সিসা যেভাবে ঢাকার শিশুদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিচ্ছে

শাহরিয়ার ইসলাম শোভন
শাহরিয়ার ইসলাম শোভন
ঢাকা

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৫৪
প্রতীকী ছবি

ঢাকার বাতাসে মিশে আছে এক অদৃশ্য বিষ—সিসা। এই বিষ শিশুদের শুধু মানসিক বিকাশে বাধা দিচ্ছে না, তাদের ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতি আইসিডিডিআরবি ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা এই সংকটের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে।

২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার দুই থেকে চার বছর বয়সী ৫০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা স্বাভাবিক সীমার চেয়ে বেশি।

গবেষণার তথ্য আরও উদ্বেগজনক। প্রতিটি শিশুর রক্তেই সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যেখানে মধ্যম মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে ৬৭ মাইক্রোগ্রাম, যা সিডিসি নির্ধারিত নিরাপদ সীমা প্রতি লিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রামের অনেক ওপরে। বিশেষ করে যারা সিসাসম্পর্কিত শিল্পকারখানার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে, তাদের শরীরে সিসার মাত্রা পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরে থাকা শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

এ সংকট ঢাকার সর্বত্র সমান নয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা ঢাকা উত্তরের তুলনায় বেশি। এর পেছনে একটি বড় কারণ সিসা দূষণকারী শিল্পকারখানার ঘনত্ব দক্ষিণ ঢাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি।

এই বাস্তবতা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের পূর্বাভাস। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন লুবির মতে, এ ধরনের সিসার সংস্পর্শ ভবিষ্যতের কর্মশক্তির সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।

বাস্তবে তথ্যগুলো যেমন

ঢাকার বাদামতলীর বাসিন্দা সুলতানার অভিজ্ঞতা সেই কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসেন। একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি তাঁর সন্তানের মনোযোগের ঘাটতি স্পষ্টভাবে লক্ষ করেছেন। প্রথমে তিনি দায় দিয়েছেন মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল আসক্তিকে।

তিনি বলেন, অবসর সময় পেলেই শিশুরা ফেসবুকে চ্যাট করে, গেম খেলে বা ভার্চ্যুয়াল জগতে ডুবে থাকে। সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা কমছে। তাঁর ছোট ছেলের মধ্যেও তিনি মনোযোগের এই ঘাটতি দেখছেন।

কিন্তু এই গল্পের আরেকটি দিক আছে যা আমরা প্রায়ই অগ্রাহ্য করি।

সুলতানার বাসা এবং তাঁর সন্তানের স্কুল দুটিই সিসা নির্গমনকারী শিল্পকারখানার এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। তিনি একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা। সেখানে চারপাশে ছোট ছোট বই বাঁধাইয়ের কারখানা, ধাতব ও সিসার ওয়ার্কশপ। এসব জায়গা থেকে প্রায়ই বের হয় কালো ধোঁয়ার তীব্র গন্ধ।

এই বাতাসই ধীরে ধীরে বিষে পরিণত হয়। সিসার ক্ষুদ্র কণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে, ফুসফুস পেরিয়ে রক্তে মিশে শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। শুধু একটি পরিবার নয় এভাবে একই ঝুঁকিতে বসবাস করছে এই এলাকায় প্রায় চার লাখ মানুষ।

শিক্ষাবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে সতর্ক করছেন। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ড. নওজিয়া ইয়াসমিনের মতে, সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। এটি সবার জন্য ক্ষতিকর হলেও শিশু এবং সন্তান ধারণক্ষম নারীদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

তিনি বলেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, মনোযোগের ঘাটতি এবং স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা ক্রমেই বাড়ছে। এই লক্ষণগুলোকে আমরা হয়তো প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে মনে করি, কিন্তু এর পেছনে সিসা দূষণের মতো গভীরতর কারণও হতে পারে।

সিসা ভারী ধাতু শিল্প, নির্মাণ, ব্যাটারি, রং ও জ্বালানিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর বিষক্রিয়া ধীরে ধীরে কাজ করে, কিন্তু প্রভাব হয় দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক।

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু সিসা দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ কোটি শিশু উচ্চমাত্রার সিসা-সংস্পর্শে রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ মানুষ এর কারণে মারা যায়। এমনকি সিসা-সংস্পর্শজনিত মৃত্যুহারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আর শুধু স্বাস্থ্যগত নয় এটি নীতিনির্ধারণের প্রশ্ন, উন্নয়নের প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।

প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে শ্রেয়

‘প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে শ্রেয়’ এই কথাটি জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রায় সর্বজনস্বীকৃত সত্য। কিন্তু ঢাকার প্রেক্ষাপটে সেই প্রতিরোধ এখনো বাস্তবতার কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) দুই সংস্থার প্রশাসনিক কাঠামো থাকলেও শিশুদের জন্য মারাত্মক সিসাদূষণ মোকাবিলায় কার্যকর, ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো তৈরি হয়নি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

এই নীরব সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় শহরের প্রান্তিক এলাকায়। পুরান ঢাকার নিকটবর্তী কেরানীগঞ্জের ধুলাময় পরিবেশে ৯ বছরের ইমরান প্রতিদিন পরিত্যক্ত ব্যাটারি ও ধাতব টুকরো সংগ্রহ করে পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটায়। নিজের অজান্তেই সে প্রতিনিয়ত সিসা-ধুলার সংস্পর্শে আসে—যা তাঁর মতো হাজারো শিশুর জীবনের বাস্তবতা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ শিশুর মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে হৃদরোগসহ নানা জটিলতাঁর ঝুঁকি বাড়ায়।

এই শিশুদের জীবন শুরু হয় এমন এক পরিবেশে, যেখানে সর্বত্র উপস্থিত বিপদ। ফলে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, জরুরি স্বাস্থ্য ইস্যু যেমন হাম ও রুবেলা নিয়ে কাজের চাপের কারণে সিসাদূষণ ইস্যুটি এখনো পূর্ণ মনোযোগ পায়নি। অন্য জরুরি সমস্যাগুলো সমাধানের পর আমরা সিসা সংকটের দিকে আরও গুরুত্ব দেব।

এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক যে পর্যবেক্ষণ তা আরও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থা পিওর আর্থ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, সিসাদূষণে আইকিউ হ্রাসের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশে রয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রতিবছর আইকিউ পয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যা শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

গবেষক বিওর্ন লারসেনের মতে, সিসার প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, এটি সরাসরি একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও সীমিত করে দেয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর ক্ষতি বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে শিশুদের জন্য সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন রক্তে ৩.৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার এর বেশি সিসার উপস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারক সতর্ক করে বলেছেন, সিসা শিশুদের মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এই ধাতব বিষ শিশুদের শেখার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে এবং আচরণগত পরিবর্তন ঘটায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এককথায় একটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

এই স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতিও যুক্ত। ২০২৩ সালে পিওর আর্থের তথ্য অনুযায়ী, সিসাদূষণের কারণে শিশুদের আইকিউ হ্রাসের ফলে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১০ দশমিক ৮৯৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, এই সংকট শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির সক্ষমতাকেও দুর্বল করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। আইসিডিডিআরবির পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও ওয়াশ প্রকল্পের সমন্বয়ক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, সঠিক নীতি ও প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির ব্যবহার কমানো ও আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর, অবৈধ রিসাইক্লিং কার্যক্রম বন্ধ, ব্যবহৃত ব্যাটারির আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং মসলাজাত পণ্যে সিসা ব্যবহারে কঠোর নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ভোক্তা পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন

এই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আর কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন হিসেবেও উঠে আসছে। শ্রম আইনবিশেষজ্ঞ সাইয়েদ আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সিসা বিষক্রিয়া সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত জীবনের অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

তাঁর মতে, জনস্বার্থে যেকোনো নাগরিক—এনজিও, সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী বা অভিভাবক জনস্বার্থ মামলা মাধ্যমে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করতে পারেন।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসেও এ ধরনের পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে হস্তক্ষেপের নজির রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পরিবেশগত ক্ষতিকে জীবনের অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।

পরবর্তীতে ২০১৯ সালের হাকিমপুরী জর্দা মামলায় ক্ষতিকর ভারী ধাতু থাকার কারণে পণ্য বন্ধের নির্দেশ আসে। ২০১৪ সালের লিগ্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন বনাম বাংলাদেশ মামলায় খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ২০২১ সালে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনো সীমিত।

সব মিলিয়ে সিসাদূষণ এখন একটি বহুমাত্রিক সংকট। এই সংকটে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও আইন একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। ইমরানের মতো হাজারো শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ এই অদৃশ্য বিষের কারণে ধীরে ধীরে বিপদের মুখে পড়ছে। তাই প্রশ্নটি আর শুধু সচেতনতার নয়। এটি এখন সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।

সম্পর্কিত