নেচারের গবেষণা

তাপপ্রবাহের নতুন মানচিত্র: বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে গরম বাড়ছে কেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৪৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহ এখন আর মৌসুমি অস্বস্তির বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে বড় ধরনের জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি বছরই গরম আরও দীর্ঘ, তীব্র ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি পরিবেশ বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণায় এই পরিবর্তনের পেছনের কারণগুলো নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

‘রিসেন্ট চেঞ্জেস ইন স্পেশিওটেমপোরাল প্যাটার্নস অব হিট এক্সট্রিমস ইন সাউথ এশিয়া’ শিরোনামের গবেষণাটি করেছে ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের শিক্ষক অভিরূপ ব্যানার্জি এবং পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের গবেষক শ্রদ্ধা গুপ্তের নেতৃত্বাধীন একটি দল। দলের অন্য গবেষকেরা হলেন—প্রণব প্রিয়াংশু, অঙ্কন কর, রুবি সাহা, তনুজিৎ চক্রবর্তী, দিবাকর ঘোষ, ইয়ুর্গেন কুর্থস ও চিত্তরঞ্জন হেন্স।

প্রখ্যাত জার্নাল নেচারের ‘ক্লাইমেট অ্যান্ড অ্যাটমোসফিয়ার সায়েন্সে’ কয়েক মাস আগে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা দ্রুত বাড়ছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৮৯ সাল, ১৯৯০ থেকে ২০১৯ এবং ২০২০ থেকে আগামী ২০৪৯ সাল—এই তিন সময়-কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের কেন্দ্র ও বিস্তারে ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে তাপপ্রবাহের মূল ‘হটস্পট’ ছিল পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া। এখন তা পাকিস্তান, উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং দক্ষিণ-পশ্চিম তিব্বতি মালভূমির দিকে সরে এসেছে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাপপ্রবাহকে শুধু ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়নি। গবেষকেরা কমপ্লেক্স ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, অনেক অঞ্চলে তাপপ্রবাহ একসঙ্গে বা সমন্বিতভাবে ঘটছে। অর্থাৎ পাকিস্তানে যে গরম শুরু হচ্ছে, তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম ভারতে দেখা যাচ্ছে। সেটি বিস্তৃত হচ্ছে বাংলাদেশেও। আবার এই তাপপ্রবাহের সঙ্গে ইরান, আরব উপদ্বীপ এমনকি উত্তর-পূর্ব আফ্রিকারও সংযোগ তৈরি হচ্ছে।

এই ‘সংযুক্ত তাপপ্রবাহ’ বোঝার জন্য গবেষকেরা ইআরএ-ফাইভ রিঅ্যানালিসিস ডেটা (ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টের তৈরি করা নির্ভরযোগ্য ডেটাসেট) এবং সিএমআইপি-সিক্স ক্লাইমেট মডেল ব্যবহার করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, ১৯৯০ সালের পর থেকে ‘সমন্বিত তাপপ্রবাহ’ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও ইরানের মধ্যে তাপপ্রবাহের সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়েছে। আগে এটি ছিল পূর্ব ভারতের সঙ্গে।

কেন এমন হচ্ছে?

গবেষণা বলছে, এর প্রধান কারণ সারফেস সেন্সিবল হিট ফ্লাক্স বা ভূ-পৃষ্ঠের সংবেদনশীল তাপপ্রবাহ। সহজ ভাষায়, ভূমি থেকে বায়ুমণ্ডলে তাপ সঞ্চালন এখন অনেক বেশি হচ্ছে। মাটি শুকিয়ে গেলে, আর্দ্রতা ও গাছপালা কমে গেলে ভূমি দ্রুত উত্তপ্ত হয়। সেই তাপ বাতাসকে আরও গরম করে তোলে। এটি এক ধরনের ‘পজিটিভ ফিডব্যাক লুপ’ তৈরি করে। এর অর্থ হচ্ছে, একটি পরিবর্তন আরেকটি পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে, এই বাড়তি পরিবর্তন প্রথমটিকে আরও শক্তিশালী করে। গবেষণায় বলা হয়েছে, নগরায়ণ, বন উজাড়, মরুকরণ এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন এই তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির বড় কারণ।

পাকিস্তানে যে গরম শুরু হচ্ছে, তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম ভারতে দেখা যাচ্ছে। সেটি বিস্তৃত হচ্ছে বাংলাদেশেও। ছবি: নেচার থেকে নেওয়া
পাকিস্তানে যে গরম শুরু হচ্ছে, তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম ভারতে দেখা যাচ্ছে। সেটি বিস্তৃত হচ্ছে বাংলাদেশেও। ছবি: নেচার থেকে নেওয়া

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, উচ্চচাপ বলয় এবং স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ বিঘ্নিত হওয়া (অ্যাটমোসফেরিক ব্লকিং)। কোনো অঞ্চলে দীর্ঘ সময় উচ্চচাপ থাকলে, বাতাস নিচে নামতে থাকে, আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং সূর্যের তাপ সরাসরি ভূমিতে পড়ে। ফলে গরম আরও বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘সারকামগ্লোবাল টেলিকানেকশন’। অর্থাৎ, এক ধরনের বৃহৎ বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গ, যা ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত তাপপ্রবাহকে সংযুক্ত করতে পারে।

গবেষকেরা আরও দেখেছেন, নর্থ আটলান্টিক গ্রিনল্যান্ড অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনও দক্ষিণ এশিয়ার গরম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। এই পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, আর্টিক অঞ্চলের বরফ গলছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ উষ্ণ হচ্ছে, উত্তর আটলান্টিকে বায়ুচাপের পরিবর্তন হচ্ছে, উচ্চ বায়ুমণ্ডলে শক্তিশালী পশ্চিমা বাতাসের ধারা (জেট স্ট্রিম) দুর্বল হচ্ছে এবং বরফ গলার কারণে সমুদ্রের লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। এসব কারণে পাকিস্তান ও উত্তর ভারতের ওপর ‘ব্লকিং’ তৈরি হয়। আর এটিই গ্রীষ্মের আগে তীব্র তাপপ্রবাহ তৈরি করে।

ভবিষ্যতের পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। ২০২০ থেকে ২০৪৯ সালের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই তাপপ্রবাহ আরও বাড়বে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। এমপিআইএসএম ওয়ান পয়েন্ট টু, সিএনআরএম-সিএম-সিক্স ও ইউকেইএসএম-ওয়ান জিরো এলএল—এই তিনটি জলবায়ু মডেলও একই ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা

গবেষণার মূল ফোকাস যদিও উত্তর-পশ্চিম ভারত ও পাকিস্তান, কিন্তু ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি এবং আঞ্চলিক সারকুলেশনের কারণে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি, কমে যাওয়া সবুজ এলাকা এবং উচ্চ আর্দ্রতা মিলিয়ে ‘ফিলস লাইক টেম্পারেচার’ বা অনুভূত তাপ অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি হলেও শরীরে তা ৪১–৪৩ ডিগ্রির মতো অনুভূত হচ্ছে।

গবেষণাটি তাই শুধু আবহাওয়ার ব্যাখ্যা নয়, নীতিনির্ধারণেরও সতর্কবার্তা। তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল আবহাওয়ার ঘটনা নয়; এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, শ্রম, নগর পরিকল্পনা ও অর্থনীতির প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি নগর পরিকল্পনা, সবুজায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজনে দ্রুত বিনিয়োগ না করে, তাহলে এই গরম ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত