এক্সপ্লেইনার/র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার কী, কেন দেওয়া হয়, মূল্যমান কত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৫০
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ। ফিলিপাইনের আকাশে হঠাৎ একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট র‍্যামন ম্যাগসাইসাই। তাঁর সততা ও জনকল্যাণমুখী কাজ ছিল ফিলিপাইনে সর্বজনবিদিত। এমন একজন নেতাকে হারিয়ে শোকে মুষড়ে পড়েছিল ফিলিপাইনের সর্বস্তরের মানুষ।

সেই শোক থেকেই জন্ম নেয় ‘র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার’ নামের উদ্যোগ। উদ্দেশ্য— ম্যাগসাইসাইয়ের মতোই যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্য কাজ করেন, তাঁদের খুঁজে বের করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।

যেভাবে শুরু হয়েছিল র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই ছিলেন ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাগসাইসাইয়ের মেয়াদ দীর্ঘ হয়নি। ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। সেই বছরই তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে গড়ে ওঠে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন। ফিলিপাইন সরকারের সম্মতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ব্রাদার্স ফান্ডের সহায়তায় ফাউন্ডেশনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছর, ১৯৫৮ সালের ৩১ আগস্ট প্রথমবার দেওয়া হয় এই পুরস্কার। প্রথম আয়োজনে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও শ্রীলঙ্কার পাঁচজন ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছিল। ২০২৬ সালে এসে এই পুরস্কারের বয়স দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত দশক।

কেন দেওয়া হয়

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি শুধু নির্দিষ্ট পেশায় অসাধারণ সাফল্যের জন্য দেওয়া হয় না। ফাউন্ডেশনের ভাষায়, পুরস্কারটি দেওয়া হয় এশিয়ার মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা, নেতৃত্ব এবং ‘গ্রেটনেস অব স্পিরিট’ বা মহান মানবিক চেতনার স্বীকৃতি হিসেবে। এমন মানুষ বা প্রতিষ্ঠানকে খোঁজা হয় যাঁরা শুধু নিজের সাফল্যের জন্য কাজ করেননি, কাজ করেছেন অন্যদের জীবন উন্নত করতে। এ কারণেই একেক বছর একেক পেশার লোক বিজয়ী হন। কেউ কাজ করেন স্বাস্থ্য নিয়ে, কেউ শিক্ষা নিয়ে, কেউ দারিদ্র্য কমাতে, কেউ মানবাধিকার বা পরিবেশ নিয়ে। কেউ আবার সাংবাদিকতা, শিল্প বা শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেন।

শুরুতে এর কাঠামো আজকের মতো ছিল না। ১৯৫৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ছয়টি নির্দিষ্ট বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হতো। সেগুলো ছিল সরকারি সেবা, জনসেবা, কমিউনিটি নেতৃত্ব, সাংবাদিকতা-সাহিত্য ও সৃজনশীল যোগাযোগ, শান্তি ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া এবং উদীয়মান নেতৃত্ব। ২০০০ সালে ‘উদীয়মান নেতৃত্ব’ বিভাগটি যুক্ত হয়। এতে ৪০ বছর বা তার কম বয়সী এমন ব্যক্তি কিংবা তুলনামূলক নতুন প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া হতো, যারা নিজেদের এলাকায় সামাজিক পরিবর্তনের জন্য উল্লেখযোগ্য কাজ করছে।

তবে ২০০৯ সাল থেকে পুরস্কারটি আর এসব নির্দিষ্ট বিভাগে দেওয়া হয় না। এখন মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব এবং মানুষের জন্য বাস্তব কাজের ওপর।

কীভাবে বিজয়ী বাছাই করা হয়, পুরস্কারের আর্থিক মূল্য কত

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের জন্য ফাউন্ডেশন প্রতিবছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও গোপনীয় মনোনয়নদাতার কাছ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম সংগ্রহ করে। এরপর তাদের কাজ ও অবদান নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হয়। সবশেষে ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ড কঠোর মূল্যায়নের মাধ্যমে বিজয়ীদের নির্বাচন করে।

পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেকটা আড়ালে হয়। কে কাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, সেটিও প্রকাশ করা হয় না। এই গোপনীয়তার একটা কারণও আছে। পুরস্কারটি যেন জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রচারণার প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়, কাজের বাস্তব প্রভাবটাই মূল হয়ে থাকে।

পুরস্কার হিসেবে বিজয়ীদের হাতে একটি সার্টিফিকেট, ম্যাগসাইসাইয়ের প্রতিকৃতি খোদাই করা একটি পদক, আর একটি চেক তুলে দেওয়া হয়। এই পুরস্কারের আর্থিক পরিমাণ ৫০,০০০ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫৫-৬০ লাখ টাকার কাছাকাছি।

‘এশিয়ার নোবেল’ বলা হয় কেন

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম বা পরিচয় ‘এশিয়ার নোবেল’ নয়। এটি মূলত সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ আলোচনায় তৈরি হওয়া একটি উপাধি।

নোবেল পুরস্কারের মতো র‍্যামন ম্যাগসাইসাইও বহু বছর ধরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের এমন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে সামনে এনেছে, যাঁদের কাজ নিজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজে প্রভাব ফেলেছে। ছয় দশকের বেশি সময়ে ৩৫০-এর বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। ফাউন্ডেশনের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৪টি দেশ ও অঞ্চলের ৩২৮ ব্যক্তি ও ২৮টি প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। তবে এটি নোবেল পুরস্কারের কোনো আঞ্চলিক সংস্করণ নয়। এর দীর্ঘ ইতিহাস, মর্যাদা এবং এশিয়ার মানুষের জন্য অসাধারণ কাজকে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে এই তুলনা করা হয়।

পুরস্কার হিসেবে বিজয়ীদের হাতে একটি সার্টিফিকেট, ম্যাগসাইসাইয়ের প্রতিকৃতি খোদাই করা পদক, আর একটি চেক তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কারের আর্থিক পরিমাণ ৫০,০০০ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫৫-৬০ লাখ টাকার কাছাকাছি।

১৯৬৭ সালে সত্যজিৎ রায় এই পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁর চলচ্চিত্রে মানবিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে তুলে ধরার জন্য। বাংলাদেশ থেকেও এর আগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তি এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদও র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের তালিকায় আছেন।

২০২৬-এ ‘রুনা খান’

রুনা খান ২০০২ সালে ‘ফ্রেন্ডশিপ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি বাংলাদেশের দুর্গম চর, নদীভাঙনপ্রবণ ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে কাজ করে। বিশেষ করে নদীর চরের মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে ভাসমান হাসপাতালের উদ্যোগ ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর কাজকে আলাদা করে চেনায়।

২০২৬ সালের পুরস্কার ঘোষণায় র‍্যামন ম্যাগসাইসাই ফাউন্ডেশন রুনা খানের কাজকে এমন নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা প্রান্তিক ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সমন্বিত উন্নয়নমূলক সমাধান তৈরি করেছে। তাঁর স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘গ্রেটনেস অব স্পিরিট’ বা মানুষের জন্য নিবেদিত মানবিক নেতৃত্বের ধারণাকে।

রুনা খানের ২০২৬ সালের পুরস্কার শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের নদীভাঙন, জলবায়ু ঝুঁকি আর দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের সমস্যাকেও আন্তর্জাতিক একটি মঞ্চে নিয়ে আসে। রুনা খান তাঁর পুরস্কারটি ১৫ নভেম্বর ২০২৬ ম্যানিলার মেট্রোপলিটন থিয়েটারে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবেন।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে যাঁরা পেয়েছেন ম্যাগসাইসাই

বাংলাদেশ থেকে রুনা খানসহ এখন পর্যন্ত ১৪ জন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৩ সালে করভি রাকশান্দ, ২০২১ সালে ফেরদৌসী কাদরী, ২০১২ সালে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ২০১০ সালে এএইচএম নোমান খান, ২০০৫ সালে মতিউর রহমান, ২০০৪ সালে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ১৯৯৯ সালে অ্যাঞ্জেলা গোমেজ, ১৯৮৮ সালে মোহাম্মদ ইয়াসিন, ১৯৮৭ সালে রিচার্ড উইলিয়াম টিম, ১৯৮৫ সালে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ১৯৮৪ সালে মুহাম্মদ ইউনূস, ১৯৮০ সালে ফজলে হাসান আবেদ এবং ১৯৭৮ সালে তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত