কাঁচাবাজার থেকে যেভাবে প্যাকেটে এল মাংস

স্ট্রিম গ্রাফিক

উপমহাদেশে মাংস কেনার সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। চোখের সামনে পশু জবাই হবে, কাটা হবে, এরপর তা ঘরে নেওয়া হবে। অনেকের কাছে এটিই ছিল ‘ফ্রেশ’ বা ‘টাটকা’ মাংসের সংজ্ঞা।

নিকট অতীতে ঘোড়া বা শিয়ালের মাংসকেও গরুর মাংস বলে বিক্রির মতো ঘটনা খোদ ঢাকা শহরেই ধরা পড়েছে। তাই ফ্রিজে রাখা, প্যাকেটজাত বা প্রসেসড মাংসকে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়—এটা কি বাসি? ভেজাল নয় তো? স্বাস্থ্যকর হবে তো?

এই সামাজিক অভ্যাসের ঠিক বিপরীত দিকে দাঁড়িয়েই ‘বেঙ্গল মিট’ তাঁদের প্রসেসড মাংসের বাজার তৈরি করেছে। কীভাবে তারা যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরোনো ভোক্তা আচরণ পরিবর্তন করে বাজারে সয়লাব হয়ে থাকা একটি নিয়মিত পণ্যকে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডে রূপান্তর করল, এর পেছনের বিজনেস ডাইনামিক্সটা কী?

বাংলাদেশের মাংসের বাজারে বেঙ্গল মিটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল স্থানীয় কসাইয়ের দোকানের সঙ্গে সরাসরি দামের লড়াই। কারণ খোলা বাজারে একই পণ্যের মূল্য তুলনামূলক অনেক কম। তখনই তারা বাজারে তাদের ব্র্যান্ডটির ভ্যালু প্রপোজিশন দাঁড় করায়, এটি শুধু ‘মাংস’ নয়, ‘নিরাপদ মাংস’।

এখানেই আসলে ভোক্তা আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। জর্জ অ্যাকারলফের ‘মার্কেট ফর লেমনস’ বা তথ্যের অসমতা তত্ত্ব। ১৯৭০ সালের এই বিখ্যাত গবেষণায় অ্যাকারলফ দেখিয়েছিলেন, কোনো বাজারে ক্রেতা যদি পণ্যের প্রকৃত মান যাচাই করতে না পারেন, তবে ভালো পণ্যও সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায় এবং নিম্নমানের পণ্য বাজারকে প্রভাবিত করে। মাংসের বাজারেও একই সমস্যা দেখা যায়। ক্রেতা চোখে দেখে রঙ, গন্ধ বা পশুর হাড় দেখে কিছু ধারণা করতে পারেন, কিন্তু পশুটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে বড় হয়েছে, কীভাবে জবাই ও প্রসেস হয়েছে, এসব তথ্য সাধারণত তার নাগালের বাইরে থাকে।

এই ইনফরমেশন গ্যাপ কমানোই বেঙ্গল মিটের ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি। নিরাপদ খাদ্য, হালাল প্রসেস এবং হাইজিন, এই তিনটি বিষয় বিজ্ঞাপনী দাবি হিসেবে বাজারে বলা সহজ। কিন্তু এগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজন অবকাঠামো। বেঙ্গল মিট সেই জায়গায় বড় বিনিয়োগ করেছে। পাবনার আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রসেসিং এবং ফ্যাক্টরি থেকে রিটেইল পর্যন্ত কোল্ড চেইন ধরে রাখার চেষ্টায় সক্ষম হয়েছে বেঙ্গল মিট।

এই স্ট্র্যাটেজিকে আরেকভাবে বলা যায়, ‘প্রাইস প্রিমিয়াম’কে জাস্টিফাই করার জন্য ‘ট্রাস্ট প্রিমিয়াম’ তৈরি করা। খোলা বাজারের কেজি দরে মাংসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে বেঙ্গল মিট এমন ক্রেতাকে টার্গেট করেছে, যারা ১০০ টাকা কম দেওয়ার চেয়ে নিজের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তাকে বেশি মূল্য দেন। এই ক্রেতারা সাধারণত শহুরে মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার, করপোরেট, চার ও পাঁচ তারকা মানের হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং স্বাস্থ্যসচেতন নাগরিক।

তবে খুচরা বিক্রি দেখে পুরো ব্যবসার ছবি পুরোপুরি বোঝা যায় না। বেঙ্গল মিটের ব্যবসায়িক শক্তির বড় অংশ তৈরি হয়েছে বিটুবি বা আন্তর্জাতিক বাজারে। এই বিটুবি ভলিউম ছাড়া এমন ব্যয়বহুল অবকাঠামো সচল রাখাও কঠিন। কোল্ড চেইন, প্রসেসিং প্ল্যান্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, রেফ্রিজারেটেড পরিবহন, এসবের ফিক্সড কস্ট অনেক বেশি। খুচরা ক্রেতা ব্র্যান্ডের মুখ দেখেন আউটলেটে, কিন্তু ব্যবসার ভারসাম্য ধরে রাখে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ এবং করপোরেট ক্লায়েন্ট।

যুগ যুগ ধরে কাঁচাবাজার থেকে মাংস কিনে অভ্যস্থ বাঙালি ক্রেতারা। ছবি: সংগৃহীত
যুগ যুগ ধরে কাঁচাবাজার থেকে মাংস কিনে অভ্যস্থ বাঙালি ক্রেতারা। ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল মিটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজি হলো র-মিটের বাইরে ভ্যালু-অ্যাডেড প্রোডাক্টে যাওয়া। কাঁচা মাংসের বাজারে লাভ সীমিত। কিন্তু সসেজ, কাবাব, নাগেটস, মিটবল, ম্যারিনেটেড আইটেম বা রেডি-টু-কুক পণ্যে ব্র্যান্ড ভ্যালু ও কনভিনিয়েন্স যোগ করা যায়। এতে একই কাস্টমারের বাস্কেট সাইজ বাড়ে, রিপিটেড সেল বাড়ে এবং একই সঙ্গে লাভের পরিমাণও বাড়ে।

এরই ধারাবাহিকতায় পরে যুক্ত হয় কুকড মিট বা রেডি মিল। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এই কুকড মিট আইটেমের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ আছে। প্রথমত, ঢাকার মতো শহরে রান্নার সময় কমে যাচ্ছে। কর্মজীবী সদস্যের পরিবার, একা থাকা পেশাজীবী, ছাত্র বা ছোট পরিবার, অনেকের জন্য প্রতিদিন বাজার করা, মাংস পরিষ্কার করা, মসলা মাখানো, রান্না করা সময়সাপেক্ষ কাজ। দ্বিতীয়ত, ঘরে অতিথি এলে দ্রুত রেস্টুরেন্ট-স্টাইলে খাবার পরিবেশনের চাহিদা বাড়ছে। তৃতীয়ত, অর্ডার করা খাবার ডেলিভারির ওপর নির্ভরশীল শহুরে ক্রেতা এখন ঘরে সংরক্ষণযোগ্য, দ্রুত গরম করা যায়, এমন পণ্যকেও সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে দেখছেন।

তবে এই মডেলের ঝুঁকিও কম নয়। সবচেয়ে বড় চাপ হলো কোল্ড চেইন মেইনটেন্যান্স। মাংস এমন একটি পণ্য, যেখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিদ্যুৎ, পরিবহন, স্টোরেজ বা ডেলিভারির যেকোনো দুর্বলতা পণ্যের মানকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এই ব্যবসায় অপারেশনাল এক্সিলেন্সই মার্কেটিংয়ের অংশ।

দ্বিতীয় ঝুঁকি স্কেলেবিলিটি। প্রিমিয়াম প্রাইস পয়েন্ট ও কোল্ড চেইন নির্ভরতার কারণে বেঙ্গল মিটের মতো মডেল হুট করে দেশের প্রতিটি উপজেলা বা পাড়ায় ছড়িয়ে দেওয়া সহজ ছিল না। তাদের বাজার স্বাভাবিকভাবেই শহরের নির্দিষ্ট ক্রেতাশ্রেণি, আধুনিক রিটেইল চ্যানেল, অনলাইন অর্ডার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্লায়েন্টকে ঘিরে বড় হয়েছে।

তৃতীয় চাপ হলো সোর্সিং কস্ট। ঈদ বা মৌসুমি কারণে পশুর দাম বেড়ে গেলে কাঁচামালের ব্যয় বাড়ে, কিন্তু প্যাকেটজাত পণ্যের দাম প্রতিদিন খোলা বাজারের মতো ওঠানামা করানো যায় না। এতে ব্র্যান্ড ক্রেডিবিলিটি এবং মার্জিনে চাপ পড়ে। একদিকে মান ধরে রাখার খরচ, অন্যদিকে ক্রেতার মূল্যসংবেদনশীলতা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বেঙ্গল মিটের আরেকটি বড় সফলতা হলো আরবান পেইন পয়েন্ট ধরতে পারা। কোরবানির ঈদে শহুরে ফ্ল্যাটবাসীর জন্য পশু কেনা, কসাই ম্যানেজ করা, প্রসেসিং, ভাগ করা, সংরক্ষণ সব মিলিয়ে—বেশ ঝামেলাপূর্ণ কাজ। বেঙ্গল মিট কোরবানি সার্ভিসের মাধ্যমে পশু নির্বাচন, হালাল কোরবানি, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, অনলাইন পেমেন্ট এবং কোরবানি শেষে বাসায় মাংস ডেলিভারির মতো সেবা দেওয়ার মাধ্যমে শহুরে জীবনের ধর্মীয় আচারের অংশ হয়ে উঠেছে।

এই সার্ভিস মূলত একটি সিজনাল হাই-টিকিট অফার। ব্র্যান্ডটি বুঝেছে, শহুরে জীবনে মানুষ শুধু পণ্য কিনতে চায় না, বরং সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চায়। কোরবানি সার্ভিস সেই জায়গায় ধর্মীয় প্রয়োজন, আস্থার প্রশ্ন এবং নাগরিক ঝামেলার সমাধানকে একত্র করেছে।

দিনশেষে বেঙ্গল মিটের গল্প শুধু একটি ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের বাজারে কনজিউমার পারসেপশন বদলে দেওয়ার একটি উদাহরণ। পুরোনো অভ্যাস ভাঙা সবচেয়ে কঠিন ও ব্যয়বহুল কাজগুলোর একটি। অনেক কোম্পানি শুধু বিজ্ঞাপন দিয়েই কাস্টমার বিহেভিয়ার বদলাতে চায়, কিন্তু বেঙ্গল মিটের ক্ষেত্রে মূল শক্তি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হওয়া আস্থা।

বেঙ্গল মিট সেই আস্থার নাম দিয়েছে নিরাপত্তা, হাইজিন ও কনভিনিয়েন্স। আর বাংলাদেশের বাজারকে দেখিয়েছে, ঠিকভাবে এগোলে কাঁচাবাজারের একটি সাধারণ পণ্যও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডে রূপ নিতে পারে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত