শিশুর স্বাস্থ্যে জলবায়ুর প্রভাব

এখনো ‘এক্সট্রিম হাই রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে শিশুরা, কী করছে সরকার

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ১৪
বাংলাদেশের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ‘এক্সট্রিম হাই রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই উপকূলের এক গ্রামে পানি তুলতে যায় দশ বছরের মেয়ে আদরী (ছদ্মনাম)। পুকুরের পানি লবণাক্ত, তবুও সেটিই তার পরিবারের একমাত্র ভরসা। কয়েকদিন ধরে তার শরীরে চুলকানি, জ্বর, আর দুর্বলতা।

এটি কোনো ব্যতিক্রমী গল্প নয়, বরং বাংলাদেশে হাজারো শিশুর দৈনন্দিন বাস্তবতা। বিশেষত, উপকূলীয় অঞ্চলে এই সমস্যা আরও প্রকট। জলবায়ু পরিবর্তন তাদের জন্য এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, ইতিমধ্যেই এটি শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর নানা ধরনের সংকট তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। আর এখানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ২০১৬ সালে বলেছে, বাংলাদেশের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ‘এক্সট্রিম হাই রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনেও ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশের শিশুরা এখনো এক্সট্রিম হাই রিস্ক ক্যাটাগরিতেই রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হওয়া তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও দূষণ একসঙ্গে তাদের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। এমনকি জলবায়ুর এই পরিবর্তন শিশুদের জন্মের আগ থেকে শুরু হয়ে শৈশবের প্রতিটি ধাপে বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যসংকট তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ শিশুদের জন্য নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা নবজাতক ও ছোট শিশুদের জন্য মারাত্মক। এর ফলে শিশুদের হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

শিশুদের শরীর পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় তারা তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে যে গরম একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সহ্য করতে পারে, সেটিই একটি শিশুর জন্য জীবনহানিকর হয়ে উঠতে পারে।

আরও একটি বড় সংকট হলো, পানি ও স্যানিটেশন সংকট। এটি সরাসরি বিভিন্ন রোগের সঙ্গে যুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। এতে নিরাপদ পানির উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে শিশুরা দ্রুত পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রতিবছর ৪ লাখের বেশি শিশু (৫ বছরের নিচে) নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সংকটজনিত রোগে মারা যায়। জলবায়ু পরিবর্তন এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন ‘স্কিন ডিজিজ’ হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ কিন্তু কম দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর একটি হলো অপুষ্টি। জলবায়ুর পরিবর্তনে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, খাদ্যের সহজলভ্যতা কমে যায়, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের পুষ্টিতে। যেসব শিশু আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে শিশুপুষ্টি নিয়ে কাজ করা জাতীয় জরিপগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, অপুষ্টি ও শিশুর স্বাস্থ্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু সংকটের কারণে এটি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

জলবায়ু সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বায়ুদূষণ। শিশুদের ফুসফুস ও শরীর পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় তারা বায়ুদূষণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। দূষিত বাতাস শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরাঞ্চলে, এই সমস্যা আরও তীব্র। ‘সায়েন্স অব দ্য টোটাল ইনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় সাইরা তাসনিম দেখিয়েছেন, ঢাকার ২৭ শতাংশ শিশু শ্বাসকষ্টে ভোগে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৩ জন সরাসরি শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় একসঙ্গে শিশুদের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় একসঙ্গে শিশুদের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু শারীরিক নয়, এটি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করছে। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে বাড়িঘর হারানো, স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া, পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে শিশুরা এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হচ্ছে। ইউনিসেফের অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকট একসঙ্গে স্বাস্থ্যসংকট, পানিসংকট, শিক্ষাসংকট ও নিরাপত্তাসংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যায় ৭ লাখের বেশি শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা তাদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপত্তার ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুরা এই সংকটের জন্য দায়ী নয়, কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। জলবায়ু পরিবর্তন তাই শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি শিশুদের অধিকার, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জলবায়ু মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। নিরাপদ পানি, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং শিশুদের জন্য উপযোগী নগর ও গ্রামীণ পরিবেশ গড়ে তোলা এখন জরুরি।

কারণ, জলবায়ুর পরিবর্তন শুধু প্রকৃতির পরিবর্তন নয়, এটি একটি প্রজন্মের শৈশবকে বদলে দিচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে শিশুদের শরীর ও জীবনে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিবেশ, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. মারিয়া নেইরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মানবস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। তাই তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কী করছে সরকার

সরকার নীতিগতভাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন ২০২৩–২০৫০ মেয়াদি জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) তার একটি বড় উদাহরণ। এই পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য, পানি, খাদ্য ও অবকাঠামো খাতকে জলবায়ু সহনশীল করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একইভাবে সর্বশেষ ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশনে (এনডিসি ৩.০) শিশু ও নারীদের জন্য দুর্যোগের মধ্যেও স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা চালু রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এনডিসি ৩.০ হচ্ছে, প্যারিস চুক্তির আওতায় সদস্য দেশগুলোর দাখিলকৃত তৃতীয় দফার জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা।

এরপর স্বাস্থ্যখাতেও কিছু অভিযোজনমূলক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যেমন দুর্যোগ সহনশীল স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা, জরুরি পরিস্থিতিতেও চিকিৎসাসেবা সচল রাখা ইত্যাদি। পাশাপাশি বায়ুদূষণ কমাতে সরকার শর্ট লাইভড ক্লাইমেট পলিউট্যান্টস (এসএলসিপি) অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষতিকর কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো। এ উদ্যোগ সফল হলে শিশুদের শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসজনিত রোগ কমতে পারে।

এছাড়া অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি আলাদা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নিজস্ব অর্থে গঠিত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) থেকে স্বাস্থ্য, পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা—ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা—প্রাণহানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে—এই উদ্যোগগুলো কি শিশুদের বাস্তব ঝুঁকি কমাতে পারছে? ইউনিসেফের সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, বাংলাদেশ এখনো ‘এক্সট্রিম হাই রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। অর্থাৎ নীতিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও বাস্তবতায় পরিবর্তন খুব সীমিত।

তথ্যসূত্র: ইউনিসেফের ইমপ্যাক্ট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অন চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ প্রতিবেদন, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট-২০১২, লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিতে প্রকাশিত ইমপ্যাক্ট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অন হেলথ ইন বাংলাদেশ প্রতিবেদন

সম্পর্কিত