আফ্রিকায় আবারো ছড়িয়ে পড়েছে ইবোলা ভাইরাস। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে পুনরায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রোববার (১৭ মে) এই পরিস্থিতিকে ‘জনস্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
ইবোলা এমন একটি রোগ, যার নাম শুনলেই বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এটি শুধু একটি ভাইরাস নয়, আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সংক্রামক রোগগুলোর একটি। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রথমে জ্বর, দুর্বলতা, পেশিতে ব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া দেখা দেয়। পরে অনেক ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর মৃত্যুহার এত বেশি যে কিছু কিছু প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশি মারা গেছে। তবে ইবোলা বাতাসে ছড়ায় না। এটি ছড়ায় আক্রান্ত মানুষের রক্ত, ঘাম, বমি, লালা বা অন্যান্য শরীরবাহী তরলের সংস্পর্শে এলে। মৃতদেহ থেকেও ইবোলা ভাইরাস ছড়াতে পারে।
ইবোলা প্রথম শনাক্ত হয়েছিল যেভাবে
ইবোলা প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে, আফ্রিকার বর্তমান গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও সুদানে। কঙ্গোর একটি নদীর নাম ছিল ‘ইবোলা’। সেখান থেকেই ভাইরাসটির নামকরণ হয়।
প্রচলিত গল্পটি এরকম: কঙ্গোর জাইরের ইয়ামবুকু নামের একটি গ্রামের একজন স্কুলশিক্ষক গুরুতর জ্বর, দুর্বলতা ও রক্তক্ষরণজনিত উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আশপাশের আরও অনেক মানুষ একই উপসর্গে আক্রান্ত হতে থাকেন এবং দ্রুত মারা যেতে থাকেন।
পরে চিকিৎসক ও গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এটি পূর্ব-পরিচিত কোনো রোগ নয়। আক্রান্তদের রক্তের নমুনা আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে পাঠানো হয়। ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন ধরনের ভাইরাস শনাক্ত করেন, যা মারবার্গ ভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও আলাদা। পরে ভাইরাসটির নাম দেওয়া হয় ‘ইবোলা’।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকার জঙ্গল এলাকায় বাদুড় থেকে অন্য প্রাণি, তারপর খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করে। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে এখনো বন্য প্রাণি শিকার ও খাওয়ার প্রচলন রয়েছে, যা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশ্ন হলো, কেন ইবোলার প্রাদুর্ভাব বারবার আফ্রিকাতেই হয়? এর উত্তর শুধু ভাইরাসের ভেতরে নয়, আফ্রিকার বাস্তবতার মধ্যেও লুকিয়ে আছে।
কেন ইবোলার প্রাদুর্ভাব বারবার আফ্রিকাতেই
এখন পর্যন্ত আফ্রিকা অঞ্চলে কতবার ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা—সিডিসি একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যায়, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আফ্রিকা অঞ্চলের দেশগুলোতে ২৪বার ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।
এছাড়া বিএমজে গ্লোবাল হেলথ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকায় মোট ৩৪বার ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আফ্রিকার অনেক দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভয়ানক দুর্বল। এছাড়াও হাসপাতাল কম, পরীক্ষাগার সীমিত, এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত করার সক্ষমতা কম। ফলে প্রাথমিকভাবে রোগ ধরা পড়ে না। অনেকে স্থানীয় চিকিৎসক বা ধর্মীয় পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। আবার আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরিবারের সদস্যরা ঘরে রেখে সেবা দেন, মৃতদেহ স্পর্শ করে দাফনের রীতি পালন করেন। এতে ভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ে।
আরেকটি বড় কারণ হলো যুদ্ধ ও অস্থিরতা। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল বহু বছর ধরে সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকটে ভুগছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক সময় আক্রান্ত এলাকায় পৌঁছাতেই পারেন না। মানুষও সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে অনেকেই রোগের তথ্য গোপন করেন বা হাসপাতাল এড়িয়ে যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বলছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়।
তারপরও প্রশ্ন থাকে—এত বছর পরও কেন ইবোলা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না? কারণ ভাইরাসটি প্রকৃতিতে এখনো টিকে আছে। অনেক ক্ষেত্রে, আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হলেও তার শরীরে ভাইরাসটি সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায় যা থেকে পরবর্তীতে সংক্রমণ ছড়ায়। তাই একেক সময় একেক অঞ্চল থেকে নতুন করে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ শুরু হয়। অনেক সময় কয়েক বছর শান্ত থাকার পর আবার নতুন প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, খনিশিল্পের বিস্তার ইত্যাদি কারণে ইবোলার ঝুঁকি বাড়ছে।
কী বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
এবারের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি মাসেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কঙ্গো ও উগান্ডায় নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে ‘আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। এবার যে ধরনটি ছড়াচ্ছে, সেটি ‘বান্ডিবুগিও’ স্ট্রেইন নামে পরিচিত। এটি তুলনামূলক বিরল। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এই স্ট্রেইনের জন্য এখনো অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা ওষুধ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে শত শত সন্দেহভাজন সংক্রমণ ও বহু মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীরাও রয়েছেন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতোমধ্যে উগান্ডাতেও সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পরিস্থিতি এখনো মহামারির পর্যায়ে যায়নি, কিন্তু আঞ্চলিক ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কারণ আক্রান্ত এলাকা সীমান্তঘেঁষা, মানুষ নিয়মিত এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াত করে, আর প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। কঙ্গোর খনিশিল্প এলাকা থেকে মানুষ চিকিৎসার জন্য অন্য শহরে গেছেন, সেখান থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়েছে।
তবে ইবোলা নিয়ে আতঙ্কের পাশাপাশি একটি বাস্তবতাও মনে রাখা জরুরি। এটি কোভিডের মতো সহজে বাতাসে ছড়ায় না। দ্রুত রোগ শনাক্ত, আক্রান্তকে আলাদা রাখা, নিরাপদ দাফন এবং সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণে রাখলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অতীতেও বহু প্রাদুর্ভাব শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে, শুধু ওষুধ বা হাসপাতাল নয়—মানুষের আস্থা, তথ্যের স্বচ্ছতা, এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই ইবোলা মোকাবিলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।