মাহজাবিন নাফিসা

চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। পুরো পৃথিবী যেন এক বিশাল ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়। এক মাসের জন্য বদলে যায় সবার রুটিন। বদলে যায় অনেক দেশের কর্মব্যস্ততা, রাত জেগে খেলা দেখে কোটি কোটি মানুষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে তর্ক-বিতর্কে, আর শেষ বাঁশি বাজতেই শুরু হয় বিজয়-উল্লাস কিংবা হৃদয়ভাঙার গল্প। বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোর একটি।
তবে মাঠের ৯০ মিনিটের বাইরেও এর আরও দিক আছে। মাঠের খেলার বাইরে স্পন্সরশিপ, আয়-ব্যয়, ব্যবসা। বিশ্বকাপ শেষ হলে ট্রফি জেতে মাত্র একটি দেশ, কিন্তু আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় বিজয়ী হয় আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, লাইসেন্সিং ও আতিথেয়তা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। প্রশ্ন হলো, ফিফা আসলে কত টাকা আয় করে? সেই অর্থ কোথা থেকে আসে? আর শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়?
প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ হওয়ায় ফিফা তাদের আর্থিক হিসাব প্রতি বছর নয়, প্রতি চার বছরে একবার প্রকাশ করে। ফিফার সর্বশেষ ২০১৯–২০২২ চক্রে, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কাতার বিশ্বকাপ, সংস্থাটির মোট আয় দাঁড়ায় ৭৫৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৩ হাজার কোটিরও বেশি।
এই আয়ের বড় অংশই এসেছে ২০২২ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে। কারণ বিশ্বকাপ ফিফার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে লাভজনক আয়োজন। ফিফার হিসাব অনুযায়ী, চার বছরের মোট আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত কার্যক্রম থেকে এসেছে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আসলে ফুটবল নয়, দর্শক। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বিশ্বকাপ সম্প্রচারিত হয়। সেই সম্প্রচার অধিকার কিনতে টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
২০১৯–২০২২ চক্রে ফিফার মোট আয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ এসেছে কেবল সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি থেকে। অর্থাৎ প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার আয়ের উৎস ছিল টেলিভিশন ও ডিজিটাল সম্প্রচার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৫২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা।
এ কারণেই বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকারকে ফিফার ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বলা হয়। ম্যাচ যত জনপ্রিয় হয়, দর্শক যত বাড়ে, সম্প্রচার অধিকার তত বেশি দামে বিক্রি হয়।
বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে এক মাসে কয়েকশ কোটি মানুষের কাছে একসঙ্গে পৌঁছানো সম্ভব। ফলে এটি বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও অন্যতম আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের প্ল্যাটফর্ম।
অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা, হুন্দাই-কিয়া, কাতার এয়ারওয়েজ, হিসেন্স, লেনোভোর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পন্সর বা পার্টনার হতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
ফিফার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯–২০২২ চক্রে স্পন্সরশিপ ও মার্কেটিং থেকে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ডলার বা প্রায় ২৬ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের প্রায় ২৯ শতাংশ।
শুধু মাঠের বিজ্ঞাপন নয়, অফিসিয়াল লোগো ব্যবহার, ডিজিটাল প্রচারণা, পণ্যে বিশ্বকাপের ব্র্যান্ডিং, বিশেষ ক্যাম্পেইন—সবকিছুর বিনিময়েই এই অর্থ ফিফার তহবিলে জমা হয়।
বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া অনেক সময় লটারিতে জেতার মতোই কঠিন। কাতার বিশ্বকাপে প্রায় ৩৪ লাখ দর্শক স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখেছেন।
টিকিট বিক্রির পাশাপাশি ভিআইপি হসপিটালিটি প্যাকেজ, করপোরেট বক্স, প্রিমিয়াম সেবা এবং অন্যান্য আয়োজন থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয়। ২০১৯–২০২২ চক্রে টিকিট ও হসপিটালিটি থেকে ফিফার আয় ছিল প্রায় ৮৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১০ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ।
এ ছাড়া অফিসিয়াল জার্সি, বল, স্মারক সামগ্রী, ভিডিও গেমের লাইসেন্সসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক লাইসেন্স থেকেও অতিরিক্ত আয় হয়।
ফিফা একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। অর্থাৎ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার পরিবর্তে সংস্থাটি আয়ের বড় অংশ ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করার দাবি করে। বাস্তবেও তাদের ব্যয়ের বড় অংশ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি ও টুর্নামেন্ট পরিচালনায় যায়।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ব্যয়ের একটি হলো পুরস্কারের অর্থ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে মোট ৪৪ কোটি ডলার পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পায় ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার বা প্রায় ৫১২ কোটি টাকা, রানার্সআপ ফ্রান্স ৩ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৬৬ কোটি টাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অধিকারী দলও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ পায়। এমনকি গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া দলগুলোকেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়।
ফিফার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কর্মসূচির নাম ‘ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই অর্থ ব্যবহার করা হয় নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, কোচ তৈরি, নারী ফুটবলের উন্নয়ন, যুব ফুটবল, গ্রাসরুট ফুটবল এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে।
ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কর্মসূচিতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ আয়োজন শুধু ম্যাচ পরিচালনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে সম্প্রচার অবকাঠামো, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর), ম্যাচ অফিসিয়াল, নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, স্বেচ্ছাসেবক, তথ্যপ্রযুক্তি, মিডিয়া সেন্টার এবং উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মতো বিশাল আয়োজন। এসব খাতেও ফিফা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে।
বিশ্বকাপের সময় বিভিন্ন ক্লাব তাদের খেলোয়াড়দের জাতীয় দলের জন্য ছেড়ে দেয়। এতে ক্লাবগুলো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খেলোয়াড় হারায়। এ কারণে ফিফা ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের ক্লাবগুলোকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়। ফলে ইউরোপের বড় ক্লাব থেকে শুরু করে ছোট দেশের ক্লাবও এই তহবিল থেকে অর্থ পায়।
বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে কোনো খেলোয়াড় গুরুতর আহত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ক্লাবকে আর্থিক সুরক্ষা দিতে ফিফা পরিচালনা করে ‘ক্লাব প্রটেকশন প্রোগ্রাম’। এই বিমা কর্মসূচির মাধ্যমে খেলোয়াড়ের দীর্ঘমেয়াদি ইনজুরির ক্ষেত্রে ক্লাবকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
ফিফার সংশোধিত ২০২৩–২০২৬ বাজেট বলছে, এবার তারা ১৩০ কোটি ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ আগের বিশ্বকাপ চক্রের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
এর অন্যতম কারণ, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হচ্ছে, এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করেছে এই টুর্নামেন্ট। অংশ নিয়েছে ৪৮টি দেশ, ম্যাচের সংখ্যা ১০৪টি। ফলে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার অধিকার, স্পন্সরশিপ এবং বাণিজ্যিক আয়—সব ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ড গড়ার আশা করছে ফিফা।
সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালেই ফিফার আয় প্রায় ৮৯০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ আসবে সম্প্রচার অধিকার, টিকিট ও হসপিটালিটি এবং স্পন্সরশিপ থেকে।
বিশ্বকাপকে আমরা সাধারণত গোল, ট্রফি আর নায়কদের গল্প হিসেবে দেখি। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কোটি কোটি দর্শকের আবেগ, শতাধিক দেশের সম্প্রচার চুক্তি, বহুজাতিক কোম্পানির স্পন্সরশিপ, লাখো দর্শকের টিকিট এবং হাজারো বাণিজ্যিক চুক্তি—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ আজ বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
ফলে বিশ্বকাপে একটি দল ট্রফি জিতলেও, অর্থনীতির হিসাবে সবচেয়ে বড় বিজয়ী হয়ে ওঠে ফিফা। তবে সেই অর্থের বড় অংশ আবার পুরস্কার, টুর্নামেন্ট পরিচালনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়। তাই বিশ্বকাপ কেবল একটি মাসব্যাপী ক্রীড়া আসর নয়। এটি এমন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চক্র, যার প্রভাব চার বছরজুড়ে ছড়িয়ে থাকে—মাঠের ভেতরেও, মাঠের বাইরেও।
তথ্যসূত্র: ফিফা ফিনান্সিয়াল রিপোর্ট ২০২২, ফিফা অ্যানুয়াল রিপোর্ট ২০২২, ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম গাইডলাইন্স, ফিফা বাজেট ২০২৩-২০২৬, আল জাজিরা ও রয়টার্স

চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। পুরো পৃথিবী যেন এক বিশাল ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়। এক মাসের জন্য বদলে যায় সবার রুটিন। বদলে যায় অনেক দেশের কর্মব্যস্ততা, রাত জেগে খেলা দেখে কোটি কোটি মানুষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে তর্ক-বিতর্কে, আর শেষ বাঁশি বাজতেই শুরু হয় বিজয়-উল্লাস কিংবা হৃদয়ভাঙার গল্প। বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোর একটি।
তবে মাঠের ৯০ মিনিটের বাইরেও এর আরও দিক আছে। মাঠের খেলার বাইরে স্পন্সরশিপ, আয়-ব্যয়, ব্যবসা। বিশ্বকাপ শেষ হলে ট্রফি জেতে মাত্র একটি দেশ, কিন্তু আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় বিজয়ী হয় আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, লাইসেন্সিং ও আতিথেয়তা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। প্রশ্ন হলো, ফিফা আসলে কত টাকা আয় করে? সেই অর্থ কোথা থেকে আসে? আর শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়?
প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ হওয়ায় ফিফা তাদের আর্থিক হিসাব প্রতি বছর নয়, প্রতি চার বছরে একবার প্রকাশ করে। ফিফার সর্বশেষ ২০১৯–২০২২ চক্রে, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কাতার বিশ্বকাপ, সংস্থাটির মোট আয় দাঁড়ায় ৭৫৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৩ হাজার কোটিরও বেশি।
এই আয়ের বড় অংশই এসেছে ২০২২ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে। কারণ বিশ্বকাপ ফিফার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে লাভজনক আয়োজন। ফিফার হিসাব অনুযায়ী, চার বছরের মোট আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত কার্যক্রম থেকে এসেছে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আসলে ফুটবল নয়, দর্শক। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বিশ্বকাপ সম্প্রচারিত হয়। সেই সম্প্রচার অধিকার কিনতে টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
২০১৯–২০২২ চক্রে ফিফার মোট আয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ এসেছে কেবল সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি থেকে। অর্থাৎ প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার আয়ের উৎস ছিল টেলিভিশন ও ডিজিটাল সম্প্রচার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৫২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা।
এ কারণেই বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকারকে ফিফার ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বলা হয়। ম্যাচ যত জনপ্রিয় হয়, দর্শক যত বাড়ে, সম্প্রচার অধিকার তত বেশি দামে বিক্রি হয়।
বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে এক মাসে কয়েকশ কোটি মানুষের কাছে একসঙ্গে পৌঁছানো সম্ভব। ফলে এটি বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও অন্যতম আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের প্ল্যাটফর্ম।
অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা, হুন্দাই-কিয়া, কাতার এয়ারওয়েজ, হিসেন্স, লেনোভোর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পন্সর বা পার্টনার হতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
ফিফার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯–২০২২ চক্রে স্পন্সরশিপ ও মার্কেটিং থেকে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ডলার বা প্রায় ২৬ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের প্রায় ২৯ শতাংশ।
শুধু মাঠের বিজ্ঞাপন নয়, অফিসিয়াল লোগো ব্যবহার, ডিজিটাল প্রচারণা, পণ্যে বিশ্বকাপের ব্র্যান্ডিং, বিশেষ ক্যাম্পেইন—সবকিছুর বিনিময়েই এই অর্থ ফিফার তহবিলে জমা হয়।
বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া অনেক সময় লটারিতে জেতার মতোই কঠিন। কাতার বিশ্বকাপে প্রায় ৩৪ লাখ দর্শক স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখেছেন।
টিকিট বিক্রির পাশাপাশি ভিআইপি হসপিটালিটি প্যাকেজ, করপোরেট বক্স, প্রিমিয়াম সেবা এবং অন্যান্য আয়োজন থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয়। ২০১৯–২০২২ চক্রে টিকিট ও হসপিটালিটি থেকে ফিফার আয় ছিল প্রায় ৮৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১০ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ।
এ ছাড়া অফিসিয়াল জার্সি, বল, স্মারক সামগ্রী, ভিডিও গেমের লাইসেন্সসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক লাইসেন্স থেকেও অতিরিক্ত আয় হয়।
ফিফা একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। অর্থাৎ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার পরিবর্তে সংস্থাটি আয়ের বড় অংশ ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করার দাবি করে। বাস্তবেও তাদের ব্যয়ের বড় অংশ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি ও টুর্নামেন্ট পরিচালনায় যায়।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ব্যয়ের একটি হলো পুরস্কারের অর্থ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে মোট ৪৪ কোটি ডলার পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পায় ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার বা প্রায় ৫১২ কোটি টাকা, রানার্সআপ ফ্রান্স ৩ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৬৬ কোটি টাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অধিকারী দলও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ পায়। এমনকি গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া দলগুলোকেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়।
ফিফার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কর্মসূচির নাম ‘ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই অর্থ ব্যবহার করা হয় নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, কোচ তৈরি, নারী ফুটবলের উন্নয়ন, যুব ফুটবল, গ্রাসরুট ফুটবল এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে।
ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কর্মসূচিতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ আয়োজন শুধু ম্যাচ পরিচালনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে সম্প্রচার অবকাঠামো, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর), ম্যাচ অফিসিয়াল, নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, স্বেচ্ছাসেবক, তথ্যপ্রযুক্তি, মিডিয়া সেন্টার এবং উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মতো বিশাল আয়োজন। এসব খাতেও ফিফা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে।
বিশ্বকাপের সময় বিভিন্ন ক্লাব তাদের খেলোয়াড়দের জাতীয় দলের জন্য ছেড়ে দেয়। এতে ক্লাবগুলো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খেলোয়াড় হারায়। এ কারণে ফিফা ক্লাব বেনিফিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের ক্লাবগুলোকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়। ফলে ইউরোপের বড় ক্লাব থেকে শুরু করে ছোট দেশের ক্লাবও এই তহবিল থেকে অর্থ পায়।
বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে কোনো খেলোয়াড় গুরুতর আহত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ক্লাবকে আর্থিক সুরক্ষা দিতে ফিফা পরিচালনা করে ‘ক্লাব প্রটেকশন প্রোগ্রাম’। এই বিমা কর্মসূচির মাধ্যমে খেলোয়াড়ের দীর্ঘমেয়াদি ইনজুরির ক্ষেত্রে ক্লাবকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
ফিফার সংশোধিত ২০২৩–২০২৬ বাজেট বলছে, এবার তারা ১৩০ কোটি ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ আগের বিশ্বকাপ চক্রের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
এর অন্যতম কারণ, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হচ্ছে, এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করেছে এই টুর্নামেন্ট। অংশ নিয়েছে ৪৮টি দেশ, ম্যাচের সংখ্যা ১০৪টি। ফলে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার অধিকার, স্পন্সরশিপ এবং বাণিজ্যিক আয়—সব ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ড গড়ার আশা করছে ফিফা।
সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালেই ফিফার আয় প্রায় ৮৯০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ আসবে সম্প্রচার অধিকার, টিকিট ও হসপিটালিটি এবং স্পন্সরশিপ থেকে।
বিশ্বকাপকে আমরা সাধারণত গোল, ট্রফি আর নায়কদের গল্প হিসেবে দেখি। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কোটি কোটি দর্শকের আবেগ, শতাধিক দেশের সম্প্রচার চুক্তি, বহুজাতিক কোম্পানির স্পন্সরশিপ, লাখো দর্শকের টিকিট এবং হাজারো বাণিজ্যিক চুক্তি—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ আজ বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
ফলে বিশ্বকাপে একটি দল ট্রফি জিতলেও, অর্থনীতির হিসাবে সবচেয়ে বড় বিজয়ী হয়ে ওঠে ফিফা। তবে সেই অর্থের বড় অংশ আবার পুরস্কার, টুর্নামেন্ট পরিচালনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়। তাই বিশ্বকাপ কেবল একটি মাসব্যাপী ক্রীড়া আসর নয়। এটি এমন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চক্র, যার প্রভাব চার বছরজুড়ে ছড়িয়ে থাকে—মাঠের ভেতরেও, মাঠের বাইরেও।
তথ্যসূত্র: ফিফা ফিনান্সিয়াল রিপোর্ট ২০২২, ফিফা অ্যানুয়াল রিপোর্ট ২০২২, ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম গাইডলাইন্স, ফিফা বাজেট ২০২৩-২০২৬, আল জাজিরা ও রয়টার্স
.png)

কয়েক দিন আগে পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামে নতুন একটি রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে বলে ফেসবুক, এক্স ও টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীরা সত্য হিসেবে প্রচার করেন।
২১ ঘণ্টা আগে
দুর্নীতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ এবং ব্যাপক বেকারত্বের অভিযোগে গতবছর নেপালজুড়ে তরুণদের নজিরবিহীন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে চারবারের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
১৮ জুলাই ২০২৬
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের সরু এক জলপথ। নাম তার ‘বাব এল-মান্দেব’। আরবিতে এর অর্থ দাঁড়ায়—‘কান্নার দুয়ার’ বা ‘গেট অব টিয়ার্স’। এই জলপথের একদিকে ইয়েমেনের উপকূল, অন্যদিকে জিবুতি আর ইরিত্রিয়ার তীর।
১৮ জুলাই ২০২৬
ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) টানা ষষ্ঠ রাতে তেহরানে বড় ধরনের হামলার দাবি করেছে পেন্টাগন। জবাবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এবং অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল ও ড্রোন হামলা করেছে ইরান।
১৭ জুলাই ২০২৬