মাহবুবুল আলম তারেক

২০২৫ সালের শুরু থেকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা চলছে। এই সময়ে স্বর্ণের দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। জেপি মরগ্যান, ব্ল্যাকরক, গোল্ডম্যান স্যাকস, ওয়েলস ফার্গো, ইউবিএস, ডয়েচে ব্যাংকসহ বড় বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বর্ণে বিনিয়োগে ব্যাপকভাবে আশাবাদী। জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৬ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়া বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক মনে হলেও অর্থনীতিবিদ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার এবং বাজার বিশ্লেষকদের কাছে এটি একটি সতর্ক-সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বর্ণকে একটি ‘নিরাপদ সম্পদ’ বলা হয় কারণ তা কোনো সুদ দেয় না, সরকার তা ছাপাতে পারে না এবং দীর্ঘ সময় ধরে এর মূল্য টিকে থাকে।
স্থিতিশীল অর্থনীতিতে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা, শেয়ারবাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করে লাভের আশায়। কিন্তু যখন ভূরাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধের আশঙ্কা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বা ডলারের দুর্বলতা দেখা দেয়, তখন তারা ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে বেরিয়ে স্বর্ণের মতো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এই প্রবণতাকে ‘ফ্লাইট টু সেফটি’ বলা হয়, যা অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণের চাহিদা ও দাম বাড়িয়ে দেয়।
ফলে বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো যখন স্বর্ণের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়, তখন তা বোঝায় যে বৈশ্বিক অর্থনীতি খুব তাড়াতাড়ি স্থিতিশীল হবে না—বরং মুদ্রাস্ফীতি বাড়া ও আর্থিক মন্দা আসতে পারে। এ ছাড়া এটি বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পাওলো পাসকুয়ারিয়েলো স্পষ্টভাবে বলেছেন, “স্বর্ণের এই উল্লম্ফনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—এটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সমস্যার পূর্বাভাস। উচ্চ স্বর্ণমূল্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য কঠিন সময়ের আগাম ইঙ্গিত হতে পারে।”
স্বর্ণমূল্যের এই উল্লম্ফন কোনো একক ঘটনার ফল নয়, বরং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত শক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় ঋণের ফাঁদ। ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যা একটি নতুন সংকটপর্বের সূচনা নির্দেশ করছে। শুধু সুদ পরিশোধেই প্রতিদিন প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙনের কারণে সৃষ্ট স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার উচ্চ রাখতে হচ্ছে। কিন্তু সুদ বাড়লে বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বেড়ে যায়, যা সম্ভাব্য আর্থিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ ‘মুদ্রাগত বিমা’ হয়ে ওঠে—যা সম্পূর্ণভাবে ঋণভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করে এবং এতে কোনো প্রতিপক্ষ ঝুঁকি নেই। সরকারি বন্ডের মতো এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সহজে অবমূল্যায়ন করা যায় না। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এই ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ফাইন্যান্সিয়াল রিপ্রেশন’ নীতি গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি সুদের হারের তুলনায় বেশি থাকবে এবং বাস্তব অর্থে ঋণের মূল্য কমে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় মুদ্রাধারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু স্বর্ণধারীরা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
দ্বিতীয়ত, ডি-ডলারাইজেশন। স্বর্ণমূল্য বৃদ্ধির আরেকটি প্রধান কারণ হলো বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রিজার্ভে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমে আসা। ১৯৯৯ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ ছিল ৭১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসে ৫৬.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়।
বিশেষ করে চীন, ভারত, পোল্যান্ড এবং তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর ফলে বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভ বৈচিত্র্যকরণের দিকে এগিয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট বার্ষিক স্বর্ণ চাহিদার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশের জন্য দায়ী। ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিট স্বর্ণ ক্রয় ছিল গড়ে ৮৬৩ টন। একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সাল পর্যন্ত তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।
তৃতীয়ত, প্রকৃত আয়ের সঙ্গে সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা। ঐতিহাসিকভাবে স্বর্ণের সঙ্গে প্রকৃত আয়ের (মুদ্রাস্ফীতি সমন্বিত সুদের হার) একটি বিপরীতমুখী সম্পর্ক রয়েছে। স্বর্ণ যেহেতু সুদ দেয় না, তাই প্রকৃত আয় কম বা ঋণাত্মক হলে এটি বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ২০২৬ সালে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সুদের হার তুলনামূলকভাবে উচ্চ থাকা সত্ত্বেও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা ইঙ্গিত দেয় যে বিনিয়োগকারীরা এখন কেবল সুদের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করছে না। তারা বরং বড় ধরনের ঝুঁকি বা “টেইল রিস্ক” থেকে সুরক্ষা পাওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণ একটি কার্যকর “মূলধন সংরক্ষণ” মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বর্ণের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি একটি অসুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ। তাদের মতে, এটি কোনোভাবেই সুস্থ অর্থনীতির ইতিবাচক সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। পাসকুয়ারিয়েলোর মতে, এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি একটি সতর্কবার্তা। তার মতে, স্বর্ণের দাম বাড়া মানে প্রচলিত নিরাপদ সম্পদ যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আর্থিক বাজারে যে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির অবস্থার একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে সম্পদ ব্যবস্থাপকরা অস্থিরতার বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছেন এবং শেয়ারবাজারে বেশি লাভের আশায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। অন্যদিকে উৎপাদন ও শ্রমবাজারে আগাম সতর্ক সংকেতগুলো একটি সম্ভাব্য মন্দার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান টানা আট মাস ধরে কমেছে। এটি এখন মহামারির আগের স্তরের নিচে নেমে গেছে, যা সাধারণত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ নয়, বরং সংকোচনের পূর্বাভাস দেয়। এই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ একটি মৌলিক বার্তা বহন করছে। এর অর্থ হলো বিশ্ব এখন মূল্য সৃষ্টি না করে সম্পদ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উৎপাদনশীল সম্পদ থেকে স্বর্ণে মূলধন স্থানান্তরের অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর।
স্বর্ণকে একটি ‘অনুৎপাদনশীল’ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি কোনো আয়, লভ্যাংশ বা নগদ প্রবাহ সৃষ্টি করে না। যখন ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ স্বর্ণে স্থানান্তরিত হয়, তখন তা বৈশ্বিক উদ্ভাবন বাজেট থেকে বড় ধরনের অর্থ সরিয়ে নেয়। এর ফলে নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
এছাড়া স্বর্ণ উৎপাদন খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ঘাটতি প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ব্যাসেল থ্রি ব্যাংকিং সংস্কারের কারণে ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলক কম জামানতযুক্ত ঋণের বিপরীতে বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে উদীয়মান অর্থনীতির ছোট খনন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রচলিত ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসছে।
এই পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। মূলধন প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার বদলে সরাসরি সম্পদনির্ভর বিনিয়োগের দিকে সরে যাচ্ছে। এতে স্বর্ণ উৎপাদন খাত চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। ফলে সরবরাহ সংকট ও উচ্চ চাহিদার একটি স্থায়ী চক্র তৈরি হচ্ছে, যা স্বর্ণের দামকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি নেতিবাচক সংকেত। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমিত সংখ্যক সম্পদধারীদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামের লাগামহীন বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অতিধনী ব্যক্তিরা স্বর্ণকে বৈশ্বিক আর্থিক চলাচলে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রায়ই মূল্যচক্রের বিপরীত দিকে অবস্থান করেন এবং ক্ষতির মুখে পড়েন।
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেলে এই পরিবারগুলো নিজেদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে পারে না। কারণ নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, জ্বালানি ও বাসাভাড়ার মতো মৌলিক খাতে ব্যয় করে। ফলে তারা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য স্বর্ণ কিনতে সক্ষম হয় না। এই অবস্থায় তাদের নগদ সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যায়।
এর ফলে একটি “কে-আকৃতির” অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দেখা যায়, যেখানে উচ্চ আয়ের মানুষ লাভবান হয় এবং নিম্ন আয়ের মানুষ পিছিয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি নেতিবাচক সংকেত। এটি বোঝায় যে মুদ্রাস্ফীতি আর সাময়িক বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। বরং অর্থনীতি একটি “স্ট্যাগফ্লেশন” পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতিবিদদের কাছে আস্থার সংকটের প্রাথমিক সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের মতে, এটি টাকার মান নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতার প্রতিফলন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যখন মানুষ মনে করে তাদের নগদ সঞ্চয়ের মূল্য কমে যাবে, তখন তারা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি জাতীয় মুদ্রার প্রতি আস্থা কমার সরাসরি প্রতিফলন।
২০০০ সালে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৬ হাজার ৯০০ টাকা, যা তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনীতির প্রতিফলন ছিল। ২০১০ সালে এটি বেড়ে ৪২ হাজার ১৬৫ টাকায় পৌঁছায়, যা বৈশ্বিক আর্থিক সংকট পরবর্তী পুনরুদ্ধারের সময়কাল নির্দেশ করে। ২০২০ সালে দাম দাঁড়ায় ৭০ হাজার টাকা, যা কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৩ সালে এটি ১ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফনের প্রতিফলন। ২০২৪ সালে স্বর্ণের দাম বেড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় পৌঁছায়, যেখানে ডলার সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০২৫ সালে দাম লাফিয়ে ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায় পৌঁছায়, যা এক বছরে প্রায় ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় উঠে নতুন রেকর্ড গড়ে। যদিও বর্তমানে তা ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৫ টাকায় নেমে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টাকার বৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে কিছু কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে, যা মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। স্বর্ণ আমদানি পুরোপুরি বৈধ নয় বলে চোরাচালান চক্র বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা বাজারের অস্থিরতাকে কাজে লাগাতে পারছে। উচ্চ মূল্য চোরাচালানকে আরও উৎসাহিত করছে। এতে আর্থিক বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। এই অনানুষ্ঠানিক বাজার কাঠামো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কার প্রতিও আরও সংবেদনশীল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামে উল্লম্ফন বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর চাপেরও একটি সামগ্রিক সংকেত। এটি দেখায় যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারগুলোর মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা পুনর্মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় ঝুঁকির পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের প্রকৃত মূল্য কমায় স্বর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী সম্পদ হিসেবে কাজ করছে। আর বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের জন্য স্বর্ণমুখী হওয়া ডলারভিত্তিক একক ব্যবস্থার ভাঙনেরও লক্ষণ।
স্বর্ণের রেকর্ড মূল্য এবং উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমার মধ্যে বৈপরীত্য অর্থনীতির দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এতে বোঝা যায় বাস্তব অর্থনীতি শেয়ারবাজারের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি “কে-আকৃতির” অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এতে দরিদ্র মানুষের সঞ্চয় মুদ্রাস্ফীতিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, আর ধনী শ্রেণি তাদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে পারছে। বাংলাদেশের মতো দেশে এর ফলে সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়ছে।
সবমিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বর্ণের দাম বাড়া নিজেই সমস্যা নয়, বরং মূল সমস্যাগুলোর লক্ষণ। আর্থিক শৃঙ্খলা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং ভূরাজনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার সংকেত। সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ হলো প্রচলিত সম্পদ সৃষ্টির পথ সংকুচিত হচ্ছে। ধনীরা স্বর্ণ কিনে সম্পদ রক্ষা করলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছুই করার নেই শুধু মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া, চরমভাবে কৃচ্ছ্রসাধন এবং যতটুকু সঞ্চয় সম্ভব তা রক্ষা করার চেষ্টা করা ছাড়া।
ইতিহাসে দেখা গেছে, মহামন্দা থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ সংকট পর্যন্ত প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক মন্দায় স্বর্ণ একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমান সময়ে স্বর্ণের অতি উজ্জ্বলতাকেও তাই অর্থনীতিতে গভীর সংকটেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: জেপি মরগ্যান, ফাইন্যান্স ম্যাগনেট, বুলিয়ন এক্সচেঞ্জ, ম্যাকেনজি, ব্ল্যাকরক ও গোল্ডসিলভার ডটকম, কারেন্ট থটস অন ট্রেড, ইউরোপিয়ান বিজনেস ম্যাগাজিন ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস

২০২৫ সালের শুরু থেকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা চলছে। এই সময়ে স্বর্ণের দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। জেপি মরগ্যান, ব্ল্যাকরক, গোল্ডম্যান স্যাকস, ওয়েলস ফার্গো, ইউবিএস, ডয়েচে ব্যাংকসহ বড় বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বর্ণে বিনিয়োগে ব্যাপকভাবে আশাবাদী। জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৬ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়া বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক মনে হলেও অর্থনীতিবিদ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার এবং বাজার বিশ্লেষকদের কাছে এটি একটি সতর্ক-সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বর্ণকে একটি ‘নিরাপদ সম্পদ’ বলা হয় কারণ তা কোনো সুদ দেয় না, সরকার তা ছাপাতে পারে না এবং দীর্ঘ সময় ধরে এর মূল্য টিকে থাকে।
স্থিতিশীল অর্থনীতিতে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা, শেয়ারবাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করে লাভের আশায়। কিন্তু যখন ভূরাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধের আশঙ্কা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বা ডলারের দুর্বলতা দেখা দেয়, তখন তারা ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে বেরিয়ে স্বর্ণের মতো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এই প্রবণতাকে ‘ফ্লাইট টু সেফটি’ বলা হয়, যা অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণের চাহিদা ও দাম বাড়িয়ে দেয়।
ফলে বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো যখন স্বর্ণের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়, তখন তা বোঝায় যে বৈশ্বিক অর্থনীতি খুব তাড়াতাড়ি স্থিতিশীল হবে না—বরং মুদ্রাস্ফীতি বাড়া ও আর্থিক মন্দা আসতে পারে। এ ছাড়া এটি বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পাওলো পাসকুয়ারিয়েলো স্পষ্টভাবে বলেছেন, “স্বর্ণের এই উল্লম্ফনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—এটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সমস্যার পূর্বাভাস। উচ্চ স্বর্ণমূল্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য কঠিন সময়ের আগাম ইঙ্গিত হতে পারে।”
স্বর্ণমূল্যের এই উল্লম্ফন কোনো একক ঘটনার ফল নয়, বরং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত শক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় ঋণের ফাঁদ। ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যা একটি নতুন সংকটপর্বের সূচনা নির্দেশ করছে। শুধু সুদ পরিশোধেই প্রতিদিন প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙনের কারণে সৃষ্ট স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার উচ্চ রাখতে হচ্ছে। কিন্তু সুদ বাড়লে বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বেড়ে যায়, যা সম্ভাব্য আর্থিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ ‘মুদ্রাগত বিমা’ হয়ে ওঠে—যা সম্পূর্ণভাবে ঋণভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করে এবং এতে কোনো প্রতিপক্ষ ঝুঁকি নেই। সরকারি বন্ডের মতো এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সহজে অবমূল্যায়ন করা যায় না। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এই ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ফাইন্যান্সিয়াল রিপ্রেশন’ নীতি গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি সুদের হারের তুলনায় বেশি থাকবে এবং বাস্তব অর্থে ঋণের মূল্য কমে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় মুদ্রাধারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু স্বর্ণধারীরা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
দ্বিতীয়ত, ডি-ডলারাইজেশন। স্বর্ণমূল্য বৃদ্ধির আরেকটি প্রধান কারণ হলো বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রিজার্ভে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমে আসা। ১৯৯৯ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ ছিল ৭১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসে ৫৬.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়।
বিশেষ করে চীন, ভারত, পোল্যান্ড এবং তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর ফলে বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভ বৈচিত্র্যকরণের দিকে এগিয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট বার্ষিক স্বর্ণ চাহিদার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশের জন্য দায়ী। ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিট স্বর্ণ ক্রয় ছিল গড়ে ৮৬৩ টন। একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সাল পর্যন্ত তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।
তৃতীয়ত, প্রকৃত আয়ের সঙ্গে সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা। ঐতিহাসিকভাবে স্বর্ণের সঙ্গে প্রকৃত আয়ের (মুদ্রাস্ফীতি সমন্বিত সুদের হার) একটি বিপরীতমুখী সম্পর্ক রয়েছে। স্বর্ণ যেহেতু সুদ দেয় না, তাই প্রকৃত আয় কম বা ঋণাত্মক হলে এটি বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ২০২৬ সালে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সুদের হার তুলনামূলকভাবে উচ্চ থাকা সত্ত্বেও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা ইঙ্গিত দেয় যে বিনিয়োগকারীরা এখন কেবল সুদের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করছে না। তারা বরং বড় ধরনের ঝুঁকি বা “টেইল রিস্ক” থেকে সুরক্ষা পাওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণ একটি কার্যকর “মূলধন সংরক্ষণ” মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বর্ণের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি একটি অসুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ। তাদের মতে, এটি কোনোভাবেই সুস্থ অর্থনীতির ইতিবাচক সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। পাসকুয়ারিয়েলোর মতে, এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি একটি সতর্কবার্তা। তার মতে, স্বর্ণের দাম বাড়া মানে প্রচলিত নিরাপদ সম্পদ যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আর্থিক বাজারে যে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির অবস্থার একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে সম্পদ ব্যবস্থাপকরা অস্থিরতার বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছেন এবং শেয়ারবাজারে বেশি লাভের আশায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। অন্যদিকে উৎপাদন ও শ্রমবাজারে আগাম সতর্ক সংকেতগুলো একটি সম্ভাব্য মন্দার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান টানা আট মাস ধরে কমেছে। এটি এখন মহামারির আগের স্তরের নিচে নেমে গেছে, যা সাধারণত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ নয়, বরং সংকোচনের পূর্বাভাস দেয়। এই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ একটি মৌলিক বার্তা বহন করছে। এর অর্থ হলো বিশ্ব এখন মূল্য সৃষ্টি না করে সম্পদ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উৎপাদনশীল সম্পদ থেকে স্বর্ণে মূলধন স্থানান্তরের অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর।
স্বর্ণকে একটি ‘অনুৎপাদনশীল’ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি কোনো আয়, লভ্যাংশ বা নগদ প্রবাহ সৃষ্টি করে না। যখন ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ স্বর্ণে স্থানান্তরিত হয়, তখন তা বৈশ্বিক উদ্ভাবন বাজেট থেকে বড় ধরনের অর্থ সরিয়ে নেয়। এর ফলে নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
এছাড়া স্বর্ণ উৎপাদন খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ঘাটতি প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ব্যাসেল থ্রি ব্যাংকিং সংস্কারের কারণে ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলক কম জামানতযুক্ত ঋণের বিপরীতে বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে উদীয়মান অর্থনীতির ছোট খনন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রচলিত ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসছে।
এই পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। মূলধন প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার বদলে সরাসরি সম্পদনির্ভর বিনিয়োগের দিকে সরে যাচ্ছে। এতে স্বর্ণ উৎপাদন খাত চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। ফলে সরবরাহ সংকট ও উচ্চ চাহিদার একটি স্থায়ী চক্র তৈরি হচ্ছে, যা স্বর্ণের দামকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি নেতিবাচক সংকেত। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমিত সংখ্যক সম্পদধারীদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামের লাগামহীন বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অতিধনী ব্যক্তিরা স্বর্ণকে বৈশ্বিক আর্থিক চলাচলে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রায়ই মূল্যচক্রের বিপরীত দিকে অবস্থান করেন এবং ক্ষতির মুখে পড়েন।
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেলে এই পরিবারগুলো নিজেদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে পারে না। কারণ নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, জ্বালানি ও বাসাভাড়ার মতো মৌলিক খাতে ব্যয় করে। ফলে তারা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য স্বর্ণ কিনতে সক্ষম হয় না। এই অবস্থায় তাদের নগদ সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যায়।
এর ফলে একটি “কে-আকৃতির” অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দেখা যায়, যেখানে উচ্চ আয়ের মানুষ লাভবান হয় এবং নিম্ন আয়ের মানুষ পিছিয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি নেতিবাচক সংকেত। এটি বোঝায় যে মুদ্রাস্ফীতি আর সাময়িক বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। বরং অর্থনীতি একটি “স্ট্যাগফ্লেশন” পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতিবিদদের কাছে আস্থার সংকটের প্রাথমিক সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের মতে, এটি টাকার মান নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতার প্রতিফলন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যখন মানুষ মনে করে তাদের নগদ সঞ্চয়ের মূল্য কমে যাবে, তখন তারা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি জাতীয় মুদ্রার প্রতি আস্থা কমার সরাসরি প্রতিফলন।
২০০০ সালে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৬ হাজার ৯০০ টাকা, যা তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনীতির প্রতিফলন ছিল। ২০১০ সালে এটি বেড়ে ৪২ হাজার ১৬৫ টাকায় পৌঁছায়, যা বৈশ্বিক আর্থিক সংকট পরবর্তী পুনরুদ্ধারের সময়কাল নির্দেশ করে। ২০২০ সালে দাম দাঁড়ায় ৭০ হাজার টাকা, যা কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৩ সালে এটি ১ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফনের প্রতিফলন। ২০২৪ সালে স্বর্ণের দাম বেড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় পৌঁছায়, যেখানে ডলার সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০২৫ সালে দাম লাফিয়ে ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায় পৌঁছায়, যা এক বছরে প্রায় ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় উঠে নতুন রেকর্ড গড়ে। যদিও বর্তমানে তা ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৫ টাকায় নেমে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টাকার বৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে কিছু কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে, যা মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। স্বর্ণ আমদানি পুরোপুরি বৈধ নয় বলে চোরাচালান চক্র বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা বাজারের অস্থিরতাকে কাজে লাগাতে পারছে। উচ্চ মূল্য চোরাচালানকে আরও উৎসাহিত করছে। এতে আর্থিক বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। এই অনানুষ্ঠানিক বাজার কাঠামো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কার প্রতিও আরও সংবেদনশীল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামে উল্লম্ফন বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর চাপেরও একটি সামগ্রিক সংকেত। এটি দেখায় যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারগুলোর মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা পুনর্মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় ঝুঁকির পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের প্রকৃত মূল্য কমায় স্বর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী সম্পদ হিসেবে কাজ করছে। আর বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের জন্য স্বর্ণমুখী হওয়া ডলারভিত্তিক একক ব্যবস্থার ভাঙনেরও লক্ষণ।
স্বর্ণের রেকর্ড মূল্য এবং উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমার মধ্যে বৈপরীত্য অর্থনীতির দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এতে বোঝা যায় বাস্তব অর্থনীতি শেয়ারবাজারের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি “কে-আকৃতির” অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এতে দরিদ্র মানুষের সঞ্চয় মুদ্রাস্ফীতিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, আর ধনী শ্রেণি তাদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে পারছে। বাংলাদেশের মতো দেশে এর ফলে সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়ছে।
সবমিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বর্ণের দাম বাড়া নিজেই সমস্যা নয়, বরং মূল সমস্যাগুলোর লক্ষণ। আর্থিক শৃঙ্খলা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং ভূরাজনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার সংকেত। সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ হলো প্রচলিত সম্পদ সৃষ্টির পথ সংকুচিত হচ্ছে। ধনীরা স্বর্ণ কিনে সম্পদ রক্ষা করলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছুই করার নেই শুধু মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া, চরমভাবে কৃচ্ছ্রসাধন এবং যতটুকু সঞ্চয় সম্ভব তা রক্ষা করার চেষ্টা করা ছাড়া।
ইতিহাসে দেখা গেছে, মহামন্দা থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ সংকট পর্যন্ত প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক মন্দায় স্বর্ণ একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমান সময়ে স্বর্ণের অতি উজ্জ্বলতাকেও তাই অর্থনীতিতে গভীর সংকটেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: জেপি মরগ্যান, ফাইন্যান্স ম্যাগনেট, বুলিয়ন এক্সচেঞ্জ, ম্যাকেনজি, ব্ল্যাকরক ও গোল্ডসিলভার ডটকম, কারেন্ট থটস অন ট্রেড, ইউরোপিয়ান বিজনেস ম্যাগাজিন ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস

গণতন্ত্রকে বিবেচনা করা হয় জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিফলন হিসেবে। জনগণের ম্যান্ডেট বা জনসমর্থনই হলো গণতান্ত্রিক ক্ষমতার মূল উৎস। কিন্তু একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে এই দৃশ্যমান ক্ষমতার সমান্তরালে এক অদৃশ্য শক্তির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্ত
১ দিন আগে
১৯৯২ সালে জাইদি শিয়া মতাদর্শের পুনর্জাগরণ এবং সৌদি আরবের ওয়াহাবি প্রভাব মোকাবিলার জন্য হুসেইন বদরেদ্দীন আল-হুথি 'বিলিভিং ইয়ুথ' নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
২ দিন আগে
ট্রান্সআটলান্টিক বা আটলান্টিক পাড়ের দাস ব্যবসাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এবং ক্ষতিপূরণের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
২ দিন আগে
মাইক্রোফোন হাতে তাঁরা একসময় মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তুলে ধরেছেন সমাজের নানা অসঙ্গতি। তাঁদের গানের তালে মেতেছে তরুণ প্রজন্ম। সেই র্যাপাররা সামলাচ্ছেন রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব।
৩ দিন আগে