কাজী নিশাত তাবাসসুম

একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তুলে নিয়ে গেল। কিন্তু কোথায় নেওয়া হলো, কেন নেওয়া হলো, তিনি বেঁচে আছেন কি না—কিছুই জানল না পরিবার। থানায় মামলা হলো না, আদালতে হাজির করা হলো না, রাষ্ট্রও স্বীকার করল না যে তাকে আটক করা হয়েছে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শুধু অপেক্ষা। বাংলাদেশে এভাবেই ‘গুম’ একটা ভয়াবহ ও অনিশ্চিত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই গোপন বিষয়গুলো অনেকটাই প্রকাশ্যে আসে। আলোচনায় আসে ‘আয়নাঘর’সহ গোপন আটককেন্দ্রের কথা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুম নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে কমিশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রকৃত জোরপূর্বক গুম বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখনও অন্তত ২৫১ জনের কোনো খোঁজ নেই, আর ৩৬ জনের মরদেহ পরে পাওয়া গেছে। কমিশনের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
গত দুই বছরে কিছু ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। রাজনৈতিক কর্মী মাইকেল চাকমা প্রায় পাঁচ বছর গোপনে আটক থাকার পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান। তিনি জানান, দীর্ঘদিন তাঁকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল, বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে, তিনি জানতেন না।
ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, হুমাম কাদের চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনের ফিরে আসাও একই প্রশ্ন তোলে। যাঁদের গ্রেপ্তারের কথা রাষ্ট্র কখনো স্বীকারই করেনি, তাঁরা এতদিন কোথায় ছিলেন? আল জাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে এসব ঘটনায় গোপন আটককেন্দ্র ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে।
তদন্ত কমিশনও বলেছে, বহু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গুমকে আলাদা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নির্দিষ্ট কোনো আইন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ছিল না। ফলে অপহরণ, বেআইনি আটক, হত্যা বা নির্যাতনের মতো পুরোনো আইনে মামলা করার সুযোগ থাকলেও, ‘রাষ্ট্রীয় মদদে কাউকে গোপনে তুলে নিয়ে তার অবস্থান লুকিয়ে রাখা’—এই নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য আলাদা কোনো আইনি কাঠামো ছিল না।
জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি আগেই বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছিল, গুমকে আলাদা অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে। এ দিকে বড় একটা পদক্ষেপ আসে ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট, যখন বাংলাদেশ জোরপূর্বক গুম থেকে সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে (আইসিপিপিইডি) যোগ দেয়।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এটাই ছিল গুমকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে ধরার প্রথম বড় আইনি পদক্ষেপ। এই অধ্যাদেশে গুমকে একটি চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, গোপন আটককেন্দ্র নিষিদ্ধ করা হয় এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখা হয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল তদন্ত পদ্ধতিতে। ২০২৫ সালের এই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, অভিযুক্ত বাহিনীকে দিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে তদন্ত করানোর বদলে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তদন্তের সুযোগ রাখা হয়।
২০২৬ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অধ্যাদেশটি নির্ধারিত সময়ে সংসদে বিল আকারে তোলা হয়নি। ফলে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও এই বিষয়টি উল্লেখ করে জানিয়েছেন, এরপর নতুন করে গুম প্রতিরোধ আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেছেন। তবে এটি এখনও পাস হয়নি। পাস হলেই এটি আইনে পরিণত হবে। এই বিলে গুমকে অস্বীকারের সংস্কৃতি থেকে বের করে সরাসরি আইনের আওতায় আনার চেষ্টা হয়েছে। অপরাধীর শাস্তি, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও তাদের অধিকারের কথাও এতে বলা আছে।
নতুন বিলে গুমের একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা সরকারের অনুমোদনে যদি কাউকে গ্রেপ্তার-আটক-অপহরণ করার পর তার অবস্থান অস্বীকার করা হয় বা গোপন রাখা হয়, সেটাই গুম।
প্রস্তাবিত এই আইনে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপসের সুযোগ নেই এমন একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে। সাধারণ গুমের ঘটনায় অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে গুমের কারণে কারও মৃত্যু হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে বা পাঁচ বছর পরও ব্যক্তির সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া এই আইনে আরও কিছু বিষয় রাখা হয়েছে। যেমন, আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা নেওয়ার ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণের সুযোগ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকার, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের জন্য গুম সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং তদন্ত সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে এবং বিচারপ্রক্রিয়াও সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই আইনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তদন্তকারী সংস্থা নিয়ে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তকাঠামো নিয়েই সমালোচনা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অভিযুক্ত বাহিনীর নিজেদের ব্যবস্থার মধ্যেই যদি তদন্ত হয়, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও খসড়ার কিছু বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, কাউকে গ্রেপ্তারের পর সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলেই সেটাকে গুমের সংজ্ঞার বাইরে রাখা ঠিক হবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সাময়িক গোপন আটকও গুমের আওতায় পড়তে পারে।
মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়েও জাতিসংঘের আপত্তি আছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তির খোঁজ না মিললে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মত হলো, গুমের মতো জটিল অপরাধে প্রমাণ ও দায় নির্ধারণে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে মেলে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়, যাকে বলা হয় ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’। জাতিসংঘ বলছে, শুধু মাঠপর্যায়ের ব্যক্তিকে নয়—কোনো অপরাধ সম্পর্কে জেনেও যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদেরও এই আইনের আওতায় আনা উচিত।
বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস শুধু নিখোঁজ মানুষের একটা তালিকা নয়—এটা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতা আর সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন। ২০২৬ সালের এই আইন শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা শুধু শাস্তির মাত্রার ওপর নির্ভর করবে না। এটি নির্ভর করবে অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হচ্ছে কি না, গোপন আটককেন্দ্র সত্যিই বন্ধ হচ্ছে কি না, প্রমাণ সংরক্ষণ ঠিকমতো হচ্ছে কি না, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ করা যাচ্ছে কি না, এবং ভুক্তভোগী পরিবার সত্য জানার অধিকার পাচ্ছে কি না, তার ওপর।
তথ্যসূত্র: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬; হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তুলে নিয়ে গেল। কিন্তু কোথায় নেওয়া হলো, কেন নেওয়া হলো, তিনি বেঁচে আছেন কি না—কিছুই জানল না পরিবার। থানায় মামলা হলো না, আদালতে হাজির করা হলো না, রাষ্ট্রও স্বীকার করল না যে তাকে আটক করা হয়েছে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শুধু অপেক্ষা। বাংলাদেশে এভাবেই ‘গুম’ একটা ভয়াবহ ও অনিশ্চিত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই গোপন বিষয়গুলো অনেকটাই প্রকাশ্যে আসে। আলোচনায় আসে ‘আয়নাঘর’সহ গোপন আটককেন্দ্রের কথা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুম নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে কমিশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রকৃত জোরপূর্বক গুম বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখনও অন্তত ২৫১ জনের কোনো খোঁজ নেই, আর ৩৬ জনের মরদেহ পরে পাওয়া গেছে। কমিশনের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
গত দুই বছরে কিছু ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। রাজনৈতিক কর্মী মাইকেল চাকমা প্রায় পাঁচ বছর গোপনে আটক থাকার পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান। তিনি জানান, দীর্ঘদিন তাঁকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল, বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে, তিনি জানতেন না।
ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, হুমাম কাদের চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনের ফিরে আসাও একই প্রশ্ন তোলে। যাঁদের গ্রেপ্তারের কথা রাষ্ট্র কখনো স্বীকারই করেনি, তাঁরা এতদিন কোথায় ছিলেন? আল জাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে এসব ঘটনায় গোপন আটককেন্দ্র ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে।
তদন্ত কমিশনও বলেছে, বহু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গুমকে আলাদা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নির্দিষ্ট কোনো আইন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ছিল না। ফলে অপহরণ, বেআইনি আটক, হত্যা বা নির্যাতনের মতো পুরোনো আইনে মামলা করার সুযোগ থাকলেও, ‘রাষ্ট্রীয় মদদে কাউকে গোপনে তুলে নিয়ে তার অবস্থান লুকিয়ে রাখা’—এই নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য আলাদা কোনো আইনি কাঠামো ছিল না।
জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি আগেই বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছিল, গুমকে আলাদা অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে। এ দিকে বড় একটা পদক্ষেপ আসে ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট, যখন বাংলাদেশ জোরপূর্বক গুম থেকে সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে (আইসিপিপিইডি) যোগ দেয়।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এটাই ছিল গুমকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে ধরার প্রথম বড় আইনি পদক্ষেপ। এই অধ্যাদেশে গুমকে একটি চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, গোপন আটককেন্দ্র নিষিদ্ধ করা হয় এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখা হয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল তদন্ত পদ্ধতিতে। ২০২৫ সালের এই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, অভিযুক্ত বাহিনীকে দিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে তদন্ত করানোর বদলে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তদন্তের সুযোগ রাখা হয়।
২০২৬ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অধ্যাদেশটি নির্ধারিত সময়ে সংসদে বিল আকারে তোলা হয়নি। ফলে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও এই বিষয়টি উল্লেখ করে জানিয়েছেন, এরপর নতুন করে গুম প্রতিরোধ আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেছেন। তবে এটি এখনও পাস হয়নি। পাস হলেই এটি আইনে পরিণত হবে। এই বিলে গুমকে অস্বীকারের সংস্কৃতি থেকে বের করে সরাসরি আইনের আওতায় আনার চেষ্টা হয়েছে। অপরাধীর শাস্তি, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও তাদের অধিকারের কথাও এতে বলা আছে।
নতুন বিলে গুমের একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা সরকারের অনুমোদনে যদি কাউকে গ্রেপ্তার-আটক-অপহরণ করার পর তার অবস্থান অস্বীকার করা হয় বা গোপন রাখা হয়, সেটাই গুম।
প্রস্তাবিত এই আইনে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপসের সুযোগ নেই এমন একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে। সাধারণ গুমের ঘটনায় অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে গুমের কারণে কারও মৃত্যু হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে বা পাঁচ বছর পরও ব্যক্তির সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া এই আইনে আরও কিছু বিষয় রাখা হয়েছে। যেমন, আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা নেওয়ার ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণের সুযোগ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকার, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের জন্য গুম সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং তদন্ত সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে এবং বিচারপ্রক্রিয়াও সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই আইনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তদন্তকারী সংস্থা নিয়ে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তকাঠামো নিয়েই সমালোচনা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অভিযুক্ত বাহিনীর নিজেদের ব্যবস্থার মধ্যেই যদি তদন্ত হয়, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও খসড়ার কিছু বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, কাউকে গ্রেপ্তারের পর সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলেই সেটাকে গুমের সংজ্ঞার বাইরে রাখা ঠিক হবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সাময়িক গোপন আটকও গুমের আওতায় পড়তে পারে।
মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়েও জাতিসংঘের আপত্তি আছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তির খোঁজ না মিললে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মত হলো, গুমের মতো জটিল অপরাধে প্রমাণ ও দায় নির্ধারণে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে মেলে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়, যাকে বলা হয় ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’। জাতিসংঘ বলছে, শুধু মাঠপর্যায়ের ব্যক্তিকে নয়—কোনো অপরাধ সম্পর্কে জেনেও যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদেরও এই আইনের আওতায় আনা উচিত।
বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস শুধু নিখোঁজ মানুষের একটা তালিকা নয়—এটা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতা আর সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন। ২০২৬ সালের এই আইন শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা শুধু শাস্তির মাত্রার ওপর নির্ভর করবে না। এটি নির্ভর করবে অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হচ্ছে কি না, গোপন আটককেন্দ্র সত্যিই বন্ধ হচ্ছে কি না, প্রমাণ সংরক্ষণ ঠিকমতো হচ্ছে কি না, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ করা যাচ্ছে কি না, এবং ভুক্তভোগী পরিবার সত্য জানার অধিকার পাচ্ছে কি না, তার ওপর।
তথ্যসূত্র: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬; হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
.png)
-f65f09-256x144.webp)
নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই আগ্নেয়াস্ত্র কাছে রাখেন। কিন্তু বাংলাদেশে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা কোনো সাধারণ অধিকার নয়। চাইলেই অস্ত্র রাখা যায় না। লাইসেন্স ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র নিজের কাছে রাখা বা বহন করা বেআইনি। এর জন্য গুরুতর ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে। ১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্টের ১৩ ও ১৪ নম্বর ধারা
২০ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলায় শতাধিক শিশু নিহত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব
২৮ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদনে ধস, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার অপচয় আর বাসাবাড়িতে নিভু নিভু চুলা—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদেরও উদ্বেগের কারণ। এটি সত্য, গ্যাসের সমস্যা নতুন নয়। তবে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে ঠিক
২৭ আগস্ট ২০২৬
চীন-তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসের ব্যাপক বিধ্বংসী রূপ দেখা যাচ্ছে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত প্রলয়ঙ্করী এই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৬২, বিদেশি পর্যটকসহ নিখোঁজ ৪ শতাধিক মানুষ। সুবিশাল হিমালয়ের কোলের দেশটিতে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়।
২৭ আগস্ট ২০২৬