ad

জন্মদিন/জহির রায়হানের শিল্পভাবনায় অধিকার ও রাজনীতি

সাজেদুল ইসলাম
সাজেদুল ইসলাম

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১: ০১
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২) যখন ব্রিটিশ ভারতের ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেন, তখন বিশ্বজুড়ে ঘটনার ঘনঘটা। মাথার ওপর শোষকের খাঁড়া ঝুলছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-অত্যাচার, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ত্রিশের অর্থনৈতিক মন্দার পশ্চিমা ঢেউ, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, বিভেদ থেকে রক্তাক্ত দাঙ্গা, চতুর্দিকে দাঙ্গার আগুন ও শেষতক ভারত রাষ্ট্রের বিভক্তি।

পূর্ববাংলায় জহির রায়হানের বেড়ে ওঠার কালে, বিশেষত যখন তিনি পরিবারে অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারের অনুপ্রেরণায় প্রগতিশীল রাজনীতির দিকে ঝুঁকলেন, তখন তাঁর মস্তিষ্কে মানুষ ও সমাজ নিয়ে নতুন এক কমপার্টমেন্ট তৈরি হলো। তিনি সমাজস্থ মানুষ নিয়ে নয়া পাঠে আগ্রহী হলেন। সাম্যবাদে অনুপ্রাণিত এই মানুষটি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সাম্রাজ্যিক বাসনার প্রেক্ষাপটে নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করলেন আরবান মানুষের নাগরিক যন্ত্রণা। সম্ভবত তখন থেকেই তিনি মনস্থ করলেন সেই মধ্যবিত্তের কথা বলবেন, যাদের কথাগুলো ঠিক বলা হয়ে ওঠে না। এমনকি সেই ব্রাত্যজীবনের গল্পও তুলে আনবেন নিজের লেখায়-ছবিতে, যাদের নিয়ে কথা বলবার তাগিদ সমাজে নিতান্ত কম।

জহির রায়হানের শিল্পীজীবনে হয়তো নানা বিভক্তিরেখা টানা যায়—গল্পকার, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার, গীতিকার ইত্যাদি। এই শিল্পীজীবন ছাপিয়ে তার সংগ্রামী পরিচয় বড় হয়ে উঠতে পারে। তিনি অ্যাকটিভিস্ট—এক আজীবন সংগ্রামী। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। এমন প্রতিটি পরিচয়ের সঙ্গে হাজারো বিবৃতি, বক্তব্য ও ঘটনা যুক্ত। শেষপর্যন্ত তিনি শহীদও। জহির রায়হান বেঁচেছিলেন সাঁইত্রিশ বছর। ছোট জীবনে বড় বড় ঘটনার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন, যা তাঁকে মহান ও মহীয়ান করেছে তুলেছে। তাঁর সমকালে বাঙালির জীবনের বড় দুই ঘটনা—ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ—দুটিতেই তিনি অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও বাঙালির জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। কোথাও কোথাও বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন যুগিয়েছেন। তিনি তাঁর সময়ের মানুষকে যেভাবে নিজ তাগিদে জেনেছেন, উত্তর প্রজন্মকে জানানোর দায়িত্বও নিয়েছেন। ফলে পরবর্তীকালে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়বলি স্থান পেয়েছে তাঁরই সৃষ্ট শিল্পের নানা শাখায় বিশেষত সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে।

তাঁর গল্পের, তাঁর শিল্প সৃজনের মুখ্য বিষয় ও অনুপ্রেরণা ছিল—মানুষ, সমাজ ও সময়—এই ত্রয়ী। আরও অনেক শিল্পীর রচনা ও নির্মাণেও হয়তো একই প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে যেমন বিষয় হিসেবে মানুষ তাঁর শিল্পে মুখ্য অন্যদিকে তেমনি তিনি সেই মানব মনের গহীনে আলো ফেলে দেখতে চেয়েছেন, দেখাতে চেয়েছেন স্বকালের সমাজ ও পরিপার্শ্বকে। সমালোচকের চোখে এই চিত্রায়ণে তিনি সফলও।

সাম্যবাদী চেতনা, সময় ও রাজনীতি সচেতনতা এবং কণ্ঠহীন মানুষের কথাগুলো বলবার আগ্রহ সম্ভবত তাঁর শিল্পসৃজনের উন্মুক্ত প্রান্তরে একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছিল। এমনকি একে মাপকাঠিও বলা চলে। অর্থাৎ তিনি কোন বিষয়ে বলবেন, কী বলবেন, কতটুকু বলবেন তা যেন পূর্বনির্ধারিত। সেই নির্ধারিত মাপকাঠিতে মেপেছেন বলেই তাঁর সৃষ্ট শিল্পের (ছোটগল্প, উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রের) সূতামুখ বহুপথ পরিভ্রমণ করে এক অভিন্ন সুরে প্রাগ্রসর। ফলে তিনি প্রাসঙ্গিকভাবে শিল্পের বিভিন্ন শাখায় ছবি এঁকেছেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দ্বারা অনুপ্রাণিত শাসনব্যবস্থা ও শাসকের চরিত্রের, তাদের শাসন যন্ত্রের ও যন্ত্রচালনা কৌশলেরও। তাঁর শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ সামন্ততন্ত্রের যাঁতাকল, মধ্যবিত্তের অভ্যন্তরীণ ও নিম্নবিত্তের ধ্রুপদী (চিরকালীন) সংকট, রাজনীতির অন্দর, ব্রাত্যজীবনকথা এবং এসব নানাবিধ সংকট উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা।

লড়াই-সংগ্রামের ক্ষেত্র পূর্ব থেকে প্রস্তুত হয়েছিল, তুমুল উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে জহির রায়হান কেবল সেই পথে পা রাখলেন, সকলকে জানান দিয়ে, ঘোষণার ধ্বনি তুলে। কো-ইনসিডেন্ট মনে হলেও তাঁর প্রথম কবিতা ‘ওদের জানিয়ে দাও’ প্রকাশ হয় ১৯৪৯ সালে। কবিতায় তিনি জানান দেবার কাজটিই করলেন। তাকে যারা আমলে নেয়নি বা নেবারও প্রয়োজনবোধ করেনি এবং যারা তাঁর উপস্থিতি টের পায়নি উভয় পক্ষকে তিনি জানিয়ে দিলেন। যেনবা বললেন, আমি এসেছি, সর্বশক্তি নিয়ে উপস্থিত। ভারত ভাগ হওয়ার অব্যবহিত পর পূর্ব বাংলায় তাঁর এই জানিয়ে দেওয়ার আগ্রহ থেকে বুঝা যায় জেনেশুনে এই শিল্পী শুরু করেছিলেন তাঁর শিল্প সংগ্রাম। চতুর্দিকে জানিয়ে দিলেন, মানুষকে জাগিয়ে তুলবার বিষয়ে তিনি অসম্ভব আগ্রহী, যেন এটিই তাঁর শিল্পসাধনার মূল লক্ষ্য। তিনি গণমানুষের পক্ষে লড়বেন, প্রয়োজনে তাঁর সমস্ত শিল্প তৎপরতা ও উদ্যম লোলুপ সাম্রাজ্যিক শক্তির বিপরীতে গিয়ে দাঁড়াবে তা পূর্বেই স্পষ্টীকরণ করা হয়েছে।

পারিবারিক আবহে চলচ্চিত্রের নির্মাণ হলেও চলচ্চিত্রের বার্তা খুব স্পষ্ট, বার্তাটি লড়াইয়ের, যেখানে বন্ধনের বাস্তবতা সেখানেই লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যায়—তা ঘর হোক বা কর্মক্ষেত্র—সর্বত্র। এমনকি যে প্রায় ভাষাহীন তাকেও যেন সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াতে বলছেন চলচ্চিত্রকার।

জহির রায়হানের চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়ায় (১৯৭০) মানুষের উঠে ও রুখে দাঁড়ানোর আহবান স্পষ্ট ও শক্তিশালী। বারংবার তা প্রতিধ্বনি হয়েছে। চলচ্চিত্রে বায়ান্নোর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, মজুর ও মেহনতি শ্রেণির জেগে উঠার চিত্র চিত্রণের পাশাপাশি ভাষাহীন মানুষের মুখে ভাষা দেবার মত সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন চলচ্চিত্রকার। চলচ্চিত্রে সমস্ত গন্তব্য এসে মিলিত হয়েছে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার কাছে। মুক্তি সেখানে একমাত্র আরাধ্য। পারিবারিক আবহে চলচ্চিত্রের নির্মাণ হলেও চলচ্চিত্রের বার্তা খুব স্পষ্ট, বার্তাটি লড়াইয়ের, যেখানে বন্ধনের বাস্তবতা সেখানেই লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যায়—তা ঘর হোক বা কর্মক্ষেত্র—সর্বত্র। এমনকি যে প্রায় ভাষাহীন তাকেও যেন সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াতে বলছেন চলচ্চিত্রকার। শ্রমিক-মজুরকে বলছেন মালিকের চোখে চোখ রেখে ন্যায্য পাওনা চাইতে। কৃষকের মুখে আহারের বন্দোবস্ত না হলে সমস্ত ফল-ফসল ধ্বংস করে হলেও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার পক্ষপাতী তিনি। একজন উচ্চকাঙ্ক্ষী সংগ্রামী শিল্পীর পক্ষে কেবল ছোটপাখিদের ঈগলের সঙ্গে যুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা সম্ভব। কোনো অসম যুদ্ধে বাজি ধরার কথা জহির রায়হান অসীম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পেরেছেন। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্র পূর্ব বাংলার গণমানুষকে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মনে করিয়ে দিয়েছে তারাই এদেশের প্রকৃত মালিক। দেশে যাদের শাসন—শোষণ চলছে তারা দখলদার মাত্র। চলচ্চিত্রে বর্ণিত রূপরেখা অনুযায়ী একসময় সত্যি পাকিস্তানী শাসকশ্রেণির সিংহদুয়ারের ভিত্তি কেঁপে উঠেছিল।

শিল্পচর্চার ছদ্মাবরণে জহির রায়হান তাঁর রাজনৈতিক ভাবনা প্রচার করে গেছেন বিরামহীনভাবে। এক্ষেত্রে জার্মান নাট্যকার বের্টল্ড ব্রেখটের (১৮৯৮-১৯৫৬) সঙ্গে তাঁর দারুণ সাযুজ্য। ব্রেখট যেমন ডাক্তারি পেশা ছেড়ে নাটককে বেছে নিলেন, ভাবলেন, উচিত কথাটা বলতে হলে মঞ্চে উঠতে হবে, সেটা সভা-সমিতির মঞ্চ না হলেও অন্তত নাটকের মঞ্চ হতে হবে। তিনি নাটকের মঞ্চে আচমকা অপ্রাসঙ্গিক বিরতি দিয়ে প্ল্যাকার্ড দেখাতে লাগলেন, সেসব প্ল্যাকার্ডে লেখা সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি ও দুর্গতির কথা। সেগুলো বদলে ফেলতে হবে এমনকি সেই তাগিদও দিতে লাগলেন।

এসবের ফল হিসেবে সেকালের সেই সমাজে ও রাষ্ট্রে কী কী পরিবর্তন এসেছিল তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো শিল্পী হিসেবে তিনি তার কাজটি করেছেন অসীম সাহসে, নতুন ভঙ্গি ও পদ্ধতিতে। জহির রায়হানও সিনেমায় দেখিয়েছেন, গল্প ও উপন্যাসে লিখেছেন কীভাবে প্রচল ভাঙতে হবে, কীভাবে চোখে চোখ রাখতে হবে, কীভাবে রক্তচক্ষু ও বুদ্ধিবৃত্তিকে উপেক্ষা করে ডিঙিয়ে যেতে হবে একের পর এক বন্ধ দুয়ার। তাঁর শিল্পভাবনার সিংহভাগজুড়ে আছে এই রাজনীতি যা তিনি আশৈশব দেখেছেন-শিখেছেন। আছে মানুষের অধিকারের প্রসঙ্গ। ফলে ছোটর সঙ্গে বড়র একটা অনিবার্য বিবাদও সেখানে উপস্থিত। সেটা অন্দরে কিংবা বিস্তৃত বন্দরে-সর্বত্র।

জহির রায়হান যে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন তা শেষপর্যন্ত অসমাপ্ত। ঠিক তাঁর না ফেরার মতো। সেই গানের মতো, একজন মানুষ মাঝরাতে বাড়ি ফিরে এলো না। অথচ তাঁর তো ফেরার পিপাসা ছিল। যে অগ্রজের হাত ধরে তিনি সাম্যবাদী রাজনীতির পাঠ নিলেন সেই শহীদুল্লা কায়সারের সন্ধানে গিয়ে তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কোথায় হারালেন। সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার কাজ এখনো ঢের বাকি। (নাকি) এরই মাঝে সেই মিরপুরেই ঘাতকের নৃশংসতায় বিদীর্ণ হয়েছে তাঁর বুক। কোথায় ডুবে গেলেন চিরতরে। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হানের অন্তর্ধান এখনও এক অমীমাংসিত রহস্য হয়েই জাগরুক রইলো আমাদের হৃদয়ে। তাঁকে ফিরে পাওয়ার অবাস্তব অপেক্ষায়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

জহির রায়হানের শিল্পভাবনায় অধিকার ও রাজনীতি