ad

আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ–১৪/প্রেইরির পথ ধরে চলেছি, সামনে একের পর এক বিস্ময়

ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর ১৫তম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন প্রতি বৃহস্পতিবার বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ৪০
প্রেইরির পথ ধরে চলেছি, সামনে একের পর এক বিস্ময়। স্ট্রিম গ্রাফিক
প্রেইরির পথ ধরে চলেছি, সামনে একের পর এক বিস্ময়। স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রেইরির ভেতর দিয়ে চলছি তো চলছিই। যাত্রায় কোনো হেরফের নেই, নেই তেমন কোনো বৈচিত্রও। কিন্তু মন ভরে আছে আনন্দে!

শিশুকাল থেকে লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার, জেমস ফেনিমোর কুপারদের বই পড়ে আর ওয়েস্টার্ন কাহিনি পড়তে পড়তে এই তৃণভূমি যেন আমার চিরচেনা। ঢেউ খেলানো ঘাসের মাঝে আলো-ছায়ার খেলা, দূরে দূরে একাকি গাছ, গরুর পাল, খামারের বেড়া। আবার মাঝে মাঝে দেখি, একটু নিচু জায়গায় এক টুকরো নীল আকাশের মতো জল জমে আছে। ওয়েস্টার্ন বইয়ের সুবাদে জানি, এগুলোর নাম ওয়াটার হোল!

পথে ১৮৮০ সালের মডেল শহর দেখে থামলাম। ছবি লেখকের সৌজন্যে
পথে ১৮৮০ সালের মডেল শহর দেখে থামলাম। ছবি লেখকের সৌজন্যে

যেকোনো র‍্যাঞ্চের টিকে থাকা আর সমৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভর করে এই ওয়াটার হোলের ওপর। বছর পাঁচ আগে লিখেছিলাম, বুনো পশ্চিমের এই জীবনের প্রতি নিজের অদম্য আকর্ষণের কারণ—

‘কেন ভালো লাগত ওয়েস্টার্ন কাহিনি? কেন এত আফসোস বাড়াত তা জীবনের প্রতি?

প্রেইরি তথা আমেরিকার সবচেয়ে আইকনিক প্রাণীদের মধ্যে মারমোট জাতীয় এই প্রাণীটিও অন্যতম।। ছবি লেখকের সৌজন্যে
প্রেইরি তথা আমেরিকার সবচেয়ে আইকনিক প্রাণীদের মধ্যে মারমোট জাতীয় এই প্রাণীটিও অন্যতম।। ছবি লেখকের সৌজন্যে

হয়তো প্রতিদিনের ছন্দবদ্ধ একঘেয়ে জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক অলীক জীবনধারা মনে হতো। ভাবতাম, মাথায় সমব্রেরো হ্যাট চাপিয়ে মাইলের পর মাইল ঘোড়ায় চেপে নতুন নতুন প্রান্তর, পর্বত, নদী, মানুষ দেখা ছাড়া আর কোনো সুখের ব্যাপার থাকতে পারে না জীবনে। সৎ পরিশ্রমে নিজের উপার্জনে জীবন গড়ার একটা হাতছানি ছিল। বজ্জাত শত্রুর নাক-মুখ থেতলে পিটিয়ে প্রায় লাশ বানিয়েও নবজীবন দেওয়ার মহত্ত্ব ছিল। একটা শহর কোনো কুচক্রের হাত থেকে একা মুক্ত করার বাসনা ছিল। পিস্তলের ছয়টা গুলিই একের পর এক জাদুময় দক্ষতায় বেঁধানোর খায়েশ ছিল। পায়ের দুই ফাঁকে স্যাডল আর কোমরের দুই পাশে নানা জাতের রিভলবার ঝোলানোর কল্পনা ছিল।

আমার এখনো প্রায়ই ঘুম ভাঙার পর মনে হয়, প্রেইরির মাঝে নিজের হাতে তৈরি এক কাঠের কেবিনে আছি। চারদিকের গমের ক্ষেতের মাঝে সরসর করে হাওয়া বয়ে যায়। সেই প্রান্তরে আগের জোছনাময় রাতের কথা মনে হওয়ার সুখের হাসি মুখে নিয়ে আনমনে বলে উঠি—শীতের সকালে শরীর গরম করতে কফির জুড়ি নেই।’

ছবি লেখকের সৌজন্যে
ছবি লেখকের সৌজন্যে

পথে ১৮৮০ সালের মডেল শহর দেখে থামলাম। জানা গেল, আদ্যিকালের এই শহরটিকে সেই আমলের মতোই রাখা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা এখনো বুনো পশ্চিমের স্বাদ পেতে পারেন। স্যালুন, ব্যাংক, শেরিফের অফিস, রেস্তোরাঁ—সবই রাখা হয়েছে আগের মতো।

আবার ঢুকলে দুই ঘণ্টা চলে যাবে। তার সঙ্গে জনপ্রতি ১২ ডলার! হাতে ঘণ্টা নেই বলেই সামনের দিকে এগিয়ে দুপুরে খাবারের জন্য থামা হলো বিশেষ এক জায়গায়—প্রেইরি ডগদের আস্তানায়!

মাদাগাস্কারের মতো সারি সারি খাড়া পাথর। ছবি লেখকের সৌজন্যে
মাদাগাস্কারের মতো সারি সারি খাড়া পাথর। ছবি লেখকের সৌজন্যে

প্রেইরি তথা আমেরিকার সবচেয়ে আইকনিক প্রাণীদের মধ্যে মারমোট জাতীয় এই প্রাণীটিও অন্যতম। অসম্ভব কিউট, গর্ত খুঁড়ে বাস করে। এই কারণেও অনেক র‍্যাঞ্চের মালিকের তারা শত্রু। কারণ তাদের তৈরি গর্তে ঘোড়ার পা পড়লেই ভেঙে যেতে পারে!

মানুষের ভয়ও যেন খুব একটা নেই তাদের। যেখানে গিয়েছিলাম, সেখানে কয়েকশ প্রেইরি ডগ দেখলাম আপন আপন গর্তে। কেউ কেউ আবার পরিবারসহ। তবে নিজের গর্তের ব্যাপারে তারা বেশ সচেতন। কোনো অনধিকার প্রবেশকারী দেখলেই সোজা ধাওয়া করে!

মাদাগাস্কারের মতো সারি সারি খাড়া পাথর। ছবি লেখকের সৌজন্যে
মাদাগাস্কারের মতো সারি সারি খাড়া পাথর। ছবি লেখকের সৌজন্যে

মজার ব্যাপার হলো, সেখান থেকে রওনা দেওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার প্রেইরি ডগ দেখলাম। তারা প্রায় সবাই নিজের গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে আইকনিক ভঙ্গিতে ইতিউতি তাকাচ্ছে।

দুপুরের পরপরই আমরা প্রবেশ করলাম এক ভিনগ্রহে! সে জায়গার নামই ব্যাডল্যান্ডস! এতটাই ভূতুড়ে, কর্কশ আর রুক্ষ সেই ভূমি যে সেখানে কিছুই জন্মায় না। এককালে চরে বেড়ানো ডাইনোসরদের ফসিল মেলে, আর আছে এন্তার র‍্যাটলস্নেক!

ছবি লেখকের সৌজন্যে
ছবি লেখকের সৌজন্যে

ঠিক গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ছোট ভাই যেন। নানা আকৃতির, নানা রঙের পাথর। রং জমে আছে স্তরে স্তরে। দিনের বিভিন্ন সময়ে আলোর কারণে সেগুলোও নানা রকম লাগে—লালচে, খয়েরি, ফিকে লাল। আর বিশাল এই ন্যাশনাল পার্কের এলাকা। কেমন যেন বিষণ্ণ, প্রাণহীনতায় মোড়া। কিন্তু এই কারণেই হয়তো ব্যাডল্যান্ডসের প্রতি এক ধরনের সমীহ জাগে।

এখানে বাইসনের দেখা মেলে। আমরা অবশ্য বুনো ভেড়ার দেখা পেলাম। আর পেলাম ক্ষুদে জাদুঘরে ডাইনোসরের জীবাশ্ম! জায়গায় জায়গায় ভিউ পয়েন্ট করে দেওয়া আছে, এই বিস্ময়কে থেমে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করার জন্য। সেটা করে আমরা আবার চলে গেলাম বুনো পশ্চিমের জগতে।

ছবি লেখকের সৌজন্যে
ছবি লেখকের সৌজন্যে

ওয়াল ড্রাগ নামের বিশাল এক দোকানপাড়ায়। সেখানে থরে থরে সাজানো আছে সেই আমলের অস্ত্র, পোশাক, তাদের নকল, অপূর্ব সব ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, বিশেষ করে আদিবাসী আমেরিকানদের ছবি। কত ধরনের যে পিস্তল দেখলাম, তার ইয়ত্তা নেই। সেই সঙ্গে ছুঁয়ে দেখলাম জিম বাউয়ির কিংবদন্তির ছুরি, ‘দ্য আয়রন মিস্ট্রেস’!

এখানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নাকি ৫ সেন্টের কফি। যদিও তার চেয়ে বন্যপ্রাণীর জাদুঘরটিই বেশি ভালো লাগল। সেখানে বাস্তব সব প্রাণীর সঙ্গে ছিল জ্যাক র‍্যাবিট আর হরিণের সংকর জ্যাকেলোপও! আর আছে বুনো পশ্চিমের নামকরা সব বন্দুকবাজের ভাস্কর্য।

ছবি লেখকের সৌজন্যে
ছবি লেখকের সৌজন্যে

সন্ধ্যা নেমে আসবে, মানে রাত ৯টা হয়ে যাবে। তার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম প্যাঁচানো রাস্তা ধরে একটি স্টেট পার্কের ভেতরের নিডলস হাইওয়ে ধরে আরেক ভিনগ্রহে। সেখানে মাদাগাস্কারের মতো সারি সারি খাড়া পাথর। যেন দানবের দল খেলতে খেলতে ফেলে গেছে বিশাল সব বোল্ডার!

এর মধ্যে একটার নাম ‘সুঁইয়ের চোখ’। সেখান দিয়ে কোনোমতে একটি গাড়ি যেতে পারে, অল্পের জন্য ঘষা না লাগিয়ে। আমরাও গেলাম এবং পুরো এলাকাটিকে শেষ সূর্যের আলোয় দেখে অতি মুগ্ধ হলাম! যে কেউই হবে অবশ্যই!

ছবি লেখকের সৌজন্যে
ছবি লেখকের সৌজন্যে

সেই পার্কের রাস্তায় সামনে এল অনেক অনেক হরিণ আর তিনটি শেয়াল। তাই সাবধানে, আস্তে আস্তে নিচের দিকে গাড়ি চালিয়ে ফিরে এলাম র‍্যাপিড সিটিতে রাতের আস্তানার খোঁজে।

মধ্যরাত হয়ে গেছে। বড্ড বেশি গতির ওপর দিয়ে চলছে সময়। কথা হবে অন্য পর্বে আবারও।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত