অভিবাসন ও জলবায়ুজনিত চাপ: দেশের হাওরাঞ্চলে বাড়াচ্ছে বন্যার ঝুঁকি

লেখা:
লেখা:
আশরাফুল হক

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৫০
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এক মহিলা। ছবি: মাসুদ আল মামুন

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা একটি সাধারণ ঘটনা। বাটি আকৃতির এই বৃহৎ ভৌগোলিক নিম্নভূমিগুলো বছরের প্রায় সাত মাস পানিতে ডুবে থাকে।

বর্ষার শুরুতে ভারতের মেঘালয়ের হিমালয় পাদদেশে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে তৈরি জলপ্রবাহ সীমান্তবর্তী নদীগুলোর মাধ্যমে প্রবেশ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকায় বন্যা সৃষ্টি করে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীতে পলি জমে যাওয়ায় বন্যার প্রভাব (২০১৭ সালের বন্যা) আরও তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপও এখানকার মানুষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, মেঘালয়ের হিমালয় পাদদেশে অবস্থিত সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের রংপুর বস্তি বা নতুন জীবনপুরের মতো নতুন তৈরি হওয়া গ্রামগুলি ২০২২ সালে একাধিক আকস্মিক বন্যায় ভেসে গিয়েছিল। যদিও এই এলাকায় আকস্মিক বন্যা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এই গ্রামগুলিতে ধ্বংসের মাত্রা ছিল ব্যাপক।

ভারত থেকে উৎপন্ন সীমান্তবর্তী ধলাই নদীর তীরে অবস্থিত এসব গ্রামের একের পর এক বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি ভেসে যায়। এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্যার ভয়াবহ শক্তি দেখিয়েছে। যা আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্যও এক বিরল ঘটনা।

এর কারণ গ্রামগুলো এখানে থাকার কথা ছিল না এবং এগুলো এমন মাত্রার বন্যা সহ্য করার মতো করে তৈরিও হয়নি।

গ্রামের বাসিন্দারাও এ অঞ্চলের মূল বাসিন্দা নন। তাঁদের ভাষা ও গ্রামের নাম থেকেই তা বোঝা যায়। ‘রংপুর বস্তি’ নামটি রংপুর থেকে আসা মানুষের বসতি নির্দেশ করে। ‘নতুন জীবনপুর’ ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর মানুষদের বসতি। নাম থেকেই বোঝা যায় তাঁরা নতুন জীবনের সন্ধানে এদিকে বসতি গড়েছেন।

তারা কাজ ও জমির সন্ধানে এখানে এসে মূলত খাস জমি, নদীর চর বা বাঁধের ওপর ঘরবাড়ি তৈরি করেছেন।

নতুন বসতি, হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ

নতুন বসতি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আগের অনাবাদি জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় আসে। এসব জমিতে আগে হিজল, করচ গাছ ও লম্বা নলখাগড়ার ঝোপ ছিল, যা হাওরে প্রবেশ করা বন্যার পানির প্রবাহকে প্রতিরোধ করত।

সিলেটের রাজাপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী ওয়ালিউল্লাহ বলেন, আগে নলখাগড়ার জমি ছিল, এখন চাষ হচ্ছে। ফলে পাহাড় থেকে নামা পানি কোনো বাধা ছাড়াই চলে আসে। এখন আবার সেখানে রাস্তা হওয়ায় পানিও জমে থাকে।

এখন প্রাকৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করার মতো গাছপালা প্রায় শূন্য। ফলে প্রবল বন্যার পানিতে শুধু প্লাবিত না হয়ে টিনের ঘরবাড়িও ভেসে যায়।

২০১৭ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গাছপালা বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বনভূমি পানি ধরে রাখতে পারে এবং পলি প্রবাহ কমায়।

গবেষণাটিতে আরও বলা হয়, পরিবেশগত পরিবর্তন শুধু দুর্যোগের মাত্রা বাড়ায় না। প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে তোলে। বন উজাড় হওয়ায় বন্যা হলে ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়।

হাওর অঞ্চলে বন উজাড়ের কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে যাচ্ছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। আগে এখানে পানিসহিষ্ণু গাছপালা প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করত।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বন উজাড়ের ফলে পলি জমে নদী ভরাট হয় এবং কাদা প্রবাহ সৃষ্টি হয়, যা সাধারণ বন্যার পানির চেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক।

২০১৩ সালের আরেকটি গবেষণা দেখায়, জনসংখ্যার চাপ ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাংলাদেশের জলাভূমি—হাওর, বাওড় ও বিলের জন্য বড় হুমকি।

বাড়ছে জলবায়ুর তীব্রতা

২০১৮ সালের এক গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়, ২০২০, ২০৫০ ও ২০৮০ দশকে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ও পানির প্রবাহ যথাক্রমে ৪০ মিলিমিটার (১.৫ ইঞ্চি), ৯০ মিলিমিটার (৩.৫ ইঞ্চি) এবং ১৫০ মিলিমিটার (৬ ইঞ্চি) পর্যন্ত বাড়তে পারে। মেঘনা নদীর অববাহিকায়, বিশেষ করে মেঘালয়ে, মেঘের আচ্ছাদন আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা হাওর অঞ্চলে উচ্চতর বৃষ্টিপাত এবং জলপ্রবাহের ইঙ্গিত দেয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এতে পূর্ব হিমালয়ের নদীগুলোতে অতিরিক্ত পানি সৃষ্টি হবে। যা পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি করে বন্যা আরও বাড়াবে।

এখন বৃষ্টির সময়ও পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে যেখানে জুলাই-আগস্টে বেশি বৃষ্টি হতো, এখন মে মাসে বেশি হচ্ছে। ফলে স্বল্প সময়ে বেশি তীব্র বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে, বিশেষ করে প্রাক বর্ষায়।

২০২২ সালে মেঘালয়ে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেট ও সুনামগঞ্জে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, তা এরই উদাহরণ।

প্রকৃতির রোষে বাস্তুচ্যুত মানুষ

২০২২ সালের বন্যায় সুনামগঞ্জের ৯৪ শতাংশ এবং সিলেটের ৮৪ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে মানুষের হাজার হাজার একরের ফসল নষ্ট হয় এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়।

অনেকে জীবিকার জন্য শহরে চলে যান। নতুন জীবনপুরের হাসিনা বেগম বন্যায় ঘর হারিয়ে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ শুরু করেন। তাঁর ছোট দুই সন্তানও কারখানায় কাজ করতে শুরু করে।

তিনি বলেন, সব হারিয়ে ফেলেছি। এখন তাঁরা অল্প হলেও উপার্জন করছে। তাঁর পরিকল্পনা, কিছু টাকা জোগাড় করে আবার ঘর বানাবেন।

বারবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মানুষ ঋণের ফাঁদে পড়ছে। ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আবার বন্যা আঘাত হানে।

জনসংখ্যার চাপ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে

হাওর অঞ্চলের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা এর একটি উদাহরণ মাত্র। দেশের অন্যত্রেও মানুষ প্রায়শই এমন বন্যাপ্রবণ সমভূমিতে বাড়িঘর তৈরী করছে। অথবা এমনস্থানে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে যেখানে আগে কেউ বাস করতো না। যার ফলে এখন বন্যা বেশি হচ্ছে বলে মনে হলেও আসলে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় জনগণের মতামত এবং বিভিন্ন খাতের সমন্বয় জরুরি। স্থানীয় গাছপালা সংরক্ষণ করে রক্ষণাবেক্ষণ করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

এর উদাহরণও রয়েছে। রংপুর বস্তির কাছে কিছু সরকারি ভবন পিলারের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে, যা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে কমিউনিটি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা করচ বনও বন্যার ক্ষতি কমাতে সাহায্য করছে।

লেখক: সাংবাদিক। মঙ্গাবে থেকে অনূদিত

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত