বালানি সংকট ও বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কারখানাগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে। এর ওপর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা ও ব্যয়বহুল লজিস্টিকস ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। রপ্তানিকারকদের নগদ অর্থপ্রবাহেও চাপ বাড়বে। কারণ পণ্য পাঠাতে বেশি সময় লাগলে বিনিয়োগের রিটার্ন পেতেও বিলম্ব হয়।

পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে তৈরি হতে পারে ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি। বিদেশী ক্রেতারা বাড়তি পরিবহন ভাড়া পরিশোধ করলেও দিন শেষে এর চাপ আমাদের ওপরই পড়বে।’

সেলিম রহমান আরও বলেন, ‘তুরস্ক থেকে তৈরি পোশাকের কাঁচামাল ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তুলা আমদানিতেও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হলে উৎপাদন ও রপ্তানির সময়সূচি আরও ব্যাহত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ

চলতি বছরের এপ্রিলে তেলের দাম বৃদ্ধির ধাক্কায় খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছিল। নতুন করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সেই চাপ তীব্র হতে পারে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে জ্বালানির আমদানি ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ খুচরা দামের মধ্যে সমন্বয় করা। আমদানি ব্যয় বাড়লেও খুচরা দাম স্থির রাখা হলে ভর্তুকির বোঝা বাড়বে। আবার দাম বাড়ানো হলে তা সরাসরি ভোক্তা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে।’

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের একটি কাঠামোগত দুর্বলতা, যা আন্তর্জাতিক নৌপথে একের পর এক সংকটে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা সম্প্রসারণ ও বিকল্প আমদানি রুট নিশ্চিতের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত