এক্সপ্লেইনার

বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ আর গণতন্ত্রের গল্প পেরিয়ে যেভাবে গড়ে উঠল আমেরিকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটি আবারও রাজনৈতিক বিভাজন, বর্ণবাদী উত্তেজনা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আড়াই শতকের এই দীর্ঘ ইতিহাসে আমেরিকা যেমন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সামরিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, তেমনি তাকে পার হতে হয়েছে সংকট, সহিংসতা ও আত্মপরিচয়ের সংঘাত।

১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জন্ম নেওয়া দেশটি শুরু থেকেই নিজেকে ঘোষণা করেছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের এক নতুন আদর্শ হিসেবে। কিন্তু সেই আদর্শের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ভয়ঙ্কর বৈপরীত্য—একদিকে ‘সব মানুষ সমান’ ঘোষণার মহৎ প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে লাখো আফ্রিকান ক্রীতদাস মানুষের শৃঙ্খলিত জীবন। সেই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে ঠেলে দেয় ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দিকে।

এই গৃহযুদ্ধ কেবল উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে ভূখণ্ড বা ক্ষমতার লড়াই ছিল না। এটি ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, দাসপ্রথা এবং আমেরিকার ভবিষ্যৎ পরিচয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা নিষ্ঠুর সংঘর্ষ। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে অন্তত ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। সে সময় মার্কিন জনসংখ্যার প্রায় দুই শতাংশ মানুষ যুদ্ধে মারা যায়। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলে সেই সংখ্যা ৬০ লাখেরও বেশি হবে। পশ্চিমা বিশ্বের ইতিহাসে এত বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ তখন পর্যন্ত আর দেখা যায়নি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্র? যে রাষ্ট্র স্বাধীনতা ও সমতার আদর্শ নিয়ে জন্ম নিয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের মানুষ কেন নিজেদের মধ্যেই এত নির্মমভাবে যুদ্ধ করল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তে।

১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করার সময় আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশেই দাসপ্রথা বৈধ ছিল। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে থমাস জেফারসন লিখেছিলেন, ‘সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে।’ কিন্তু সেই একই সমাজে লাখো আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ ছিল দাস। অর্থাৎ আমেরিকার জন্মলগ্ন থেকেই তার আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর বৈপরীত্য ছিল।

দাসপ্রথা আমেরিকায় শুরু হয়েছিল আরও আগে, ১৬১৯ সালে। একটি পর্তুগিজ জাহাজ প্রায় ২০ জন আফ্রিকান ক্রীতদাসকে বর্তমান ভার্জিনিয়ায় নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এই দাসশ্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তুলা, তামাক ও আখের বিশাল খামারগুলোতে অমানবিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হলো কৃষ্ণাজ্ঞ দাসদের।

অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে ধীরে ধীরে ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছিল। সেখানে শিল্প-কারখানা, ক্ষুদ্র খামার ও উদ্যোক্তানির্ভর অর্থনীতি বিস্তার লাভ করছিল। ফলে ১৯ শতকের শুরুতেই উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য তীব্র হয়ে ওঠে।

উত্তরের অনেক মানুষ দাসপ্রথাকে নৈতিকভাবে ভুল মনে করতে শুরু করলেও দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গ অভিজাত শ্রেণি এটিকে তাদের অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখত। তাদের ধারণা ছিল, দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলে দক্ষিণের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ধসে পড়বে।

এই বিরোধ আরও তীব্র হয় ১৮৪৬-১৮৪৮ সালের আমেরিকান-মেক্সিকান যুদ্ধের পর। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর কাছ থেকে বিশাল ভূখণ্ড দখল করে। তখন প্রশ্ন ওঠে, নতুন অঞ্চলগুলোতে দাসপ্রথা থাকবে কি না?

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যদি গৃহযুদ্ধে দক্ষিণ জয়ী হত, তাহলে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বর্তমান রূপে আবির্ভূত হতে পারত না। তখন হয়তো উত্তর আমেরিকায় দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র তৈরি হতো—একটি শিল্পনির্ভর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং অন্যটি দাসশ্রমভিত্তিক কৃষিনির্ভর রাষ্ট্র।

এই প্রশ্নই যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করে ফেলে। দক্ষিণের রাজ্যগুলো চাইছিল নতুন অঞ্চলগুলোতেও দাসপ্রথা বৈধ হোক। কারণ তারা বিশ্বাস করত দাসপ্রথা বিস্তার করতে না পারলে এটি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের মানুষ নতুন অঞ্চলে দাসপ্রথা ছড়িয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করছিল।

১৮৫০-এর দশকে এই দ্বন্দ্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ১৮৫২ সালে প্রকাশিত আঙ্কেল টমস কেবিন উপন্যাস উত্তরের মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। উপন্যাসটিতে দাসপ্রথার নির্মমতা এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছিল, অনেক সাধারণ মানুষও দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।

কিন্তু একই সময়ে দাসপ্রথার সমর্থকেরা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছিল। ১৮৫৪ সালের কানসাস-নেব্রাস্কা আইন নতুন অঞ্চলগুলোতে দাসপ্রথা চালুর সুযোগ সৃষ্টি করে। এই আইনের বিরোধিতা থেকেই রিপাবলিকান পার্টির উত্থান ঘটে।

এই নতুন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন। ১৮৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লিঙ্কনের বিজয় দক্ষিণের রাজ্যগুলোর কাছে ছিল আতঙ্কের খবর। যদিও লিঙ্কন শুরুতে সরাসরি সব জায়গায় দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার কথা বলেননি। দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গ নেতারা বিশ্বাস করতেন রিপাবলিকান পার্টির ক্ষমতায় আসা মানেই তাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি।

ফলে দক্ষিণ ক্যারোলিনা প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে আরও কয়েকটি দক্ষিণী রাজ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা’ গঠন করে।

এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পেছনে মূল কারণ ছিল দাসপ্রথা রক্ষা করা। কনফেডারেসির ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টিফেনস প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, কালো মানুষ কখনোই সাদা মানুষের সমান হতে পারে না এবং দাসপ্রথা প্রকৃতির স্বাভাবিক ব্যবস্থা।

এর জবাবে আব্রাহাম লিঙ্কন যুক্তরাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এবং স্বাধীনতার ঘোষণার আদর্শ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল দক্ষিণের বাহিনী ফোর্ট সামটার দুর্গে হামলা চালালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুতে দক্ষিণের কনফেডারেট বাহিনী বেশ শক্তিশালী ছিল। তাদের বহু দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা ছিল এবং তারা নিজেদের ভূখণ্ডে যুদ্ধ করছিল। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের হাতে ছিল বিশাল শিল্পশক্তি, জনসংখ্যাগত সুবিধা এবং শক্তিশালী অর্থনীতি।

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হতে থাকে, ততই এটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আধুনিক শিল্পযুদ্ধের অনেক উপাদান দেখা যায়—রেলপথ, টেলিগ্রাফ, ব্যাপক গোলাবারুদ উৎপাদন এবং বিশাল সেনাবাহিনী।

১৮৬৩ সালের গেটিসবার্গ যুদ্ধ ছিল এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। উত্তরাঞ্চলের বিজয় দক্ষিণের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়।

মার্কিন গৃহযুদ্ধ। ছবি: আনসপ্ল্যাশ থেকে নেওয়া
মার্কিন গৃহযুদ্ধ। ছবি: আনসপ্ল্যাশ থেকে নেওয়া

একই বছর লিঙ্কন মুক্তির ঘোষণা বা ইম্যান্সিপেশন প্রোক্লেমেশন জারি করেন। এর মাধ্যমে কনফেডারেট নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের দাসদের মুক্ত ঘোষণা করা হয়। এই পদক্ষেপ যুদ্ধের চরিত্র বদলে দেয়। এটি আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখার যুদ্ধ থাকেনি; এটি দাসপ্রথা বিলুপ্তির নৈতিক সংগ্রামেও পরিণত হয়।

লিঙ্কন গেটিসবার্গ ভাষণে বলেছিলেন, এই যুদ্ধ হলো এমন এক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে বোঝা যাবে ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য’ পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে কি না।

কারণ সেই সময় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ ছিল রাজা, সম্রাট বা অভিজাতদের শাসনের অধীনে। যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের প্রথম বৃহৎ আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু অনেকেই সন্দেহ করছিলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এটি আদৌ টিকে থাকতে পারবে কি না।

গৃহযুদ্ধ সেই প্রশ্নেরও উত্তর দেয়। ১৮৬৫ সালে দক্ষিণের কনফেডারেট বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু বিজয়ের মাত্র পাঁচ দিন পর আততায়ীর গুলিতে নিহত হন আব্রাহাম লিঙ্কন।

তবুও তাঁর নেতৃত্বেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে। সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়। একই সঙ্গে গৃহযুদ্ধ নিশ্চিত করে যে যুক্তরাষ্ট্র আর আলাদা আলাদা সার্বভৌম রাজ্যের শিথিল জোট নয়; এটি একটি অবিভাজ্য জাতি।

এই যুদ্ধের ফলেই উত্তরাঞ্চলের মুক্ত শ্রমভিত্তিক শিল্প অর্থনীতি পুরো দেশে আধিপত্য বিস্তার করে। পরবর্তী কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। রেলপথ, ইস্পাত শিল্প, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথ ধরে এগিয়ে যায়।

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যদি গৃহযুদ্ধে দক্ষিণ জয়ী হত, তাহলে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বর্তমান রূপে আবির্ভূত হতে পারত না। তখন হয়তো উত্তর আমেরিকায় দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র তৈরি হতো—একটি শিল্পনির্ভর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং অন্যটি দাসশ্রমভিত্তিক কৃষিনির্ভর রাষ্ট্র।

তবে গৃহযুদ্ধ সব সমস্যার সমাধান করেনি। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও বর্ণবাদ থেকে যায়। দক্ষিণে ‘জিম ক্রো’ আইন চালু হয়, যা কালো মানুষদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আলাদা করে রাখে। আফ্রিকান-আমেরিকানদের সমান অধিকারের জন্য আরও এক শতাব্দী সংগ্রাম করতে হয়।

আজও যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণ, পরিচয় ও ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে গৃহযুদ্ধের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। কনফেডারেট নেতাদের মূর্তি, দাসপ্রথার ইতিহাস, পুলিশের সহিংসতা কিংবা বর্ণগত বৈষম্য—এসব প্রশ্নে আমেরিকান সমাজ এখনও বিভক্ত।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তির মুহূর্তে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের ইতিহাস নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কারণ এই যুদ্ধ শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়; এই যুদ্ধ দেখিয়েছে, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার সংকট মোকাবিলার ক্ষমতায় নিহিত। আমেরিকার ইতিহাসে গৃহযুদ্ধ ছিল সেই মুহূর্ত, যখন দেশটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—স্বাধীনতার ঘোষণার আদর্শ কি বাস্তব অর্থ পাবে, নাকি সেটি কেবল কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতিই হয়ে থাকবে।

আড়াই শতকের ইতিহাস পেরিয়ে আজকের যুক্তরাষ্ট্র এখনও সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গণতন্ত্র কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, স্বাধীনতা কতটা সবার জন্য নিশ্চিত হবে, আর বিভক্ত সমাজকে কীভাবে একত্রে রাখা সম্ভব—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত