ad
জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ

নবম পর্ব/রংবাহারি গ্রামীণ অভিজাত সমাজ: রায় সাহেব, খান্দান আর বেপারিদের সমাহার

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যামিলি ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: বিটুইন মেমোরিজ অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের অনুবাদের একাংশ। বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা স্ট্রিমের জন্য অনুবাদ করবেন জি এইচ হাবীব। এবার প্রকাশিত হলো নবম কিস্তি।

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ২০: ৪৩
জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

(অষ্টম পর্ব পড়ুন এখানে)

১৯৫১ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে আমি এ-ধরনের কয়েকজন মিলে ভাড়া করা বাসায় কিছুদিন কাটিয়েছিলাম। আমার মায়ের এক জ্ঞাতি ভাই সেখানে চল্লিশের দশকের শেষভাগ থেকেই থাকতেন। তখনও তিনি অবিবাহিত ছিলেন, যদিও সপ্তাহান্তে গ্রামে তাঁর বাবা-মায়ের কাছে বেড়াতে যেতেন। তিনি আমার মায়ের অন্যতম সফল জ্ঞাতি ভাই হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মুসলিম বাসিন্দারা অর্থাৎ অর্থাৎ পুরোনো খানদান, পুরোনো ব্যবসায়ী, অল্প কয়েকজন মুসলমান জমিদার, ওস্তাগার (ইটের বাড়ি নির্মাতা) ও তথাকথিত কুট্টিরা—যাদেরকে মোগল বাহিনীর অবশেষ বলে মনে করা হতো, এদের বাদ দিলে পূর্ণকালীন মুসলিম নগরবাসীর সংখ্যা তখনও সীমিত ছিল। ১৯৫০-এর দশকে ক্রমবর্ধমান সরকারি কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের আকস্মিকভাবে ও অতি দ্রুত বেড়ে যাওয়া শিক্ষার্থী এবং শহরে এসে ভিড় জমানো নতুন নতুন ব্যবসায়ী ও কারবারিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে নতুন নতুন ঘর-বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত এ ধরনের শহরবাসীদের আগমন ঠিক সেভাবে বোঝা যায়নি।

কিছু পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল অন্যত্র কর্মরত তাদের পুত্রদের ডাকযোগে পাঠানো টাকা। কলকাতা এবং ঔপনিবেশিক বাংলার বিভিন্ন অংশে থাকা ও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা শিক্ষিত তরুণদের কাছ থেকে এই আর্থিক সহায়তা আসত। কর্মজীবী পুত্রদের আয় থেকে বর্ধিত পরিবারের জন্য পাঠানো এই সহায়তা হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের ক্ষেত্রেই সাধারণ ছিল। তবে পার্থক্য ছিল এই যে, বিকাশমান পেশাজীবীদের মধ্যে মুসলিমরাই ছিল নতুন মুখ।

একবার আমি আমার শ্বশুর মহোদয়ের ডায়েরি ও কলকাতায় ১৯২০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকের কিছু ব্যক্তিগত চিঠি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম—তবে সেগুলো কোন বছরের, তা ঠিক মনে নেই আমার। তো, সেখানে তিনি আমাদের বাড়ির কাছেই থাকা দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনদের কয়েকজনকে কলকাতা থেকে যে টাকা পাঠাতেন, তার পরিমাণ খুঁটিনাটি বিবরণসহ লিখে রেখেছিলেন। তিনি কিছুদিন তাঁর এক ভাগ্নে বা ভাতিজার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে, তিনি তাঁর বড় ভাইয়ের জন্য নরসিংদীতে একটি বাণিজ্যিক সম্পত্তিও কিনে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি ব্যবসা করে দেশে নিজের আয়-রোজগার বাড়াতে পারেন।

প্রাক্তন সৈন্যরাও স্বেচ্ছাসেবকদের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ দিতেন; সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য তাঁরা গ্রাম্য পাহারাদারদের দলও গঠন করতেন।

নতুন মুসলমান পেশাজীবীরা যে তাঁদের ভাই, বোন, ভাগ্নে বা ভাতিজাদের স্কুলে যেতে সাহায্য করেছিলেন, তা ছিল গ্রামীণ বাংলায়, যার একটা বড় অংশ এখন বাংলাদেশ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানে একটি বাড়তি অবদান। আমার বাবাও তাঁর এক ভাতিজার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছিলেন, যতদিন না যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আমার বাবা আমার দাদী এবং তাঁর দুই ভাইঝির দেখাশোনা করতেন। বৃহত্তর পরিবারের আত্মীয়দের প্রতি এ ধরনের দায়িত্ব পালন করা সে সময়ে একটি ধর্মীয় কর্তব্যের মতোই ছিল প্রায়। পূর্ববর্তী প্রজন্মের শুভাশিষ আর উদারতাই ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রসারে সাহায্য করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন মুসলমান নেতা তৈরি করেছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে জাতীয় নেতা হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন।

১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে যেসব তরুণ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ, দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক ডামাডোল দেখেছিল, তারা এক নতুন মন-মানসিকতা নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। তারা একটি সুপ্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য বহির্জগতের নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল। এটি ছিল ইতিহাসের এমন এক পর্যায়, যা আমার বাবা-মা ও দাদা-দাদী যে সংকীর্ণ প্রবেশমুখ দিয়ে মহাবিশ্বকে দেখতেন, তার চেয়ে আলাদা।

যুদ্ধকালীন মুষ্টিমেয় কয়েকজন সরবরাহকারী ও ছোটখাটো ঠিকাদার, যারা ঢাকায় নিজেদের ছোট নির্মাণ সংস্থা শুরু করেছিল, তারা প্রচলিত আমলা, আইনজীবী, ডাক্তার এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের থেকে দৃশ্যত আলাদা ছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই যে উচ্চবিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেনি, তাতে বিশেষ কিছু যায় আসেনি। তারা ছিল এক নতুন প্রজন্মের মানুষ। পরবর্তী জীবনে তাদের প্রায় সকলেই সচ্ছল হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের পর সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসার পর তাঁরা ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

যেহেতু কালিগঞ্জ ছিল আঞ্চলিক কেন্দ্র, যেখানে একটি স্কুল, একটি থানা, একটি ডাকঘর এবং কয়েকটি থানা অফিস (উপজেলা পর্যায়ের), একটি বাজার, একটি নদীবন্দর, নিকটবর্তী রেলস্টেশন এবং একটি ভূমি নিবন্ধন কার্যালয় ছিল, তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই অঞ্চলের তরুণ প্রত্যাবর্তনকারীরা স্থানীয় শহরে নিজেদের একটা জায়গা করে নিয়েছিল। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বড় বড় খেলার মাঠ থাকায় শহরটি রাজনৈতিক সভা ও সামাজিক সমাবেশের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়; তরুণ যুদ্ধ-ফেরতাদের সেখানে আনাগোনা করতে দেখা যেত।

আমি কেবল দুজন হিন্দু যুবককে (তাঁদের একজন স্থানীয় দোকানদারের ছেলে, এবং অন্যজন স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উৎসাহী এক যুবক) বিভিন্ন প্রাক্তন সৈনিক, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ও কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের এই দলের সঙ্গে ওঠা বসা করতে দেখেছিলাম। তাছাড়াও, আমি গ্রামীণ উদীয়মান অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে কয়েকজন মাদ্রাসার ছাত্র, মৌলভী এবং ধর্মীয় নেতাকে দেখেছিলাম; শহরের মসজিদে আয়োজিত মিলাদ অনুষ্ঠানে কয়েকজন সুপরিচিত মৌলভীদের কথাও আমার মনে পড়ে।

আমি এরকমই একজন যুদ্ধকালীন সেবাকর্মীকে চিনতাম, যিনি পরে ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে বিশাল কালীগঞ্জ মসলিন সুতাকলের ঠিকাদার হয়েছিলেন। আমার মনে আছে, প্রকল্পটি জাপানি কারিগরি সহায়তায় তৈরি করা হয়েছিল। সেসব উদ্যোগী তরুণদের মধ্যে কয়েকজন সেই বস্ত্র কারখানায় চাকরি বা ব্যবসার সুযোগ খুঁজছিলেন। তাঁরা প্রায়ই কালীগঞ্জে যেতেন এবং সেই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত জাপানি নির্মাতা ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতেন। অল্প ক’জন ছাড়া, জাপানি ঠিকাদার ও তাঁদের ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি সমকক্ষরা সাধারণত অনর্গল বাংলা বলত না; ভাঙা ভাঙা ইংরেজি অথবা ইংরেজি, উর্দু ও বাংলার এক অদ্ভুত মিশেলেই প্রধানত দুই পক্ষের মধ্যে কথাবার্তা চলত।

এর আগে, সদ্য সামরিক চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া একদল সৈনিক এলাকায় নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করত। লঙ্গরখানাগুলো ১৯৪২-১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করত; আমার ধারণা, ১৯৪৬ সালেও স্কুলের খেলার মাঠে সেগুলো সক্রিয় ছিল। কোনো একটি স্কুলের এক ছাত্রাবাসে একটি ছোট সেনা ছাউনি ছিল। স্থানীয় কিছু কর্মকর্তা, গ্রাম পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে গঠিত অস্থায়ী কমিটিগুলো বিনামূল্যে এসব লঙ্গরখানা বা খাবার দেওয়ার রান্নাঘরগুলো চালাত। স্বেচ্ছাসেবকরা ক্ষুধাকাতর প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ ও শিশুদের বিশাল ভিড়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করত। আমার এখনো মনে আছে, কয়েক ডজন ক্ষুধার্ত ও কৃশকায় নারী-পুরুষ, শিশু, ও নবজাতক বিনামূল্যের খাবারের জন্য খেলার মাঠে এসে ভিড় জমাত এবং তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা প্রায়ই ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হত। খাদ্য সরবরাহ ও রান্নাঘর পরিচালনার দিকটা দেখত বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও একদল স্থানীয় রাজনীতিবিদ। যখনই খাবারের মান ও পরিমাণ কমে যেত, ক্ষুধার্ত নারী পুরুষেরা ঠিকাদার, খাদ্য সরবরাহকারী, ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিত। ত্রাণ তহবিল মূলত তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে আসত ঠিকই, তারপরেও দুর্ভিক্ষের ত্রাণ সামলানো এবং দরিদ্র মানুষদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়া ছিল গ্রামের নেতাদের জন্য একটি সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ।

বিভিন্ন মৌখিক ও লিখিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৩০-এর দশকে ওয়ারী, হাটখোলা, পল্টন ও ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের কাছে নতুন ও অত্যন্ত বিশিষ্ট কিছু আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছিল।

প্রাক্তন সৈন্যরাও স্বেচ্ছাসেবকদের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ দিতেন; সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য তাঁরা গ্রাম্য পাহারাদারদের দলও গঠন করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই প্রাক্তন সৈন্যদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এবং কলকাতা থেকে আসা দু-একজন স্থানীয় লোক মুসলিম লীগের আধাসামরিক শাখা হিসেবেই বেশি পরিচিত মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডে যোগ দিয়েছিলেন। তবে, আমাদের এলাকায় সেটা তেমন কোনো বড় সংগঠন ছিল বলে মনে পড়ে না, যদিও আমার একথা মনে আছে যে সেই পাহারাদার দলের আমাদের গ্রামবাসী একজন সদস্য— আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড় এবং আমার মাছ ধরার সঙ্গী—মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডে কাজ করতেন।

তাঁদের মধ্যে সেই প্রতিবেশীসহ অল্প কয়েকজন পরে আনসার বাহিনীতে যোগ দেন। এটি ছিল আধাসামরিক ও পুলিশের মাঝামাঝি ধরনের একটি বাহিনী। ১৯৪৭ সালের পর নতুন পাকিস্তান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাহায্য করার জন্য এটি তৈরি করেছিল। আমার মনে আছে, সম্ভাব্য দুষ্কৃতকারীদেরকে নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালানো থেকে নিবৃত্ত করার জন্য আমি রাতের বেলা কয়েক ঘণ্টার জন্য পাড়ার রাস্তায় মুরব্বিদের সঙ্গে পাহারায় যোগ দিয়েছিলাম। এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী দলের সঙ্গে যখন যুক্ত হয়েছিলাম তখন আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। মোসলেহউদ্দিন আহমদ নামে একজন প্রাক্তন সৈনিক ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্রমবর্ধমান পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সুপরিচিত কর্মী ছিলেন। তিনি ছিলেন সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং চমৎকার শৌখিন দাড়ি ছিল তাঁর; জনসমক্ষে কথা বলার সময় তিনি সেই দাড়ি বারবার স্পর্শ করতে পছন্দ করতেন। তিনি যখন বড় বড় জনসমাবেশে ভাষণ দিতেন, শ্রোতারা তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনত এবং তারা চাইত তিনি যেন ভবিষ্যতে নির্বাচিত নেতাদের একজন হন।

অবশ্য তাঁর মতো আরো কয়েকজনও ছিলেন। আমার মনে আছে, আমার জ্ঞাতিভাইসহ প্রাক্তন সৈন্যদের মধ্যে কয়েকজন সেনাবাহিনীতে ফিরে গিয়েছিলেন। সেরকমই একজন প্রাক্তন সৈনিক বাড়ি ফেরার সময় একটি গ্রামোফোন নিয়ে এসেছিলেন: সে সময়ে গ্রামেগঞ্জে রেকর্ড প্লেয়ার ছিল বিনোদনের একটি দুর্লভ সামগ্রী। আমার মনে আছে, একদল বয়স্ক ও তরুণ প্রতিবেশী গান শোনার জন্য তাঁর বাড়িতে ভিড় জমিয়েছিল এবং তিনি বেশ গর্বভরে তাঁর নতুন যন্ত্রটি দেখিয়েছিলেন। যুদ্ধ এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় চালু হওয়া তৎকালীন ‘বেসামরিক সরবরাহ বিভাগ’ থেকে ছাঁটাই হওয়া দু-একজন যুবকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে একজনকে পরে সরকার আবার কাজে বহাল করেছিল। আমার মনে আছে, পুলিশে কর্মরত দুজন যুবক ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঠিক আগের দিন শুধু বিয়ে করার জন্য বাড়ি এসেছিল। এক তরুণ প্রতিবেশী, যিনি আগে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগের একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি একজন স্বল্পভাষী সুফিতে পরিণত হয়েছিলেন; তিনি তাঁর বাবার পুকুর পাড়ে একটি গাছের ছায়ায় বসে থাকতেন; লোকজনের সঙ্গে কথা প্রায় বলতেনই না—এমনকি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেও নয়। এই মানুষগুলো ছিলেন—তাঁদের শিক্ষা-দীক্ষা ও পেশাগত স্তর নির্বিশেষে—গ্রামীণ নেতৃত্বের এক নতুন প্রজন্ম এবং অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও বিশ্বদৃষ্টির বিচারে আমার বাবার প্রজন্মের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন রায়ত ও কৃষক পরিবারের; যুদ্ধ, ব্যাপক দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা, দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ও আসন্ন দেশভাগ তাঁদেরকে আরো ভ্রাম্যমাণ ও উদ্যমী করে তুলেছিল।

বিভিন্ন মৌখিক ও লিখিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৩০-এর দশকে ওয়ারী, হাটখোলা, পল্টন ও ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের কাছে নতুন ও অত্যন্ত বিশিষ্ট কিছু আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছিল। সেই বসতিগুলো ছিল প্রায় সংরক্ষিত বা স্বতন্ত্র অঞ্চল, দেশভাগের আগের ঢাকার সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে কয়েকটি; সেখানের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিলেন হিন্দু ভদ্রলোক—পেশাজীবী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ছোট তালুকদার; ১৯৪৭ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাই ছিল আগেভাগে বিত্তশালী হিন্দুদের ঢাকায় চলে সালের কিছু আগে ও পরে তাঁরা এলাকাগুলো ছেড়ে চলে যান। আইনশৃঙ্খলার পরিসর সীমিত এমন কিছু গ্রামীণ এলাকায় চাপা আসার অন্যতম কারণ। স্থানীয় মানুষজনের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৩০-এর দশক থেকে গ্রামগুলোতে ঘন ঘন ডাকাতি হতো এবং বিত্তশালী ভদ্রলোক পরিবারগুলো প্রায়ই তাঁর শিকার হতো। সেসবের অধিকাংশই ছিল হিন্দু পরিবার। আমার বাবা এই প্রবণতাকেই গ্রাম থেকে শহরে গ্রামীণ ভদ্রলোকদের পলায়নের সূচনা বলে উল্লেখ করতেন।

তবে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, ১৯৪৭ সালের বহু বছর পর অব্দি, গ্রামীণ মুসলমান অভিজাত শ্রেণীর লোকজনের মধ্যে আশেপাশের শহরাঞ্চলের দিকে চলে যাওয়ার কোনো প্রবণতা দেখা যায়নি। অনেক মুসলমান খানদান তাঁদের ক্রমবর্ধমান পরিবারের চাহিদা মেটাতে ঋণী হয়ে পড়েছিল, তবে তাঁদের বেশিরভাগেরই শহরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ ও পেশাগত চাপ ছিল না।

গ্রামীণ এই ঋণগ্রস্ততা কৃষকদের উপর অবশ্যই প্রভাব ফেলেছিল—মুসলমান ও হিন্দু এই দুই সম্প্রদায়ের রায়তই গ্রামের সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন নেতাদের কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল। উদীয়মান রাজনীতিবিদদের জন্য, দরিদ্র রায়তদের ঋণ মওকুফ করা ছিল একটি প্রাথমিক কর্তব্য; তাঁদের এলাকার লোকজনদের সন্তানদের স্কুল ও কলেজে পাঠানোর সামর্থ্য ছিল না। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে এ. কে. ফজলুল হক, ও আবুল মনসুর আহমদদের মতো অগ্রণী নেতা এবং একজন জনতুষ্টিমুখী পথপ্রদর্শক মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অধীনে ধারাবাহিক ঋণ মওকুফ এবং আরো মৌলিক ভূমি সংস্কার কার্যকর হয়েছিল; বাংলা ও আসামের মুসলমান কৃষক ও প্রজারা তাঁদের সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁদের মতো কিছু নেতা গ্রামেও ছিলেন: আরো বেশি সংখ্যক ক্ষেতমজুর ও চাষী তাঁদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা এবং শ্রেয়তর পেশাগত সুযোগের জন্য কলেজে পাঠাবার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। আমার শৈশবে স্থানীয় কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদদের মধ্যে আমি কোনো মুসলমান নারীর দেখা পাইনি, কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে হিন্দু ও খ্রিস্টান নারী স্কুলশিক্ষকের দেখা পেয়েছিলাম। আমি আমাদের শহরের এক তরুণী মুসলমান নারীর কথা জানতাম; তিনি সেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর অনেক আত্মীয় সেটা পছন্দ করেননি।

জি এইচ হাবীব: অনুবাদক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

রংবাহারি গ্রামীণ অভিজাত সমাজ: রায় সাহেব, খান্দান আর বেপারিদের সমাহার