দাম ও উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী, চা শিল্পে ফিরছে স্বস্তি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মৌলভীবাজার

শ্রীমঙ্গলের চা বাগান। ছবি: সংগৃহীত
শ্রীমঙ্গলের চা বাগান। ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে চা উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও নিলামে ভালো দাম পাওয়ায় দেশের চা শিল্পে নতুন স্বস্তি ফিরেছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৭২টি বৃহৎ ও ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখ ৩১ হাজার কেজি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে চা উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।

চলতি বছর দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। অনুকূল বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার সুবাদে সাধারণত মার্চের পর থেকে উৎপাদনে গতি আসে। চলতি বছরের এপ্রিলে ৫৯ লাখ, মে মাসে ৯১ লাখ ও জুনে ১ কোটি ২৪ লাখ কেজির বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে।

২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে চা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২৪ লাখ ১৯ হাজার কেজি। এ হিসাবে চলতি বছরের একই সময়ে উৎপাদন বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে উৎপাদন ছিল ২ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার কেজি।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে গত কয়েক বছর চা পাতার উৎপাদন তুলনামূলক কম ছিল। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত খরা, তাপমাত্রার তারতম্য এবং বাগান পরিচর্যায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল। এ ছাড়া উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং নিলামে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় অনেক বাগান কর্তৃপক্ষ চা গাছের পরিচর্যা ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারেনি।

তবে বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এ বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হয়েছে। নিলামে চায়ের ভালো দাম পাওয়ায় বাগান মালিক ও সংশ্লিষ্টরাও চা গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ও উন্নত ব্যবস্থাপনায় নজর দিয়েছেন। ফলে চা গাছে কুঁড়ি ও কাঁচা পাতার উৎপাদন বেড়েছে। সব মিলিয়ে আগের বছরের তুলনায় বর্তমানে চা পাতার উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় নিলামে চায়ের দাম কম থাকার সমস্যাটি কয়েক বছর ধরেই ভোগাচ্ছিল। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ন্যূনতম নিলাম মূল্য নির্ধারণ এবং বাজারে চাহিদা বাড়ায় বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

চট্টগ্রাম, শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়—বর্তমানে দেশের তিনটি চা নিলাম বাজারেই দাম বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে রয়েছে। অধিকাংশ নিলামেই ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ চা বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি ও ভালো দামের সুবাদে দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর দেশের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ন্যাশনাল টি কোম্পানির মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দিপন কুমার সিংহ বলেন, ‘চলতি মৌসুমে আবহাওয়া চা উৎপাদনের জন্য বেশ অনুকূল রয়েছে। বর্তমানে বাগানগুলোতে প্রচুর কচি পাতা ও কুঁড়ি দেখা যাচ্ছে।’

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর ইসলাম বলেন, ‘নিলামে ভালো দাম পাওয়া গেলে বাগানগুলোতেও বিনিয়োগ বাড়বে। ফলে উৎপাদন আরও বাড়বে।’

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘২০৩০ সাল নাগাদ দেশে চা উৎপাদন ১১ কোটি ৫০ লাখ কেজিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।’

বর্তমানে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও খরা সহনশীল জাত সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রিন টি, উলং টি, হোয়াইট টি ও অন্যান্য মূল্যসংযোজিত চা উৎপাদনেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র চাষি ও বাগান ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

দাম ও উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী, চা শিল্পে ফিরছে স্বস্তি