আমীন আল রশীদ

‘এবার ৭ গড়ি পুলিশ পাঠিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ।’ এরকম একটি সংবাদ আসে রবিবার মধ্যরাতে। খবরে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় পুলিশ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমোর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগে শনিবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের একটি স্কুলে সিনেমাটির প্রদর্শনী হওয়া কথা থাকলেও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসনও এ বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করে।
জেলা সদরে প্রদর্শনী স্থগিত হওয়ার কারণে কসবার তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সিনেমাটির প্রদর্শনীর আয়োজন করে তরুণদের একটি গ্রুপ। কিন্তু প্রদর্শনী শুরুর আগ মুহূর্তে কসবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানজিল কবির ও কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনীন সুলতানার নেতৃত্বে পুলিশ গিয়ে প্রদর্শনীটি বন্ধ করে দেয়।
অনুষ্ঠানের আয়োজক আদিব রেজা রঙ্গণ গণমধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক প্রীতিভোজের আয়োজন ছিল। ভোজ শেষে রাত ১১টায় সিনেমা প্রদর্শনীর কথা ছিল। এজন্য পর্দা এবং চেয়ার প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রদর্শনী শুরুর ১৫ মিনিট আগে পুলিশ আসে। ৫-৭ গাড়ি পুলিশ এসেছিল।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী নিয়ে যখন এই নাটক অথবা নাটকীয়তা—তখন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম হয় চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর। যেটাকে এতদিন বলা হতো রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র। ছোট্ট ভূখণ্ডটি বাংলাদেশের অংশ হওয়ার পরেও অঘোষিতভাবে ছিল স্বাধীন। মূলত সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবেই পরিচিত ছিল। সাধারণ মানুষ তো বটেই, চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে এই পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশাধিকারও ছিলো অনেকটা নিষিদ্ধ। কয়েকটি বাহিনীর হাতে ছিলো অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি আর কোটি কোটি টাকার প্লট বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। যেখানে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি নির্মাণাধীন ক্যাম্পও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। এই অভিযানে একে ফোরটি সেভেনের মতো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলেও শোনা যায়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে এখানে অভিযানে গিয়ে হতাহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য। প্রাণ গেছে সাংবাদিকেরও।
এরকম একটি ভয়ঙ্কর জনপদে রবিবার (৩১ মে) পরিদর্শনে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া হবে না। এখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বিভিন্ন পাহারা বসিয়ে সন্ত্রাসীরা যে সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছিলো, তা যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার মতো দুঃসাহস কীভাবে পেলো সন্ত্রাসীরা—তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হওয়ার কারণে জঙ্গল সলিমপুরকে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র বলে অভিহিত করা হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়াও এখন কার্যত রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গত ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি স্থানীয় অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে সাম্প্রতিক সময়ের একটি জনপ্রিয় সিনেমার প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কিন্তু জেলার কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সিনেমাটি প্রদর্শন না করার বিষয়ে ফেইসবুকে নানা পোস্ট করেন। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রদর্শনীর অনুমতি বাতিল করে দেয়। বিকল্প হিসেবে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অথবা সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে প্রদর্শনী আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আয়োজকেরা। তাদের জানানো হয়, ঈদের ছুটিতে দুটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এরপর সিনেমা বন্ধের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেন কওমি শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থায় আয়োজকরা সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন তাদের অসহযোগিতা করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা হাফেজ নাসুরুল্লাহ মুয়াজ নিজের ফেসবুকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীর ফটোকার্ডে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে একটি পোস্ট দিয়ে লেখেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর। এই শহরে আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল রহ. একসময় সিনেমা বন্ধ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কুচক্রী মহল আবারও শহরে সিনেমা চালু করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।’
তিনি লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর।’ কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া যে সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও কবি আল মাহমুদেরও শহর—সে কথা তিনি লেখেননি। তার চেয়ে বড় কথা, একটি শহরে শুধু আলেম-ওলামা থাকেন না। অন্য পেশার এবং অন্য ধর্মের মানুষও থাকেন। সব ধর্ম ও মতের মানুষের আনন্দ উদযাপনের অধিকার সেখানে থাকার কথা। একটি শহরে শুধু ওয়াজ মাহফিল হবে। এর বাইরে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শরিয়া আইন চালু হলো কি না, সেটি স্থানীয় প্রশাসন ভালো বলতে পারবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পাওয়ার পরে যে সিনেমাটি রাজধানী ঢাকায় চললো, যে সিনেমাটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা ধর্মীয় অবমাননার কোনো অভিযোগ নেই, সেটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কেন চলবে না বা সেখানে কেন চলতে দেয়া হবে না, এই প্রশ্নের উত্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রশাসন দেয়নি।
যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আলেম-ওলামা, পীর মাশায়েখ এবং মাদ্রাসার জায়গা বলা হচ্ছে—সেখানেই বছরের পর বছর ধরে সামান্য কারণে মানুষ গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। পান থেকে চুন খসলে টেটা বল্লম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চায়ে চিনি কম দেয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়নের খবর আসে।
গত বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারি নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের ফতেহপুর হিলফুল ফুজুল হাফিজিয়া মাদ্রাসার ৯ বছরের এক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধরে বলাৎকার করার অভিযোগে আনোয়ার হুসাইন নামের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে মামলা করলে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০ বছরের শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগে দ্বীন ইসলাম নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় তাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়। অভিযুক্ত শিক্ষক শহরের কালিবাড়ি মোড় সংলগ্ন টিএ রোডের মাদানিয়া তাহফিজুর কোরআন মাদ্রসার শিক্ষক।
২০২৩ সালের মধ্য অক্টোবরে নবীনগর উপজেলায় এক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা হয়।
২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সরাইল উপজেলায় ১০ বছরের এক মাদরাসা ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে একই মাদ্রাসার আরেক ছাত্রকে আটক করে পুলিশ।
২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওই প্রতিষ্ঠানেরই এক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পরে ওই শিক্ষক পালিয়ে যান।
সবগুলো ঘটনাই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত। অনলাইনে খুঁজলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন মাদ্রাসায় এরকম শিশু বলাৎকারের আরও অনেক খবরের সন্ধান মিলবে। যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা চলতে দিতে চান না বা সিনেমা চললে সমাজ নষ্ট হবে বলে মনে করেন, মাদ্রাসায় বলাৎকারের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। বলাৎকারের বিরুদ্ধে তারা কখনো মানববন্ধন করেছেন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্যাম্পেইন করেছেন বলে শোনা যায়নি।
মাদ্রাসায় শিশুদের বলাৎকারে অসুবিধা নেই। অসুবিধা শুধু সিনেমায়। যে সিনেমাটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অশ্লীল নয়। যে সিনেমায় কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয় নেই। যে সিনেমাটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ছাড়পত্রপ্রাপ্ত। সেই সিনেমার প্রদর্শনী হলে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। অথচ এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলে; তুচ্ছ ঘটনায় বছরের পর বছর ধরে এই জেলায় গোষ্ঠীগত সংঘাত বা টেটাযুদ্ধ হতে থাকলে; মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকার হতে থাকলেও তাতে প্রতিবাদী কওমি শিক্ষার্থীদের কোনো অসুবিধা নেই। তাদের সমস্ত অসুবিধা সিনেমায়। বাকি সব অপরধ চলতে কোনো বাধা নাই।
রাষ্ট্রীয় ছাত্রপত্র পাওয়া একটি সিনেমার প্রদর্শনী একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর বাধার মুখে স্থগিত করা হলো। দ্বিতীয় দফায় পুলিশ প্রশাসন গিয়ে সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিলো। এসবের মধ্য দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন আসলে কী বার্তা দিলো? বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একটি লিখিত সংবিধানের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। দেশে একটি গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে রয়েছে। দেশে শরিয়া আইন চালু হয়েছে এমন কোনো ঘোষণা এখন পর্যন্ত আসেনি। তখন এই দেশের একটি জেলা ভিন্ন আইনে চলবার কোনো সুযোগ আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিত হবে।
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে হুঁশিয়ারি দিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যারা আলাদা রাষ্ট্র বানাতে চায় তাদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য শুধু সালাহউদ্দিন আহমদই নন, অতীতের কোনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের সংবিধান ও আইন-কানুনকে পাত্তা না দেয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কখনো কিছু বলার সাহস করেননি।

‘এবার ৭ গড়ি পুলিশ পাঠিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ।’ এরকম একটি সংবাদ আসে রবিবার মধ্যরাতে। খবরে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় পুলিশ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমোর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগে শনিবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের একটি স্কুলে সিনেমাটির প্রদর্শনী হওয়া কথা থাকলেও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসনও এ বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করে।
জেলা সদরে প্রদর্শনী স্থগিত হওয়ার কারণে কসবার তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সিনেমাটির প্রদর্শনীর আয়োজন করে তরুণদের একটি গ্রুপ। কিন্তু প্রদর্শনী শুরুর আগ মুহূর্তে কসবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানজিল কবির ও কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনীন সুলতানার নেতৃত্বে পুলিশ গিয়ে প্রদর্শনীটি বন্ধ করে দেয়।
অনুষ্ঠানের আয়োজক আদিব রেজা রঙ্গণ গণমধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক প্রীতিভোজের আয়োজন ছিল। ভোজ শেষে রাত ১১টায় সিনেমা প্রদর্শনীর কথা ছিল। এজন্য পর্দা এবং চেয়ার প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রদর্শনী শুরুর ১৫ মিনিট আগে পুলিশ আসে। ৫-৭ গাড়ি পুলিশ এসেছিল।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী নিয়ে যখন এই নাটক অথবা নাটকীয়তা—তখন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম হয় চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর। যেটাকে এতদিন বলা হতো রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র। ছোট্ট ভূখণ্ডটি বাংলাদেশের অংশ হওয়ার পরেও অঘোষিতভাবে ছিল স্বাধীন। মূলত সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবেই পরিচিত ছিল। সাধারণ মানুষ তো বটেই, চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে এই পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশাধিকারও ছিলো অনেকটা নিষিদ্ধ। কয়েকটি বাহিনীর হাতে ছিলো অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি আর কোটি কোটি টাকার প্লট বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। যেখানে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি নির্মাণাধীন ক্যাম্পও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। এই অভিযানে একে ফোরটি সেভেনের মতো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলেও শোনা যায়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে এখানে অভিযানে গিয়ে হতাহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য। প্রাণ গেছে সাংবাদিকেরও।
এরকম একটি ভয়ঙ্কর জনপদে রবিবার (৩১ মে) পরিদর্শনে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া হবে না। এখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বিভিন্ন পাহারা বসিয়ে সন্ত্রাসীরা যে সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছিলো, তা যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার মতো দুঃসাহস কীভাবে পেলো সন্ত্রাসীরা—তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হওয়ার কারণে জঙ্গল সলিমপুরকে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র বলে অভিহিত করা হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়াও এখন কার্যত রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গত ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি স্থানীয় অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে সাম্প্রতিক সময়ের একটি জনপ্রিয় সিনেমার প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কিন্তু জেলার কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সিনেমাটি প্রদর্শন না করার বিষয়ে ফেইসবুকে নানা পোস্ট করেন। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রদর্শনীর অনুমতি বাতিল করে দেয়। বিকল্প হিসেবে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অথবা সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে প্রদর্শনী আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আয়োজকেরা। তাদের জানানো হয়, ঈদের ছুটিতে দুটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এরপর সিনেমা বন্ধের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেন কওমি শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থায় আয়োজকরা সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন তাদের অসহযোগিতা করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা হাফেজ নাসুরুল্লাহ মুয়াজ নিজের ফেসবুকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীর ফটোকার্ডে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে একটি পোস্ট দিয়ে লেখেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর। এই শহরে আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল রহ. একসময় সিনেমা বন্ধ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কুচক্রী মহল আবারও শহরে সিনেমা চালু করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।’
তিনি লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর।’ কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া যে সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও কবি আল মাহমুদেরও শহর—সে কথা তিনি লেখেননি। তার চেয়ে বড় কথা, একটি শহরে শুধু আলেম-ওলামা থাকেন না। অন্য পেশার এবং অন্য ধর্মের মানুষও থাকেন। সব ধর্ম ও মতের মানুষের আনন্দ উদযাপনের অধিকার সেখানে থাকার কথা। একটি শহরে শুধু ওয়াজ মাহফিল হবে। এর বাইরে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শরিয়া আইন চালু হলো কি না, সেটি স্থানীয় প্রশাসন ভালো বলতে পারবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পাওয়ার পরে যে সিনেমাটি রাজধানী ঢাকায় চললো, যে সিনেমাটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা ধর্মীয় অবমাননার কোনো অভিযোগ নেই, সেটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কেন চলবে না বা সেখানে কেন চলতে দেয়া হবে না, এই প্রশ্নের উত্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রশাসন দেয়নি।
যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আলেম-ওলামা, পীর মাশায়েখ এবং মাদ্রাসার জায়গা বলা হচ্ছে—সেখানেই বছরের পর বছর ধরে সামান্য কারণে মানুষ গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। পান থেকে চুন খসলে টেটা বল্লম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চায়ে চিনি কম দেয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়নের খবর আসে।
গত বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারি নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের ফতেহপুর হিলফুল ফুজুল হাফিজিয়া মাদ্রাসার ৯ বছরের এক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধরে বলাৎকার করার অভিযোগে আনোয়ার হুসাইন নামের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে মামলা করলে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০ বছরের শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগে দ্বীন ইসলাম নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় তাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়। অভিযুক্ত শিক্ষক শহরের কালিবাড়ি মোড় সংলগ্ন টিএ রোডের মাদানিয়া তাহফিজুর কোরআন মাদ্রসার শিক্ষক।
২০২৩ সালের মধ্য অক্টোবরে নবীনগর উপজেলায় এক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা হয়।
২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সরাইল উপজেলায় ১০ বছরের এক মাদরাসা ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে একই মাদ্রাসার আরেক ছাত্রকে আটক করে পুলিশ।
২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওই প্রতিষ্ঠানেরই এক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পরে ওই শিক্ষক পালিয়ে যান।
সবগুলো ঘটনাই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত। অনলাইনে খুঁজলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন মাদ্রাসায় এরকম শিশু বলাৎকারের আরও অনেক খবরের সন্ধান মিলবে। যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা চলতে দিতে চান না বা সিনেমা চললে সমাজ নষ্ট হবে বলে মনে করেন, মাদ্রাসায় বলাৎকারের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। বলাৎকারের বিরুদ্ধে তারা কখনো মানববন্ধন করেছেন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্যাম্পেইন করেছেন বলে শোনা যায়নি।
মাদ্রাসায় শিশুদের বলাৎকারে অসুবিধা নেই। অসুবিধা শুধু সিনেমায়। যে সিনেমাটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অশ্লীল নয়। যে সিনেমায় কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয় নেই। যে সিনেমাটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ছাড়পত্রপ্রাপ্ত। সেই সিনেমার প্রদর্শনী হলে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। অথচ এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলে; তুচ্ছ ঘটনায় বছরের পর বছর ধরে এই জেলায় গোষ্ঠীগত সংঘাত বা টেটাযুদ্ধ হতে থাকলে; মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকার হতে থাকলেও তাতে প্রতিবাদী কওমি শিক্ষার্থীদের কোনো অসুবিধা নেই। তাদের সমস্ত অসুবিধা সিনেমায়। বাকি সব অপরধ চলতে কোনো বাধা নাই।
রাষ্ট্রীয় ছাত্রপত্র পাওয়া একটি সিনেমার প্রদর্শনী একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর বাধার মুখে স্থগিত করা হলো। দ্বিতীয় দফায় পুলিশ প্রশাসন গিয়ে সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিলো। এসবের মধ্য দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন আসলে কী বার্তা দিলো? বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একটি লিখিত সংবিধানের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। দেশে একটি গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে রয়েছে। দেশে শরিয়া আইন চালু হয়েছে এমন কোনো ঘোষণা এখন পর্যন্ত আসেনি। তখন এই দেশের একটি জেলা ভিন্ন আইনে চলবার কোনো সুযোগ আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিত হবে।
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে হুঁশিয়ারি দিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যারা আলাদা রাষ্ট্র বানাতে চায় তাদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য শুধু সালাহউদ্দিন আহমদই নন, অতীতের কোনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের সংবিধান ও আইন-কানুনকে পাত্তা না দেয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কখনো কিছু বলার সাহস করেননি।

সম্প্রতি ঢাকাসহ সারা দেশে একটি বাক্য অদ্ভুতভাবে ভাইরাল হয়েছে, “রাগ করলা?” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ এটি নিয়ে হাস্যরস করছে, ভিডিও বানাচ্ছে, টেলিভিশন চ্যানেলেও সেটিকে আলোচনার উপকরণে পরিণত করা হয়েছে। আমরা কি অজান্তেই এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করছি, বা তৈরিতে সহায়তা করছি যেখানে...
৬ মিনিট আগে
ঈদ ব্যবস্থাপনায় সরকার বিশেষ তৎপর ছিল বলেই মনে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১০টি বিশেষ নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের ফলে জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছিল। তবে সামগ্রিক চিত্র বলছে, কিছু মৌলিক সংকটের জায়গা এখনো বিদ্যমান।
৩ ঘণ্টা আগে
ঈদের সময় পত্রিকা পাঁচ-ছয় দিন বন্ধ থাকায় কি পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক সত্যিই আলগা হয়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। পত্রিকা ছয় দিন বন্ধ, পাঠক কি ইতিমধ্যে আরো বেশি ‘ডিজিটাল এলাকা’য় চলে গেছে? এই বিরতি কি কেবল সাময়িক ছুটি, নাকি দীর্ঘমেয়াদে পাঠকের অভ্যাস, আগ্রহ ও আনুগত্যে স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
৫ ঘণ্টা আগে
দেশে অকটেন, পেট্রল এবং কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এর আগে গত এপ্রিলেও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল সরকার। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন জাগে, এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর কতটা পড়ছে?
৭ ঘণ্টা আগে