মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

খাজা আহমদ আব্বাসের গল্প: তিন ঝাড়ুদার

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ১৭: ৩৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ খাজা আহমদ আব্বাসের (১৯১৪–১৯৮৭) মৃত্যুদিন। তিনি ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলন ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, উর্দু লেখক, সাংবাদিক, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। জন্ম ভারতের পানিপতে। উর্দু সাহিত্যের দিকপাল মাওলানা আলতাফ হোসেন হালি ছিলেন তাঁর মাতামহর বাবা। তাঁর পিতামহর বাবা খাজা গোলাম আব্বাস ছিলেন পানিপতের প্রথম শহীদ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের অন্যতম বীর।

আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ও আইনে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি ১৯৩৫ সালে ‘দ্য বম্বে ক্রনিকল’ পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত কলাম ‘লাস্ট পেজ’ শুরু করেন। চালু রাখেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এটি ভারতের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক কলাম হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের অনেক বড় বড় নেতা ও ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যার মধ্যে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, নিকিতা ক্রুশ্চেভ, চার্লি চ্যাপলিন ও ইউরি গ্যাগারিন অন্যতম।

যারা রাজ কাপুরের কালজয়ী সিনেমা আওয়ারা, শ্রী ৪২০, মেরা নাম জোকার বা ববি দেখেছেন, তাঁরা জানতে পারেন যে এই সিনেমাগুলোর তিনি ছিলেন চিত্রনাট্যকার। পরিচালক হিসেবেও তিনি ছিলেন খ্যাতনামা। ১৯৪৬ সালে বাংলার ভয়াবহ মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে তাঁর পরিচালিত ‘ধরতি কে লাল’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম সামাজিক বাস্তববাদী চলচ্চিত্রগুলোর একটি। অমিতাভ বচ্চনকে রুপালি পর্দায় প্রথম নিয়ে এসেছিলেন তাঁর ‘সাত হিন্দুস্তানি’ সিনেমার মাধ্যমে। তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক কান চলচ্চিত্র উৎসবেও তাঁর কাজের অসামান্য স্বীকৃতি মিলেছে।

১৯৬৮ সালে খাজা আহমদ আব্বাস নির্মিত ডকুমেন্টারি ‘চার শহর এক কাহানি’ তৈরি করেন। বিষয় তৎকালীন ভারতের প্রধান শহরগুলোর চরম ধনী-দরিদ্র বৈষম্য। এই কারণেই সেন্সর বোর্ড এটিকে সবার জন্য যোগ্য সার্টিফিকেট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর বিরুদ্ধে আব্বাস ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক মামলা দায়ের করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, সিনেমা বাক-প্রকাশের মাধ্যম এবং সেন্সরশিপ তাঁর মৌলিক বাক-স্বাধীনতার পরিপন্থী। আদালত ‘পূর্ব-সেন্সরশিপ’-এর সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখে। তবে এই মামলার রায়ে আদালত সেন্সর বোর্ডের ক্ষমতার ওপর সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। আব্বাসের এই সাহসী লড়াই আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা রক্ষার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ কথাসাহিত্যিক। ৭৪টি বই এবং ৯০টি ছোটগল্প লিখেছেন। উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজি—তিনটি ভাষাতেই ছিল তাঁর অসামান্য দখল। কিন্তু তাঁর সমস্ত কাজের মূল উপজীব্য ছিল ‘মানুষ’। তিনি চেয়েছেন মানুষের দুর্দশা, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বৈষম্যের কথাগুলো সাহসের সাথে তুলে ধরতে।

তিন ঝাড়ুদার

মধ্যপ্রদেশের সরকার ঘোষণা করেছে, কোনো উচ্চবর্ণের মানুষ যদি মিউনিসিপ্যালিটিতে ঝাড়ুদারের কাজ করতে রাজি হন, তবে বেতনের পাশাপাশি তাকে মাসে নব্বই টাকা করে বাড়তি বিশেষ ভাতা দেওয়া হবে। অস্পৃশ্যতা দূর করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। (দৈনিক ভোপালের খবর)

সূর্য ওঠার আগেই মিউনিসিপ্যালিটির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সেই তিনজন নতুন ঝাড়ুদার তাদের ঝাড়ু আর ঝুড়ি নিয়ে ডিউটিতে চলে এল। স্যানিটারি ইন্সপেক্টর রেজিস্ট্রারে চোখ বুলিয়ে ঝাড়ুদারদের জমাদারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, তোমার তিনজন ঝাড়ুদারই কি হাজির?’

‘জি হুজুর,’ জবাব দিল জমাদার। প্রমাণ হিসেবে সে তখনই হাজিরা নিতে শুরু করল।

‘পণ্ডিত কৃপা রাম হাজির?’

‘হাজির।’

‘বাবু কালীচরণ হাজির?’

‘হাজির।’

‘শেখ রহিমুদ্দিন হাজির?’

‘হাজির।’

স্যানিটারি ইন্সপেক্টর সাইকেলে চেপে অন্য এলাকা দেখতে বেরিয়ে পড়লেন। যাওয়ার সময় জমাদারকে বলে গেলেন, ‘এই নতুন তিনজনকে কাজ শেখানোর দায়িত্ব তোমার।’

এই জমাদারের বাবা-দাদা সাত পুরুষ ধরে এই শহরে ঝাড়ুদারের কাজ করে আসছে। মিউনিসিপ্যালিটিতে বিশ বছর চাকরি করার পর সে নিজে জমাদার পদ পর্যন্ত পৌঁছেছে। তার অধীনে শত শত ঝাড়ুদার কাজ করেছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তার নিজের জাত-ভাইদের কী যে হয়েছে কে জানে! তারা সবাই বাপ-দাদার পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে চার ক্লাস পড়া ছোকরারা এখন হাতে ঝাড়ু নেওয়াটাকে পাপ বলে মনে করে। অনেকে পাশের শহরের চিনির কারখানায় চাকরি নিয়েছে। একজন তো অবৈধ মদ তৈরির ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। চারজন ছেলে বাড়ি ছেড়ে মুম্বাই চলে গেল। তাদের মধ্যে তিনজন নিরুদ্দেশ। আরেকজনের কথা শোনা গেছে, সে নাকি কোনো ফিল্ম কোম্পানিতে এক্সট্রা হিসেবে কাজ করে আর তাজমহল হোটেলের পাশের ফুটপাতে রাত কাটায়।

‘বোকা কোথাকার!’ ছেলেটার কথা ভেবে জমাদার মনে মনে বলল, ‘লেখাপড়া জানা ঝাড়ুদার তো চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই জমাদার হয়ে যায়। আর তুই কিনা রাস্তায় রাত কাটাস!’

এরপর সে তাকাল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তিনজন নতুন রিক্রুটের দিকে। তিনজনই তার আদেশের অপেক্ষায় ছিল।

পণ্ডিত কৃপা রাম। রোগা-পাতলা, মাথা ন্যাড়া। চোখে লোহার ফ্রেমের চশমা। সে মিউনিসিপ্যালিটিরই একটা স্কুলের শিক্ষক ছিল। জমাদার তাকে ভালোভাবেই চেনে। চার বছর আগে সে তার ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়েছিল। তখন এই পণ্ডিত কৃপা রামই বলেছিল তার ছেলেকে ক্লাসের অন্য সব বাচ্চাদের থেকে আলাদা বসতে। বলেছিল, ‘জমাদার ভাই, কিছু মনে করো না। আমি নিজে জাতপাত বা অস্পৃশ্যতায় বিশ্বাস করি না, কিন্তু স্কুলে যে বাচ্চারা পড়ে, তাদের বাবা-মায়ের কথাও তো বিবেচনায় রাখতে হয়।’

তাই জমাদার এবার জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার পণ্ডিত, আজ তোমার হাতে ঝাড়ু-ঝুড়ি কীভাবে এল?’

পণ্ডিত কৃপা রাম চশমার ফাঁক দিয়ে জমাদারকে এক নজর দেখে জবাব দিল, ‘সব কলিযুগের মায়া, জমাদার। পঁচিশ বছর ধরে ছেলেদের পড়াচ্ছি, তাও বেতন পাই সত্তর টাকা। ঘরে দুটো সোমত্থ মেয়ে। বিয়ে না দিয়ে বসে আছি। মরিয়া না হয়ে উপায় কী!’

‘পণ্ডিতজি, কিছু মনে করবেন না।’ পণ্ডিতের কথাগুলোই চিবিয়ে চিবিয়ে জমাদার যেন পালটা উগড়ে দিল, ‘সামনের গলির নর্দমাগুলো ভালো করে ঘষে পরিষ্কার করে ফেলো। তবে জলদি করবে। এরপর চকের পাবলিক টয়লেটটাও পরিষ্কার করতে হবে।’

পাবলিক টয়লেটের নাম শুনতেই পণ্ডিত কৃপা রামের গা গুলিয়ে বমি এল। পায়খানার স্তূপে কিলবিল করা পোকাগুলো যেন তার চোখের সামনে নাচতে লাগল। শুধু চিন্তাতেই তার নাকে যেন ভ্যাপসা দুর্গন্ধ আসতে লাগল। সে চুপচাপ ঝাড়ু তুলে নর্দমা পরিষ্কার করতে শুরু করল। কিন্তু ঝাড়ুটা ছিল ছোট। এতই ছোট যে তাকে ঝুঁকে কুঁজো হতে হচ্ছিল। আর তাতে তার বয়স্ক ও বাতে ভোগা হাড়গুলো খটখট করে শব্দ করছিল।

এরপর জমাদার শেখ রহিমুদ্দিনের দিকে তাকাল, ‘কী শেখজি, তুমি কীভাবে এই পেশায় এলে?’

রহিমুদ্দিন মাথা নিচু করে মুখটা এমনভাবে করে দাঁড়িয়ে ছিল যেন কোনো অন্যায় করেছে। তার বংশে এর আগে কেউ কোনোদিন চাকরি করেনি। চিরকাল জমিদারির ওপরই তাদের জীবন কেটেছে। তার দাদার অর্ধেক সম্পত্তি এক বাঈজির পেছনে খরচ হয়ে গিয়েছিল। তার বাবা কোনো ভারী বিলাসিতার ভার বইতে পারেননি। সারাদিন শুধু হুক্কা টানতেন আর বৈঠকি ঘরে তার মতো ‘ভদ্র’ বন্ধুদের সঙ্গে বসে পাশা খেলতেন। ছেলেকে বাড়িতে কিছুটা আরবি-ফারসি পড়িয়েছিলেন। তিন-চার বছরের জন্য স্থানীয় মুসলিম স্কুলেও ইংরেজি পড়তে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিন বছর পরপর ফেল করার পর স্কুল থেকে নাম কাটিয়ে দেওয়া হয়। তারপর জমিদারিও গেল। এই ঐতিহাসিক ধাক্কা তিনি সামলাতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর পর জমির বদলে যে ‘বন্ড’ পেয়েছিল, সেগুলো বেচে রহিমুদ্দিন তিন মাস কলকাতায় ঘুরে সব খরচ করে ফেলেছে। এখন তার কাছে আছে শুধু একটা ভাঙাচোরা ঘর, দাদার আমলের একটা জরির কাজ করা শেরওয়ানি আর বাবার স্মৃতিমাখা একটা হুক্কা। সেই হুক্কার তামা দিয়ে বাঁধানো তলায় খোদাই করা আছে: ‘শেখ করিমুদ্দিন, রইস-ই-আজম, কুর্সিনশিন জিলা দরবার।’

‘জমাদার সাহেব,’ সে খোশামুদে গলায় বলল, ‘এসব তো কালের খেলা। তবে আপনি তো জানেন, আমাদের মুসলমানদের মধ্যে তো কোনো জাতপাতের ব্যাপার নেই। নিজের হাতে কাজ করা দোষের কিছু নয়।’

কিন্তু জমাদারের মনে পড়ে গেল, যখন এই শেখ রহিমুদ্দিনের বিয়ে হয়েছিল, তখন তার বাবা কীভাবে অতিথিদের খাওয়া শেষে ফেলে দেওয়া এঁটো খাবার ঝাড়ুদারদের দিয়েছিল। জমাদারের বড় ছেলে বলেছিল, ‘শেখজি, পুরো দুই দিন আপনার বাড়ির পরিষ্কারের কাজ করেছি। মজুরি হিসেবে টাকা দিন, এঁটো খাবার কেন দিচ্ছেন?’—তখন সেই বুড়ো জমিদার তাকে মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। চিৎকার করে বলেছিল, ‘দেখো এদের সাহস, এই ছোটলোকদের! এরা চায় আমরা ভদ্রলোকেরা এদের সমান আসনে বসিয়ে পোলাও-কোরমা খাওয়াই?’

জমাদার এবার বলল, ‘শেখজি, ওই যে ময়লার স্তূপটা দেখছো, ওটা ঝুড়িতে ভরে মিউনিসিপ্যালিটির গাড়িতে তুলে দাও। তারপর পণ্ডিতজিকে চকের পাবলিক টয়লেট পরিষ্কারের কাজে সাহায্য করতে হবে।’

রহিমুদ্দিন ময়লা ঝুড়িতে ভরতে শুরু করতেই দেখল, তাতে মহল্লায় সবার ফেলে দেওয়া এঁটো খাবার পড়ে আছে—পচা তরকারি, বাসি রুটির টুকরো, ডিমের খোসা, মাংসের চর্বি, চিবানো হাড়, আর সঙ্গে একটা মরা ছুঁচো। গরু-ছাগলের গোবর, গলিজুড়ে বাচ্চাদের করা পায়খানা। ময়লার স্তূপটা যত কমতে লাগল, তার দুর্গন্ধের ভ্যাপসা ভাব তত বাড়তে লাগল। শেষমেশ অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, দুর্গন্ধের চোটে রহিমুদ্দিনকে নিজের বমি করা জায়গাটাও পরিষ্কার করতে হলো।

অবশেষে আর একজন ঝাড়ুদার বাকি রইল—কালীচরণ। কিন্তু জমাদার তাকে চিনতে পারল না।

‘বাবু কালীচরণ, কোত্থেকে আসা হয়েছে? তোমাকে তো আগে কখনও দেখিনি।’

‘জমাদার সাহেব, আমি এই শহরের নই। বিক্রমপুর থেকে এসেছি।’

জমাদার দেখল সূর্য বেশ উপরে উঠে এসেছে। এখন আর গল্পগুজব করার সময় নেই। তাই সে বলল, ‘বাবু কালীচরণ, যাও আগে রহিমুদ্দিনকে সাহায্য করো। তারপর পণ্ডিতের সঙ্গে মিলে নর্দমাগুলো ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করবে।’

‘বাবু কালীচরণ।’ জমাদার মনে মনে তৃতীয় ঝাড়ুদারের নামটি আওড়ালো। ভাবল, ‘কোনো কায়স্থ-টায়স্থ হবে। হয়তো আদালতে মুহুরি ছিল। কিংবা কোনো ছোটখাটো স্কুলের মাস্টার। হুঁ হুঁ…ভাইজান, আপনার বাবুগিরি এখনই বেরিয়ে যাবে। এসেছে বাবু কালীচরণ কোথাকার!’ কিন্তু সেই মুহূর্তেই সে দেখল, কালীচরণ খুব ক্ষিপ্রতার সাথে কাজ করছে। মাত্র তিনবারেই সে ময়লার পুরো স্তূপ গাড়িতে তুলে ফেলেছে। এখন সে একটা টিনের টুকরো দিয়ে মাটিতে লেগে থাকা ময়লাগুলো খুঁটে পরিষ্কার করছে। তারপর মিউনিসিপ্যালিটির একটা কল থেকে টিনের ক্যানেস্তারা ভরে জল ঢেলে নর্দমাটা ঝাড়ু দিয়ে ঘষতে শুরু করল। দেখে মনে হচ্ছে একজন অভিজ্ঞ পুরানো ঝাড়ুদার। জমাদারের মনে পড়ে গেল, সে যখন জমাদার হয়নি তখন নিজেও ঠিক এভাবেই ক্ষিপ্রতার সাথে কাজ করত। কালীচরণকে নিয়ে ধন্দে পড়ে গেল জমাদার।

‘এই বাবু, এদিকে এসো তো।’ সে ডেকে কালীচরণকে গলির এক কোণে নিয়ে গেল।

‘কোনো ভুল করেছি? আমার কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না?’

‘তোমার নাম কী?’

‘কালীচরণ।’

‘জাত কী?’

‘কায়স্থ।’

‘কোন কায়স্থ?’

‘জি... আমরা সাক্সেনা।’

‘আগে কী কাজ করতে?’

‘এই ধরুন... বিক্রমপুর মিউনিসিপ্যালিটিতে কাজ করতাম।’

‘কোন বিভাগে?’

‘জি... এই ধরুন, সাফাই বিভাগে ছিলাম।’

‘হ্যাঁ, তো জাত কী বললে?’

‘জি... কায়স্থ।’

‘তুমি মিথ্যে বলছ।’

‘জি?’

‘তুমি ঝাড়ুদার... মানে, আমার মতো।’

‘আস্তে বলুন।’ কালীচরণ হাত জোড় করে বলল, ‘কেউ শুনে ফেলবে।’

‘লজ্জার কথা! নব্বই টাকার জন্য এত বড় মিথ্যে বললে? নিজের জাতকে অস্বীকার করলে?’

‘কী করব জমাদার সাহেব? ছেলেকে পড়াচ্ছি। মাসে চল্লিশ টাকায় তার খরচ চালাব কীভাবে? আপনার কৃপা থাকলে সে কলেজ পর্যন্ত পড়তে পারবে।’

‘আচ্ছা।’ জমাদার কিছুক্ষণ ভেবে ধীর গলায় বলল, ‘তবে একটা শর্ত আছে।’

‘যা বলবেন, জমাদার সাহেব। আপনিই মালিক।’

‘ভবিষ্যতে আর কখনও এমন ঝটপট নিখুঁত কাজ করবে না, তাহলে ধরা পড়ে যাবে।’ তারপর সে চিৎকার করে সবাইকে শুনিয়ে বলল, ‘কালীচরণ! তুমি বাবু হলে নিজের বাড়িতেই থেকো। ঝাড়ুদারের কাজ করতে এসেছ, তাহলে ঝাড়ুদারের মতোই কাজ করতে হবে। নব্বই টাকা স্পেশাল অ্যালাউন্স নিচ্ছ...’

এখন সেই তিনজন ঝাড়ুদারই গলিতে ঝাড়ু দিচ্ছে আর জমাদার তার গোঁফে তা দিচ্ছে।

(মূল উর্দু গল্প ‘তিন ভাংগি’। ভূমিকা ও অনুবাদ: জাভেদ হুসেন)

সম্পর্কিত