জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরান যুদ্ধ যেভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকটও ডেকে আনতে পারে

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৬, ১৬: ০৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পর এবার বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, আন্তর্জাতিক সার বাজারও বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যের দাম ও সরবরাহে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর ২ মার্চ থেকেই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি “বন্ধ” করে দেয়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর ফলে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর আড়ালে আরও বড় একটি সংকট ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর সেটি হলো বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে খাদ্য উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যক সার উৎপাদন এবং সরবরাহও দ্রুত সংকটে পড়তে পারে। এটি শুধু তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি বিশ্বের সার সরবরাহেরও একটি প্রধান পথ।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষক ব্রাম গোভার্টস ও শ্যারন বার্ক সতর্ক করে লিখেছেন, “হরমুজ প্রণালি শুধু তেলবাহী জাহাজের একটি নৌপথ নয়; এটি বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ বিশ্বজুড়ে কৃষিকে ব্যাহত করতে পারে এবং ১০ কোটির বেশি মানুষকে মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।”

কেন সারের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে

বিশ্বের বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার ইউরিয়া। এর বড় একটি অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে বিশ্ববাজারে যায়। শুধু ইউরিয়া নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সার ও সার তৈরির উপকরণও এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেখা দিলে বিশ্ব কৃষি সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন এবং জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানের সার কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলার পর দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়।

এই প্রভাব ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার পর ভারত তার তিনটি ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন কমিয়েছে। বাংলাদেশও ৬টির মধ্যে ৫টি সার কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও এ সময়ের তুলনায় সার সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে বলে জানা গেছে।

সরবরাহ সংকটের কারণে সারের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যও দ্রুত বেড়েছে। জ্বালানি ও পণ্যবাজারবিষয়ক সংস্থা আরগাসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানিকৃত ইউরিয়ার দাম অল্প সময়ের মধ্যে প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ৫০০ ডলারের কম থেকে বেড়ে ৭০০ ডলারের বেশি হয়েছে। অর্থাৎ দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই দাম এখন প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

বিশ্বের কতটুকু সার উপসাগরীয় অঞ্চল উৎপাদন করে

শিপিং সেবা প্রতিষ্ঠান সিগন্যাল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক ইউরিয়া সরবরাহের ৪৬ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া সরবরাহকারী কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানি একাই বিশ্ব ইউরিয়ার ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে।

তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের মতে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যাহত হতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের পতাকাবাহী অল্প কয়েকটি জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে বিশ্ববাজারে সারের সরবরাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক সেথ গোল্ডস্টেইনের মতে, নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের দাম বর্তমান স্তর থেকে প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। আর ফসফেটের দাম বাড়তে পারে প্রায় ৫০ শতাংশ।

কোন দেশগুলো এই সারের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল

২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের সারের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো। ক্লেপলার জানিয়েছে, উপসাগরীয় ইউরিয়া রপ্তানির ৩৫ শতাংশ, সালফার রপ্তানির ৫৩ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়া রপ্তানির ৬৪ শতাংশ গেছে এশিয়ার দেশগুলোতে।

বিশেষ করে ভারত, ব্রাজিল ও চীনের মতো বড় কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এই সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এই সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।

ভারত বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সারের ওপর নির্ভরশীল। দেশটি তার মোট ইউরিয়া ও ফসফেট সারের ৪০ শতাংশের বেশি এই অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে। অন্যদিকে ব্রাজিল প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। দেশটির প্রয়োজনীয় সারের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।

সারের ঘাটতি খাদ্য উৎপাদনে এত বড় আঘাত হানবে কেন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের সময়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ উত্তর গোলার্ধে এখন বপন মৌসুম চলছে, যা সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ে কৃষকেরা জমিতে ফসল রোপণ ও উৎপাদনের প্রস্তুতি নেন। ফলে সারের সংকট সরাসরি উৎপাদনে আঘাত হানতে পারে।

বাণিজ্যিক কৃষিতে অধিকাংশ ফসলের ভালো ফলনের জন্য সার অপরিহার্য। কিন্তু সারের দাম বেড়ে গেলে বা সরবরাহ কমে গেলে অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় মাত্রায় সার ব্যবহার করতে পারবেন না। এতে ফসলের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ব অবশ্য আগে থেকেই সারের বাজারে চাপের মধ্যে ছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপ সস্তা রুশ গ্যাসের প্রবেশাধিকার হারায়। এর ফলে সার উৎপাদন ব্যাহত হয়। একই সময়ে চীনও নিজ দেশের কৃষকদের চাহিদা পূরণে ইউরিয়াসহ কিছু সারের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। তার ওপর ইরান যুদ্ধ নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে।

এতে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো খাদ্য উৎপাদন। কারণ উপসাগরীয় সারের বড় আমদানিকারক দেশগুলোর অনেকগুলোই আবার বিশ্বের বড় খাদ্য উৎপাদক।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় ধান, গম, ডাল ও ফল উৎপাদক। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক চাল রপ্তানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এসেছে ভারত থেকে।

ব্রাজিল বিশ্বে সয়াবিন রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং দেশটি চিনি ও ভুট্টাও বড় পরিসরে রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল এখন বৈশ্বিক সয়াবিন রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয়।

চীন বিশ্বে চায়ের একটি বড় উৎপাদক। পাশাপাশি রসুন, মাশরুমসহ আরও অনেক কৃষিপণ্যও তারা বিশ্ববাজারে সরবরাহ করে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সারের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধি অনেক কৃষককে সার ব্যবহার কমাতে বাধ্য করবে। কেউ কেউ হয়তো একেবারেই সার ব্যবহার করতে পারবেন না। এর ফলে ধান, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের ফলন কমে যাবে। বিশ্ববাজারে সরবরাহ হ্রাস পেলে খাদ্যের দাম আরও বাড়বে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্যসংকটও দেখা দিতে পারে।

তাহলে কি বৈশ্বিক খাদ্যসংকট অনিবার্য

এখনই তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ঝুঁকি খুবই বাস্তব। সংকট কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন কত দিন থাকে। দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলে গ্যাস ও সারের উৎপাদন কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়। তৃতীয়ত, বড় আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস কত দ্রুত খুঁজে পায়।

স্বল্পমেয়াদি বিঘ্ন অনেক সময় মজুত বা বিকল্প সরবরাহ দিয়ে সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকেই বদলে দেয়। তখন সংকট বাজারদর থেকে সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তায় গিয়ে আঘাত করে।

পুরো বিষয়টি একটি চেইন রিয়েকশনের মতো। যুদ্ধ হরমুজ প্রণালিকে ব্যাহত করে। এতে তেল, গ্যাস ও জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। সারের উৎপাদন কমে, দাম বাড়ে, কৃষকের খরচ বাড়ে। কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করলে ফলন কমে যায়। ফলন কমলে খাদ্যের সরবরাহ কমে, আর বাজারে দাম বাড়ে।

অর্থাৎ জ্বালানির ধাক্কা দেখা যায় সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু খাদ্যের ধাক্কা আসে কিছুটা পরে। আর সংকট দীর্ঘায়িত হলে সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি আশঙ্কা করছে, যুদ্ধ যদি জুন পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে অতিরিক্ত ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। এতে বিশ্বে তীব্র ক্ষুধার মুখে থাকা মানুষের মোট সংখ্যা ৩১ কোটি ৯০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা হবে নতুন রেকর্ড।

ডব্লিউএফপির উপনির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাও বলেছেন, “এতে বৈশ্বিক ক্ষুধার মাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এটি সত্যিই ভয়াবহ এক সম্ভাবনা। এই যুদ্ধের আগেই আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে ছিলাম, যেখানে ক্ষুধা সংখ্যার দিক থেকেও এবং গভীরতার দিক থেকেও আগে কখনও এত গুরুতর ছিল না।”

আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বাবাক হাফেজি বলেছেন, “এটি হবে একটি বৈশ্বিক সংকট। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্বের কিছু অংশে দুর্ভিক্ষও দেখা দিতে পারে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই সংঘাত প্রশমিত করা, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং খাদ্য ও সার সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে যুদ্ধ থেমে গেলেও খাদ্যসংকট অনেক দিন ধরে বিশ্বকে ভোগাতে পারে।

তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, সিএনবিসি

সম্পর্কিত