এক্সপ্লেইনার

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র ৪৭ বছর ধরে কীভাবে টিকে আছে

স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লব আধুনিক বিশ্বের রাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এই বিপ্লবের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ১ এপ্রিল ১৯৭৯ তারিখে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত গণভোটের ঐতিহাসিক ফলাফলের ভিত্তিতে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ বা ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এই বিপ্লব কেবল আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়নি, বরং বিশ্বকে এক সম্পূর্ণ নতুন এবং অনন্য শাসনকাঠামোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালে এসে যখন এই প্রজাতন্ত্র ৪৭ বছরে পদার্পণ করছে, তখন এর সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক।

মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ১৯৪১ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ইরান শাসন করেন। তাঁর শাসনকাল ছিল নাটকীয় পরিবর্তনের, যাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘হোয়াইট রেভোলিউশন’ বা শ্বেতবিপ্লব। তবে এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ছিল গভীর সংকট। শাহের পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিকায়ন সাধারণ জনগণের, বিশেষ করে রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মধ্যবিত্তের জীবনধারা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়— যা একধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছিল। তারা এই পরিবর্তনকে ‘পশ্চিমাকরণের আগ্রাসন’ হিসেবে দেখেছিল।

শাহের গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’ যেকোনো ধরনের ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করত। এর ফলে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক আলোচনার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা মানুষকে মসজিদ বা ধর্মীয় কেন্দ্রের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ কেবল মসজিদই ছিল সেই সময় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরের একমাত্র জায়গা যেখানে জনমত গঠন সম্ভব ছিল।

এ সময়ে তেল থেকে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদ শহরের একটি অভিজাত শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত ছিল। শিল্পায়নের ফলে গ্রামের মানুষ শহরে এসে বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, যা তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করে।

‘বেলায়েত-এ-ফকিহ’

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি যখন নির্বাসনে ছিলেন, তখন তিনি শিয়া দর্শনের ধারণাকে একটি রাজনৈতিক মডেলে রূপান্তরিত করেন যা ‘বেলায়েত-এ-ফকিহ’ তত্ত্ব নামে পরিচিত। এ তত্ত্বের মূল কথা হলো শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বাদশ ইমামের অনুপস্থিতিতে সমাজ পরিচালনা করবে কে?

বেলায়েত-এ-ফকিহ বা ‘বিচারবিভাগীয় বা ফকিহ-র অভিভাবকত্ব’ তত্ত্বে খোমেনি যুক্তি দেন, ইমামের অনুপস্থিতিতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সেই আলেম বা ফকিহর, যিনি ইসলামি আইনশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এবং যার ব্যক্তিগত চরিত্র ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সর্বোচ্চ মানের।

বেলায়েত-এ-ফকিহ এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে আইনপ্রণেতারা বা নির্বাহী প্রধানরা তাদের ক্ষমতা পান সংবিধানের মাধ্যমে, কিন্তু সেই ক্ষমতার বৈধতা আসে ওই অভিভাবকত্বের মূলনীতির আওতায়। এটি কেবল ধর্মীয় শাসন নয়; এটি এমন একটি শাসন যেখানে রাষ্ট্রকে হতে হয় ‘নৈতিক ও ন্যায়পরায়ণ’ কাঠামো।

ধর্ম ও রাষ্ট্র-সম্পর্ক

ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা থিওক্র্যাসি ও রিপাবলিকানিজমের অনন্য সংমিশ্রণ বিধায় একে ‘থিওক্র্যাটিক রিপাবলিক’ বলা হয়। ইরানের সংবিধানে একদিকে যেমন ধর্মীয় অভিভাবকত্ব (সুপ্রিম লিডার) আছে, তেমনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও সংসদ সদস্যও আছেন। রাষ্ট্রব্যবস্থাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি একটি নিয়মিত নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।

বিশ্বে এটিই একমাত্র দেশ যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত হলেও তার ক্ষমতার ওপরে সুপ্রিম লিডারের ‘ভেটো’ বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে। এটি আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি সরাসরি মিথস্ক্রিয়া তৈরি করেছে।

ইরান আজ এক অমোঘ সন্ধিক্ষণে। তার ভবিষ্যৎ কোনো একটি নির্দিষ্ট পথে নির্ধারিত নয়। এটি নির্ভর করছে রাষ্ট্রের রক্ষণশীল কাঠামো কতটা নমনীয় হতে পারে এবং তার অদম্য মেধা ও শক্তিকে কতটা জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারে রূপান্তর করতে পারে তার ওপর।

আধুনিক সেক্যুলার বিশ্বে রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা থাকলেও, ইরানে ধর্ম, রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি বা ‘মেরুদণ্ড’। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শরিয়া আইনকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে তা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার চেষ্টাও করা হয়। এই ব্যবস্থার কারণে ইরান বিশ্বের এমন একটি অনন্য রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে নিজেকে জাহির করে। এটি সমসাময়িক বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি অদ্ভুত সংমিশ্রণ তৈরি করেছে, যেখানে একই সঙ্গে আধুনিক ব্যালট বাক্স এবং মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োগ ঘটে।

রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সাধারণ কোনো গণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক ছকে বাঁধা যায় না। এটি মূলত একটি ‘দ্বৈত-কর্তৃত্ব’ ব্যবস্থা, যেখানে ধর্মীয় আইন এবং জনগণের ম্যান্ডেট পাশাপাশি চলার চেষ্টা করে। এটি অত্যন্ত জটিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক চেক-অ্যান্ড-ব্যালেন্স ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

সুপ্রিম লিডার বা ‘রাহবার’ সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রধান। তবে তিনি সম্পূর্ণ জবাবদিহিহীন নন। ৮৮ জন ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদ নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ তাত্ত্বিকভাবে সুপ্রিম লিডারকে নির্বাচিত করে এবং তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। এমনকি তারা চাইলে সুপ্রিম লিডারকে অপসারণও করতে পারে। তবে মজার বিষয় হলো, এই অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর প্রার্থী কারা হবেন, তা আবার বাছাই করে দেয় সুপ্রিম লিডার কর্তৃক প্রভাবিত ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’। এই ১২ সদস্যের গার্ডিয়ান কাউন্সিল সংসদীয় আইন পরীক্ষা করে এবং নির্বাচনের প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে।

প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করেন, তবে তার ক্ষমতা সুপ্রিম লিডারের অধীন। প্রেসিডেন্ট বাজেট প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাকে এবং তার ক্যাবিনেটকে সংসদের (মজলিস) কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সংসদ যেকোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারে।

যখন নির্বাচিত সংসদ এবং অনির্বাচিত গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে কোনো আইন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়, তখন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল। এটি সুপ্রিম লিডারকে নীতি নির্ধারণে পরামর্শও দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, ইরানি ব্যবস্থায় অচলাবস্থা নিরসনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রাখা হয়েছে।

সংবিধান ও গণতন্ত্র

ইরানের সংবিধানের ১১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে হলে একজন প্রার্থীকে প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পেতে হয়। যদি প্রথম দফার নির্বাচনে কেউ এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান, তবে শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে এক সপ্তাহ পর ‘রান-অফ’ বা দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে (যেমন যুক্তরাজ্যের ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট সিস্টেমে) একাধিক প্রার্থী থাকলে মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ ভোট পেয়েও কেউ জয়ী হতে পারেন, যেখানে বাকি ৬৫ শতাংশ মানুষই হয়তো তাকে চায়নি। কিন্তু ইরানের এই নিয়মটি নিশ্চিত করে যে, যিনি দেশের প্রধান নির্বাহী হচ্ছেন, তার পেছনে দেশের অন্তত অর্ধেকের বেশি ভোটারের প্রত্যক্ষ সমর্থন বা সম্মতি রয়েছে। এটি গণতন্ত্রের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন’ নীতিকে কঠোরভাবে প্রতিফলিত করে।

যখন দ্বিতীয় দফায় শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হয়, তখন প্রথম দফায় বাদ পড়া ছোট ছোট দল বা প্রার্থীরা কোনো একজনকে সমর্থন দেয়। এর ফলে বিজয়ী প্রার্থীকে একটি বৃহত্তর কোয়ালিশন বা জোটের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এটি শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব তৈরি করে এবং প্রেসিডেন্টের জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। এই ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, সরকার কেবল ভোটের সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে নয়, বরং তারা জনগণের একটি বড় অংশের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট বা রায় পেয়ে সরকার গঠন করেছে যা শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক বৈধতা বাড়াতে সাহায্য করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো ইরানি গণতন্ত্রকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বা ‘সীমাবদ্ধ’ বলে অভিহিত করে। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ভেটিং প্রক্রিয়ার কারণে যেকোনো নাগরিক চাইলেই নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন না। যারা বর্তমান ইসলামী ব্যবস্থার অনুগত নন বা সংস্কারপন্থী, তাদের শুরুতেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ভোটারের সামনে পছন্দের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। নির্বাচনের আগে প্রচারণার সুযোগ থাকলেও, গণমাধ্যমগুলো রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে বিরোধী বা ভিন্নমতাবলম্বী প্রার্থীরা তাদের মতাদর্শ স্বাধীনভাবে প্রচার করতে পারেন না।

তবে এর একটি বিপরীত দিকও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ, যেখানে কোনো সংবিধান বা সংসদই নেই এবং শাসনক্ষমতা বংশানুক্রমিক, তাদের তুলনায় ইরানে রাজনৈতিক বিতর্ক অনেক বেশি প্রাণবন্ত। সেখানে প্রার্থীরা অর্থনৈতিক পলিসি, ইন্টারনেটের স্বাধীনতা এবং পাশ্চাত্যের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি বাহাসে অংশ নেন। এটি এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক গতিশীলতা তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিরোধ অর্থনীতি

গত ৪৭ বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় ইরান কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থেকেছে। বিশেষ করে ১৯৮০-র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে পরমাণু কর্মসূচির কারণে মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরেছে। নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ইরান 'প্রতিরোধ অর্থনীতি'র ধারণা গ্রহণ করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি।

২০১০ সালের দিকে আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রথম ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ শব্দটির আনুষ্ঠানিক ব্যবহার শুরু করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে বাইরের কোনো দেশ (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না পারে। ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র জন্য ইরান তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

প্রথমত, তেল-নির্ভরতা হ্রাস। ইরান তার বাজেটে অপরিশোধিত তেল বিক্রির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং অ-তৈল পণ্য রপ্তানিতে মনোযোগ দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতি যার মাধ্যমে শিক্ষিত তরুণদের কাজে লাগিয়ে উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য দেশে উৎপাদন করা, যাতে বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন না হয়।

তৃতীয়ত, আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর (যেমন ইরাক, তুরস্ক, আফগানিস্তান) সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় বা পণ্য বিনিময় প্রথায় বাণিজ্য বাড়ানো।

আধুনিক সেক্যুলার বিশ্বে রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা থাকলেও, ইরানে ধর্ম, রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি বা ‘মেরুদণ্ড’। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শরিয়া আইনকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে তা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার চেষ্টাও করা হয়। এই ব্যবস্থার কারণে ইরান বিশ্বের এমন একটি অনন্য রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে নিজেকে জাহির করে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে ইরান ‘লুক ইস্ট’ নীতি গ্রহণ করেছে। চীনের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত চুক্তির আওতায় ইরান সস্তায় তেল বিক্রি করছে এবং বিনিময়ে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ পাচ্ছে। চীন বর্তমানে ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশই নিষেধাজ্ঞার শিকার হওয়ায় তারা একটি সাধারণ ব্যাংকিং মেসেজিং সিস্টেম তৈরির কাজ করছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানকে এক ধরনের বাধ্যতামূলক স্বনির্ভরতার অর্থনৈতিক মডেলে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে কিছু নির্দিষ্ট খাতে দেশটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা গড়ে তুলতে পেরেছে। শিল্পখাতে ‘ইরান খোদরো’ ও অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরান প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষাধিক যানবাহন উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। ইস্পাত ও সিমেন্ট উৎপাদনেও বিশ্বের শীর্ষ ১০-১৫টি দেশের মধ্যে অবস্থান করছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রয়ান ইনষ্টিটিউট-এর মতো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে স্টেম সেল গবেষণা এবং ন্যানোটেকনোলজি প্রকাশনার দিক থেকে ইরান বিশ্বের চতুর্থ বা পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণেই ইরান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তি গড়ে তুলেছে। আজ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বড় বড় সংঘাতে ইরানি ড্রোন (যেমন শাহেদ-১৩৬) একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

‘নিষেধাজ্ঞার অর্থনীতি’

সাফল্যের মুদ্রার উল্টো পিঠটি বেশ অন্ধকার। অর্থনীতির সামষ্টিক সূচকগুলো সাধারণ মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ইরানের মুদ্রাস্ফীতি এখন ‘ক্রনিক’ বা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ সালেও খাদ্যদ্রব্যের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যবিত্ত সমাজ ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। এক দশক আগে ১ ডলারে পাওয়া যেত প্রায় ৩০ হাজার রিয়াল (মুক্ত বাজারে), বর্তমানে ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে তা কয়েক লাখ রিয়ালে ঠেকেছে। এর ফলে মানুষের জমানো টাকার মূল্য রাতারাতি শূন্য হয়ে যাচ্ছে।

মেধাপাচার ইরানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক কঠোরতার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং বিজ্ঞানী দেশ ছাড়ছেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইরানের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের একটি বড় অংশই এখন বিদেশে কর্মরত। নিষেধাজ্ঞার আড়ালে একদল অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা চোরাই পথে পণ্য এনে আকাশচুম্বী মুনাফা করছে। একে বলা হয় ‘নিষেধাজ্ঞার অর্থনীতি’, যা সাধারণ জনগণের পকেট কাটছে কিন্তু সরকারের ঘনিষ্ঠদের সম্পদশালী করছে।

ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা

ইরানের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের মূলে রয়েছে পরমাণু কর্মসূচি। পরমাণু কর্মসূচির বিষয় ইরান দাবি করে এটি শান্তিপূর্ণ, কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো একে সামরিক হুমকি হিসেবে দেখে। ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ফিলিস্তিনের হামাসের সাথে ইরানের কৌশলগত সম্পর্ক ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে ভাবিয়ে তুলেছে। এছাড়া ইরানের ইসরায়েল বিরোধী অবস্থান এই বিরোধের অন্যতম কারণ। বিপ্লবের পর থেকে ইরান ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, যা বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

ইরানের বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই প্রজন্ম বিপ্লব দেখেনি এবং তারা বৈশ্বিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাইরের বিশ্বের সাথে যুক্ত। ২০২২ সালের ‘মাহসা আমিনি’ পরবর্তী আন্দোলন ইরানের সামাজিক ফাটলগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। ইরানের সমাজ বর্তমানে দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি ধারা রক্ষণশীল ও বিপ্লবের আদর্শে বিশ্বাসী, অন্যটি উদারপন্থী ও আধুনিক জীবনযাত্রায় আগ্রহী। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদনে নারীদের ওপর কঠোর হিজাব আইন এবং রাজনৈতিক দমনের সমালোচনা করা হলেও, এটিও সত্য যে ইরানে নারীদের শিক্ষার হার (৯৭% এর বেশি) এবং কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ অনেক প্রতিবেশী দেশের চেয়ে উন্নত। এই 'ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা'র দ্বন্দ্বই বর্তমানে দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

ইরান কেন টিকে আছে

এত বাধা ও নিষেধাজ্ঞার পরেও কেন এই ব্যবস্থা ধসে পড়েনি? এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করেন: প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি—বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং বাসিজ মিলিশিয়া রাষ্ট্রের সুরক্ষায় অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে; মতাদর্শিক ভিত্তি—যা দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে এই ব্যবস্থা তাদের জাতীয় মর্যাদা ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক; কৌশলগত জোট—বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ইরানকে একঘরে হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।

২০২৬ সালের বর্তমান যুদ্ধের দামামার ভেতর ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর— অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং পরমাণু চুক্তির ভাগ্য। যদি ইরান তার ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামত করতে পারে এবং তরুণ প্রজন্মের সাথে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে পারে, তবে এই ব্যবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক অসন্তোষ বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করতে পারে।

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছর পার হওয়া এক জটিল ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বিবর্তনের আখ্যান। আজ ইরান এমন এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বৈপরীত্যই তার প্রধান পরিচয়। একদিকে দেশটিতে চিকিৎসা বিজ্ঞান, ন্যানোটেকনোলজি, মহাকাশ গবেষণা এবং সামরিক ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা তাকে আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তর করেছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকল, কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ এবং মেধা পাচারের মতো অভিশাপগুলো দেশটির উন্নয়ন অভিযাত্রায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রটি আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রাচীন ধর্মীয় মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরার রক্ষণশীলতার মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৪৭ বছর প্রমাণ করেছে যে, চরম বৈরী আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখেও এই ব্যবস্থা তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই সক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

ইরান আজ এক অমোঘ সন্ধিক্ষণে। তার ভবিষ্যৎ কোনো একটি নির্দিষ্ট পথে নির্ধারিত নয়। এটি নির্ভর করছে রাষ্ট্রের রক্ষণশীল কাঠামো কতটা নমনীয় হতে পারে এবং তার অদম্য মেধা ও শক্তিকে কতটা জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারে রূপান্তর করতে পারে তার ওপর।

ঐতিহ্যের গর্বিত ধারক এবং আধুনিকতার প্রবক্তা হওয়ার এই দ্বান্দ্বিক যাত্রায় ইরান কি তার বিপ্লবী আদর্শকে টিকিয়ে রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে, নাকি পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান জোয়ারে রাষ্ট্রকাঠামোয় আসবে বড় কোনো রূপান্তর—এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকের মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নির্ধারণ করবে। ইরানের ৪৭ বছর কেবল একটি সমাপ্তি নয়, বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনালগ্ন।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

সম্পর্কিত