কৈশোরের বিঝু, যা দেখেছি, যা দেখিনি

মৃত্তিকা চাকমা
মৃত্তিকা চাকমা

স্ট্রিম গ্রাফিক

‘বিঝু’ শব্দটি চাকমা জাতিসত্তার। পার্বত্য চট্টগ্রামে অপরাপর যে জাতিসত্তা রয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা নাম রয়েছে। আমি যখন একজন চাকমা, সে ক্ষেত্রে ‘বিঝু’ শব্দটি এই আলোচনায় ব্যবহার করে আমার কৈশোর জীবনের বিঝুর কথা আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

বিঝু মানে উৎসব। বিঝু মানে সামাজিক মেলবন্ধনে ভাগাভাগি করা। বিঝু মানে তিনদিন খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ-ফুর্তিসহ নানা খেলা-ধুলায় দিনটি মাতিয়ে তোলা। এই তিন দিনের নাম— ১ম দিন ফুল বিঝু, চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ। ২য় দিনের নাম মূল বিঝু, চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ। ৩য় দিনের নাম গোজ্জ্যে পোজ্জ্যে বিঝু, বৈশাখ মাসের ১ম দিন—মানে নববর্ষের দিন।

এই তিন দিনের বিঝুকে নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমার আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করি। আর তাই আমি সোজাসুজি চলে যাচ্ছি আমার ফেলে আসা সেই কৈশোরের বিঝুর কথায়।

গ্রামের বুড়ো-বুড়িদের বিঝুকে নিয়ে পারিবারিক আলাপ-আলোচনাগুলো আমরা ছোটরা শুনতাম এবং তাঁদের থেকে শুনে আমরা কিশোরেরা উদগ্রীব হতাম। বিঝু আসছে, বিঝু আসছে— তাই কেনা-কাটার জন্য নিজেদের উৎপাদিত ধান, চাল, আদা, হলুদ, আলুসহ বিভিন্ন পণ্য বাজারে গিয়ে বিক্রির হিড়িক পড়ে যেত। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে ছোটদের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যেত।

পণ্য-দ্রব্য বিক্রি করার পর আমাদের জন্য জুতা-সেন্ডেল, প্যান্ট-শার্ট কিনে দিত মা-বাবারা। বিঝুর আগে নতুন জিনিসগুলো পেলে সেগুলো সযত্নে রাখতাম।

আমার একটা ছোট টিনের পেটি (সুটকেসের মতো) ছিল, সেটা এখনো মনে পড়ে। ওখানে আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রাদি যেমন—কাপড়-চোপড়, কলম এবং সাদা কাপড়ের জুতার রঙ (খড়িমাটির মতো দেখতে) করতাম। বর্ষা-বাদলে জুতা নষ্ট হলে ছুটির সময় জুতাগুলো ধুয়ে রং করতাম। রোদে শুকিয়ে গেলে কেমন যেন ধবধবে সাদা হয়ে উঠত। তখন মনটা খুব আনন্দে মেতে উঠত। নতুন রঙ করা জুতাগুলো পায়ে দিয়ে নিজের পায়ে মগ্ন হয়ে চেয়ে দেখতাম। এভাবে জুতা নষ্ট বা ময়লা হয়ে গেলে আবার ধুয়ে রঙ করতে মন চাইত।

ফুল বিঝুর দিন, মানে বিঝুর ১ম দিনে আমরা বড়দের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেতাম। ছোট ছোট ছড়ায় বাঁধ দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরতাম। জমিতে জমে যাওয়া পানি অর্থ্যাৎ ডোবা, বিলগুলোও সেচে মাছ ধরতাম। পাজন রান্নার জন্য বড়োদের সঙ্গে জঙ্গলে গিয়ে নানা ধরনের পাহাড়ি ও বনজ শাক-সবজি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতাম।

মা-দিদি-বৌদিরা যখন লোগাং নদীতে থালা-বাসন, হাঁড়ি-পাতিল এবং ব্যবহার উপযোগী কাপড়-চোপড় ধোয়ার জন্য যেত, আমরাও তাঁদের সঙ্গে নদীতে সাঁতার কাটতে যেতাম। আসার সময় নদীর পার থেকে লাল টুকটুকে পলিমাটি পাতিলে ভর্তি করে নিয়ে আসতাম ঘর লেপার জন্য।

বড়রা দল বেঁধে বাড়ি থেকে অনেক দূরে শিকার করতে যেত বন্দুক এবং ফাঁদ পাতার জাল নিয়ে। কারও হাতে শান দেওয়া দা, বল্লম। হরিণ, সজারু, বন্য শুকর, গুইসাপ শিকার করাই ছিল শিকারীদের লক্ষ্য।

বিঝুর প্রস্তুতির কাজকর্ম দিনের বেলা শেষ করে রাতের খাওয়া শেষ করে মা-দিদি-বৌদিরা বসে যেত পাজন রান্নার প্রস্তুতির জন্য। কেউ কাঁঠাল কুটছে, কেউ কেতকী, কেউ মূলা-আলু, কেউ মিষ্টি কুমড়া, কেউ বেগুন, শুকনো মুলা ইত্যাদি আরও কত কি!

রাত ১০/১১ টায় ঘুমিয়ে পড়তাম। পরদিন খুব ভোরে উঠে মূল বিঝুর জন্য নদীতে গিয়ে গোসল করে আসতাম ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতি, বুড়ো-বুড়ি সবাই মিলে। যারা অতিবৃদ্ধ, নদীতে নামতে পারে না, তাদের জন্য যুবক-যুবতিরা নদী থেকে পানি তুলে আনত, তারপর স্নান করিয়ে দিত। আমিও তাদের সঙ্গে কত যোগ দিয়েছি, তা এখনো আমার খুব মনে পড়ে।

মা-বাবারা আমাদেরকে বলত—কখন তুমি বিঝুগুলো খেয়ে আসবে। চলো একসাথে খেয়ে আসি। সেই বিঝুগুলো খাওয়ার জন্য নদীতে যতবার যাই, কোনোবার বিঝুগুলো খেতে পারলাম না। নদীতে ডুব দিলে নাকি বিঝুগুলো পাওয়া যায়, সেই কারণে বিঝুগুলোটা পাওয়ার জন্য খুব আগ্রহ ভরে ডুব দিতাম। কিন্তু কোনোবারই বিঝুগুলোর দেখা পেলাম না।

এখন আর সেই দিন, সেই খানা, সেই পরিবেশ নেই। তার পরিবর্তে অন্য পরিবেশ—শহুরে বলি আর গ্রামের বলি—সব পরিবেশ একাকার। দোকানে পাওয়া যাচ্ছে পাজন বা বিঝুর জন্য যা যা লাগবে তা।

পরে ধীরে ধীরে কৈশোর পেরিয়ে বুঝতে পারি, আসলে সকালে গোসল করে পবিত্র হওয়ার জন্য মা-বাবারা এই বিঝুগুলোর লোভ দেখাত। বলত, আস্তে করে ডুব দাও, খুঁজে নিয়ে এসো বিঝুগুলোকে। এইভাবে বাবা বলত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টার পর কোথাও বিঝুগুলো না পেয়ে পরে বলতো বিঝুগুলো যখন পেলে না, তাহলে এবার চলো গঙ্গিমাকে ফুল দিয়ে বাড়ি চলে যাই।

বাড়ি গিয়ে শুরু হয় বন্ধুদের নিয়ে মুরগিগুলোকে খাবার দেওয়া। বাড়ি বাড়ি গিয়ে উঠানে মুরগিদের খাদ্য বিলিয়ে দেওয়া। যারা একটু যৌবনে পদার্পণ করেছে সেই সব ছেলে-মেয়ে বুড়ো-বুড়িদেরকে গোসল করায়।

আর এরই মধ্যে গেরস্থদের বিঝুর পাজন রান্না শেষ হয়ে আমাদের ঘরে ডেকে পাজন, কলা পিঠা, সান্যে পিঠা, বরা পিঠা আর সিদ্ধ মিষ্টি আলু পরিবেশন করত। অনেকে আবার সিদ্ধ ভুট্টাও খেতে দেয়। আমার সেই কৈশোরকালে দেখিনি মদ, জগরা বা কাঞ্জি। দেখিনি কোক, মিষ্টি, সেমাই, আপেল, কমলা, জিলাপি, নুডলস যা এখন চমকপ্রদ খাদ্য দ্রব্য।

ছোটবেলার সেই সব কথা আমার আজও মনে আছে। বিঝু দিনে সাতটি ঘরে তিতা করলা রান্না খেলে জীবনে একটা মহা ঔষধ খাওয়া হয়। এভাবে মনে সান্ত্বনা হতো যে গা-রক্ষার ঔষধ খেলাম।

সেই সময় বিঝুতে ঘুরতে গিয়ে বড়দের আমরা পায়ে ধরে প্রণাম করতাম। বাড়িতে এলে মা-বাবা বলত কোথায় গিয়েছিলে? তারা বলত, দাদা-দাদি, নানা-নানি, মামা-মামি, কাকা-কাকি সব বয়োজ্যেষ্ঠদের সালাম করবে।

এখন আর সেই দিন, সেই খানা, সেই পরিবেশ নেই। তার পরিবর্তে অন্য পরিবেশ—শহুরে বলি আর গ্রামের বলি—সব পরিবেশ একাকার। দোকানে পাওয়া যাচ্ছে পাজন বা বিঝুর জন্য যা যা লাগবে তা।

এমনকি অনলাইনেও বুকিং দেওয়া যাচ্ছে বিঝুর খানা। আর বিঝুর দাওয়াত! দাওয়াত না দিলে আন্দাজে কেউ কারও বাড়িতে গিয়ে ওঠে না। তাই আমরা প্রায় বলতে শুনি, বিঝুতে দাওয়াত দিলে না, অথবা বিঝুতে এসো ইত্যাদি ইত্যাদি।

লেখক: কবি, গদ্যকার ও অনুবাদক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি ফেলো

সম্পর্কিত