মৃদুল মাহবুব

(লেখাটির প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে)
বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পরবর্তী সময়ে আধুনিক বাংলা কবিতায় ত্রিশের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আমার মনে হয়, ভাব ও চিন্তাগত জায়গা থেকে ত্রিশের কবিদের গুরু মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ত্রিশের দশক শেষ হলেও ১০০ বছর পর ত্রিশের সেই ধারাবাহিকতা শেষ হয়নি। মধুসূদন রেভ্যুলেশনারি। কেমন তাঁর এই বিপ্লব?
উপমহাদেশে এনলাইটেনমেন্টের শুরু মাইকেল মধুসূদনের দত্ত দিয়ে। ১৮৬১ সালে মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশের ভেতর দিয়ে উপমহাদেশের চিন্তার রাজ্যে কাগজে কলমে এনলাইটেনমেন্টের শুভ সূচনা। জয় রাবণ! জয় আলোকবর্তিকা!
অনেকে বলতে পারেন রাবণের পূজা বহু আগে থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হতো, মেঘনাদবধ কাব্য লেখা হওয়ার আগে থেকেই। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস রামকে হিরো দেখার ভেতর দিয়ে। রামায়ণের নানা মিথ সমগ্র ভারতের নীতি ও বিশ্বাসকে তৈরি করেছে। ইউরোপীয় আলোর বাতি উপমহাদেশের চলমান বিশ্বাসকে কুসংস্কার হিসাবে দেখেছে। রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে ফোর্ট উইলিয়ামের বুদ্ধিতাত্ত্বিকরা পশ্চিমা কলোনিকে জোরালো করেছে নানাভাবে। চিন্তারাজ্যে কলোনির ফর্ম তৈরিতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কলোনিয়ান আলোকময়তা ভালো কি মন্দ, তা তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। এটা আমাদের বাস্তবতা। এখন এই কলোনির রোগ সারিয়ে প্রি-কলোনিয়াল অবস্থায় আমরা যেতে চাইলে নতুন রোগ দেখা দেবে।
যিশুখ্রিষ্টকে নিয়ে একটা মেটাফরিক ডার্টি জোকস আছে স্লাভো জিজেকের। সেখানের সারমর্ম, কেউ যদি তাঁর অসুস্থতাই উপভোগ করে তবে সমস্যা কী! একইভাবে কলোনিয়াল দেশগুলো প্রি-কলোনিয়াল অবস্থায় ফিরতে গেলে দুঃস্বপ্নের মতোই অবস্থা হবে। ভারত কলোনিয়াল প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘদিনের রূপান্তরকে বাদ দিয়ে রামরাজত্বে ফিরতে চাইলে তা হবে না।
ফলে কবিতায় আধুনিক কবিতাকে কলোনিয়াল বলে খারিজ করে দিলে হয় না। এটা বাস্তবতা। কিন্তু এর একটা অন্য বিচার করা যেতে পারে।
কিন্তু ইউরোপীয় রেনেসাঁর মডেল তাদের নিজেদের প্রয়োজনে গ্রহণ ও বর্জনের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে হয়েছে অনুকরণের আলোকে, শাসন পরিচালনার স্বার্থে। অনেকে ভেবে থাকেন, ফোর্ট উইলিয়ামবাসী চিন্তকদের সমাজ, ধর্ম ও প্রযুক্তি সংস্কার আমাদের সমাজের জন্য হিতকর। হ্যাঁ, সংস্কারটা ভেতর থেকে হওয়া দরকার ছিলে। মানে, ভারতের রেনেসাঁ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও সামাজিক সম্মতির ভেতর দিয়ে হওয়া দরকার ছিলে। ইউরোপিয়ান অনুকরণের ফলাফল হলো উপমহাদেশে দুটো দেশ আছে যাদের পারমাণবিক অস্ত্র আছে যদিও বহু লোকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও রাজনৈতিক অধিকার নাই। এগুলো আলোর নিচের বড় বড় অন্ধকার ও গহ্বর।
মধুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্য না লিখলে তাঁকে বাংলা সাহিত্য মনে রাখত কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বাংলা ভাষার বহু লেখক সমাধিতে শুয়ে আছে ভাষার এপিটাফ নিয়ে। কোনো মোমবাতি প্রজ্জ্বলন হয় না, তাঁরা শুধু ভাষার কৌশল দেখিয়েছেন এই কারণে। মেঘনাদবধ কাব্য খুব সিগনিফিকেন্ট হয়ে উঠেছে তার ভাষার জন্য না। আবহমান চিন্তার সঙ্গে বড় একটা ছেদ তিনি তৈরি করেছেন তাঁর এই কাব্যে, সেই জন্য।
মেঘনাদবধ মাইকেলের কলোনিয়াল মাইন্ডসেটের চূড়ান্ত প্রকাশ। কাব্যচিন্তায় তারই ধারাবাহিকতা ত্রিশের কবিরা।
এই কলোনিয়াল মাইন্ডসেট থেকে প্রগতিশীল সাহিত্য বের হতে পারেনি আজও। আমাদের সাহিত্য আলোয় আলোয় আলোয় ভরা। ফলে, সাহিত্যকে চিন্তার জায়গা থেকে না দেখে মুখস্থ তোতাপাখির মতো আমরা বলতে চাইব, ভাষাই সাহিত্য। ভাষার পৃথকত্ব মানেই সাহিত্যের নতুনত্ব, এগুলো খুব অকেজো সাহিত্য আলোচনা। এর নাম দিলাম ‘ল্যাংগুয়েজ ফেটিসিজম’। এর থেকে লেখক সমাজকে বের হতে হবে। তা না হলো সাহিত্য ভাষা, ভাষা, ভাসা ভাসা থেকে যাবে।
মাইকেলের হাত ধরে যে কলোনির আমদনি, তার প্রচ্ছন্ন একটা গীতল এক্সটেনশন আমাদের ত্রিশের কবিতা। সুধীন, বুদ্ধদেব বা বিষ্ণু দে’র কবিতায় আপনি ল্যান্ড খুঁজে পাবেন না।
জীবনানন্দের কবিতায় যা পাবেন তা রাজনৈতিক কোনো সমাজ না। মানব অস্তিত্বের নিগুঢ় একটা জায়গা, হতাশা, অন্ধকারময়, বাঁচার জন্য বাঁচার মতো ব্যাপার। এছাড়া জীবনানন্দের কবিতায় বৃহৎ কোনো চিন্তার দেখা আপনি পাবেন না। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, নজরুল বা আরও এমন অনেকে যখন একটা দেশের কল্পনা সাজ্জাচ্ছে যেখানে আপনি ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডবদের লেখার তেমন কিছু পাবেন না। মনে হবে তাঁরা দেশে থেকেও দেশে নাই। তাঁদের কাছে সাহিত্য সাধনা মানে নন্দনের সাধ। এমনকি বুদ্ধদেব মুসলমানদের সাহিত্যকে বেশ তাচ্ছিল্যভরেই দেখতেন। ঢাকার সাহিত্যকে তারা একটা কলোনিয়াল মন দিয়েই দেখতেন, যতই আল মাহমুদ বা শামসুর রাহমানকে স্পেস দিন না কেন।
সমগ্র বাংলা কবিতায় এখন পর্যন্ত ত্রিশের কবিতার নামে শিল্প সাধনার একটা চল আছে। এই কবিতা চলের বিরুদ্ধে রাহমান দাঁড়াতে পেরেছিলেন। তিনি কবিতাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন তা ত্রিশ পরবর্তী বেশিরভাগ কবি পারেননি। রাহমানের কবিতা খুব বেশি নান্দনিক না, পেলব না, ভাষার সৌন্দর্যে মুখরিত না, অব্যক্ত নয়, বহির্মুখী, বিরাট একটা জনগোষ্ঠীর কথা বলতে চায়। এটা বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি ত্রিশের কবিতা চিন্তার বিপরীত। যে চিন্তা বাংলা কবিতাকে বছরের পর বছর শাসন করছে সেখানে এত বড় একটা ছেদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিচ্ছেদ তৈরি করতে পারা বিশাল বড় ঘটনা। সাহিত্যে এগুলো হরহামেশা ঘটে না। কালেভদ্রে ঘটে। বাংলাদেশে রাহমানই প্রথম কবি যিনি একটা জাতির সামগ্রিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে সচেষ্ট থেকেছেন। বাংলাদেশ জন্মের আগে-পরে উল্লেখযোগ্য যে ঘটনাই ঘটুক না কেন, আপনি রাহমানকে পাবেন। এমন কবি বাংলাদেশে কয়জন ছিল বা এখন আর আছে? শামসুর রাহমানের এই কাব্য-রাজনীতিটা আমাদের ধরতে পারা লাগে। মানুষের একটা স্টেপও রাজনীতির বাইরে নয়। ফলে, ত্রিশের অরাজনৈতিক চিন্তার ফলাফল হিসাবে কবিতাকে আমরাসোশিও-পলিটিক্যাল জায়গা থেকে দেখতে পারি না। যা অতীব জরুরি বিষয়, এ না হলে কবিতার কাজটা কী!
যে কথাটা বারবার বলতে চাচ্ছি তা হলো, রাহমান ৪৭-এর দেশভাগের পর যে বাংলাদেশ আমাদের দরকার ছিলো, তার জন্য যে যৌথ স্মৃতি আমাদের দরকার ছিল, তা তিনি কবি হিসেবে খুব সফলভাবেই তৈরি করতে পেরেছিলেন।
বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল পুস্তের ১২ লাখ ওয়ার্ডের ৭ খণ্ডের ৩০০০ পৃষ্ঠার একটা ঢাউস সাইজের উপন্যাস আছে… In Search of Lost Time. মার্সেল ১৯১৩ থেকে ১৯২৭ সাল এই ১৪ বছরে এটা প্রকাশিত হয়। ১৯২২-এ পুস্ত মারা যান। অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় পুরো বই একসঙ্গে প্রিন্টেড অবস্থায় তিনি দেখে যেতে পারেননি। এটাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসাবে ধরা হয় এবং এ জন্যই খুব কম লোকেই এটা পড়েছে। খুব নান্দনিক কিছু না, খুব পরিপাটিভাবে আধুনিক সাহিত্য যেভাবে লেখা হয় এটা তাও না। তেমন কোনো প্লট নাই। দর্শন, মনোবিজ্ঞান, স্মৃতি, সময়, প্রেম ও সমাজ নিয়ে নানা অবজার্ভেশনে ঠাসা। এই উপন্যাসের সেন্ট্রাল থিম স্মৃতি, সময় ও শিল্প এগুলো কীভাবে আমাদের জীবনের মর্ম তৈরি করে। একজন আর্টিস্ট আসলে কী করে থাকেন তারও একটা হিসাব যায় In Search of Lost Time-এ।
পুস্তের মতে শিল্পের কাজ শুধু নন্দন ও আনন্দ তৈরি করা না। এটা জীবনের অর্থ উন্মোচন করার একটা উপায়। শিল্প-সাহিত্য-কবিতা কী করে? এটা আমাদের অভিজ্ঞতা, আবেগ আর সময়ের যাত্রাটকে লিপিবদ্ধ করে বা ছবি এঁকে রাখে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা উপেক্ষা করে যাই, বাস্তবতায় যা দেখা যায় না তাতে প্রবেশ করতে পারে আর্ট। একজন শিল্পী মূলত বন্তু ও প্রাণের মর্মের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, গায়কেরা মূলত এই নশ্বর জীবনের যে ভঙ্গুর দশা, তাকে অমর হিসাবে প্রাণ-ই দিতে পারে। এই অমর দশাই যুগের পর যুগ পরিচালিত হতে থাকে। ইমমর্টালিটি আর ‘fragility of human life’-এর যে বৈপরীত্য তার সংযোগস্থল হলো আর্ট। মানুষ মানুষের স্মৃতি দিয়েই অতীতের আবেগকে উপলব্ধি করতে সক্ষম। মানুষের ভেতর হারিয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি থাকে যা আর্ট পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারে। আর আর্টের সব থেকে বড় শক্তি হলো তা ‘সাবজেক্টিভিটি’। ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, তার অতীত অভিজ্ঞতা ও তার ভেতরে লুকানো মেমোরির আলোকে তার আবেগ জাগ্রত হয়। একটা নতুন মানে খুঁজে পায়। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির অনুভূতির ভিন্নতার পরও একটা কমন জায়গা সে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভেতর তৈরি করে। এর এটাই আমাদের যৌথ চেতনা।
কবি শামসুর রাহমান একটা দেশের জন্য যৌথ চেতনা তৈরি করেছেন বছরের পর বছর ধরে। ফলে তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে বাংলাদেশের এমন সব স্মৃতি আমাদের মনে পড়ে যাবে যাকে দিয়ে এই দেশের মাটিতে আপনি নোঙর ফেলতে পারবেন। একটা কানেকটিভিটি তৈরি হবে, এটাই কালেকটিভ কন্সাস। একজন কবি তাঁর দীর্ঘ জীবনের কবিতা সাধনায় এই কাজটাই করতে চান। অনেক কবি এটা ধরতে পারেন না। পুস্ত যেমন তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে অস্তিত্বের মর্ম খুঁজেছেন, রাহমানও তাই তৈরি করছেন। বেশিরভাগই কবি হওয়ার একটা মোহের পেছনে ছুটতে থাকেন। কিন্তু একজন কবি বা লেখককে বা শিল্পীকে কোন জার্নির ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে, আজীবন কবিতা লেখার পর এপিটাফ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না… সাধারণ মানুষ থেকে একটু বেশি দেখার সুযোগ পাবেন। আর্ট একটা টাইমলেস ব্যাপার। কিন্তু ভেতর দিয়ে অতীত নিয়ে আপনি বর্তমানে প্রবেশ করতে পারবেন। রাহমান যে বাংলাদেশের ছবিটা তাঁর কবিতায় লিখেছেন যা পড়লে আমরা জ্যান্ত ইতিহাসকে নিয়ে বর্তমানে প্রবেশ করতে পারব, যা আমাদের ভবিষ্যত নির্মাণে প্রণোদনা দেবে।
স্মৃতি বিষয়ক আলোচনা দস্তয়েভস্কির দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ-এর একটা বিষয় টেনে শেষ করতে চাই। যারা দস্তয়েভস্কির এই এপিক উপন্যাসটা পড়েছেন, তাঁরা জানেন জমিদার ফিওদর পাবলোভিচের তিনপুত্র দ্রিমিত্রি, ইভান ও আলিওশা। প্রত্যেকের শৈশবস্মৃতিতে তারা প্রত্যেকেই খুব নেগলেকটেড, ট্রমাটাইজড ও ইমোশনালি ডিসটেন্সড। এর কারণ তাদের বাবা পাবলোভিচের স্বার্থপরতা ও দায়িত্বহীনতা। এই উপন্যাসে দস্তয়েভস্কি একটা সেন্ট্রাল ধারণা বা সংকেত দিতে চেয়েছেন, ‘মানুষের শৈশবস্মৃতি একটা মানুষকে আজীবন তাড়া করে। পরবর্তী জীবনে আমরা কতটা সুখী হবো তা নির্ভর করে আমাদের শৈশবস্মৃতির উপরে।’ প্রথম ছেলে দ্রিমিত্রি তাঁর বাবার প্রথম স্ত্রীর সন্তান। তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন এবং পাবলোভিচের নির্যাতনের কারণে তিনি তাকে ছেড়ে চলে যানে এবং দ্রিমিত্রি যখন খুব ছোট তখন তার মৃত্যু হয়। তার মায়ের মৃত্যুর পর দ্রিমিত্রিকে তার বাবা ত্যাগ করেন। সে তার আত্মীয়দের কাছে বড় হতে থাকে যেখানে ইমোশনাল সাপোর্ট বলে কিছু সে পায়নি। ফলে, প্যাশনেট, ইমপালসিভ, রেকলেস, কেয়ারলেস চরিত্র হিসাবে সে বেড়ে ওঠে। এর পরের সন্তানের নাম ইভান। সে পাবলোভিচের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরের প্রথম সন্তান। তার মা সোফিয়া খুবই ভদ্র ও নিবেদিতপ্রাণ মহিলা হলেও তার আবেগ ভঙ্গুর ছিলো। তার আরও একটি সন্তানের জন্ম হয় যার নাম আলিওশা।
ইভান ও আলিওশা কম বয়সে তাদের মাকে হারায়। তাদের ভাগ্য প্রথম ভাইয়ের থেকে আলাদা কিছু না। ইভান আত্মীয়দের কাছে বড় হয়েছে। সে একা ও ইন্টেলেকচুয়াল। পরিবারের কারো সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তার ভেতর আবেগ থেকে বুদ্ধি বেশি ছিল। কিন্তু শৈশবের একাকিত্বের স্মৃতির কারণে তার বুদ্ধিবৃত্তি পলায়নপর। আলিওশা এই তিন ভাইয়ের ভেতর সবচেয়ে ব্যতিক্রম। তার ভালোবাসা ও অপরকে ক্ষমা করার গুণ ছিলো। পরিবার ও দুনিয়ার সব মানুষকে সে ভালোবাসত। আধ্যাত্মিক শান্তিপূর্ণ জীবনের অনুসন্ধান সে করতে চায়। এর কারণ হলো তার মায়ের স্মৃতি। তার স্মৃতিতে তার মায়ের প্রার্থনা করার স্মৃতি আছে। ফলে, সে গ্রাউন্ডেড টু অ্যাফারমেটিভ লাইভ। স্পিরিচ্যুয়ালিটির দেখা মেলে।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শাসক ফিওদর পাভলোভিচ। তাঁরা আমাদের স্মৃতিকে যন্ত্রণায় আক্রান্ত করেছেন। দূরে সরিয়ে রেখেছেন স্বার্থপরতার কারণে। ফলে, এই সব জনকের স্বার্থপরতার, নীতিহীনতার কারণেই পুরো বাংলাদেশের মানুষের যৌথ স্মৃতির ভেতর পারস্পরিক অবিশ্বাস ঢুকে গিয়েছে। বারবার মার খেতে খেতে আমরা বাংলাদেশ নির্মাণের আস্থার জায়গাটা আমরা শেষ করে ফেলেছি বা হারিয়ে ফেলেছি। আলিওশা সামান্য মায়ের প্রার্থনার স্মৃতি জন্য পরবর্তী জীবনে ভালোবাসার কথা বলেছে। এই স্মৃতি খুব সামান্য কিন্তু খুব শক্তিশালী। শামসুর রাহমানের কবিতা মূলত এই আলিওশার মায়ের প্রার্থনার মতো একটা বিষয়। ২০২৪ সালের পর মুসলিম জাতিতত্ত্ব বা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাতিল হয়ে গেছে। এখন যে বাংলাদেশ নাগরিকত্বের রাজনীতিটা আমরা করতে চাই বাংলাদেশি মানুষের পক্ষে সেই সংগ্রামের ছোট ছোট সব স্মৃতি আপনি রাহমানের কবিতায় পাবেন। তাবৎ বাংলাদেশের একটা চিত্র ও সংগ্রামের উপাদান আপনি পাবেন তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতা থেকে বাংলাদেশ নাগরিকত্ব-বোধের স্মৃতি নিয়ে আমাদের আগাতে হবে।
শামসুর রহমান আমাদের বাংলাদেশ নাগরিকত্ব-বোধের স্মৃতি নির্মাণের কবি।
স্মৃতি বা মেমোরি নিয়ে কথা বললে চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরার কথা বলতে হয়। স্মৃতি আমাদের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। অন্য দিকে ‘ভুলে যাওয়া’ হলো ‘the political manipulation of history’। ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং'-এ কুন্ডেরা স্মৃতি আর বিস্মৃতি কীভাবে আমাদের ইতিহাস, রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করে তা তুলে ধরেছেন। নিপীড়ক শাসক বা ব্যক্তি আমাদের অতীত মুছে দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাঁরা নতুন একটা বয়ান হাজির করতে চায়। যুগোস্লাভিয়ার স্বৈরাচারী কম্যুনিস্ট সরকার কালেকটিভ কন্সাস থেকে বেদনাদায়ক সকল স্মৃতি মুছে দিতে চেয়েছিল।
বিগত ১৫ বছরের বাংলাদেশের দিকে তাকালে আপনি বুঝতে পারবেন, ক্ষমতা কীভাবে নিজের শাসন চালানোর জন্য একমুখী ইতিহাস রচনা করে। ইতিহাস ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের নানা যন্ত্র কাজ করেছে। কুন্ডেরা এটাও মনে করেন যে ভুলে যাওয়া সর্বদা খারাপ নয়। এটা একটা ডুয়াল ফোর্স। এটা যখন চাপানো হয় তখন তা ভয়ংকর, কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তি পর্যায়ে এটা একরকম স্বাধীনতাও বটে। অনেক খারাপ কিছু ভুলে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়। ভুলতে পারা হলো লাইটনেস, স্মৃতি ভারী বিষয় যা আমাদের সময় ও মাটির সঙ্গে প্রোথিত করে। কানেকশন তৈরি করে। তার উপন্যাস ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং’-এ দেখা যায়। আবেগাক্রান্ত স্মৃতি হলো ভার... আমাদের জীবনের অর্থ দেয়, অতীতের সঙ্গে বেঁধে রাখে। অন্যদিকে ভুলে যাওয়া হলো ওজনহীনতা, কোনোরকম বোঝা ছাড়া আমাদের বাঁচতে দেয়, ট্রমা, হতাশাহীন এক জীবনের দিকে আমাদের নিয়ে যায়।
কুন্ডেরার মতো বিস্মৃতি আমাদের অর্থহীনতার দিকে নিয়ে যায়, অস্তিত্বের লঘুত্ব ভর করে। স্মৃতি ছাড়া আমাদের ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় বলে আর কিছু থাকে না। স্মৃতি বা মেমোরি বিষয়ে কুন্ডেরার অবস্থান অনেক বেশি রাজনৈতিক।
ফলে আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য এই দেশের নিজস্ব কিছু স্মৃতির দরকার। ৭১-এর দিকে ধাবমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক পরিচয় শামসুর রাহমান তৈরি করে এদেশের মানুষকে বাংলাদেশ নামক আইডিয়ার সাথে যুক্ত করেছেন। এটা একটা ওয়েট... ওজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনের। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করতে পেরেছিলাম জন্যই ৭১-এ আমরা সফল হয়েছি। মুসলিম জাতিতত্ত্ব থেকে বের হয়ে আমার বাঙালি জাতীয়তাদ দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে সক্ষম হয়েছি।
শামসুর রাহমান মোটাদাগে এই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদেরই কবি। শামসুর রাহমান নেই তো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ নাই। বাংলাদেশের ‘কোর’ স্মৃতি নেই তো বাংলাদেশ নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য, বাংলাদেশ নাগরিকবোধ জন্মানোর জন্য এই জাতীয়তাবাদ অপরিহার্য ছিল। কিন্তু ইতিহাসে যা আজ কল্যাণকর, ভবিষ্যতে তা আর কল্যাণকর নাও থাকতে পারে। ফলে, ২০২৪ বাংলাদেশের জন্য বড় এক টার্নিং পয়েন্ট, যা আর এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব না। বাঙালি মুসলমান পরিচয় দিয়েও ধরে রাখা সম্ভব না। আমাদের আজ বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় লাগে যেখানে সকল মত-পথ-ধর্মের মানুষ নিরাপত্তা পাবে। ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ থেকে যে নতুন বাংলাদেশ নাগরিকবোধের বাংলাদেশ, সেখানে শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক অস্তিত্ব কোথায়?
এর কিছুটা উত্তর কুন্ডেরায় আছে। প্রথম বিষয় হলো বাংলাদেশ জন্মের যে স্মৃতি রাহমান তৈরি করেছেন, তা আমাদের আত্মায় একটা ওজন বা ওয়েট দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশ নাগরিকত্বের ইতিহাসে প্রোথিত। রাহমান আমাদের দেখিয়েছেন, লেখককে ইতিহাসের সঙ্গে কীভাবে আগাতে হয়। জনগণকে বুঝে তার জন্য ইতিহাস রচনা করতে হয়। বড় লেখকরা সময়ের বাইরের কেউ নন। একজন লেখকের ভেতর আমাদের সকল উত্তর ও সমাধান পেতে হবে এমন না। রাহমানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো কীভাবে কবিতায় স্মৃতি তৈরি করতে হয়, যা একটা দেশ গঠন করে ফেলে। ২৪ পরবর্তী সময়ে আমাদের লেখকেদের এগুলো ভাবতে হবে। এবং তা শেখার জন্য রাহমানের জার্নিটা দেখা লাগবে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে কুফল আমরা দেখছি তার অনেক কিছু ভুলতেও হবে। স্মৃতি ও বিস্মৃতির যে ডুয়ালিটির কথা কুন্ডেরা বলছেন এটা তাই। এই ট্রমা হতাশাকে ভুলে নতুন চিন্তার সূচনা করতে হবে। এটা সহজ কাজ নয়। চিন্তার এই বদল মানে ভাষার বদল।
বাংলাদেশে একটা কথার চল আছে যে, শামসুর রাহমানের কবিতা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে বা ২০০৬ সালে তাঁর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তাঁর কবিতারও মৃত্যু হয়েছে। এর কারণ হিসেবে এই ধারার কাব্য-গণিতবিদরা যে কারণ হাজির করেন, তা হলো তার কবিতা নান্দনিক না, অতি বর্ণনা নির্ভর, অতি সরল, কাব্যিকতার অভাব, সংবাদপত্রের রিপোর্ট, অতি আবেগের উল্লম্ফন, ভাষা লিনিয়ার, উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক, গীতলতাহীন ইত্যাদি। আমার মনে হয় এই সবই তাঁর কবিতার দোষ না, গুণ। ত্রিশের যে কবিতার অন্তর্মুখী ধারাবাহিকতা গড়ে উঠেছিল, তার বাইরে কবিতা লেখার বিপুল সাহস দেখিয়েছেন শামসুর রাহমান। প্রথম দিকে এর একটা প্রভাব থাকলেও সচেতনভাবে তিনি এই সমস্ত এড়িয়ে নিজস্ব একটা ধারা তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। এটা তাঁর কবিতার অর্জন।
বাংলাদেশের কবিতা দীর্ঘদিন পশ্চিম বাংলার কাব্য-নন্দন শাসিত। ঢাকার সাহিত্য দীর্ঘদিন কলকাতার সাহিত্যের কলোনি। এই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যত না ভূমিকা রেখেছে এই কাজে, তার থেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে ৮০ বা ৯০ দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধী লিটলম্যাগগুলো। বাংলাদেশের জ্ঞান-কাঠামোর ইতিহাসে আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলো এক অন্ধকার অধ্যায়। তারা বছরের পর বছর কলকাতার কলোনিকে জিইয়ে রাখার জন্য কলকাতার ‘ফালতু কবি’ থেকে শুরু করে ‘ঊনকবি’ সকলের বই বিক্রি করেছে। ফলে, কবিতা-নন্দনের এক ডিজাস্টার রচিত হয়েছে ঢাকায়। আজকের বড় বড় আলোকিত যে সব চকচকে বইয়ের দোকান গড়ে উঠেছে, সেটা আজিজের এক্সটেনশন। বাংলাদেশের লেখকদের বই তারা রাখে না। ফলে, দেশীয় প্রয়োজনীয় সকল লেখককে তারা কলকাতা নন্দনের মাপে বেশ খর্ব করেছে।
ফলে, বিরাজনৈতিক এক কবিতাকলার জন্ম হয়েছে এখানে। যার সঙ্গে শব্দ, বর্ণ, ছন্দ ছাড়া মানুষের আর কোনো যোগাযোগ নেই। কবিতা হয়ে উঠেছে জনবিচ্ছিন্ন ভাববাদী চর্চা। ফলে ৮০ ও ৯০ দশক পরবর্তী কবিতার যে ট্রেন্ড তা ব্যবহারিক কোনো সাহিত্য না বেশিরভাগ। কোনো কবির ভেতর দীর্ঘ কোনো জার্নি নেই। ক্ষণিকের মুগ্ধতা, শব্দজট তৈরিতে বেশ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে অনেকে ভেবে থাকেন নতুন ভাষা তৈরিই কবিতার সাধনা। কেবল কবিতার ভাষা ভাঙতে পারাই কাব্য-সফলতা। ফলে, ক্রিয়াপদ মূলক ভাষার কসরতকে কবিতা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম বাংলার গোলাম হতে হলে কবিতাকে এমন এক বাস্তবতায় উন্নীত করতে হয়, যা শুধু কবিতা, আর কিছু না। ফলে, বছরের পর বছর ছোটকাগজ ও ছোটকাগজের সম্পাদকরা যখন দেশের বড় বড় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে, তাঁরা একই কাজে করেছে। ফলে, বলতে-বলতে, লিখতে-লিখতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী একটা দেশের রাজ্যের কলোনি হয়ে উঠল বাংলাদেশের শিল্প-চেতনা। এটি শুধু কবিতার ক্ষেত্রে নয়; আমাদের গান, সিনেমা, নাটক সব জায়গায় এর একটা প্রভাব আছে। আমিও এক সময় এমনই ভাবতাম, যেহেতু আমারও সাহিত্যের ওরিয়েন্টেশন লিটলম্যাগের হাত ধরে। ফলে, সেগুলোর পেটের খবর আমি বুঝি। কিন্তু বিগত ১০ বছর আমার এই সমস্ত ভুল ভেঙে গেছে।
আমার বারবার মনে হয়েছে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে, স্বাধীন একটা দেশের মানুষ হিসেবে আমাদের নন্দনচেতনা আমাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন অনুযায়ী হওয়া উচিত, অন্যের অনুকরণে না। তা মেলাতে গিয়ে দেখি এই বাংলাদেশের নিজস্ব কবিতা লেখার ধারা শুরু হয়েছে রাহমানের হাত দিয়ে। ফলে আল মাহমুদ যতটা আদর কলকাতায় পান, ততটা ভালোবাসা তিনি পান না। আল মাহমুদ অনেক বেশি ত্রিশ-ঘেঁষা, কলকাতার নন্দনের খুব কাছাকাছি। ফলে তারা আগ্রহ বেশি পায় আল মাহমুদে।
দিল্লির রাজনৈতিক আগ্রসন আছে বাংলাদেশ নিয়ে। তাদের রাজনীতিবিদসহ সেদেশের লেখক-কবি-সাহিত্যিক সকলেই বাংলাদেশকে তাদের একটা কলোনির জায়গা থেকে দেখতে চায়। একটা সামান্য উদাহরণ দেই। খুব বিখ্যাত বিপ্লবী লেখিকা অরুন্ধতি রায়। তিনি বাংলাদেশে বেশ বিখ্যাত। তিনি দুনিয়ার সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু বাংলাদেশের ওপর দিল্লির নিপীড়ন বিষয়ে তিনি নীরব। এমন অনেক ভারতীয় বুদ্ধিজীবী আছেন যারা সাবঅল্টার্ন স্টাডি করেন কিন্তু বাংলাদেশ বিষয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে তাঁদের কোনো পাঠ নাই। তাঁরা এত নিরবতা দিয়ে জ্ঞানচর্চা করেন কীভাবে? কীভাবে সম্ভব? এর কারণ তাঁরা দিল্লির সকল রাজনৈতিক দলের মতো ভাবতে শুরু করেছেন… বাংলাদেশ ভারতের কলোনি।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ম্যাস-কিলিংয়ের সময় আমার ভারতীয় কবি বন্ধুদের অনুরোধ করেছিলাম এর প্রতিবাদ করার জন্য। তাঁরা তা করেনি। ৫ আগস্ট হাসিনা পালানোর পর ভারত তাঁকে আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রতিবাদ করতে বলেছিলাম, তা তাঁরা করেনি। তাঁরা স্বৈরাচারী সরকার যে ২,০০০ এর কাছাকাছি মানুষ হত্যা করেছে, ৪০,০০০ লোককে পঙ্গু করেছে, তার থেকে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী দেশ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে বেশি তৎপর। তো এই রাজনীতিটা আপনার বুঝতে শেখেন আমার কবি বন্ধুরা। এ রাজনীতির শিকার শামসুর রাহমান। কেননা কলকাতার নন্দনের খাপে তাঁকে মাপতে গিয়ে আপনি তাঁর কোনো উচ্চতা পান না। এই নন্দনের মাপকাঠি আমাদের জন্য না। আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। ফলে, বাংলাদেশ নামক দেশের স্মৃতির নির্মাতা রাহমানকে এখানে খর্ব দেখাবে।
আমরা মনে হয়, শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে এই সমস্ত অভিযোগ বাংলাদেশকে কলকাতার নন্দনের বাইরে যেতে না দেওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা মাত্র। তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবেন। আর এটাও বুঝতে পারবেন যে সাহিত্য মানে শব্দ, বাক্য বা ভাষা না, একটা পুরো জনপদের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে উচ্চারিত হয়। এই কাজে রাহমান থেকে বাংলা ভাষায় আর বড় কবি কে আছেন?
লেখক: কবি, গদ্যকার ও চিন্তক

(লেখাটির প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে)
বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পরবর্তী সময়ে আধুনিক বাংলা কবিতায় ত্রিশের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আমার মনে হয়, ভাব ও চিন্তাগত জায়গা থেকে ত্রিশের কবিদের গুরু মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ত্রিশের দশক শেষ হলেও ১০০ বছর পর ত্রিশের সেই ধারাবাহিকতা শেষ হয়নি। মধুসূদন রেভ্যুলেশনারি। কেমন তাঁর এই বিপ্লব?
উপমহাদেশে এনলাইটেনমেন্টের শুরু মাইকেল মধুসূদনের দত্ত দিয়ে। ১৮৬১ সালে মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশের ভেতর দিয়ে উপমহাদেশের চিন্তার রাজ্যে কাগজে কলমে এনলাইটেনমেন্টের শুভ সূচনা। জয় রাবণ! জয় আলোকবর্তিকা!
অনেকে বলতে পারেন রাবণের পূজা বহু আগে থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হতো, মেঘনাদবধ কাব্য লেখা হওয়ার আগে থেকেই। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস রামকে হিরো দেখার ভেতর দিয়ে। রামায়ণের নানা মিথ সমগ্র ভারতের নীতি ও বিশ্বাসকে তৈরি করেছে। ইউরোপীয় আলোর বাতি উপমহাদেশের চলমান বিশ্বাসকে কুসংস্কার হিসাবে দেখেছে। রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে ফোর্ট উইলিয়ামের বুদ্ধিতাত্ত্বিকরা পশ্চিমা কলোনিকে জোরালো করেছে নানাভাবে। চিন্তারাজ্যে কলোনির ফর্ম তৈরিতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কলোনিয়ান আলোকময়তা ভালো কি মন্দ, তা তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। এটা আমাদের বাস্তবতা। এখন এই কলোনির রোগ সারিয়ে প্রি-কলোনিয়াল অবস্থায় আমরা যেতে চাইলে নতুন রোগ দেখা দেবে।
যিশুখ্রিষ্টকে নিয়ে একটা মেটাফরিক ডার্টি জোকস আছে স্লাভো জিজেকের। সেখানের সারমর্ম, কেউ যদি তাঁর অসুস্থতাই উপভোগ করে তবে সমস্যা কী! একইভাবে কলোনিয়াল দেশগুলো প্রি-কলোনিয়াল অবস্থায় ফিরতে গেলে দুঃস্বপ্নের মতোই অবস্থা হবে। ভারত কলোনিয়াল প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘদিনের রূপান্তরকে বাদ দিয়ে রামরাজত্বে ফিরতে চাইলে তা হবে না।
ফলে কবিতায় আধুনিক কবিতাকে কলোনিয়াল বলে খারিজ করে দিলে হয় না। এটা বাস্তবতা। কিন্তু এর একটা অন্য বিচার করা যেতে পারে।
কিন্তু ইউরোপীয় রেনেসাঁর মডেল তাদের নিজেদের প্রয়োজনে গ্রহণ ও বর্জনের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে হয়েছে অনুকরণের আলোকে, শাসন পরিচালনার স্বার্থে। অনেকে ভেবে থাকেন, ফোর্ট উইলিয়ামবাসী চিন্তকদের সমাজ, ধর্ম ও প্রযুক্তি সংস্কার আমাদের সমাজের জন্য হিতকর। হ্যাঁ, সংস্কারটা ভেতর থেকে হওয়া দরকার ছিলে। মানে, ভারতের রেনেসাঁ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও সামাজিক সম্মতির ভেতর দিয়ে হওয়া দরকার ছিলে। ইউরোপিয়ান অনুকরণের ফলাফল হলো উপমহাদেশে দুটো দেশ আছে যাদের পারমাণবিক অস্ত্র আছে যদিও বহু লোকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও রাজনৈতিক অধিকার নাই। এগুলো আলোর নিচের বড় বড় অন্ধকার ও গহ্বর।
মধুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্য না লিখলে তাঁকে বাংলা সাহিত্য মনে রাখত কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বাংলা ভাষার বহু লেখক সমাধিতে শুয়ে আছে ভাষার এপিটাফ নিয়ে। কোনো মোমবাতি প্রজ্জ্বলন হয় না, তাঁরা শুধু ভাষার কৌশল দেখিয়েছেন এই কারণে। মেঘনাদবধ কাব্য খুব সিগনিফিকেন্ট হয়ে উঠেছে তার ভাষার জন্য না। আবহমান চিন্তার সঙ্গে বড় একটা ছেদ তিনি তৈরি করেছেন তাঁর এই কাব্যে, সেই জন্য।
মেঘনাদবধ মাইকেলের কলোনিয়াল মাইন্ডসেটের চূড়ান্ত প্রকাশ। কাব্যচিন্তায় তারই ধারাবাহিকতা ত্রিশের কবিরা।
এই কলোনিয়াল মাইন্ডসেট থেকে প্রগতিশীল সাহিত্য বের হতে পারেনি আজও। আমাদের সাহিত্য আলোয় আলোয় আলোয় ভরা। ফলে, সাহিত্যকে চিন্তার জায়গা থেকে না দেখে মুখস্থ তোতাপাখির মতো আমরা বলতে চাইব, ভাষাই সাহিত্য। ভাষার পৃথকত্ব মানেই সাহিত্যের নতুনত্ব, এগুলো খুব অকেজো সাহিত্য আলোচনা। এর নাম দিলাম ‘ল্যাংগুয়েজ ফেটিসিজম’। এর থেকে লেখক সমাজকে বের হতে হবে। তা না হলো সাহিত্য ভাষা, ভাষা, ভাসা ভাসা থেকে যাবে।
মাইকেলের হাত ধরে যে কলোনির আমদনি, তার প্রচ্ছন্ন একটা গীতল এক্সটেনশন আমাদের ত্রিশের কবিতা। সুধীন, বুদ্ধদেব বা বিষ্ণু দে’র কবিতায় আপনি ল্যান্ড খুঁজে পাবেন না।
জীবনানন্দের কবিতায় যা পাবেন তা রাজনৈতিক কোনো সমাজ না। মানব অস্তিত্বের নিগুঢ় একটা জায়গা, হতাশা, অন্ধকারময়, বাঁচার জন্য বাঁচার মতো ব্যাপার। এছাড়া জীবনানন্দের কবিতায় বৃহৎ কোনো চিন্তার দেখা আপনি পাবেন না। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, নজরুল বা আরও এমন অনেকে যখন একটা দেশের কল্পনা সাজ্জাচ্ছে যেখানে আপনি ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডবদের লেখার তেমন কিছু পাবেন না। মনে হবে তাঁরা দেশে থেকেও দেশে নাই। তাঁদের কাছে সাহিত্য সাধনা মানে নন্দনের সাধ। এমনকি বুদ্ধদেব মুসলমানদের সাহিত্যকে বেশ তাচ্ছিল্যভরেই দেখতেন। ঢাকার সাহিত্যকে তারা একটা কলোনিয়াল মন দিয়েই দেখতেন, যতই আল মাহমুদ বা শামসুর রাহমানকে স্পেস দিন না কেন।
সমগ্র বাংলা কবিতায় এখন পর্যন্ত ত্রিশের কবিতার নামে শিল্প সাধনার একটা চল আছে। এই কবিতা চলের বিরুদ্ধে রাহমান দাঁড়াতে পেরেছিলেন। তিনি কবিতাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন তা ত্রিশ পরবর্তী বেশিরভাগ কবি পারেননি। রাহমানের কবিতা খুব বেশি নান্দনিক না, পেলব না, ভাষার সৌন্দর্যে মুখরিত না, অব্যক্ত নয়, বহির্মুখী, বিরাট একটা জনগোষ্ঠীর কথা বলতে চায়। এটা বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি ত্রিশের কবিতা চিন্তার বিপরীত। যে চিন্তা বাংলা কবিতাকে বছরের পর বছর শাসন করছে সেখানে এত বড় একটা ছেদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিচ্ছেদ তৈরি করতে পারা বিশাল বড় ঘটনা। সাহিত্যে এগুলো হরহামেশা ঘটে না। কালেভদ্রে ঘটে। বাংলাদেশে রাহমানই প্রথম কবি যিনি একটা জাতির সামগ্রিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে সচেষ্ট থেকেছেন। বাংলাদেশ জন্মের আগে-পরে উল্লেখযোগ্য যে ঘটনাই ঘটুক না কেন, আপনি রাহমানকে পাবেন। এমন কবি বাংলাদেশে কয়জন ছিল বা এখন আর আছে? শামসুর রাহমানের এই কাব্য-রাজনীতিটা আমাদের ধরতে পারা লাগে। মানুষের একটা স্টেপও রাজনীতির বাইরে নয়। ফলে, ত্রিশের অরাজনৈতিক চিন্তার ফলাফল হিসাবে কবিতাকে আমরাসোশিও-পলিটিক্যাল জায়গা থেকে দেখতে পারি না। যা অতীব জরুরি বিষয়, এ না হলে কবিতার কাজটা কী!
যে কথাটা বারবার বলতে চাচ্ছি তা হলো, রাহমান ৪৭-এর দেশভাগের পর যে বাংলাদেশ আমাদের দরকার ছিলো, তার জন্য যে যৌথ স্মৃতি আমাদের দরকার ছিল, তা তিনি কবি হিসেবে খুব সফলভাবেই তৈরি করতে পেরেছিলেন।
বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল পুস্তের ১২ লাখ ওয়ার্ডের ৭ খণ্ডের ৩০০০ পৃষ্ঠার একটা ঢাউস সাইজের উপন্যাস আছে… In Search of Lost Time. মার্সেল ১৯১৩ থেকে ১৯২৭ সাল এই ১৪ বছরে এটা প্রকাশিত হয়। ১৯২২-এ পুস্ত মারা যান। অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় পুরো বই একসঙ্গে প্রিন্টেড অবস্থায় তিনি দেখে যেতে পারেননি। এটাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসাবে ধরা হয় এবং এ জন্যই খুব কম লোকেই এটা পড়েছে। খুব নান্দনিক কিছু না, খুব পরিপাটিভাবে আধুনিক সাহিত্য যেভাবে লেখা হয় এটা তাও না। তেমন কোনো প্লট নাই। দর্শন, মনোবিজ্ঞান, স্মৃতি, সময়, প্রেম ও সমাজ নিয়ে নানা অবজার্ভেশনে ঠাসা। এই উপন্যাসের সেন্ট্রাল থিম স্মৃতি, সময় ও শিল্প এগুলো কীভাবে আমাদের জীবনের মর্ম তৈরি করে। একজন আর্টিস্ট আসলে কী করে থাকেন তারও একটা হিসাব যায় In Search of Lost Time-এ।
পুস্তের মতে শিল্পের কাজ শুধু নন্দন ও আনন্দ তৈরি করা না। এটা জীবনের অর্থ উন্মোচন করার একটা উপায়। শিল্প-সাহিত্য-কবিতা কী করে? এটা আমাদের অভিজ্ঞতা, আবেগ আর সময়ের যাত্রাটকে লিপিবদ্ধ করে বা ছবি এঁকে রাখে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা উপেক্ষা করে যাই, বাস্তবতায় যা দেখা যায় না তাতে প্রবেশ করতে পারে আর্ট। একজন শিল্পী মূলত বন্তু ও প্রাণের মর্মের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, গায়কেরা মূলত এই নশ্বর জীবনের যে ভঙ্গুর দশা, তাকে অমর হিসাবে প্রাণ-ই দিতে পারে। এই অমর দশাই যুগের পর যুগ পরিচালিত হতে থাকে। ইমমর্টালিটি আর ‘fragility of human life’-এর যে বৈপরীত্য তার সংযোগস্থল হলো আর্ট। মানুষ মানুষের স্মৃতি দিয়েই অতীতের আবেগকে উপলব্ধি করতে সক্ষম। মানুষের ভেতর হারিয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি থাকে যা আর্ট পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারে। আর আর্টের সব থেকে বড় শক্তি হলো তা ‘সাবজেক্টিভিটি’। ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, তার অতীত অভিজ্ঞতা ও তার ভেতরে লুকানো মেমোরির আলোকে তার আবেগ জাগ্রত হয়। একটা নতুন মানে খুঁজে পায়। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির অনুভূতির ভিন্নতার পরও একটা কমন জায়গা সে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভেতর তৈরি করে। এর এটাই আমাদের যৌথ চেতনা।
কবি শামসুর রাহমান একটা দেশের জন্য যৌথ চেতনা তৈরি করেছেন বছরের পর বছর ধরে। ফলে তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে বাংলাদেশের এমন সব স্মৃতি আমাদের মনে পড়ে যাবে যাকে দিয়ে এই দেশের মাটিতে আপনি নোঙর ফেলতে পারবেন। একটা কানেকটিভিটি তৈরি হবে, এটাই কালেকটিভ কন্সাস। একজন কবি তাঁর দীর্ঘ জীবনের কবিতা সাধনায় এই কাজটাই করতে চান। অনেক কবি এটা ধরতে পারেন না। পুস্ত যেমন তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে অস্তিত্বের মর্ম খুঁজেছেন, রাহমানও তাই তৈরি করছেন। বেশিরভাগই কবি হওয়ার একটা মোহের পেছনে ছুটতে থাকেন। কিন্তু একজন কবি বা লেখককে বা শিল্পীকে কোন জার্নির ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে, আজীবন কবিতা লেখার পর এপিটাফ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না… সাধারণ মানুষ থেকে একটু বেশি দেখার সুযোগ পাবেন। আর্ট একটা টাইমলেস ব্যাপার। কিন্তু ভেতর দিয়ে অতীত নিয়ে আপনি বর্তমানে প্রবেশ করতে পারবেন। রাহমান যে বাংলাদেশের ছবিটা তাঁর কবিতায় লিখেছেন যা পড়লে আমরা জ্যান্ত ইতিহাসকে নিয়ে বর্তমানে প্রবেশ করতে পারব, যা আমাদের ভবিষ্যত নির্মাণে প্রণোদনা দেবে।
স্মৃতি বিষয়ক আলোচনা দস্তয়েভস্কির দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ-এর একটা বিষয় টেনে শেষ করতে চাই। যারা দস্তয়েভস্কির এই এপিক উপন্যাসটা পড়েছেন, তাঁরা জানেন জমিদার ফিওদর পাবলোভিচের তিনপুত্র দ্রিমিত্রি, ইভান ও আলিওশা। প্রত্যেকের শৈশবস্মৃতিতে তারা প্রত্যেকেই খুব নেগলেকটেড, ট্রমাটাইজড ও ইমোশনালি ডিসটেন্সড। এর কারণ তাদের বাবা পাবলোভিচের স্বার্থপরতা ও দায়িত্বহীনতা। এই উপন্যাসে দস্তয়েভস্কি একটা সেন্ট্রাল ধারণা বা সংকেত দিতে চেয়েছেন, ‘মানুষের শৈশবস্মৃতি একটা মানুষকে আজীবন তাড়া করে। পরবর্তী জীবনে আমরা কতটা সুখী হবো তা নির্ভর করে আমাদের শৈশবস্মৃতির উপরে।’ প্রথম ছেলে দ্রিমিত্রি তাঁর বাবার প্রথম স্ত্রীর সন্তান। তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন এবং পাবলোভিচের নির্যাতনের কারণে তিনি তাকে ছেড়ে চলে যানে এবং দ্রিমিত্রি যখন খুব ছোট তখন তার মৃত্যু হয়। তার মায়ের মৃত্যুর পর দ্রিমিত্রিকে তার বাবা ত্যাগ করেন। সে তার আত্মীয়দের কাছে বড় হতে থাকে যেখানে ইমোশনাল সাপোর্ট বলে কিছু সে পায়নি। ফলে, প্যাশনেট, ইমপালসিভ, রেকলেস, কেয়ারলেস চরিত্র হিসাবে সে বেড়ে ওঠে। এর পরের সন্তানের নাম ইভান। সে পাবলোভিচের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরের প্রথম সন্তান। তার মা সোফিয়া খুবই ভদ্র ও নিবেদিতপ্রাণ মহিলা হলেও তার আবেগ ভঙ্গুর ছিলো। তার আরও একটি সন্তানের জন্ম হয় যার নাম আলিওশা।
ইভান ও আলিওশা কম বয়সে তাদের মাকে হারায়। তাদের ভাগ্য প্রথম ভাইয়ের থেকে আলাদা কিছু না। ইভান আত্মীয়দের কাছে বড় হয়েছে। সে একা ও ইন্টেলেকচুয়াল। পরিবারের কারো সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তার ভেতর আবেগ থেকে বুদ্ধি বেশি ছিল। কিন্তু শৈশবের একাকিত্বের স্মৃতির কারণে তার বুদ্ধিবৃত্তি পলায়নপর। আলিওশা এই তিন ভাইয়ের ভেতর সবচেয়ে ব্যতিক্রম। তার ভালোবাসা ও অপরকে ক্ষমা করার গুণ ছিলো। পরিবার ও দুনিয়ার সব মানুষকে সে ভালোবাসত। আধ্যাত্মিক শান্তিপূর্ণ জীবনের অনুসন্ধান সে করতে চায়। এর কারণ হলো তার মায়ের স্মৃতি। তার স্মৃতিতে তার মায়ের প্রার্থনা করার স্মৃতি আছে। ফলে, সে গ্রাউন্ডেড টু অ্যাফারমেটিভ লাইভ। স্পিরিচ্যুয়ালিটির দেখা মেলে।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শাসক ফিওদর পাভলোভিচ। তাঁরা আমাদের স্মৃতিকে যন্ত্রণায় আক্রান্ত করেছেন। দূরে সরিয়ে রেখেছেন স্বার্থপরতার কারণে। ফলে, এই সব জনকের স্বার্থপরতার, নীতিহীনতার কারণেই পুরো বাংলাদেশের মানুষের যৌথ স্মৃতির ভেতর পারস্পরিক অবিশ্বাস ঢুকে গিয়েছে। বারবার মার খেতে খেতে আমরা বাংলাদেশ নির্মাণের আস্থার জায়গাটা আমরা শেষ করে ফেলেছি বা হারিয়ে ফেলেছি। আলিওশা সামান্য মায়ের প্রার্থনার স্মৃতি জন্য পরবর্তী জীবনে ভালোবাসার কথা বলেছে। এই স্মৃতি খুব সামান্য কিন্তু খুব শক্তিশালী। শামসুর রাহমানের কবিতা মূলত এই আলিওশার মায়ের প্রার্থনার মতো একটা বিষয়। ২০২৪ সালের পর মুসলিম জাতিতত্ত্ব বা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাতিল হয়ে গেছে। এখন যে বাংলাদেশ নাগরিকত্বের রাজনীতিটা আমরা করতে চাই বাংলাদেশি মানুষের পক্ষে সেই সংগ্রামের ছোট ছোট সব স্মৃতি আপনি রাহমানের কবিতায় পাবেন। তাবৎ বাংলাদেশের একটা চিত্র ও সংগ্রামের উপাদান আপনি পাবেন তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতা থেকে বাংলাদেশ নাগরিকত্ব-বোধের স্মৃতি নিয়ে আমাদের আগাতে হবে।
শামসুর রহমান আমাদের বাংলাদেশ নাগরিকত্ব-বোধের স্মৃতি নির্মাণের কবি।
স্মৃতি বা মেমোরি নিয়ে কথা বললে চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরার কথা বলতে হয়। স্মৃতি আমাদের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। অন্য দিকে ‘ভুলে যাওয়া’ হলো ‘the political manipulation of history’। ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং'-এ কুন্ডেরা স্মৃতি আর বিস্মৃতি কীভাবে আমাদের ইতিহাস, রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করে তা তুলে ধরেছেন। নিপীড়ক শাসক বা ব্যক্তি আমাদের অতীত মুছে দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাঁরা নতুন একটা বয়ান হাজির করতে চায়। যুগোস্লাভিয়ার স্বৈরাচারী কম্যুনিস্ট সরকার কালেকটিভ কন্সাস থেকে বেদনাদায়ক সকল স্মৃতি মুছে দিতে চেয়েছিল।
বিগত ১৫ বছরের বাংলাদেশের দিকে তাকালে আপনি বুঝতে পারবেন, ক্ষমতা কীভাবে নিজের শাসন চালানোর জন্য একমুখী ইতিহাস রচনা করে। ইতিহাস ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের নানা যন্ত্র কাজ করেছে। কুন্ডেরা এটাও মনে করেন যে ভুলে যাওয়া সর্বদা খারাপ নয়। এটা একটা ডুয়াল ফোর্স। এটা যখন চাপানো হয় তখন তা ভয়ংকর, কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তি পর্যায়ে এটা একরকম স্বাধীনতাও বটে। অনেক খারাপ কিছু ভুলে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়। ভুলতে পারা হলো লাইটনেস, স্মৃতি ভারী বিষয় যা আমাদের সময় ও মাটির সঙ্গে প্রোথিত করে। কানেকশন তৈরি করে। তার উপন্যাস ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং’-এ দেখা যায়। আবেগাক্রান্ত স্মৃতি হলো ভার... আমাদের জীবনের অর্থ দেয়, অতীতের সঙ্গে বেঁধে রাখে। অন্যদিকে ভুলে যাওয়া হলো ওজনহীনতা, কোনোরকম বোঝা ছাড়া আমাদের বাঁচতে দেয়, ট্রমা, হতাশাহীন এক জীবনের দিকে আমাদের নিয়ে যায়।
কুন্ডেরার মতো বিস্মৃতি আমাদের অর্থহীনতার দিকে নিয়ে যায়, অস্তিত্বের লঘুত্ব ভর করে। স্মৃতি ছাড়া আমাদের ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় বলে আর কিছু থাকে না। স্মৃতি বা মেমোরি বিষয়ে কুন্ডেরার অবস্থান অনেক বেশি রাজনৈতিক।
ফলে আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য এই দেশের নিজস্ব কিছু স্মৃতির দরকার। ৭১-এর দিকে ধাবমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক পরিচয় শামসুর রাহমান তৈরি করে এদেশের মানুষকে বাংলাদেশ নামক আইডিয়ার সাথে যুক্ত করেছেন। এটা একটা ওয়েট... ওজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনের। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করতে পেরেছিলাম জন্যই ৭১-এ আমরা সফল হয়েছি। মুসলিম জাতিতত্ত্ব থেকে বের হয়ে আমার বাঙালি জাতীয়তাদ দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে সক্ষম হয়েছি।
শামসুর রাহমান মোটাদাগে এই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদেরই কবি। শামসুর রাহমান নেই তো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ নাই। বাংলাদেশের ‘কোর’ স্মৃতি নেই তো বাংলাদেশ নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য, বাংলাদেশ নাগরিকবোধ জন্মানোর জন্য এই জাতীয়তাবাদ অপরিহার্য ছিল। কিন্তু ইতিহাসে যা আজ কল্যাণকর, ভবিষ্যতে তা আর কল্যাণকর নাও থাকতে পারে। ফলে, ২০২৪ বাংলাদেশের জন্য বড় এক টার্নিং পয়েন্ট, যা আর এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব না। বাঙালি মুসলমান পরিচয় দিয়েও ধরে রাখা সম্ভব না। আমাদের আজ বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় লাগে যেখানে সকল মত-পথ-ধর্মের মানুষ নিরাপত্তা পাবে। ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ থেকে যে নতুন বাংলাদেশ নাগরিকবোধের বাংলাদেশ, সেখানে শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক অস্তিত্ব কোথায়?
এর কিছুটা উত্তর কুন্ডেরায় আছে। প্রথম বিষয় হলো বাংলাদেশ জন্মের যে স্মৃতি রাহমান তৈরি করেছেন, তা আমাদের আত্মায় একটা ওজন বা ওয়েট দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশ নাগরিকত্বের ইতিহাসে প্রোথিত। রাহমান আমাদের দেখিয়েছেন, লেখককে ইতিহাসের সঙ্গে কীভাবে আগাতে হয়। জনগণকে বুঝে তার জন্য ইতিহাস রচনা করতে হয়। বড় লেখকরা সময়ের বাইরের কেউ নন। একজন লেখকের ভেতর আমাদের সকল উত্তর ও সমাধান পেতে হবে এমন না। রাহমানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো কীভাবে কবিতায় স্মৃতি তৈরি করতে হয়, যা একটা দেশ গঠন করে ফেলে। ২৪ পরবর্তী সময়ে আমাদের লেখকেদের এগুলো ভাবতে হবে। এবং তা শেখার জন্য রাহমানের জার্নিটা দেখা লাগবে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে কুফল আমরা দেখছি তার অনেক কিছু ভুলতেও হবে। স্মৃতি ও বিস্মৃতির যে ডুয়ালিটির কথা কুন্ডেরা বলছেন এটা তাই। এই ট্রমা হতাশাকে ভুলে নতুন চিন্তার সূচনা করতে হবে। এটা সহজ কাজ নয়। চিন্তার এই বদল মানে ভাষার বদল।
বাংলাদেশে একটা কথার চল আছে যে, শামসুর রাহমানের কবিতা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে বা ২০০৬ সালে তাঁর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তাঁর কবিতারও মৃত্যু হয়েছে। এর কারণ হিসেবে এই ধারার কাব্য-গণিতবিদরা যে কারণ হাজির করেন, তা হলো তার কবিতা নান্দনিক না, অতি বর্ণনা নির্ভর, অতি সরল, কাব্যিকতার অভাব, সংবাদপত্রের রিপোর্ট, অতি আবেগের উল্লম্ফন, ভাষা লিনিয়ার, উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক, গীতলতাহীন ইত্যাদি। আমার মনে হয় এই সবই তাঁর কবিতার দোষ না, গুণ। ত্রিশের যে কবিতার অন্তর্মুখী ধারাবাহিকতা গড়ে উঠেছিল, তার বাইরে কবিতা লেখার বিপুল সাহস দেখিয়েছেন শামসুর রাহমান। প্রথম দিকে এর একটা প্রভাব থাকলেও সচেতনভাবে তিনি এই সমস্ত এড়িয়ে নিজস্ব একটা ধারা তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। এটা তাঁর কবিতার অর্জন।
বাংলাদেশের কবিতা দীর্ঘদিন পশ্চিম বাংলার কাব্য-নন্দন শাসিত। ঢাকার সাহিত্য দীর্ঘদিন কলকাতার সাহিত্যের কলোনি। এই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যত না ভূমিকা রেখেছে এই কাজে, তার থেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে ৮০ বা ৯০ দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধী লিটলম্যাগগুলো। বাংলাদেশের জ্ঞান-কাঠামোর ইতিহাসে আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলো এক অন্ধকার অধ্যায়। তারা বছরের পর বছর কলকাতার কলোনিকে জিইয়ে রাখার জন্য কলকাতার ‘ফালতু কবি’ থেকে শুরু করে ‘ঊনকবি’ সকলের বই বিক্রি করেছে। ফলে, কবিতা-নন্দনের এক ডিজাস্টার রচিত হয়েছে ঢাকায়। আজকের বড় বড় আলোকিত যে সব চকচকে বইয়ের দোকান গড়ে উঠেছে, সেটা আজিজের এক্সটেনশন। বাংলাদেশের লেখকদের বই তারা রাখে না। ফলে, দেশীয় প্রয়োজনীয় সকল লেখককে তারা কলকাতা নন্দনের মাপে বেশ খর্ব করেছে।
ফলে, বিরাজনৈতিক এক কবিতাকলার জন্ম হয়েছে এখানে। যার সঙ্গে শব্দ, বর্ণ, ছন্দ ছাড়া মানুষের আর কোনো যোগাযোগ নেই। কবিতা হয়ে উঠেছে জনবিচ্ছিন্ন ভাববাদী চর্চা। ফলে ৮০ ও ৯০ দশক পরবর্তী কবিতার যে ট্রেন্ড তা ব্যবহারিক কোনো সাহিত্য না বেশিরভাগ। কোনো কবির ভেতর দীর্ঘ কোনো জার্নি নেই। ক্ষণিকের মুগ্ধতা, শব্দজট তৈরিতে বেশ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে অনেকে ভেবে থাকেন নতুন ভাষা তৈরিই কবিতার সাধনা। কেবল কবিতার ভাষা ভাঙতে পারাই কাব্য-সফলতা। ফলে, ক্রিয়াপদ মূলক ভাষার কসরতকে কবিতা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম বাংলার গোলাম হতে হলে কবিতাকে এমন এক বাস্তবতায় উন্নীত করতে হয়, যা শুধু কবিতা, আর কিছু না। ফলে, বছরের পর বছর ছোটকাগজ ও ছোটকাগজের সম্পাদকরা যখন দেশের বড় বড় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে, তাঁরা একই কাজে করেছে। ফলে, বলতে-বলতে, লিখতে-লিখতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী একটা দেশের রাজ্যের কলোনি হয়ে উঠল বাংলাদেশের শিল্প-চেতনা। এটি শুধু কবিতার ক্ষেত্রে নয়; আমাদের গান, সিনেমা, নাটক সব জায়গায় এর একটা প্রভাব আছে। আমিও এক সময় এমনই ভাবতাম, যেহেতু আমারও সাহিত্যের ওরিয়েন্টেশন লিটলম্যাগের হাত ধরে। ফলে, সেগুলোর পেটের খবর আমি বুঝি। কিন্তু বিগত ১০ বছর আমার এই সমস্ত ভুল ভেঙে গেছে।
আমার বারবার মনে হয়েছে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে, স্বাধীন একটা দেশের মানুষ হিসেবে আমাদের নন্দনচেতনা আমাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন অনুযায়ী হওয়া উচিত, অন্যের অনুকরণে না। তা মেলাতে গিয়ে দেখি এই বাংলাদেশের নিজস্ব কবিতা লেখার ধারা শুরু হয়েছে রাহমানের হাত দিয়ে। ফলে আল মাহমুদ যতটা আদর কলকাতায় পান, ততটা ভালোবাসা তিনি পান না। আল মাহমুদ অনেক বেশি ত্রিশ-ঘেঁষা, কলকাতার নন্দনের খুব কাছাকাছি। ফলে তারা আগ্রহ বেশি পায় আল মাহমুদে।
দিল্লির রাজনৈতিক আগ্রসন আছে বাংলাদেশ নিয়ে। তাদের রাজনীতিবিদসহ সেদেশের লেখক-কবি-সাহিত্যিক সকলেই বাংলাদেশকে তাদের একটা কলোনির জায়গা থেকে দেখতে চায়। একটা সামান্য উদাহরণ দেই। খুব বিখ্যাত বিপ্লবী লেখিকা অরুন্ধতি রায়। তিনি বাংলাদেশে বেশ বিখ্যাত। তিনি দুনিয়ার সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু বাংলাদেশের ওপর দিল্লির নিপীড়ন বিষয়ে তিনি নীরব। এমন অনেক ভারতীয় বুদ্ধিজীবী আছেন যারা সাবঅল্টার্ন স্টাডি করেন কিন্তু বাংলাদেশ বিষয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে তাঁদের কোনো পাঠ নাই। তাঁরা এত নিরবতা দিয়ে জ্ঞানচর্চা করেন কীভাবে? কীভাবে সম্ভব? এর কারণ তাঁরা দিল্লির সকল রাজনৈতিক দলের মতো ভাবতে শুরু করেছেন… বাংলাদেশ ভারতের কলোনি।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ম্যাস-কিলিংয়ের সময় আমার ভারতীয় কবি বন্ধুদের অনুরোধ করেছিলাম এর প্রতিবাদ করার জন্য। তাঁরা তা করেনি। ৫ আগস্ট হাসিনা পালানোর পর ভারত তাঁকে আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রতিবাদ করতে বলেছিলাম, তা তাঁরা করেনি। তাঁরা স্বৈরাচারী সরকার যে ২,০০০ এর কাছাকাছি মানুষ হত্যা করেছে, ৪০,০০০ লোককে পঙ্গু করেছে, তার থেকে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী দেশ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে বেশি তৎপর। তো এই রাজনীতিটা আপনার বুঝতে শেখেন আমার কবি বন্ধুরা। এ রাজনীতির শিকার শামসুর রাহমান। কেননা কলকাতার নন্দনের খাপে তাঁকে মাপতে গিয়ে আপনি তাঁর কোনো উচ্চতা পান না। এই নন্দনের মাপকাঠি আমাদের জন্য না। আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। ফলে, বাংলাদেশ নামক দেশের স্মৃতির নির্মাতা রাহমানকে এখানে খর্ব দেখাবে।
আমরা মনে হয়, শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে এই সমস্ত অভিযোগ বাংলাদেশকে কলকাতার নন্দনের বাইরে যেতে না দেওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা মাত্র। তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবেন। আর এটাও বুঝতে পারবেন যে সাহিত্য মানে শব্দ, বাক্য বা ভাষা না, একটা পুরো জনপদের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে উচ্চারিত হয়। এই কাজে রাহমান থেকে বাংলা ভাষায় আর বড় কবি কে আছেন?
লেখক: কবি, গদ্যকার ও চিন্তক
.png)

১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর কলকাতার ডোমতলার (অধুনা এজরা স্ট্রিট) পঁচিশ নম্বর বাড়িতে গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ নামে এক রুশ সংগীতজ্ঞ পর্দা তুললেন। মঞ্চস্থ হলো কাল্পনিক সংবদল। রিচার্ড পল জোড্রেলের ইংরেজি প্রহসন দ্য ডিসগাইজ-এর বঙ্গানুবাদ। এশীয় কোনো ভাষায় প্রসেনিয়াম মঞ্চে অভিনীত প্রথম নাটক। দুই শতাব্দী
৬ ঘণ্টা আগে
কবিতা হলো দুনিয়া দেখার উপায়। যখন কোনো কবিতা থেকে চোখ তুলে দেখবেন আপনার চারপাশের দুনিয়াটাকে আর আগের মতো থাকে না। নতুন অর্থ নিয়ে দুনিয়া জেগে ওঠে। ভালো কবিতা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কবিতাটা পড়ার পর যদি বুঝতে পারেন, এটা পড়ার পর আপনি আর আগের মানুষটি নেই, তবে তা নতুন কবিতা। এটা পড়ার পর যদি আপনার ম
১৭ আগস্ট ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার শ্রীরামপুর শহরটি ঐতিহাসিক ফ্রেডরিক নগর বা ‘দিনেমার নগর’ নামে পরিচিত। কলকাতার হাওড়া থেকে মাত্র ৫ রুপিতে লোকাল ট্রেনে টিকেট কেটে যাওয়া যায় গঙ্গা নদীর ধারঘেঁষা এই ঐতিহাসিক স্থানে। এখানেই রয়েছে ‘কেরি জাদুঘর’। উইলয়াম কেরির নিজের মুখের ভাষা বাংলা ছিল না, তবুও মানুষ
১৭ আগস্ট ২০২৬
প্রথম ইউরোপ ভ্রমণ শুরু হয়েছিল যুক্তরাজ্যের লিডস শহর থেকে, ২০২২ সালের মার্চে। শহরটি রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় তিন শ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এয়ার নদীর তীরে। এটি উত্তর ইংল্যান্ডের একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শহরের মূল কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্রোঞ্জের নানারকম ভাস্কর্