জুলাই অভ্যুত্থানের গল্প
আসিফ মাহমুদ খান

সকাল নয়টার আশপাশে তখন। আকাশের দূর প্রান্তে চক্কর কাটছে কয়েকটা নিঃসঙ্গ চিল। মানুষের রক্তের গন্ধ মনে হয় একটু বেশিই টানছে ওদের। স্বৈরাচারকে যেমন টেনেছে গদির লোভ। পুরো জুলাইয়ের ঝড়-ঝাপটায় সবচেয়ে বেশি যারা আঁকড়ে রেখেছে বিপ্লব, তাদেরই এক দুর্লঙ্ঘ ঘাঁটি, যাত্রাবাড়ীজুড়েই তখন চাপা অসন্তোষ। ফিসফাস চলছে। কে, কীভাবে বের হবে এসব নিয়ে চলছে আলোচনা।
১৪৪ ধারা জারি, তার ওপর বিকট শব্দে খুব নিচু থেকে মুহুর্মুহু উড়ে যাচ্ছে টহল হেলিকপ্টার। রাস্তায় গর্জন তুলছে র্যাব-পুলিশের গাড়িগুলো। দোতলার জানালার পাশে বসে আছে মুস্তাকিম। মোটে কলেজে ওঠা ছেলেটাকে দেখলে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই কী তুখোড় বিপ্লবী ও। বুকের পাঁজর জোড়া পুরোটাই যেন কলিজা ছেলেটার।
বাসায় আম্মু নেই, দেশের বাড়িতে বিশেষ একটি কাজে গিয়ে আটকা পড়েছেন তিনি। গাড়ি-ঘোড়া চলছে না। ফেরার কোনো রাস্তাও পাচ্ছেন না। তাই আপাতত বড় আপুই ভরসা।
রান্না করে খাওয়ানো থেকে বকাঝকা, সব কিছুতেই একেবারে আম্মুর কপি হয়েছে বড়াপু, মুস্তাকিম ভাবে।
কাল পুলিশের দুটো গুলি ওর কাঁধ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। একটু ডান-বাম হলেই আজ প্রিয় বন্ধু শাকিলের জায়গায় পড়ে থাকত ওর নিজের লাশ। শাকিলটা পেছনে থাকে সবসময়, ভীতুর ডিম, কিন্তু আন্দোলন শুরু হতেই কী যেন এক জিয়নকাঠির স্পর্শে আমূল বদলে গেল।
প্রথম দিন যখন মিছিলে শাকিলকে দেখল, একটু চমকেছিল বটে। কিন্তু যখন দেখল মিছিলে যে স্লোগান থেকে আগুনের হলকা বেরোচ্ছে, সেই স্লোগান ওর সবসময়ের ব্যাকবেঞ্চার, ভীতুর ডিম বন্ধুটাই দিচ্ছে! তখন ওর সব অনিশ্চয়তা কর্পূরের মতো উবে গেছে। সেসময়েই ওর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে, ওরা জিতবেই।
এক দফা, এক দাবি … দূর থেকে একটা স্লোগানের খণ্ডাংশ ইথারে ভেসে আসতেই, ভাবনাচ্যুতি হলো মুস্তাকিমের। ততক্ষণে বড়াপুও এসে দাঁড়িয়েছে ওর রুমের জানালার কাছে।
‘কী অবস্থা রে? আজকে কি কিছু হবে? তোরা কী করবি? তুই চল আমরা বাড়িতে চলে যাই, নইলে পুলিশ কখন না কখন এসে তোকে ধরবে।’ এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে; আপাতত মুস্তাকিমের মায়ের ভূমিকায় থাকা বড়াপু।
পরিবারের এই একটা মানুষই জানে, কী করেছে মুস্তাকিম।
কাল যখন শাকিল গুলি খেলো, ওরা তখন একসঙ্গে টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচতে আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত। হঠাৎ কেউ একজন চিৎকার করে উঠল, পুলিশ আগাচ্ছে! চারদিন ধরে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে মুস্তাকিমদের আগলে রাখা রাজপথের দখল নিতে আসছে ভীমদর্শন সব এপিসি নিয়ে।
এমন সময় গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। একটার পর একটা ছুটে আসতে লাগল, পুলিশ-ছাত্রলীগের এলোমেলো বুলেট।
রোড ডিভাইডারের পেছনে আশ্রয় নিল ওরা কয়েকজন। গুলির আওয়াজ আস্তে আস্তে আগাচ্ছে, ওদের হাতের কাছে স্রেফ কয়েকটা ইটের টুকরো।
এমন সময় কী যেন হলো। শাকিলের একটা হাত ধরেছিল মুস্তাকিম। ক্লাসে নিয়মিতই নোট দিয়ে আর ক্লাস ফাঁকির হাজিরার মার থেকে বাঁচিয়ে দেয়ায়, ওদের বন্ধুত্ব খুবই ভালো। ওর ধরা হাতটাকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি করতে থাকা পুলিশের দিকে দৌড়াতে শুরু করল ছেলেটা। মুখে সেই মিছিলের স্লোগান … ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম।’ ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ।’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়।’, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ শেষ স্লোগানটার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই লুটিয়ে পড়ল শাকিল। ওর ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ বুকে আশ্রয় নিয়েছে স্বৈরাচারের হায়েনাদের গুলি।
ডিভাইডারের আড়াল ছেড়ে, পড়ে থাকা শাকিলের দিকে ছুটলো মুস্তাকিম। ওর আশপাশ ছুঁয়ে বাতাসে বেড়িয়ে গেল কয়েকটা গুলি।
শাকিলের লুটিয়ে পড়ার পরপরই বন্ধুকে বাঁচাতে মুস্তাকিমের লা-পরোয়া ছুট, যেন মেঘে ঢাকা আকাশের বিদ্যুৎ চমক হয়ে আঘাত করল বিক্ষিপ্ত ছাত্র-জনতাকে। মুস্তাকিমের পেছনে যেন আকাশ থেকে নেমে এলো একঝাঁক দেবদূত। আহত সিংহের ন্যায় উন্মত্ত জনতার ফিরে আসা দেখে ‘যার যার অবস্থান থেকে পালিয়ে গেল’ স্বৈরাচারের হায়েনারা।
শাকিলের নিথর দেহটাকে হাচড়ে-পাচড়ে মাথাটা কোলে তুলে নিল মুস্তাকিম। গলার এক খাবলা মাংস উড়ে গেছে ওর। বুকে অন্তত চারটা গুলি। রক্ত গড়িয়ে গেছে অনেক দূর। অঙ্ক স্যারের দু-চারটা মারের ভয়ে প্রতিদিন মুস্তাকিমের নোটখাতা নিয়ে স্যারকে দেখানো ছেলেটা, কত অবলীলায় পাঁচটা গুলি খেয়ে রাজপথে পড়ে আছে।
নাহ, প্রাণবায়ু আর অবশিষ্ট নেই শাকিলের দেহটায়। কিন্তু ঠোঁটে লেপ্টে আছে এক পশলা হাসি।
কোথা থেকে যেন একটা রিকশা এনেছে কয়েকজন। শাকিলের কোমরে বাঁধা রক্তে মাখামাখি শার্টটা খুলে নিয়েছে মুস্তাকিম। পলকা শরীরটা খুব যত্নে সবাই মিলে উঠাচ্ছে রিকশায়।
কেউ একজন বলে উঠল, আস্তে-সাবধানে, আমাদের ভাই শহীদ। এরপর রিকশা নিয়ে ওদের বাসার গলির দিকে চলে গেছে শাকিলের এলাকার কয়েকজন। কিন্তু রাস্তায় জমে থাকা শাকিলের চাপ চাপ রক্তের পাশে অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল মুস্তাকিম। হাতে ওর বন্ধুর রক্তমাখা শার্ট।
শার্টটা বাসায় নিয়ে এসেছে ও। দরজা খুলেই প্রায় অজ্ঞান হতে বসেছিল বড়াপু। রক্তে মাখামাখি হয়ে কোত্থেকে এলো ও! থাপ্পড়ও দিয়েছে একটা।
কিন্তু ঘটনার সবটা শুনে যেন পাথর হয়ে গেছে বড়াপু। তার ছোট্ট ভাইটা কী বলছে এসব। এই সেদিন যাকে কোলে পিঠে করে এ রুম থেকে ও রুমে নিতেন, সেই মুস্তাকিম আজ পুলিশের বৃষ্টির মতো গুলির ভেতর বসেছিল।
হ্যাংলা যে ছেলেটা মাঝে মাঝে বাসার সামনে এসে মুস্তাকিমের জন্য অপেক্ষা করত, ও এখন জানাজার খাটিয়ায়। রাগ হয় তার, নিতান্ত চুপচাপ বড়াপুর ধবধবে সাদা চেহারাটা রক্তিম হয়ে যেতে দেখে মুস্তাকিম।
অন্য সময় হলে, ভয়ে সটকে পড়তো। কিন্তু আজ ও যায় না। ওর মনে এখন বন্ধু হারানোর শোক।
নিস্তব্ধতা ভাঙেন বড়াপু, কাল আমিও যাব তোর সঙ্গে!
বলো কী, পাগল হইছো! প্রায় আঁতকে ওঠে মুস্তাকিম।
বড়াপু জানেন, পাগল হননি তিনি। তার ভাইগুলো রাজপথে রক্ত বিলিয়ে যে সংগ্রামে নেমেছে, সেটা এখন জনমানুষের হয়ে গেছে। জগদ্দল পাথরের মতো দেশটার বুকের ওপর চেপে বসা স্বৈরাচারকে এবার বিদায় করতেই হবে। নিজের গদিটা টিকিয়ে রাখতে যে রক্তলোলুপ ক্ষমতাসীন, এই ফুলের মতো ছেলেগুলোর ওপর নির্বিচারে গুলি ছোড়ার আদেশ দেয়, লাখো শহীদের রক্তের দামে কেনা, এই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই তার।
এই মুস্তাকিম শোন, আবার ভাবনায় ছেদ পড়ে ছেলেটার। বড়াপু বলে, ডিএনডি খালের দিক থেকে স্লোগানের আওয়াজ আসছে না।
দু ভাই-বোন কান পাতে, ইথারে ভেসে আসে ... ‘লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’, ‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’।
সামান্য ইতস্তত করে দুজন। তারপর কিচেনে জ্বলতে থাকা চুলাটা নিভে যায়। ঘরের দরজার অটো লকে চাবি ঘোরে, ‘ক্লিক’ শব্দ তুলে লক হয়ে যায় দরজাটা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায় দুটো প্রাণ। বড়াপুর মাথায় ছোট্ট ভাইটার কিনে আনা পতাকা বাঁধা আর মুস্তাকিমের কোমরে বাঁধা শাকিলের রক্তমাখা শার্ট।
আজ ৩৬শে জুলাই, আজ জিততেই হবে।
জলপাই রঙের ট্যাংক কিংবা সাদা রঙের এপিসিগুলোকে ওরা এখন আর ভয় পায় না। ওদের চোখে এখন রক্তের লাল রঙ। যে রঙের সামনে মিইয়ে যায় পরাধীনতার বিষবাষ্প, খসে পড়ে অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ, ভেঙে পড়ে স্বৈরাচারের দম্ভের প্রাসাদ।
বন্ধুর রক্তের দামে চুকানো বাংলা মাকে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ দিতেই হবে। স্বৈরাচারের ভয়াল শাসনের নিকষ কালো অন্ধকারের বুক চিরে বিজয় সূর্য ছিনিয়ে আনতেই হবে। যে সূর্যের রং হবে পতাকার জমিনে শাকিলের রক্তের মতো লাল, বৃত্তাকার।
মুস্তাকিমের আজ পতাকা নেই, শাকিলের শার্টটাই ওড়াবে ও। ওর আর ওর মতো বন্ধু-স্বজনহারা অনেকের জন্য এটাই হবে রক্তে কেনা, নব্য-স্বাধীন, স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের পতাকা। হাত ধরাধরি করে রাস্তায় নেমে আসে ওরা দুই ভাই-বোন। ওদের মতো একঝাঁক দেবদূতের পেছনে আজ পুরো বাংলাদেশ।
[লেখকের জবানবন্দি: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কিয়দংশের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সামনা সামনি দেখা বহু ঘটনার একটি সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা অবলম্বনে এই গল্প। এর প্রতিটি চরিত্র বাস্তব, শুধু পরিচয় গোপনের জন্য শহীদসহ অন্যদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।]

সকাল নয়টার আশপাশে তখন। আকাশের দূর প্রান্তে চক্কর কাটছে কয়েকটা নিঃসঙ্গ চিল। মানুষের রক্তের গন্ধ মনে হয় একটু বেশিই টানছে ওদের। স্বৈরাচারকে যেমন টেনেছে গদির লোভ। পুরো জুলাইয়ের ঝড়-ঝাপটায় সবচেয়ে বেশি যারা আঁকড়ে রেখেছে বিপ্লব, তাদেরই এক দুর্লঙ্ঘ ঘাঁটি, যাত্রাবাড়ীজুড়েই তখন চাপা অসন্তোষ। ফিসফাস চলছে। কে, কীভাবে বের হবে এসব নিয়ে চলছে আলোচনা।
১৪৪ ধারা জারি, তার ওপর বিকট শব্দে খুব নিচু থেকে মুহুর্মুহু উড়ে যাচ্ছে টহল হেলিকপ্টার। রাস্তায় গর্জন তুলছে র্যাব-পুলিশের গাড়িগুলো। দোতলার জানালার পাশে বসে আছে মুস্তাকিম। মোটে কলেজে ওঠা ছেলেটাকে দেখলে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই কী তুখোড় বিপ্লবী ও। বুকের পাঁজর জোড়া পুরোটাই যেন কলিজা ছেলেটার।
বাসায় আম্মু নেই, দেশের বাড়িতে বিশেষ একটি কাজে গিয়ে আটকা পড়েছেন তিনি। গাড়ি-ঘোড়া চলছে না। ফেরার কোনো রাস্তাও পাচ্ছেন না। তাই আপাতত বড় আপুই ভরসা।
রান্না করে খাওয়ানো থেকে বকাঝকা, সব কিছুতেই একেবারে আম্মুর কপি হয়েছে বড়াপু, মুস্তাকিম ভাবে।
কাল পুলিশের দুটো গুলি ওর কাঁধ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। একটু ডান-বাম হলেই আজ প্রিয় বন্ধু শাকিলের জায়গায় পড়ে থাকত ওর নিজের লাশ। শাকিলটা পেছনে থাকে সবসময়, ভীতুর ডিম, কিন্তু আন্দোলন শুরু হতেই কী যেন এক জিয়নকাঠির স্পর্শে আমূল বদলে গেল।
প্রথম দিন যখন মিছিলে শাকিলকে দেখল, একটু চমকেছিল বটে। কিন্তু যখন দেখল মিছিলে যে স্লোগান থেকে আগুনের হলকা বেরোচ্ছে, সেই স্লোগান ওর সবসময়ের ব্যাকবেঞ্চার, ভীতুর ডিম বন্ধুটাই দিচ্ছে! তখন ওর সব অনিশ্চয়তা কর্পূরের মতো উবে গেছে। সেসময়েই ওর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে, ওরা জিতবেই।
এক দফা, এক দাবি … দূর থেকে একটা স্লোগানের খণ্ডাংশ ইথারে ভেসে আসতেই, ভাবনাচ্যুতি হলো মুস্তাকিমের। ততক্ষণে বড়াপুও এসে দাঁড়িয়েছে ওর রুমের জানালার কাছে।
‘কী অবস্থা রে? আজকে কি কিছু হবে? তোরা কী করবি? তুই চল আমরা বাড়িতে চলে যাই, নইলে পুলিশ কখন না কখন এসে তোকে ধরবে।’ এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে; আপাতত মুস্তাকিমের মায়ের ভূমিকায় থাকা বড়াপু।
পরিবারের এই একটা মানুষই জানে, কী করেছে মুস্তাকিম।
কাল যখন শাকিল গুলি খেলো, ওরা তখন একসঙ্গে টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচতে আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত। হঠাৎ কেউ একজন চিৎকার করে উঠল, পুলিশ আগাচ্ছে! চারদিন ধরে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে মুস্তাকিমদের আগলে রাখা রাজপথের দখল নিতে আসছে ভীমদর্শন সব এপিসি নিয়ে।
এমন সময় গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। একটার পর একটা ছুটে আসতে লাগল, পুলিশ-ছাত্রলীগের এলোমেলো বুলেট।
রোড ডিভাইডারের পেছনে আশ্রয় নিল ওরা কয়েকজন। গুলির আওয়াজ আস্তে আস্তে আগাচ্ছে, ওদের হাতের কাছে স্রেফ কয়েকটা ইটের টুকরো।
এমন সময় কী যেন হলো। শাকিলের একটা হাত ধরেছিল মুস্তাকিম। ক্লাসে নিয়মিতই নোট দিয়ে আর ক্লাস ফাঁকির হাজিরার মার থেকে বাঁচিয়ে দেয়ায়, ওদের বন্ধুত্ব খুবই ভালো। ওর ধরা হাতটাকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি করতে থাকা পুলিশের দিকে দৌড়াতে শুরু করল ছেলেটা। মুখে সেই মিছিলের স্লোগান … ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম।’ ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ।’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়।’, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ শেষ স্লোগানটার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই লুটিয়ে পড়ল শাকিল। ওর ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ বুকে আশ্রয় নিয়েছে স্বৈরাচারের হায়েনাদের গুলি।
ডিভাইডারের আড়াল ছেড়ে, পড়ে থাকা শাকিলের দিকে ছুটলো মুস্তাকিম। ওর আশপাশ ছুঁয়ে বাতাসে বেড়িয়ে গেল কয়েকটা গুলি।
শাকিলের লুটিয়ে পড়ার পরপরই বন্ধুকে বাঁচাতে মুস্তাকিমের লা-পরোয়া ছুট, যেন মেঘে ঢাকা আকাশের বিদ্যুৎ চমক হয়ে আঘাত করল বিক্ষিপ্ত ছাত্র-জনতাকে। মুস্তাকিমের পেছনে যেন আকাশ থেকে নেমে এলো একঝাঁক দেবদূত। আহত সিংহের ন্যায় উন্মত্ত জনতার ফিরে আসা দেখে ‘যার যার অবস্থান থেকে পালিয়ে গেল’ স্বৈরাচারের হায়েনারা।
শাকিলের নিথর দেহটাকে হাচড়ে-পাচড়ে মাথাটা কোলে তুলে নিল মুস্তাকিম। গলার এক খাবলা মাংস উড়ে গেছে ওর। বুকে অন্তত চারটা গুলি। রক্ত গড়িয়ে গেছে অনেক দূর। অঙ্ক স্যারের দু-চারটা মারের ভয়ে প্রতিদিন মুস্তাকিমের নোটখাতা নিয়ে স্যারকে দেখানো ছেলেটা, কত অবলীলায় পাঁচটা গুলি খেয়ে রাজপথে পড়ে আছে।
নাহ, প্রাণবায়ু আর অবশিষ্ট নেই শাকিলের দেহটায়। কিন্তু ঠোঁটে লেপ্টে আছে এক পশলা হাসি।
কোথা থেকে যেন একটা রিকশা এনেছে কয়েকজন। শাকিলের কোমরে বাঁধা রক্তে মাখামাখি শার্টটা খুলে নিয়েছে মুস্তাকিম। পলকা শরীরটা খুব যত্নে সবাই মিলে উঠাচ্ছে রিকশায়।
কেউ একজন বলে উঠল, আস্তে-সাবধানে, আমাদের ভাই শহীদ। এরপর রিকশা নিয়ে ওদের বাসার গলির দিকে চলে গেছে শাকিলের এলাকার কয়েকজন। কিন্তু রাস্তায় জমে থাকা শাকিলের চাপ চাপ রক্তের পাশে অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল মুস্তাকিম। হাতে ওর বন্ধুর রক্তমাখা শার্ট।
শার্টটা বাসায় নিয়ে এসেছে ও। দরজা খুলেই প্রায় অজ্ঞান হতে বসেছিল বড়াপু। রক্তে মাখামাখি হয়ে কোত্থেকে এলো ও! থাপ্পড়ও দিয়েছে একটা।
কিন্তু ঘটনার সবটা শুনে যেন পাথর হয়ে গেছে বড়াপু। তার ছোট্ট ভাইটা কী বলছে এসব। এই সেদিন যাকে কোলে পিঠে করে এ রুম থেকে ও রুমে নিতেন, সেই মুস্তাকিম আজ পুলিশের বৃষ্টির মতো গুলির ভেতর বসেছিল।
হ্যাংলা যে ছেলেটা মাঝে মাঝে বাসার সামনে এসে মুস্তাকিমের জন্য অপেক্ষা করত, ও এখন জানাজার খাটিয়ায়। রাগ হয় তার, নিতান্ত চুপচাপ বড়াপুর ধবধবে সাদা চেহারাটা রক্তিম হয়ে যেতে দেখে মুস্তাকিম।
অন্য সময় হলে, ভয়ে সটকে পড়তো। কিন্তু আজ ও যায় না। ওর মনে এখন বন্ধু হারানোর শোক।
নিস্তব্ধতা ভাঙেন বড়াপু, কাল আমিও যাব তোর সঙ্গে!
বলো কী, পাগল হইছো! প্রায় আঁতকে ওঠে মুস্তাকিম।
বড়াপু জানেন, পাগল হননি তিনি। তার ভাইগুলো রাজপথে রক্ত বিলিয়ে যে সংগ্রামে নেমেছে, সেটা এখন জনমানুষের হয়ে গেছে। জগদ্দল পাথরের মতো দেশটার বুকের ওপর চেপে বসা স্বৈরাচারকে এবার বিদায় করতেই হবে। নিজের গদিটা টিকিয়ে রাখতে যে রক্তলোলুপ ক্ষমতাসীন, এই ফুলের মতো ছেলেগুলোর ওপর নির্বিচারে গুলি ছোড়ার আদেশ দেয়, লাখো শহীদের রক্তের দামে কেনা, এই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই তার।
এই মুস্তাকিম শোন, আবার ভাবনায় ছেদ পড়ে ছেলেটার। বড়াপু বলে, ডিএনডি খালের দিক থেকে স্লোগানের আওয়াজ আসছে না।
দু ভাই-বোন কান পাতে, ইথারে ভেসে আসে ... ‘লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’, ‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’।
সামান্য ইতস্তত করে দুজন। তারপর কিচেনে জ্বলতে থাকা চুলাটা নিভে যায়। ঘরের দরজার অটো লকে চাবি ঘোরে, ‘ক্লিক’ শব্দ তুলে লক হয়ে যায় দরজাটা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায় দুটো প্রাণ। বড়াপুর মাথায় ছোট্ট ভাইটার কিনে আনা পতাকা বাঁধা আর মুস্তাকিমের কোমরে বাঁধা শাকিলের রক্তমাখা শার্ট।
আজ ৩৬শে জুলাই, আজ জিততেই হবে।
জলপাই রঙের ট্যাংক কিংবা সাদা রঙের এপিসিগুলোকে ওরা এখন আর ভয় পায় না। ওদের চোখে এখন রক্তের লাল রঙ। যে রঙের সামনে মিইয়ে যায় পরাধীনতার বিষবাষ্প, খসে পড়ে অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ, ভেঙে পড়ে স্বৈরাচারের দম্ভের প্রাসাদ।
বন্ধুর রক্তের দামে চুকানো বাংলা মাকে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ দিতেই হবে। স্বৈরাচারের ভয়াল শাসনের নিকষ কালো অন্ধকারের বুক চিরে বিজয় সূর্য ছিনিয়ে আনতেই হবে। যে সূর্যের রং হবে পতাকার জমিনে শাকিলের রক্তের মতো লাল, বৃত্তাকার।
মুস্তাকিমের আজ পতাকা নেই, শাকিলের শার্টটাই ওড়াবে ও। ওর আর ওর মতো বন্ধু-স্বজনহারা অনেকের জন্য এটাই হবে রক্তে কেনা, নব্য-স্বাধীন, স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের পতাকা। হাত ধরাধরি করে রাস্তায় নেমে আসে ওরা দুই ভাই-বোন। ওদের মতো একঝাঁক দেবদূতের পেছনে আজ পুরো বাংলাদেশ।
[লেখকের জবানবন্দি: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কিয়দংশের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সামনা সামনি দেখা বহু ঘটনার একটি সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা অবলম্বনে এই গল্প। এর প্রতিটি চরিত্র বাস্তব, শুধু পরিচয় গোপনের জন্য শহীদসহ অন্যদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।]
.png)

দুই বছর আগের ৫ আগস্টের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেন না রিকশাচালক আবদুল করিম। সেদিন বিকেলে তিনি তাঁর বাবার জন্য ওষুধ কিনতে বের হয়েছিলেন। বৃদ্ধ বাবা ভর্তি ছিলেন একটি সরকারি হাসপাতালে।
৩ ঘণ্টা আগে
রাস্তার এপারের মানুষ জানে না, ওই পারে কী হচ্ছে। টুকটাক বাজার করে বাসায় ঢুকলাম। সেদিন রাত থেকে জ্বর। ঘুমালেও স্বপ্নের ভেতর দৌড়াচ্ছি, কোথাও লুকাচ্ছি, ধাওয়া খাচ্ছি। টানা কয়েকদিন জ্বর থাকল। তারপর শুরু হলো পেট ব্যথা। এই পেট ব্যথা কীসের ধরতে পারলাম না।
৫ ঘণ্টা আগে
শুটিংয়ের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মেরিলিনের দ্বিতীয় স্বামী, বেসবল তারকা জো ডিম্যাজিও। হাজারো মানুষের সামনে স্ত্রীকে এভাবে দেখানো তিনি মেনে নিতে পারেননি। আলোকচিত্রী জর্জ এস. জিমবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষুব্ধ ডিম্যাজিও শুটিং সেট ছেড়ে চলে যান।
১৪ ঘণ্টা আগে
আবুল হাসান অকালে প্রয়াত হয়েছেন এ কথা সত্য। অগণন লেখক, কবি, শিল্পী আছেন যারা আমাদের প্রত্যাশার পূর্বেই চলে গেছেন। একজন শিল্পী তাঁর কাজের ভেতর মূলত তাঁর সময়কে ধরে রাখেন।
১৫ ঘণ্টা আগে