জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দেশে দেশে যেভাবে পালিত হয় ঈদুল ফিতর

খাদিজা আক্তার
খাদিজা আক্তার

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০২৬, ১৩: ৫৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

এশিয়া মহাদেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর অত্যন্ত আনন্দ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদ্‌যাপিত হয়। এক মাসের সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে মুসলমানরা ঈদের উৎসবে মেতে ওঠেন। নতুন পোশাক পরে ঈদের নামাজ আদায়, সেমাই-মিষ্টান্ন ভোজন, কোলাকুলি, ঈদ সালামি আদান-প্রদান এবং ফিতরা ও জাকাত বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হয়।

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে শুরু করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই উৎসব ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় ঈদের আনন্দ

ঈদের আগের রাতকে অনেক দেশে ‘চাঁদ রাত’ বলা হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই রাতে বাজারগুলোতে খুব জমজমাট থাকে। নারীরা হাতে মেহেদি দেন, পরিবারে পরিবারে চলে ঈদের বিশেষ খাবার তৈরির প্রস্তুতি। পরদিন সকালে মুসলমানরা নতুন পোশাক পরে ঈদগাহ ময়দান বা বড় মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে একে অপরকে ‘ঈদ মোবারক’ জানিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয় এবং শুরু হয় আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাতায়াত।

বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাত। ছবি: সংগৃহীত
বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাত। ছবি: সংগৃহীত

ঈদের দিনে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব খাবারেরও বড় ভূমিকা আছে। সেমাই, পায়েস, ক্ষীর, বিরিয়ানি, পিঠা-পুলি ও মিষ্টি ছাড়া যেন ঈদ পূর্ণতা পায় না। বড়রা ছোটদের টাকা বা উপহার দেয়, যেটা শিশুদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। আর নামাজের আগেই ফিতরা বা জাকাত দেওয়া হয়, যাতে গরিব মানুষরাও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঈদ উদ্‌যাপনে কিছু পার্থক্যও দেখা যায়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে আলোকসজ্জা, মেহেদি আর পারিবারিক ভোজ বেশি জনপ্রিয়। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেমন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর-এ এই উৎসব ‘হারি রায়া ইদুল ফিতরি’ নামে পরিচিত। সেখানে পরিবারের ছোটরা বড়দের কাছে ক্ষমা চেয়ে দিনটি শুরু করে এবং বাড়ি বাড়ি ঘুরে মেহমানদারির ঐতিহ্য পালন করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় আবহ ও আয়োজন

মধ্যপ্রাচ্যে ঈদুল ফিতর অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়। এক মাস সিয়াম সাধনার পর রমজানের শেষ রাতে চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে এই আনন্দঘন উৎসবের সূচনা ঘটে। ভোরে মুসল্লিরা নতুন বা পরিষ্কার পোশাক পরে মসজিদ কিংবা খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ‘ঈদ মোবারক’ বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, যা পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের প্রতীক।

ঈদ উপলক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ঘরে ঘরে বিশেষ খাবারের আয়োজন থাকে। খেজুর, মা'মুল (খেজুর বা বাদাম দিয়ে তৈরি কুকি), বাখলাভা এবং নানা ধরনের মিষ্টান্ন অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য পরিবেশন করা হয়। অনেক দেশে সকালে মিষ্টি খাওয়ার প্রচলন রয়েছে, যা ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একত্রে খাবার গ্রহণ এবং আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

ঈদে সৌদি আরবের শিশুরা। সংগৃহীত ছবি
ঈদে সৌদি আরবের শিশুরা। সংগৃহীত ছবি

ঈদের আরেকটি আকর্ষণ হলো ‘ইদিয়া’ বা সালামি। বড়রা ছোটদের নতুন টাকা বা উপহার দিয়ে থাকে। এটা শিশুদের কাছে ঈদের সবচেয়ে আনন্দের অংশগুলোর একটি। পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট সাজানো হয় রঙিন আলো, লন্ঠন ও বিভিন্ন সজ্জায়, যা উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

ঈদের নামাজের আগে ফিতরা বা যাকাতুল ফিতর প্রদান করাও মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষও ঈদের আনন্দে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই ঈদ উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি থাকে এবং কয়েকদিন ধরে উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদ উদ্‌যাপন করা হয়।

পাশ্চাত্যে ভিন্ন পরিবেশে ঈদ

পাশ্চাত্যের দেশগুলো—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে—ঈদুল ফিতরের পরিবেশ কিছুটা ভিন্ন। এসব দেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হওয়ায় ঈদ আয়োজনে স্থানীয় সংস্কৃতি ও বহুজাতিক সমাজের প্রভাব দেখা যায়। সাধারণত শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে মুসলিমরা নতুন পোশাক পরে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদ, কনভেনশন সেন্টার, বড় হলরুম বা খোলা পার্কে সমবেত হন। একই জামাতে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মুসলিমদের উপস্থিতি ঈদের মিলনমেলায় বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে।

মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মতো পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ দেশে ঈদের সরকারি ছুটি থাকে না। তাই অনেক মুসলিম আগেই ব্যক্তিগতভাবে ছুটি নিয়ে রাখেন, আবার কেউ কেউ সকালে ঈদের নামাজ আদায় করে কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে যান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু শহরে মুসলিম শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে স্কুলে ঈদের ছুটি দেওয়া শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ। সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ। সংগৃহীত ছবি

পাশ্চাত্যের ঈদে পোশাক ও সংস্কৃতির এক সুন্দর মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। কেউ মধ্যপ্রাচ্যের জুব্বা, কেউ দক্ষিণ এশিয়ার পাঞ্জাবি-পায়জামা, আবার কেউ পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরে ঈদের জামাতে অংশ নেন। নারীরাও তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ও বর্ণিল পোশাকে সেজে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। খাবার-দাবারের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। দক্ষিণ এশীয় পরিবারে সেমাই বা পায়েস, আরবদের ঘরে খেজুর ও ‘মামুল’সহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন থাকে। অনেক সময় বন্ধু ও আত্মীয়দের নিয়ে বাড়িতে বা রেস্টুরেন্টে একসাথে খাবারের আয়োজন করা হয়, যেখানে সবাই নিজ নিজ দেশের খাবার নিয়ে আসে।

এ ছাড়া অনেক শহরে ঈদ উপলক্ষ্যে কমিউনিটিভিত্তিক ঈদ মেলা বা সামাজিক উৎসবের আয়োজন করা হয়। সেখানে শিশুদের জন্য খেলাধুলা, মেহেদি স্টল, বিভিন্ন খাবারের দোকান এবং ইসলামিক শিল্প ও পোশাকের স্টল থাকে, যা নতুন প্রজন্মের কাছে ঈদের আনন্দকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ছোটদের ঈদি বা উপহার দেওয়া এবং ঈদের আগে ফিতরা বা দান করার রীতিও পাশ্চাত্যেও পালিত হয়। এভাবেই প্রবাসে থেকেও মুসলিমরা ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে ঈদুল ফিতরের আনন্দ উদ্‌যাপন করেন।

সম্পর্কিত