ad

শরৎচন্দ্র: যে নারীদের পেয়েছিলেন জীবনে, তাঁদেরই কি অমর করেছেন সাহিত্যে

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আরেক নাম ‘অমর কথাসাহিত্যিক’। তিনি অমর হয়েছেন মানুষের ‘জীবন’ লিখে। আরও স্পষ্ট করে বললে, নারীদের আনন্দ-বেদনা লিখে। সেসব লেখা লিখতে গিয়ে তাঁকে কলম ধরতে হয়েছে সমাজের বিরুদ্ধে, সংসারের বিরুদ্ধে, কখনো বা নিজের ভাগ্যের বিরুদ্ধে। কেউ বিধবা, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, কেউ সমাজের চোখে ‘চরিত্রহীন’, কেউবা নিজের জীবনের সিদ্ধান্তটুকু নেওয়ার অধিকারও পায়নি।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাসে এই নারীরাই বারবার ফিরে এসেছেন কখনো প্রেমে, কখনো বঞ্চনায়, কখনো প্রতিবাদে। শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্ররা সেই সমাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যে সমাজ নারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু নারীর কণ্ঠটিই শুনতে চায় না।

শরৎচন্দ্র শুধু নারীর দুঃখ দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন দুঃখের পেছনে থাকা সমাজকে। আর সেই কারণেই তাঁর নারীচরিত্র আজও পাঠকের কাছে এত জীবন্ত। যে লেখক সাহিত্যে নারীর এত গভীর মন পড়তে পেরেছিলেন, তাঁর নিজের জীবনে নারীরা কেমন ছিলেন?

শরৎচন্দ্রের প্রেম, বিয়ে ও শোক

শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিজীবনও ছিল বেশ ঘটনাবহুল। একাধিক প্রেম এসেছিল তাঁর জীবনে। শরৎচন্দ্রকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন নিবন্ধ থেকে জানা যায়, তাঁর জীবনে প্রথম প্রেমিকা ছিল রাজলক্ষ্মী। এরপরে একে একে এসেছিল নিরুপমা দেবী, গায়ত্রী। ১৯০৬ সালে মিয়ানমারের রেঙ্গুনে (বর্তমানে ইয়াঙ্গুন) তিনি শান্তি চক্রবর্তীকে বিয়ে করেছিলেন বলেও জানা যায়। সেই সংসারে তাঁদের এক পুত্রসন্তান জন্মেছিল। কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯০৭ সালে প্লেগ রোগে স্ত্রী শান্তি ও তাঁদের শিশুপুত্র দুজনেই মারা যান। এই মৃত্যু শরৎচন্দ্রকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

এরপর তাঁর জীবনে আসেন মোক্ষদা। শরৎচন্দ্র ভালোবেসে যাঁর নাম দিয়েছিলেন হিরণ্ময়ী দেবী। রেঙ্গুনে শরৎচন্দ্রের পরিচিত কৃষ্ণদাস অধিকারীর কন্যা মোক্ষদা ছিলেন অল্পবয়সী বিধবা। তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। কৃষ্ণদাসের অনুরোধে শরৎচন্দ্র শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিয়ে করেন। তিনি তখন লেখাপড়া জানতেন না। শরৎচন্দ্র তাঁকে পড়তে ও লিখতে শেখান। তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না। হিরণ্ময়ী দেবী কিংবা মোক্ষদা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের সঙ্গেই কাটিয়েছেন।

শরৎচন্দ্রের নারীরা কেন আলাদা

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের চরিত্র পার্বতী, চন্দ্রমুখী, রাজলক্ষ্মী, অভয়া, কিরণময়ী, অচলা, ললিতা, সাবিত্রী, বিরাজ—তাঁরা কেউই একরকম নন। ‘দেবদাস’ উপন্যাসে পার্বতী ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসা না পেয়ে ভেঙে পড়ে না। নিজের জীবনকে অন্য বাস্তবতায় এগিয়ে নেয়। চন্দ্রমুখী আবার সমাজের চোখে ‘অচ্ছুৎ’, অথচ তাঁর ভালোবাসা ও মানবিকতা দেবদাসের চেয়ে অনেক বেশি গভীর হয়ে ওঠে। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী আরও ব্যতিক্রম। সে শুধুই প্রেমিকা নয়, তার নিজের ব্যক্তিত্ব আছে, নিজের ইচ্ছা আছে। শ্রীকান্তের দ্বিতীয় খণ্ডের ‘অভয়া’ সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে, একজন নারী কি শুধু স্বামীর অত্যাচার সহ্য করেই সতী হয়ে থাকবে? ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের কিরণময়ী কিংবা ‘গৃহদাহ’র অচলাও প্রচলিত নারীর ছাঁচে আটকে থাকে না।

শরৎচন্দ্রের বড় শক্তি তিনি নারীর চরিত্রকে শুধু ‘ভালো মেয়ে’ আর ‘খারাপ মেয়ে’ এই দুই ভাগে ভাগ করেননি। তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারীর আচরণের পেছনেও থাকে ক্ষুধা, আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, অপমান, একাকিত্ব ও আত্মমর্যাদা। গ্রামের অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীর প্রতি শরৎচন্দ্রের গভীর মমত্ববোধ ছিল এবং সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও শাস্ত্রনির্ভর অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি সরব ছিলেন।

তিনি কি নারীবাদী ছিলেন

বর্তমান সময়ে এসে শরৎচন্দ্রকে সরাসরি ‘নারীবাদী’ বলে ফেলা হয়তো সহজ। কারণ তাঁর অনেক নারীচরিত্র শেষ পর্যন্ত প্রেম, সংসার কিংবা পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই মুক্তির পথ খোঁজে। সমসাময়িক সমালোচকেরাও বলেন, নারীর প্রতি সহানুভূতি থাকলেও তাঁর সাহিত্য সবসময় সম্পূর্ণ স্বাধীন নারীসত্তা নির্মাণ করতে পারেনি। তবে তাঁর সময়ের কথা ভাবলে তাঁর অবস্থান ছিল যথেষ্ট সাহসী।

‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন, পুরুষের যেমন নারীদের ত্যাগ করার ক্ষমতা আছে, নারীরও সেই অধিকার থাকবে না কেন? তাঁর লেখায় পুরুষের নৈতিক ব্যর্থতার দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সামাজিক প্রবণতাকেও তিনি আক্রমণ করেছেন। অর্থাৎ শরৎচন্দ্রের কাছে নারী কেবল প্রেমের মানুষ নয় একজন পূর্ণ মানুষ।

শরৎচন্দ্র যে সমাজকে নিয়ে লিখেছিলেন, সেই সমাজে নারীর সামনে স্বাধীনতার পথ খুবই সংকীর্ণ ছিল। তাই তিনি তাঁর লেখায় কোনো নিখুঁত মুক্ত নারীচরিত্র তৈরি করেননি। তিনি সমাজের ভেতর আটকে থাকা বাস্তব নারীকেই লিখেছেন। শরৎচন্দ্রের জীবনে দুজন স্ত্রী এসেছিলেন। একজনকে হারিয়েছেন মহামারির কবলে, আর অন্যজনের হাত ধরে দীর্ঘ সংসার করেছেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যের জীবনে নারী এসেছেন শত শত রূপে।

কখনো প্রেমিকা, কখনো বিধবা, কখনো দেহপসারিনী, কখনো স্ত্রী, আবার কখনো বিদ্রোহী। কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই তারা একটি প্রশ্ন রেখে গেছে, নারীর জীবন কি সমাজ ঠিক করে দেবে, নাকি সে নিজেই নিজের জীবনের মালিক হবে?

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত