জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রমজানে মিশর সেজে উঠে বাহারি আলোর লন্ঠনে

মাহজাবিন নাফিসা
মাহজাবিন নাফিসা

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ১০
রমজানে মিশর সেজে উঠে বাহারি আলোর লন্ঠনে। ছবি: সংগৃহীত

রমজান মাস মুসলিমদের জন্য খুবই তাৎপর্য পূর্ণ একটি মাস। বিশ্বজুড়েই সব মুসলমান একই নিয়মে মাসব্যাপী এই ইবাদত পালন করেন। তবে নিয়ম একই হলেও, রমজান নিয়ে প্রতিটি দেশেরই আছে নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান। বিভিন্নভাবে দেশগুলো ভিন্নধর্মী নানা আয়োজনে এই মাস বরণ করে নেন। কোথাও তারা ঐতিহ্যবাহী গানের আসর বসান, আবার কোথাও সবাই মিলে মেতে উঠেন খেলাধুলায়। রমজানকে উপলক্ষ্য করে প্রাচীন দেশ মিশর সেজে উঠে বাহারি আলোর লন্ঠনে।

আরবিতে ‘ফানুস’ অর্থ প্রদীপ বা লণ্ঠন। প্রতিবছর রমজান এলেই মিশরের রাস্তা, দোকান ও বাড়িতে জ্বলে ওঠে হরেক রঙের লণ্ঠন। মিশরের এই ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো। রমজান এলেই আলোয় সেজে উঠে পুরো মিশর।

পাল্টে যায় চিরচেনা চিত্র

রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় মিশরের রাস্তার চিত্র। রমজানে কায়রো বা অন্য কোনো শহরে গেলে দেখা যাবে রাস্তার দুই পাশে ঝুলছে বাহারি রঙের ফানুস। ছড়াচ্ছে কোমল নান্দনিক আলো।

শুধু রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোতেই নয়, বাড়ির বারান্দা এমনকি দোকানেও দেখা যায় এই ঐতিহ্যবাহী লণ্ঠন বা ফানুস। মিশরে এখনো ঠিকে থাকা পুরোনো আচার–অনুষ্ঠানের মধ্যে এই ফানুস জ্বালানো প্রথম সারির। রমজানের শুরুতেই তারা বাড়ির প্রধান দরজায় ঝুলিয়ে দেন বড় একটি লন্ঠন। সন্ধ্যার হলেই এগুলো দৃষ্টিনন্দন আলো ছড়ায়। কেউ কেউ ঝুলিয়ে দেয় বাড়ির বারান্দায়ও। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চর্চিত হয়ে আসছে এই সংস্কৃতি।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রিক শব্দ ‘ফ্যানাস’ থেকে ফানুসের উৎপত্তি। পরে যা আরবি শব্দ ভাণ্ডারে প্রবেশ করেছে। এর অর্থ বহনযোগ্য লণ্ঠন, যা থেকে আলো বের হয়।

ফানুস সংস্কৃতির শুরু

ফানুস নিয়ে অনেক প্রচীন গল্প ও রূপকথা আছে। তবে এর উৎপত্তি নিয়ে আছে অনেক মতভেদ। তবে একটি বিষয়ে সব ইতিহাসবেত্তাই একমত যে, মিশরীয়রাই প্রথম ফানুসের প্রচলন করেন এবং পরে আরবের অন্যান্য দেশে এটি ছড়িয়ে দেন।

একটি গল্পে বলা হয়েছে, ৩৫৮ হিজরির রমজান মাসের পঞ্চম দিনে ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজ প্রথম কায়রো শহরে প্রবেশ করেছিলেন। ওই দিন খলিফাকে স্বাগত জানাতে হাজার হাজার মিশরীয় নারী–পুরুষ জড়ো হয়েছিল কায়রোর পশ্চিমে বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তরে। তখন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সবার হাতে ছিল রঙিন লণ্ঠন যেন পথ আলোকিত হয়। ধারণা করা হয়, এর পর থেকেই মিশরে আনন্দের প্রতীক ও ঐতিহ্য হয়ে ওঠে রঙিন ফানুস।

অন্য একটি গল্পে শোনা যায়, ফাতেমীয় খলিফাদেরই একজন (তাঁর নাম জানা যায় না) রমজান মাসে পুরো রাত কায়রোর রাস্তা আলোকিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি মসজিদের ভেতর আলোকিত করার জন্য ছাদ থেকে ফানুস ঝোলাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

লণ্ঠন কারিগর

ফানুস বা লণ্ঠন জ্বালানোর সংস্কৃতি রমজান মাসে দেখা গেলেও এটি কোনো মৌসুমি শিল্প নয়। সারা বছর ধরেই মিশরীয় কারিগরেরা ফানুস বানান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লন্ঠনের আকার, আকৃতি ও নকশায় পরিবর্তন এসেছে। ধারণা করা হয়, মিশরের অন্যান্য শহরের চেয়ে কায়রো শহরে সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছে ফানুস শিল্পের। তবে এল দার্ব এল আহমার, আল ঘওরিয়া, সাইদা জেইনাব ও আল ফিল এর মতো এলাকাগুলোতে ফানুস তৈরির বহু কারখানা রয়েছে। এসব এলাকায় অনেক পরিবার বংশ পরম্পরায় ফানুস তৈরি করছে।

রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় মিশরের রাস্তার চিত্র। ছবি: সংগৃহীত
রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় মিশরের রাস্তার চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

মিশরে লণ্ঠনের উৎপত্তি হলেও দ্রুত আশপাশের অঞ্চল যেমন দামেস্ক, আলেপ্পো, জেরুজালেম ও গাজায়ও ফানুস সংস্কৃতি ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

জেরুজালেমেও প্রচুর ফানুস কারিগর রয়েছে। তারা শক্ত লোহার কাঠামোর মধ্যে কাচ বসিয়ে ফানুস তৈরি করে। আর কাচের গায়ে রঙিন আলপনা আঁকে। রমজান মাসে জেরুজালেমের ওল্ড সিটি মার্কেট ও সড়কের পাশের দোকানগুলোতে এসব ফানুস বিক্রি হতে দেখা যায়। এসব ফানুস খুব উচ্চমূল্যের হলেও জেরুজালেমে এটি বেশ জনপ্রিয়। প্রায় প্রতিটি পরিবার চেষ্টা করে, রমজান মাসে ফানুস জ্বালাতে।

নানা রঙের বাহারি লণ্ঠন

মিশরের সবচেয়ে জনপ্রিয় লণ্ঠন বা ফানুস হলো প্রাচীন মিশরীয় পার্লামেন্টে ঝোলানো এক ফানুস। এটিই এখন পর্যন্ত টিকে থাকা মিশরের সবচেয়ে পুরোনো নকশার লণ্ঠন বলে মনে করা হয়। মিশরে এটি পার্লামেন্ট ফানুস নামে পরিচিত।

মিশরে আরেকটি জনপ্রিয় লণ্ঠনের নাম ‘ফারুক ফানুস’। এটি বাদশা ফারুকের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে প্রচলিত গল্পটি হলো নিজের জন্মদিন উদযাপনের জন্য রাজা ফারুক তাঁর ভৃত্যদের রাজপ্রসাদ সাজাতে বলতেন। তখন যে বিশেষ ধরনের লণ্ঠন দিয়ে রাজপ্রাসাদ সাজানো হতো, সেটিই পরে ‘ফারুক ফানুস’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

এ ছাড়াও ইতিহাসে আবু হাশওয়া, আবু শরফ ও আবু আল ওয়ালাদ নামে ফানুস পাওয়া যায়। এসব নাম অবশ্য কোনো রাজা–বাদশাহদের নাম নয়। বরং এই ফানুসগুলো পরিচিত হয়ে উঠেছে এদের কারিগরদের নামে। কারণ এই ফানুসগুলো ডিজাইন এতটাই আকর্ষণীয় যে, তাদের নামেই ফানুসগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াতেও প্রচুর ফানুস তৈরির কারখানা রয়েছে। সেখানকার আহমেদ আল সাঈদ নামের এক কারিগর বলেন, ‘আমি লোহা ও কাপড় ব্যবহার করে লণ্ঠন বানাই। আমার লণ্ঠনের নাম ‘খায়ামিয়া’। এটি দেখতে অনেকটা আলাদিনের আশ্চর্য লণ্ঠনের মতো।’

লণ্ঠন তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আহমেদ আল সাঈদ বলেন, ‘প্রথমে লোহার তার দিয়ে লণ্ঠনের ভেতরের কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর কামারশালায় নিয়ে এটির চরপাশে লোহার বেড় দেওয়া হয়। এরপর বাতি জ্বালানোর জন্য বৈদ্যুতিক মোটর স্থাপন করা হয়। সবশেষে খায়ামিয়া কাপড় দিয়ে লণ্ঠনটিকে ঢেকে দিয়ে দোকানে পাঠানো হয় বিক্রির জন্য।’

এই রমজানেও কায়রো সেজে উঠেছে বর্ণিল ফানুসে। এসব ফানুস কিংবা লণ্ঠন শুধু ঘর আর রাস্তাকেই আলোকিত করে না, বরং হাজার বছরের পুরোনো এক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখে।

তথ্যসূত্র: মিশরীয় সংবাদমাধ্যম আল মাজাল্লা, দ্য ন্যাশনাল নিউজ ও ইজিপশিয়ান স্ট্রিট

সম্পর্কিত