সংগ্রহ ও ভূমিকা: কাজী জাহিদুল হক
চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিক জহির রায়হানের (১৯ আগস্ট ১৯৩৫—৩০ জানুয়ারি ১৯৭২) জীবনকাল মাত্র ৩৬ বছরের। এই স্বল্পায়ু জীবনেই সৃষ্টি করে গেছেন কালজয়ী কথাসাহিত্য ও চলচ্চিত্র। তাঁর অনেক লেখাই এখনো অগ্রন্থিত রয়ে গেছে। তবে অনুসন্ধানে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত জহির রায়হানের বেশকিছু গল্প, আত্মকথনমূলক লেখা ও সাক্ষাৎকার, কবিতা, চিঠিপত্র এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধের খোঁজ মিলেছে।
১৯ আগস্ট জহির রায়হানের জন্মদিন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এখানে প্রকাশিত হলো তাঁর চলচ্চিত্রবিষয়ক অগ্রন্থিত প্রবন্ধ বাংলা ছবি তৈরীর সমস্যা। প্রবন্ধটি তিনি ১৯৬৫ সালে ৬ আগস্ট থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকায় অনুষ্ঠি ‘প্রথম পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসব’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনারে পাঠ করেন। প্রবন্ধটি ১৯ আগস্ট ১৯৬৫ তারিখে জহুর হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। পরে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাতেও দুই কিস্তিতে লেখাটি ছাপা হয়।
জহির রায়হানের কোনো গ্রন্থ বা রচনাবলিতে এখনো প্রবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এখানে প্রকাশের সময় বর্তমানে প্রচলিত বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
লেখা:

চলচ্চিত্রের জন্ম মুহূর্তে সে নির্বাক ছিল। ছবির পর ছবি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেত, কিন্তু ওরা কথা বলত না। কথা না বললেও বিভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে নির্বাক ছবি সবাক হয়ে ধরা দিত দর্শকের মনে।
তারপর ছবিতে ধ্বনি এলো, শব্দ এলো, সংলাপ এলো। ছায়াছবিতে সংলাপের সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প তার বনেদি অভিব্যক্তিগুলোকে হারিয়ে ফেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংলাপ নির্ভর হয়ে পড়ল।
সিনেমার এই সংলাপ নির্ভরতার ফলে চলচ্চিত্র শিল্পে যে সমস্যাটা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিলো সেটা হচ্ছে—ভাষার সমস্যা। নির্বাক যুগের ছবিগুলো যেকোনো দেশের দর্শকের পক্ষে বুঝতে কষ্ট হতো না। কিন্তু এক ভাষার ছবি অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলের জনসাধারণের পক্ষে বোঝা একেবারে অসম্ভব না হলেও দুরুহ হয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ভাষার ছায়াছবির বাজারও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লো।
পাকিস্তানের বাংলা ছবির বাজার পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তানের বাইরে করাচি শহরে কি লাহোরে দু-একটা বাংলা ছবি মুক্তি পেলেও অর্থ লাভের দিক থেকে এটা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
বাংলা ছবি তৈরির প্রধান যে সমস্যা সেটা হলো এই বাজার সমস্যা। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে যদিও পূর্ব-পাকিস্তান বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসার উন্নতি এবং পরিপুষ্টির জন্য আশাতীতভাবে বড়, তবুও অশিক্ষা ধর্মীয় কুসংস্কার প্রসূত সিনেমা বিমুখতা, সিনেমা হলের স্বল্পতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অনগ্রসরতার ফলে পূর্ব-পাকিস্তান বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের আত্মনির্ভরতার পক্ষে অভাবিতভাবে ছোট জায়গা। কথাটার বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
পূর্ব-পাকিস্তানে মোট ১১৭টা সিনেমা হল আছে। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক সিনেমা হল হচ্ছে মৌসুমী সিনেমা হল। মানে, বর্ষার সময় বন্ধ থাকে, গ্রীষ্ম আর শীতে খোলে। সেই তুলনায় পশ্চিম-পাকিস্তানের জনসংখ্যা যদিও কম তবুও সেখানে ৩৩৫টা সিনেমা হল আছে।
ধর্মীয় সংস্কারের ফলে পূর্ব-বাংলার জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ সিনেমা দেখার প্রতি বিমুখ। তারা সিনেমা দেখেন না এবং অন্যদেরও দেখতে নিষেধ করেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার অনগ্রসরতার ফলেও বহু দর্শক সিনেমা দেখা থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে কোন গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা কোন মফস্বলের ছবিঘরে এসে ছবি দেখার ইচ্ছা পোষণ করলেও যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্গমতার কথা ভেবে ইচ্ছে দমন করে থাকেন।
তাই বলছিলাম সিনেমা হলের স্বল্পতা, জনসংখ্যার এক বিরাট অংশের সিনেমা বিমুখতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অব্যবস্থা আমাদের বাংলা ছবির বাজারকে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং সংকুচিত করে রেখেছে—যার ফলে আজ একটা বাংলা ছবি তৈরি করতে গিয়ে একজন প্রযোজককে যে পুঁজি খাটাতে হয় লাভ তো দূরের কথা সেই পুঁজি ফিরে পাওয়াই তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তাই পূর্ব পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত যে কয়টি বাংলা ছবি তৈরি হয়েছে তার দু একটি ছাড়া সব কয়টির প্রযোজকই সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
অনেকে বলে থাকেন আমাদের তৈরি বাংলা ছবিগুলো ভালো হয় না বলেই বাজার পায় না। টাকা পাই না ওটা একটা বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের তৈরি বাংলা ছবিগুলি আর যা হোক, যে কোন উর্দু ছবির চেয়ে মোটেও খারাপ নয়। অথচ উর্দু ছবিগুলো বেশ চলে সে তুলনায় বাংলা ছবিগুলো চলে না কেন? অনেকে আমাদের বাংলা ছবিগুলোকে ভারতীয় বাংলা ছবিগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে আমাদের ছবিগুলোকে একেবারে নস্যাৎ করে দেন। আমার মনে হয়, আমাদের এই অহেতুক ভারতীয় ছবি প্রীতিও আজকে এ দেশে বাংলা ছবি তৈরির পথে এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সমস্ত সমালোচকরা জানেন না যে, ‘অপুর সংসার’, ‘জলসাঘর’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কাবলিওয়ালা’ এবং ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর মত ভারতীয় ভালো ভালো বাংলা ছবিগুলো ব্যবসার ক্ষেত্রে এদেশে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। অবশ্য ওই ছবিগুলোর সঙ্গে যদি পাকিস্তানি লেভেল আটা থাকতো—তাহলে ছবিগুলো যে একেবারেই চলতো না তাতে কোন সন্দেহ নেই।
অপরপক্ষে যে সমস্ত ভারতীয় বাংলা ছবি এদেশে ভালো ব্যবসা করেছে, সেগুলির সঙ্গে তুলনা করতে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাবে আমাদের ছবিগুলি খুব যে নিকৃষ্ট তা নয়। কোন কোন ছবি উৎকৃষ্টও বটে।
অনেকে বলে থাকেন যে ভারতীয় বাংলা ছবিগুলি ভালো ব্যবসা করে কিন্তু আমাদের বাংলা ছবিগুলো ব্যবসা করে না কেন? এর কারণগুলো অত্যন্ত সহজ এবং সাধারণ।
প্রথমত: আমাদের বিদেশি দ্রব্যের প্রতি মজ্জাগত আকর্ষণ।
দ্বিতীয়ত: দেশি দ্রব্যের প্রতি একটা বিশেষ শ্রেণীর লোকের অর্থহীন উন্নাসিকতা।
তৃতীয়ত: ভারতীয় ছবিগুলি ৩০-৪০ হাজার টাকায় আমদানি করা। এগুলো যদি এক লক্ষ টাকার ব্যবসা করে তাহলে প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা মুনাফা হয়ে যায়। অপর পক্ষে আমাদের ছবিগুলো তৈরি করতে প্রায় শোয়া থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। সেক্ষেত্রে ভারতীয় ছবির সমান ব্যবসা করলেও স্বভাবতই সেগুলো লোকসান দিয়ে থাকে। বাংলা ছবি তৈরির আরেকটা সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে উর্দু ছবির জনপ্রিয়তা।
বাংলাদেশে বাঙালির তৈরি উর্দু ছবি রজতজয়ন্তী পালন করেছে, অথচ সেই একই পরিচালকের তৈরি বাংলা ছবিটা ছয় সপ্তাহের বেশি চললো না। এতে আক্ষেপ করে দুঃখ বাড়িয়ে লাভ নেই।
বাংলাদেশে উর্দু ছবির জনপ্রিয়তা অসম্ভব রকম বেড়ে গেছে—উর্দু ছবির আমদানিও তাই বেড়েছে অনেক। উর্দু ছবির এই জনপ্রিয়তার ফলে বাংলা ছবি কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন এমন হলো কারণগুলো একটু তলিয়ে দেখা দরকার।
উর্দু ছবিগুলো নাচে গানে এবং হৈহুল্লোড়ে ভরা থাকে। উর্দু ছবিগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তান সেন্সর বোর্ডের কৃপায় অসংখ্য অশ্লীল দৃশ্য ভরা থাকে। উর্দু ছবিগুলোতে অবাস্তব নাটকীয় সংঘাত এবং অহেতুক মারামারি ও হানাহানির ছড়াছড়ি থাকে। বাংলা ছবিতে সাধারণত এসব থাকে না। কারণ বাঙালির মেয়েকে যখন তখন যেখানে সেখানে নাচানো যায় না। বাঙালির ছেলেকে দিয়ে অকারণে একটা মারপিট বাধিয়ে দেয়া যায় না। বাঙালি ছেলে মেয়েদের বাংলা ভাষায় বেলেল্লপনা বাংলাদেশের সেন্সর কর্তৃপক্ষ সহ্য করতে পারে না।
অথচ আমাদের দর্শকদের একটা বিরাট অংশ তাই চান। এরা সিনেমা হলে বসে একই ছবিতে একই সঙ্গে উত্তেজিত হতে চান, রোমাঞ্চিত হতে চান, উৎফুল্ল হতে চান, কান্নায় বুক ভাসাতে চান, হাসিতে পেট ফাটাতে চান— একই সঙ্গে সকল ইন্দ্রীয় সুখ উপভোগ করতে চান। যে রস বাস্তবে উপভোগ সম্ভবপর নয়, সিনেমা হলে দুই ঘণ্টা বসে সেই রস প্রাণভরে আকণ্ঠ পান করতে চান।
অত রস বাংলা ছবিতে পরিবেশন করা সম্ভবপর নয়। অত ইন্দ্রিয় সুখের মোহিনী বটিকা বাংলা ছবির পরিচালকদের জানা থাকলেও পরিবেশন করতে গিয়ে আত্মসম্মানে বাধে।
তবুও দু’একজন পরিচালক বাংলা ছবিতে উর্দুর পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন। আমার মতে বাংলা ভাষায় উর্দু ছবি তৈরি করার চেয়ে বাংলা ছবি না করাই ভালো। তবে যারা এ ধরনের বাংলা ছবি তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন তারাও বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কারণ আমরা বাঙালিরা পরের মেয়ের ন্যাংটা নাচ বসিয়ে বসিয়ে উপভোগ করি সত্য, কিন্তু নিজের মেয়ের একটা বাঁকা কটাক্ষে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যাই। উর্দু ছবির নোংরামিগুলো উপভোগ করি আর বাংলা ছবিতে তেমন কিছু দেখলেই রেগে গিয়ে হলের চেয়ার টেবিল ভাঙি।
বাংলা ছবির প্রযোজক-পরিচালকের উভয় সংকট। এদিকে যাও মার খাবে, ওদিকে যাও মার খাবে।
উর্দু ছবি বাঙালি অবাঙালি সব শ্রেণির দর্শকরাই দেখে থাকেন। সেজন্য এর দর্শক সংখ্যা বেশি। তাই উর্দু ছবির আমদানি ও বাংলা ছবির চেয়ে বেশি।
উর্দু ছবির বাজার বাংলা ছবির প্রায় চারগুণ। তাই একজন উর্দু ছবি প্রযোজক ইচ্ছা করলে অনেক বেশি অর্থ খাটিয়ে ছবির ভিতরে অনেক চমৎপ্রদ দৃশ্যের সংযোজন করতে পারেন—যেগুলোতে আমাদের দর্শক আকৃষ্ট হয়ে থাকেন। তুলনামূলকভাবে বাংলা ছবিতে অত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না তাই অত চমকের আয়োজনও চলে না।
উর্দু ছবির জনপ্রিয়তার জন্য আমাদের প্রদর্শক ও পরিবেশকরাও দায়ী। উর্দু ছবিগুলিকে তুলনামূলক কম পয়সায় আমদানি করা যেত বলে আমাদের পরিবেশকরা দেশ বিভাগের পর অতিরিক্ত উর্দু ছবি আমদানি করে দেশটাকে ভরে দেন। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে কোন ছবি তৈরি হত না। পরবর্তীকালে ভারতীয় ছবি আমদানির উপর বিধি নিষেধ আরোপ করা হলে আমাদের পরিবেশকদের বদৌলতে লাহোর এবং করাচির উর্দু ছবিগুলো এসে ভারতীয় উর্দু ছবির স্থান দখল করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প তখন শৈশবে। এই শিশুর পক্ষে উর্দু ছবির দানবের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা দুরোহ হয়ে পড়ে। পরিবেশক-প্রদর্শকদের এই উর্দু ছবি প্রীতির আরো কতগুলো কারণ আছে।

একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখা যাবে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবেশক ও প্রদর্শকের অধিকাংশই অবাঙালি। বাকি যারা আছে তাদের মধ্যে অনেকেই উর্দু ভাষাভাষী বাঙালি। মানে, ঘরে বাইরে সব জায়গায় উর্দুতে কথা বলেন, আছেন বাংলাদেশে সে হিসেবে বাঙালি। এইসব অবাঙালি আধাবাঙালি এবং সময় বাঙালি সময় ও অবাঙালি দল যে উর্দু ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করবেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কিন্তু আশ্চর্য তখনই হতে হয় যখন দেখি ঈদ উৎসবের সময় বাংলাদেশে এরা বাংলা ছবি রিলিজ করতে চায় না। যখন এরা বলেন যে বাংলাদেশের দর্শকরা ঈদের সময় বাংলা ছবি দেখতে চায় না, আমরা প্রযোজক-পরিচালকরা পরিবেশক ও প্রদর্শকশ নামক এইসব শেঠজীদের হাতে বলির পাঁঠার মত কাঁপা উত্তর দেবে যে সাহস কোথায়।
বাংলা ছবি তৈরির আরেকটা সমস্যা হচ্ছে বাঙালি সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা। এ সমস্যাটাকে দুটো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমটা হচ্ছে ছবির পুঁজি বিনিয়োগের দিক থেকে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে দর্শকের দিক থেকে।
পূর্ব বাংলায় বাঙালি পুঁজিপতির চেয়ে অবাঙালি পুঁজিপতির সংখ্যা অনেক বেশি। হাতেগোনা যে ক’জন বাঙালি পুঁজিপতি আছেন তাদের অবস্থাও খুব সুখপ্রদ নয় হেতু তারা চলচ্চিত্রে অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহী নন। অবাঙ্গালী পুঁজিপতিরা উর্দু ছবিতে টাকা খাটাবেন এটা খুবই সোজা কথা।
বাংলা ছবিতে অর্থ খাটাবার জন্য তাই যারা অতীতে এগিয়ে এসেছিলেন তারা হচ্ছেন ছোটখাটো বাঙালি ব্যবসায়ীর দল। তাদের পুঁজি এত কম যে, একটা ছবি যদি ব্যবসায়ে সফল না হয় তাহলে তাদের কোম্পানি নিলামে ওঠে। তাই হয়েছে। উর্দু ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পরাজিত বাঙালি প্রযোজকদের অনেকেই অফিসে তালা দিয়ে রাস্তায় নেমেছেন।
বাংলা ছবির দর্শকদের প্রধান অংশ হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এরা সাধারণত স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ছবি দেখতে আসেন। এদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা সর্বজনবিদিত। মাসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা ছবি দেখতে গেলেই ওদের রেশনের টাকায় টান পড়ে। এই দরিদ্র দর্শকদের দর্শনীর উপর নির্ভর করে বাংলা ছবির বেঁচে থাকাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য সংগ্রাম।
তারপর ‘মরার উপর খারার ঘা’ হিসেবে এসেছে বর্তমান প্রমদকর। এ বছর প্রমোদকরের বৃদ্ধি সরাসরিভাবে বাংলা ছবিকে আঘাত করেছে। কারণ, উর্দু ছবির বাজার হচ্ছে সারা পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান হচ্ছে অর্থ আমদানির দিক থেকে চার ভাগের তিন ভাগ বাজার।
পশ্চিম পাকিস্তানে প্রমোদকরের হার হচ্ছে শতকরা ৫০ ভাগ আর পূর্ব পাকিস্তানে হচ্ছে শতকরা ৭৫ এবং ১০০ ভাগ। উর্দু ছবিগুলো তাদের বৃহত্তর বাজার পশ্চিম পাকিস্তানে শতকরা ৫০ ভাগ প্রমোদকরের মোকাবেলা করছে আর বাংলা ছবিগুলো তাদের এক এবং একমাত্র বাজার পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ৭৫ এবং ১০০ভাগ প্রমদকরের বোঝা মাথায় তুলে নিচ্ছে।
অত বোঝা বইবার ক্ষমতা ক্ষুদ্র এবং দরিদ্র বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের দেহে নেই। তাই বাংলা ছবি তৈরির সমস্যা আজ এত প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই বাংলাদেশে আজ বাংলা ছবি তৈর প্রায় একরকম বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে বাংলা ছবি তৈরি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে এর প্রতিক্রিয়া কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ রূপ নেবে। আজকের দিনে জাতীয় চিন্তা ধারা ও সামাজিক ভাঙা গড়ার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের প্রভাবকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।
বাংলা ছবি বন্ধ হয়ে গিয়ে কুরুচিপূর্ণ উর্দু ছবিগুলোতে যদি দেশ ভরে যায় তাহলে বাঙালি সমাজ ধীরে ধীরে তার সাংস্কৃতিকে, তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভুলে যাবে এবং উর্দু বাংলার মিশ্রণে তৈরি এক খিচুড়ি সংস্কৃতির জন্ম দেবে।
তাই পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত আছেন তাদের সকলকে আজ সজাগ হতে হবে। আজকের এই সংকট মুহূর্তে আমরা যদি কিছু না করি তাহলে আমরা বাংলাদেশ, বাঙালির সংস্কৃতি এবং বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের চরম অবজ্ঞার পরিচয় দেবো। চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক, প্রদর্শক, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকৌশলী সকলেই আজ এই সংকট মুক্তির সমাধানে সহযোগিতা করতে হবে। সমাধান যে নেই তা নয়। নিশ্চয়ই আছে।
প্রথমত: চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যাঁরা জড়িত আছেন তাঁদের সকলকেই উর্দু ছবিতে তাঁরা যে অর্থ নিয়ে থাকেন, বাংলা ছবিতে তাঁর চার ভাগের এক ভাগ নিতে হবে। বৃহত্তম স্বার্থের প্রয়োজনে ক্ষুদ্র স্বার্থকে বলি দিতে হবে বইকি।
দ্বিতীয়ত: পরিবেশন এবং প্রদর্শকদের উর্দু ছবি প্রীতির মনোভাবের সঙ্গে বাংলা ছবির প্রতি আরো উদার মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে। সিনেমা শিল্প থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা অর্জন করেছেন তাঁরা এবার কিছু বর্জনের উদারতা দেখালে আমরা খুশি হবো।
তৃতীয়ত: আমাদের পত্রপত্রিকাগুলোকে বাংলা ছবি দেখার জন্য আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। বাংলা ছবির প্রচারে প্রাধান্য দিতে হবে এবং বাংলা ছবির বিজ্ঞাপনের হার আরো কমিয়ে দিতে হবে।

চতুর্থত: চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, যার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্র শিল্পকে গড়ে তোলার জন্য সেই প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলা ছবির প্রযোজকদের প্রতি আরো সক্রিয় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে প্রয়োজনবোধে উর্দু ছবির ক্ষেত্রে শুটিং এডিটিং প্রসেসিং রেকর্ডিং প্রভৃতির রেট বর্তমানে চেয়ে আরও এক চতুর্থাংশ বাড়িয়ে দিয়ে বাংলা ছবির ক্ষেত্রে সেই রেট বর্তমানের চেয়ে কমিয়ে অর্ধেক করে দিতে হবে।
অতীতে যে সমস্ত প্রযোজক বাংলা ছবি তৈরি করে মার খেয়েছেন এবং যাদের অনেকের চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে এখনো দেনা আছে সেই দেনাগুলো মওকুফ করে দিতে হবে।
পঞ্চমত: সরকারকে তার দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে চলবে না। গত ১৮ বছর সিনেমা শিল্প থেকে প্রমদকরের মাধ্যমে সরকার কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন। সরকারকে বাংলা ছবিগুলোতে অর্জিত প্রমোদকর বাংলা ছবির প্রযোজকদের হাতে সরাসরিভাবে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর মেয়াদ ১০ বছর হতে হবে। এর ফলে সরকারের রাজস্বের ক্ষেত্রে যে একটা বিরাট উত্থান-পতন ঘটে যাবে তা নয়। বরঞ্চ একটা জাতী তার সাংস্কৃতিক অপমৃত্যুর হাত থেকেই রেহাই পাবে।
সরকারকে প্রদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। কাগজি পরিকল্পনায় চলবে না, পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবায়িত করার যোগ্যতা প্রদর্শন করতে হবে।
সরকারকে চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রতিযোগিতামূলকভাবে বাংলা ছবির উৎসবের আয়োজন করতে হবে এবং ছবির শ্রেষ্ঠ প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকৌশলীদের অর্থ পুরস্কারের বন্দোবস্ত করতে হবে। এর ফলে প্রযোজকরা যে শুধু বাংলা ছবি তৈরির ব্যাপারে উৎসাহিত হবে তা নয়, ভালো বাংলা ছবি তৈরি করার দিকেও নজর রাখতে চেষ্টা করবে।
সরকার কোন কোন শিল্পকে একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য আয়কর মুক্ত বলে ঘোষণা করেছেন। বাংলা ছবির প্রযোজক ও কলাকৌশলীদের একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য আয়করের হাত থেকে রেহাই দিতে হবে।
আমার মনে হয়, উপরোক্ত সমাধানগুলোই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে তার বর্তমান সংকট মুক্তির ব্যাপারে সাহায্য করবে।
তাই আজ প্রতিটি চলচ্চিত্রকর্মী, দর্শক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ এবং সরকার সকলকেই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে হবে। ভাষাকে বাঁচানোর জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। বাংলা চলচ্চিত্রকে বাঁচানোর জন্য যদি প্রয়োজন হয় আমরা রক্ত দিতে কুন্ঠিত হবো না।
[প্রথম পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে আয়োজিত ‘বাংলা ছবি তৈরীর সমস্যা’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক সেমিনারের পঠিত প্রবন্ধ]
উৎস: দৈনিক সংবাদ। ঢাকা: ১৯শে আগস্ট ১৯৬৫ / ২রা ভাদ্র ১৩৭২। বৃহস্পতিবার। পৃষ্ঠা: ৩ ও ৪। সম্পাদক: জহুর হোসেন চৌধুরী।

চলচ্চিত্রের জন্ম মুহূর্তে সে নির্বাক ছিল। ছবির পর ছবি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেত, কিন্তু ওরা কথা বলত না। কথা না বললেও বিভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে নির্বাক ছবি সবাক হয়ে ধরা দিত দর্শকের মনে।
তারপর ছবিতে ধ্বনি এলো, শব্দ এলো, সংলাপ এলো। ছায়াছবিতে সংলাপের সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প তার বনেদি অভিব্যক্তিগুলোকে হারিয়ে ফেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংলাপ নির্ভর হয়ে পড়ল।
সিনেমার এই সংলাপ নির্ভরতার ফলে চলচ্চিত্র শিল্পে যে সমস্যাটা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিলো সেটা হচ্ছে—ভাষার সমস্যা। নির্বাক যুগের ছবিগুলো যেকোনো দেশের দর্শকের পক্ষে বুঝতে কষ্ট হতো না। কিন্তু এক ভাষার ছবি অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলের জনসাধারণের পক্ষে বোঝা একেবারে অসম্ভব না হলেও দুরুহ হয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ভাষার ছায়াছবির বাজারও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লো।
পাকিস্তানের বাংলা ছবির বাজার পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তানের বাইরে করাচি শহরে কি লাহোরে দু-একটা বাংলা ছবি মুক্তি পেলেও অর্থ লাভের দিক থেকে এটা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
বাংলা ছবি তৈরির প্রধান যে সমস্যা সেটা হলো এই বাজার সমস্যা। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে যদিও পূর্ব-পাকিস্তান বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসার উন্নতি এবং পরিপুষ্টির জন্য আশাতীতভাবে বড়, তবুও অশিক্ষা ধর্মীয় কুসংস্কার প্রসূত সিনেমা বিমুখতা, সিনেমা হলের স্বল্পতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অনগ্রসরতার ফলে পূর্ব-পাকিস্তান বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের আত্মনির্ভরতার পক্ষে অভাবিতভাবে ছোট জায়গা। কথাটার বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
পূর্ব-পাকিস্তানে মোট ১১৭টা সিনেমা হল আছে। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক সিনেমা হল হচ্ছে মৌসুমী সিনেমা হল। মানে, বর্ষার সময় বন্ধ থাকে, গ্রীষ্ম আর শীতে খোলে। সেই তুলনায় পশ্চিম-পাকিস্তানের জনসংখ্যা যদিও কম তবুও সেখানে ৩৩৫টা সিনেমা হল আছে।
ধর্মীয় সংস্কারের ফলে পূর্ব-বাংলার জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ সিনেমা দেখার প্রতি বিমুখ। তারা সিনেমা দেখেন না এবং অন্যদেরও দেখতে নিষেধ করেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার অনগ্রসরতার ফলেও বহু দর্শক সিনেমা দেখা থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে কোন গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা কোন মফস্বলের ছবিঘরে এসে ছবি দেখার ইচ্ছা পোষণ করলেও যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্গমতার কথা ভেবে ইচ্ছে দমন করে থাকেন।
তাই বলছিলাম সিনেমা হলের স্বল্পতা, জনসংখ্যার এক বিরাট অংশের সিনেমা বিমুখতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অব্যবস্থা আমাদের বাংলা ছবির বাজারকে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং সংকুচিত করে রেখেছে—যার ফলে আজ একটা বাংলা ছবি তৈরি করতে গিয়ে একজন প্রযোজককে যে পুঁজি খাটাতে হয় লাভ তো দূরের কথা সেই পুঁজি ফিরে পাওয়াই তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তাই পূর্ব পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত যে কয়টি বাংলা ছবি তৈরি হয়েছে তার দু একটি ছাড়া সব কয়টির প্রযোজকই সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
অনেকে বলে থাকেন আমাদের তৈরি বাংলা ছবিগুলো ভালো হয় না বলেই বাজার পায় না। টাকা পাই না ওটা একটা বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের তৈরি বাংলা ছবিগুলি আর যা হোক, যে কোন উর্দু ছবির চেয়ে মোটেও খারাপ নয়। অথচ উর্দু ছবিগুলো বেশ চলে সে তুলনায় বাংলা ছবিগুলো চলে না কেন? অনেকে আমাদের বাংলা ছবিগুলোকে ভারতীয় বাংলা ছবিগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে আমাদের ছবিগুলোকে একেবারে নস্যাৎ করে দেন। আমার মনে হয়, আমাদের এই অহেতুক ভারতীয় ছবি প্রীতিও আজকে এ দেশে বাংলা ছবি তৈরির পথে এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সমস্ত সমালোচকরা জানেন না যে, ‘অপুর সংসার’, ‘জলসাঘর’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কাবলিওয়ালা’ এবং ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর মত ভারতীয় ভালো ভালো বাংলা ছবিগুলো ব্যবসার ক্ষেত্রে এদেশে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। অবশ্য ওই ছবিগুলোর সঙ্গে যদি পাকিস্তানি লেভেল আটা থাকতো—তাহলে ছবিগুলো যে একেবারেই চলতো না তাতে কোন সন্দেহ নেই।
অপরপক্ষে যে সমস্ত ভারতীয় বাংলা ছবি এদেশে ভালো ব্যবসা করেছে, সেগুলির সঙ্গে তুলনা করতে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাবে আমাদের ছবিগুলি খুব যে নিকৃষ্ট তা নয়। কোন কোন ছবি উৎকৃষ্টও বটে।
অনেকে বলে থাকেন যে ভারতীয় বাংলা ছবিগুলি ভালো ব্যবসা করে কিন্তু আমাদের বাংলা ছবিগুলো ব্যবসা করে না কেন? এর কারণগুলো অত্যন্ত সহজ এবং সাধারণ।
প্রথমত: আমাদের বিদেশি দ্রব্যের প্রতি মজ্জাগত আকর্ষণ।
দ্বিতীয়ত: দেশি দ্রব্যের প্রতি একটা বিশেষ শ্রেণীর লোকের অর্থহীন উন্নাসিকতা।
তৃতীয়ত: ভারতীয় ছবিগুলি ৩০-৪০ হাজার টাকায় আমদানি করা। এগুলো যদি এক লক্ষ টাকার ব্যবসা করে তাহলে প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা মুনাফা হয়ে যায়। অপর পক্ষে আমাদের ছবিগুলো তৈরি করতে প্রায় শোয়া থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। সেক্ষেত্রে ভারতীয় ছবির সমান ব্যবসা করলেও স্বভাবতই সেগুলো লোকসান দিয়ে থাকে। বাংলা ছবি তৈরির আরেকটা সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে উর্দু ছবির জনপ্রিয়তা।
বাংলাদেশে বাঙালির তৈরি উর্দু ছবি রজতজয়ন্তী পালন করেছে, অথচ সেই একই পরিচালকের তৈরি বাংলা ছবিটা ছয় সপ্তাহের বেশি চললো না। এতে আক্ষেপ করে দুঃখ বাড়িয়ে লাভ নেই।
বাংলাদেশে উর্দু ছবির জনপ্রিয়তা অসম্ভব রকম বেড়ে গেছে—উর্দু ছবির আমদানিও তাই বেড়েছে অনেক। উর্দু ছবির এই জনপ্রিয়তার ফলে বাংলা ছবি কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন এমন হলো কারণগুলো একটু তলিয়ে দেখা দরকার।
উর্দু ছবিগুলো নাচে গানে এবং হৈহুল্লোড়ে ভরা থাকে। উর্দু ছবিগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তান সেন্সর বোর্ডের কৃপায় অসংখ্য অশ্লীল দৃশ্য ভরা থাকে। উর্দু ছবিগুলোতে অবাস্তব নাটকীয় সংঘাত এবং অহেতুক মারামারি ও হানাহানির ছড়াছড়ি থাকে। বাংলা ছবিতে সাধারণত এসব থাকে না। কারণ বাঙালির মেয়েকে যখন তখন যেখানে সেখানে নাচানো যায় না। বাঙালির ছেলেকে দিয়ে অকারণে একটা মারপিট বাধিয়ে দেয়া যায় না। বাঙালি ছেলে মেয়েদের বাংলা ভাষায় বেলেল্লপনা বাংলাদেশের সেন্সর কর্তৃপক্ষ সহ্য করতে পারে না।
অথচ আমাদের দর্শকদের একটা বিরাট অংশ তাই চান। এরা সিনেমা হলে বসে একই ছবিতে একই সঙ্গে উত্তেজিত হতে চান, রোমাঞ্চিত হতে চান, উৎফুল্ল হতে চান, কান্নায় বুক ভাসাতে চান, হাসিতে পেট ফাটাতে চান— একই সঙ্গে সকল ইন্দ্রীয় সুখ উপভোগ করতে চান। যে রস বাস্তবে উপভোগ সম্ভবপর নয়, সিনেমা হলে দুই ঘণ্টা বসে সেই রস প্রাণভরে আকণ্ঠ পান করতে চান।
অত রস বাংলা ছবিতে পরিবেশন করা সম্ভবপর নয়। অত ইন্দ্রিয় সুখের মোহিনী বটিকা বাংলা ছবির পরিচালকদের জানা থাকলেও পরিবেশন করতে গিয়ে আত্মসম্মানে বাধে।
তবুও দু’একজন পরিচালক বাংলা ছবিতে উর্দুর পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন। আমার মতে বাংলা ভাষায় উর্দু ছবি তৈরি করার চেয়ে বাংলা ছবি না করাই ভালো। তবে যারা এ ধরনের বাংলা ছবি তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন তারাও বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কারণ আমরা বাঙালিরা পরের মেয়ের ন্যাংটা নাচ বসিয়ে বসিয়ে উপভোগ করি সত্য, কিন্তু নিজের মেয়ের একটা বাঁকা কটাক্ষে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যাই। উর্দু ছবির নোংরামিগুলো উপভোগ করি আর বাংলা ছবিতে তেমন কিছু দেখলেই রেগে গিয়ে হলের চেয়ার টেবিল ভাঙি।
বাংলা ছবির প্রযোজক-পরিচালকের উভয় সংকট। এদিকে যাও মার খাবে, ওদিকে যাও মার খাবে।
উর্দু ছবি বাঙালি অবাঙালি সব শ্রেণির দর্শকরাই দেখে থাকেন। সেজন্য এর দর্শক সংখ্যা বেশি। তাই উর্দু ছবির আমদানি ও বাংলা ছবির চেয়ে বেশি।
উর্দু ছবির বাজার বাংলা ছবির প্রায় চারগুণ। তাই একজন উর্দু ছবি প্রযোজক ইচ্ছা করলে অনেক বেশি অর্থ খাটিয়ে ছবির ভিতরে অনেক চমৎপ্রদ দৃশ্যের সংযোজন করতে পারেন—যেগুলোতে আমাদের দর্শক আকৃষ্ট হয়ে থাকেন। তুলনামূলকভাবে বাংলা ছবিতে অত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না তাই অত চমকের আয়োজনও চলে না।
উর্দু ছবির জনপ্রিয়তার জন্য আমাদের প্রদর্শক ও পরিবেশকরাও দায়ী। উর্দু ছবিগুলিকে তুলনামূলক কম পয়সায় আমদানি করা যেত বলে আমাদের পরিবেশকরা দেশ বিভাগের পর অতিরিক্ত উর্দু ছবি আমদানি করে দেশটাকে ভরে দেন। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে কোন ছবি তৈরি হত না। পরবর্তীকালে ভারতীয় ছবি আমদানির উপর বিধি নিষেধ আরোপ করা হলে আমাদের পরিবেশকদের বদৌলতে লাহোর এবং করাচির উর্দু ছবিগুলো এসে ভারতীয় উর্দু ছবির স্থান দখল করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প তখন শৈশবে। এই শিশুর পক্ষে উর্দু ছবির দানবের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা দুরোহ হয়ে পড়ে। পরিবেশক-প্রদর্শকদের এই উর্দু ছবি প্রীতির আরো কতগুলো কারণ আছে।

একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখা যাবে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবেশক ও প্রদর্শকের অধিকাংশই অবাঙালি। বাকি যারা আছে তাদের মধ্যে অনেকেই উর্দু ভাষাভাষী বাঙালি। মানে, ঘরে বাইরে সব জায়গায় উর্দুতে কথা বলেন, আছেন বাংলাদেশে সে হিসেবে বাঙালি। এইসব অবাঙালি আধাবাঙালি এবং সময় বাঙালি সময় ও অবাঙালি দল যে উর্দু ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করবেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কিন্তু আশ্চর্য তখনই হতে হয় যখন দেখি ঈদ উৎসবের সময় বাংলাদেশে এরা বাংলা ছবি রিলিজ করতে চায় না। যখন এরা বলেন যে বাংলাদেশের দর্শকরা ঈদের সময় বাংলা ছবি দেখতে চায় না, আমরা প্রযোজক-পরিচালকরা পরিবেশক ও প্রদর্শকশ নামক এইসব শেঠজীদের হাতে বলির পাঁঠার মত কাঁপা উত্তর দেবে যে সাহস কোথায়।
বাংলা ছবি তৈরির আরেকটা সমস্যা হচ্ছে বাঙালি সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা। এ সমস্যাটাকে দুটো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমটা হচ্ছে ছবির পুঁজি বিনিয়োগের দিক থেকে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে দর্শকের দিক থেকে।
পূর্ব বাংলায় বাঙালি পুঁজিপতির চেয়ে অবাঙালি পুঁজিপতির সংখ্যা অনেক বেশি। হাতেগোনা যে ক’জন বাঙালি পুঁজিপতি আছেন তাদের অবস্থাও খুব সুখপ্রদ নয় হেতু তারা চলচ্চিত্রে অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহী নন। অবাঙ্গালী পুঁজিপতিরা উর্দু ছবিতে টাকা খাটাবেন এটা খুবই সোজা কথা।
বাংলা ছবিতে অর্থ খাটাবার জন্য তাই যারা অতীতে এগিয়ে এসেছিলেন তারা হচ্ছেন ছোটখাটো বাঙালি ব্যবসায়ীর দল। তাদের পুঁজি এত কম যে, একটা ছবি যদি ব্যবসায়ে সফল না হয় তাহলে তাদের কোম্পানি নিলামে ওঠে। তাই হয়েছে। উর্দু ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পরাজিত বাঙালি প্রযোজকদের অনেকেই অফিসে তালা দিয়ে রাস্তায় নেমেছেন।
বাংলা ছবির দর্শকদের প্রধান অংশ হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এরা সাধারণত স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ছবি দেখতে আসেন। এদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা সর্বজনবিদিত। মাসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা ছবি দেখতে গেলেই ওদের রেশনের টাকায় টান পড়ে। এই দরিদ্র দর্শকদের দর্শনীর উপর নির্ভর করে বাংলা ছবির বেঁচে থাকাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য সংগ্রাম।
তারপর ‘মরার উপর খারার ঘা’ হিসেবে এসেছে বর্তমান প্রমদকর। এ বছর প্রমোদকরের বৃদ্ধি সরাসরিভাবে বাংলা ছবিকে আঘাত করেছে। কারণ, উর্দু ছবির বাজার হচ্ছে সারা পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান হচ্ছে অর্থ আমদানির দিক থেকে চার ভাগের তিন ভাগ বাজার।
পশ্চিম পাকিস্তানে প্রমোদকরের হার হচ্ছে শতকরা ৫০ ভাগ আর পূর্ব পাকিস্তানে হচ্ছে শতকরা ৭৫ এবং ১০০ ভাগ। উর্দু ছবিগুলো তাদের বৃহত্তর বাজার পশ্চিম পাকিস্তানে শতকরা ৫০ ভাগ প্রমোদকরের মোকাবেলা করছে আর বাংলা ছবিগুলো তাদের এক এবং একমাত্র বাজার পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ৭৫ এবং ১০০ভাগ প্রমদকরের বোঝা মাথায় তুলে নিচ্ছে।
অত বোঝা বইবার ক্ষমতা ক্ষুদ্র এবং দরিদ্র বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের দেহে নেই। তাই বাংলা ছবি তৈরির সমস্যা আজ এত প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই বাংলাদেশে আজ বাংলা ছবি তৈর প্রায় একরকম বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে বাংলা ছবি তৈরি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে এর প্রতিক্রিয়া কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ রূপ নেবে। আজকের দিনে জাতীয় চিন্তা ধারা ও সামাজিক ভাঙা গড়ার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের প্রভাবকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।
বাংলা ছবি বন্ধ হয়ে গিয়ে কুরুচিপূর্ণ উর্দু ছবিগুলোতে যদি দেশ ভরে যায় তাহলে বাঙালি সমাজ ধীরে ধীরে তার সাংস্কৃতিকে, তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভুলে যাবে এবং উর্দু বাংলার মিশ্রণে তৈরি এক খিচুড়ি সংস্কৃতির জন্ম দেবে।
তাই পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত আছেন তাদের সকলকে আজ সজাগ হতে হবে। আজকের এই সংকট মুহূর্তে আমরা যদি কিছু না করি তাহলে আমরা বাংলাদেশ, বাঙালির সংস্কৃতি এবং বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের চরম অবজ্ঞার পরিচয় দেবো। চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক, প্রদর্শক, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকৌশলী সকলেই আজ এই সংকট মুক্তির সমাধানে সহযোগিতা করতে হবে। সমাধান যে নেই তা নয়। নিশ্চয়ই আছে।
প্রথমত: চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যাঁরা জড়িত আছেন তাঁদের সকলকেই উর্দু ছবিতে তাঁরা যে অর্থ নিয়ে থাকেন, বাংলা ছবিতে তাঁর চার ভাগের এক ভাগ নিতে হবে। বৃহত্তম স্বার্থের প্রয়োজনে ক্ষুদ্র স্বার্থকে বলি দিতে হবে বইকি।
দ্বিতীয়ত: পরিবেশন এবং প্রদর্শকদের উর্দু ছবি প্রীতির মনোভাবের সঙ্গে বাংলা ছবির প্রতি আরো উদার মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে। সিনেমা শিল্প থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা অর্জন করেছেন তাঁরা এবার কিছু বর্জনের উদারতা দেখালে আমরা খুশি হবো।
তৃতীয়ত: আমাদের পত্রপত্রিকাগুলোকে বাংলা ছবি দেখার জন্য আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। বাংলা ছবির প্রচারে প্রাধান্য দিতে হবে এবং বাংলা ছবির বিজ্ঞাপনের হার আরো কমিয়ে দিতে হবে।

চতুর্থত: চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, যার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্র শিল্পকে গড়ে তোলার জন্য সেই প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলা ছবির প্রযোজকদের প্রতি আরো সক্রিয় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে প্রয়োজনবোধে উর্দু ছবির ক্ষেত্রে শুটিং এডিটিং প্রসেসিং রেকর্ডিং প্রভৃতির রেট বর্তমানে চেয়ে আরও এক চতুর্থাংশ বাড়িয়ে দিয়ে বাংলা ছবির ক্ষেত্রে সেই রেট বর্তমানের চেয়ে কমিয়ে অর্ধেক করে দিতে হবে।
অতীতে যে সমস্ত প্রযোজক বাংলা ছবি তৈরি করে মার খেয়েছেন এবং যাদের অনেকের চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে এখনো দেনা আছে সেই দেনাগুলো মওকুফ করে দিতে হবে।
পঞ্চমত: সরকারকে তার দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে চলবে না। গত ১৮ বছর সিনেমা শিল্প থেকে প্রমদকরের মাধ্যমে সরকার কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন। সরকারকে বাংলা ছবিগুলোতে অর্জিত প্রমোদকর বাংলা ছবির প্রযোজকদের হাতে সরাসরিভাবে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর মেয়াদ ১০ বছর হতে হবে। এর ফলে সরকারের রাজস্বের ক্ষেত্রে যে একটা বিরাট উত্থান-পতন ঘটে যাবে তা নয়। বরঞ্চ একটা জাতী তার সাংস্কৃতিক অপমৃত্যুর হাত থেকেই রেহাই পাবে।
সরকারকে প্রদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। কাগজি পরিকল্পনায় চলবে না, পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবায়িত করার যোগ্যতা প্রদর্শন করতে হবে।
সরকারকে চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রতিযোগিতামূলকভাবে বাংলা ছবির উৎসবের আয়োজন করতে হবে এবং ছবির শ্রেষ্ঠ প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকৌশলীদের অর্থ পুরস্কারের বন্দোবস্ত করতে হবে। এর ফলে প্রযোজকরা যে শুধু বাংলা ছবি তৈরির ব্যাপারে উৎসাহিত হবে তা নয়, ভালো বাংলা ছবি তৈরি করার দিকেও নজর রাখতে চেষ্টা করবে।
সরকার কোন কোন শিল্পকে একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য আয়কর মুক্ত বলে ঘোষণা করেছেন। বাংলা ছবির প্রযোজক ও কলাকৌশলীদের একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য আয়করের হাত থেকে রেহাই দিতে হবে।
আমার মনে হয়, উপরোক্ত সমাধানগুলোই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে তার বর্তমান সংকট মুক্তির ব্যাপারে সাহায্য করবে।
তাই আজ প্রতিটি চলচ্চিত্রকর্মী, দর্শক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ এবং সরকার সকলকেই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে হবে। ভাষাকে বাঁচানোর জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। বাংলা চলচ্চিত্রকে বাঁচানোর জন্য যদি প্রয়োজন হয় আমরা রক্ত দিতে কুন্ঠিত হবো না।
[প্রথম পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে আয়োজিত ‘বাংলা ছবি তৈরীর সমস্যা’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক সেমিনারের পঠিত প্রবন্ধ]
উৎস: দৈনিক সংবাদ। ঢাকা: ১৯শে আগস্ট ১৯৬৫ / ২রা ভাদ্র ১৩৭২। বৃহস্পতিবার। পৃষ্ঠা: ৩ ও ৪। সম্পাদক: জহুর হোসেন চৌধুরী।
.png)

কালজয়ী কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের জীবদ্দশার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি তাঁর সন্তানদের মানসপটে নেই। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর কারণে তাঁদের কারও স্মৃতিতেই বাবার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে বাবার রক্ত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে পথ চলছেন তাঁর সন্তানেরা।
১ সেকেন্ড আগে
জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২) যখন ব্রিটিশ ভারতের ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেন, তখন বিশ্বজুড়ে ঘটনার ঘনঘটা। মাথার ওপর শোষকের খাঁড়া ঝুলছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-অত্যাচার, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ত্রিশের অর্থনৈতিক মন্দার পশ্চিমা ঢেউ, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার, সাম্প্রদায়িক ব