শিক্ষিকার মিডিয়া ট্রায়াল ও আমাদের প্রতিরোধ

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২২: ০৮
শিক্ষিকার-মিডিয়া-ট্রায়াল-ও-আমাদের-প্রতিরোধ

​অতি-সম্প্রতি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ও জেলা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পালের একটি রিল ভিডিও নিয়ে তৈরি হওয়া অনভিপ্রেত বিতর্ক এবং তা ঘিরে শিক্ষা বিভাগের তৎপরতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো দাপ্তরিক ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজদেহের গভীরতম পুরুষতান্ত্রিক ক্ষতের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

পুরুষতন্ত্রের শোষণে আমাদের দেশের নারীর অবস্থা বহুযুগ ধরে কেমন ছিল, তা বেগম রোকেয়ার লেখা থেকে আমরা পূর্বেই ধারণা পেয়েছি। তিনি দেখিয়েছিলেন, স্বামী যখন সুদূর মহাশূন্যে গ্রহ-নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন বা সৌরজগতের হিসাব কষেন, তখন স্ত্রী ঘরের কোণে বসে কেবল একটি বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপেন। পুরুষ যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা উচ্চমার্গীয় গবেষণায় ব্যস্ত, তখন নারীর লক্ষ্য থাকে রান্নাঘরের চাল-ডাল-মশলার অনুপাত ঠিক রাখা।

কথা হচ্ছে, রোকেয়ার দেখানো সে যুগ কি আজ আর পুরোপুরি আছে? কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আছে—এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু যুগ যেহেতু পাল্টেছে, নারীরা তাদের রান্নাঘরের আগলও ভেঙেছে। অবরোধের বাইরে এসে নারী বাস্তবের পাশাপাশি এখন ভার্চুয়াল জগৎও সমানভাবে অধিকার করছে। এখন নারী পুরুষের সমকক্ষ হয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। কিন্তু এই সক্ষমতায় কিছু পুরুষ এবং কিছু পুরুষতান্ত্রিক নারীর ঐতিহ্যগত কর্তৃত্বের ‘মেল ইগো’ মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছে।

ঘরের একমাত্র উপার্জনক্ষম ও শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে পুরুষের সঙ্গে অংশীজন হিসেবে নারীর এই অবস্থান পুরুষতান্ত্রিক অহমে সহনযোগ্য নয়; ফলে নারীর পেশাগত সাফল্য তাদের মধ্যে তীব্র হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। আর এর জেরেই নারীর ওপর চলছে পরিকল্পিত ট্রমা তৈরি এবং বিউটি পালের মতো সম্মানিত মানুষকে মিডিয়া ট্রায়ালে সম্মিলিত হেনস্থা করার অপচেষ্টা।

​বিশ্বজুড়ে যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীর উপস্থিতি এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নানা প্রতিবাদী রূপ দেখা দিচ্ছে, তখন আমাদের দেশে নারীর সামান্য আনন্দ-আয়োজন যেন ডিজিটাল স্পেসের এক নতুন ট্রায়ালরুম। পুরুষরা ডিজিটাল স্পেসে নিজেদের দৈনন্দিন জীবন বা বিনোদন অবাধে ভাগ করে নিলে তা সমাজের চোখে অতি ‘স্বাভাবিক’ বিবেচিত হয়, কিন্তু একজন নারী শিক্ষক যখন একই পরিসরে নিজেকে প্রকাশ করেন, তখন তাঁর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, পোশাক কিংবা হাস্যমুখকে একটি অবাস্তব নৈতিক বিচারের নামে ট্রল, মিম ও কদর্য মন্তব্যের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।

অন্যায় না থাকা সত্ত্বেও তাদের এই ট্রায়াল আরো দীর্ঘ হয় যখন ঘটনাটি কেবল ডিজিটাল ক্রাইমেই সীমাবদ্ধ না থেকে; এর শিকড় আরও প্রোথিত হয় প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নজরদারির গভীর ষড়যন্ত্রে। এর মধ্য দিয়ে মূলত নীতিনির্ধারকরা আবার নির্ধারণ করতে চান কর্মজীবী নারীর চলাফেরার পরিধি—তাঁরা কি সেই রোকেয়ার আমলের নিঃশব্দ গৃহিণী চান, নাকি আমাদের প্রচলিত সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক বয়ানের সেই চেনা ছাঁচে ঢালা চরিত্র?

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি সহানুভূতিশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাঠামোগত সংস্কার। একজন শিক্ষককে কেবল প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে বা রোবট হিসেবে না দেখে, রক্তমাংসের একজন মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।

​গণমাধ্যম সবসময় একেক পেশার মানুষকে একেকটি কৃত্রিম চরিত্রে দাঁড় করায়, যার সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধন প্রায় অনুপস্থিত। শিক্ষকের ইমেজ নির্মাণে মিডিয়া যুগ যুগ ধরে একটি নির্দিষ্ট রূপ দেখিয়ে আসছে—যেখানে বয়স্ক শিক্ষক মানেই ভারী চশমা পরিহিত গম্ভীর মুখের কেউ, যিনি হাসলেই তা কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি করে, কিংবা যিনি চরম দারিদ্র্যের প্রতীক হয়েও নীতিবান ও কষ্টসহিষ্ণু।

মিডিয়া জেনেশুনে শিক্ষকদের দরিদ্র ও সাদামাটা বানিয়ে এক অদ্ভুত মানসিক সন্তুষ্টিতে ভুগেছে, যেন শিক্ষকদের উন্নত বা বিলাসবহুল জীবনের সঙ্গে সংবেদনশীল আনন্দময় সময় কাটানোর কোনো মানবিক অধিকারই নেই। এর সঙ্গে নাটক-সিনেমার পর্দায় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের রোমান্টিসিজম বা ইরোটিক ফ্যান্টাসি তৈরি করে এক বিকৃত মানসিকতাকে প্রতিনিয়ত উসকে দেওয়া হয়েছে।

আর এই পূর্বসূত্রিতার কারণেই রিল ভিডিওর মতো লঘু বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও নৈতিকতা নিয়ে কাটাছেঁড়া করা সহজ হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রে বা সমাজে যখন একজন নারী উচ্চপদে থাকেন, তখন তাঁর পেশাগত দক্ষতা, পাঠদানের ক্ষমতা বা প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে তাঁর শরীর ও সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতি নিয়ে মাতামাতি প্রমাণ করে যে সমাজ নারীকে যথার্থ মূল্যায়ন করার জন্য এখনও প্রস্তুত নয়। ‘আদর্শ নারী’ বানানোর এই মিথ ও পিতৃতান্ত্রিক দ্বিমুখী নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো নারীকে আধুনিক প্রযুক্তির আলো থেকে দূরে রাখা এবং সমাজের বেঁধে দেওয়া ছকের বাইরে এক পাও ফেলতে না দেওয়া।

​এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি সহানুভূতিশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাঠামোগত সংস্কার। একজন শিক্ষককে কেবল প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে বা রোবট হিসেবে না দেখে, রক্তমাংসের একজন মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। শিক্ষকের সমাজ ও পেশাগত জীবনের বাইরেও যে একটি নিজস্ব সত্তা, আবেগ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রয়েছে, তা স্বীকার করতে হবে।

শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক জায়গাগুলোকে কোনো ধরনের সামাজিক মাধ্যম বা হেইট ক্যাম্পেইনের চাপে পড়ে তাৎক্ষণিক ও প্রতিক্রিয়াশীল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। কোনো সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত পেশাগত অপরাধ ছাড়া কেবল ব্যক্তিগত জীবন বা ডিজিটাল উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের হেনস্তা করার সংস্কৃতি রোধে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, সাইবার স্পেসে নারীর গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও বুলিং রোধে কঠোর রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং দ্রুত কার্যকর সাইবার সিকিউরিটি মেকানিজম গড়ে তুলতে হবে, যাতে কেউ কোনো ভিডিও বা কনটেন্টকে পুঁজি করে একজন শিক্ষকের মানসম্মান ও জীবিকা ধ্বংস করার সাহস না পায়।

​সমাজকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে পছন্দ, আবেগ বা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার রূপ বদলাতে পারে—এই পরিবর্তিত সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমে নারীর উপস্থিতি বা একজন শিক্ষকের স্বাভাবিক আনন্দযাপন কোনো অপরাধ নয়; বরং প্রকৃত অপরাধ হলো সেই বিকৃত ও বিচারকসুলভ মানসিকতা, যা একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে একজন মানুষের মানসম্মান ও ক্যারিয়ার ধ্বংস করার সাহস করে।

এই ক্ষমাহীন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষক ও নারীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে যোগ্য সম্মান দিতে না পারলে একটি সুশিক্ষিত, মানবিক ও সহানুভূতিশীল রাষ্ট্র গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারকদের এই সত্য যত দ্রুত উপলব্ধি করা সম্ভব হবে, সমাজের জন্যই তা মঙ্গলজনক।

  • লেখক: গল্পকার, গবেষক ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক
Ad 300x250

সম্পর্কিত