গবেষণা/ছাগলের আছে মানুষের কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে খাবার খোঁজার ক্ষমতা
স্ট্রিম ডেস্ক

কথায় কথায় বন্ধুরা বলে, ‘তুই কি ছাগল’! কারও সামান্য বোকামি বা অসাবধানতা দেখলে নিরীহ এই প্রাণীটির নাম টেনে এনে কটাক্ষ করার অভ্যাস আমাদের বহু পুরোনো। রূপকথার গল্প থেকে শুরু করে দৈনন্দিন আড্ডায়, ছাগলকে আমরা সাধারণত ভোলাভালা আর কম বুদ্ধির প্রাণী হিসেবেই দেখে এসেছি।
কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ধারণাটা বদলানোর সময় এসেছে। ছাগল মোটেই ততটা অবুঝ নয়, যতটা আমরা ভাবি। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন। তাঁরা দেখেছেন, মানুষের গলার আওয়াজ এবং সে আওয়াজ কোন দিক থেকে আসছে, তা অনুসরণ করে ছাগল লুকিয়ে রাখা খাবার খুঁজে পেতে পারে!
বিষয়টি ঠিক কেমন? গবেষক সাইমন টাউনসেন্ডের ভাষায়, ‘মানুষ যেমন আঙুল দিয়ে কোনো জিনিসের দিকে ইশারা করে, তেমনি ছাগলের কাছে মানুষের কণ্ঠস্বরও এক ধরনের ‘অদৃশ্য ইশারা’।
যেভাবে চলল পরীক্ষা
ছাগল কীভাবে মানুষের সংকেত বুঝতে পারে, তা জানতে গবেষকেরা পরীক্ষা চালান। এতে অংশ নেয় ২৯ ছাগল। পর্দার দুই পাশে রাখা হয় দুটি বালতি। প্রথমে ছাগলগুলোকে পরীক্ষার জন্য সেই পরিবেশে অভ্যস্ত করা হয়। গবেষক পর্দার আড়াল থেকে তাদের ডাকতেন এবং ছাগলের চোখের সামনেই একটি বালতিতে খাবার রাখতেন।
এরপর শুরু হয় আসল পরীক্ষা। ছাগলের চোখের আড়ালে পর্দার পেছনে একটি বালতিতে রাখা হয় কিছু লোভনীয় খাবার। অন্য বালতিটি রাখা হয় খালি। এরপর গবেষক কয়েকভাবে পরীক্ষা করেন। কখনো তিনি খাবার রাখা বালতির দিকে মুখ করে উৎসাহের সঙ্গে কথা বলেন। কখনো চুপ করে থাকেন। আবার কখনো কথা বলেন, কিন্তু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখেন।
এরপর ছাগলটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দেখা হয়, সে কোন বালতির দিকে যায়। ফলাফল দেখে গবেষকদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! দেখা গেল, গবেষক যখন খাবার রাখা বালতির দিকে মুখ করে উত্তেজিতভাবে কথা বলেছেন, ছাগলগুলো প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে সোজা গিয়ে সেই বালতিতেই মুখ দিয়েছে।
অথচ গবেষক যখন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তাদের সঠিক বালতি বেছে নেওয়ার হার নেমে আসে ৪৭ শতাংশে। আর যখন তিনি অন্যদিকে মুখ করে কথা বলেছেন, তখন এই হার ছিল ৪৯ শতাংশ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরীক্ষার আগে ছাগলগুলোকে এ কাজের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। মানুষের কণ্ঠস্বরের দিক অনুসরণ করেই তারা খাবারের অবস্থান খুঁজে নিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বুঝতে পারে ছাগল
ছাগল হয়তো আপনি কী বলছেন, তার শব্দের অর্থ বোঝে না। তবে আপনার কণ্ঠের সুর, আবেগ এবং আপনি কোন দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন, এসব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বুঝতে পারে।
আগের গবেষণাগুলোতেও ছাগলের এই ক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মানুষ কোনো দিকে হাত দিয়ে ইশারা করলে ছাগল সেই ইশারা অনুসরণ করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, মানুষের কণ্ঠে রাগ, আনন্দ বা বিরক্তির মতো আবেগের পার্থক্যও তারা বুঝতে পারে। এমনকি গোমড়ামুখো মানুষের চেয়ে হাসিমুখের মানুষের প্রতিও তাদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।
দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের সম্পর্ক
গবেষণার অন্যতম লেখক স্টুয়ার্ট ওয়াটসন মনে করেন, এই ক্ষমতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের সম্পর্ক। প্রায় ১০ হাজার বছর ধরে মানুষ ছাগল পালন করে আসছে। মানুষের কাছাকাছি থামাতে আচরণ ও বিভিন্ন সংকেত বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তবে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তাই বিজ্ঞানীরা এখন বুনো ছাগলের ওপর একই ধরনের পরীক্ষা চালাতে চান। এতে বোঝা যাবে, মানুষের কণ্ঠের দিক অনুসরণ করার এই ক্ষমতা ছাগলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য কি না, নাকি মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে এই ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
তাই এরপর থেকে কাউকে চট করে ‘ছাগলের বুদ্ধি’ বলে খোঁচা দেওয়ার আগে দুবার ভাবতেই পারেন। যাকে বোকা ভাবছেন, সে হয়তো আপনার কথার সুর আর ইশারা বেশ ভালোভাবেই বুঝে নিচ্ছে!
.png)


-7c29dd-256x144.webp)





-b52d51.jpeg)
-028855-256x144.webp)
