যেভাবে হামমুক্ত হলো ভুটান-শ্রীলঙ্কা

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৯: ২৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় একসময় হাম ছিল শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এক সময় এই সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগটি বহু শিশুর জীবন কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি টিকাদান কর্মসূচি, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে আজ সেই চিত্র বদলে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা এই অঞ্চলে হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

হামজনিত মৃত্যুর ৪০ শতাংশই ঘটত দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায়

দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে একসময় এই রোগে বিপুলসংখ্যক শিশু মারা যেত। ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাপী হামজনিত মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশই ঘটেছিল এই অঞ্চলে। হাম মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির নাক, মুখ বা গলার ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের আক্রান্ত করে। সংক্রমণের ১০–১২ দিনের মধ্যে জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ দেখা দেয়। কয়েকদিন পর মুখ থেকে শুরু হয়ে পুরো শরীরে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। তবে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার হওয়ায় ২০২৪ সালের পরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ভুটান যেভাবে ‘হামমুক্ত’ হলো

ভুটানে হাম প্রতিরোধে বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৯ সালে। ওই বছর দেশটির সরকার নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের টিকা অন্তর্ভুক্ত করে। তখন বিসিজি, ডিপিটি, টিটি এবং ওরাল পোলিও টিকার পাশাপাশি হাম টিকাও দেওয়া শুরু হয়। শুরুতে ৯ মাস বয়সে এক ডোজ টিকা দেওয়া হলেও সেই সময় টিকাদানের হার ছিল মাত্র ২৪ থেকে ৮৩ শতাংশের মধ্যে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮৮ সালে টিকাদান কর্মসূচির গতি বাড়াতে একটি কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এর ফলে দ্রুতই টিকাদানের হার বাড়তে থাকে। ১৯৯১ সালে পরিচালিত প্রথম জাতীয় জরিপে দেখা যায়, হাম টিকাদানের হার বেড়ে ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এরপর থেকে দেশটি ধারাবাহিকভাবে এই কর্মসূচি বজায় রাখে।

২০০৬ সালে ভুটান হাম টিকার দ্বিতীয় ডোজ চালু করে এবং রুবেলা টিকার সঙ্গে মিলিয়ে হাম ও রুবেলা টিকা চালু করে। পরে ২০১৬ সালে হাম-রুবেলার টিকার পরিবর্তে হাম-মাম্পস-রুবেলা টিকা চালু করে ভুটান, যাতে শিশুদের আরও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।

২০০০ সালে ভুটান সরকার হামজনিত অসুস্থতা ৯০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ৯৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে টিকাদানের হার ৯০ শতাংশের বেশি নিশ্চিত করা হয়। এর ফল হিসেবে ১৯৯৩ সালের পর থেকে দেশে হামজনিত কোনো মৃত্যুর ঘটনা আর ঘটেনি।

২০০২ সালের জাতীয় টিকাদান জরিপে দেখা যায়, হাম টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের হার ছিল ৯২ শতাংশ। ২০০৮ সালের জরিপে হাম-রুবেলা টিকাদানের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ শতাংশে। ২০১২ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপে এই হার আরও বেড়ে ৯৭ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছে যায়।

নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি ভুটান বেশ কয়েকটি গণটিকাদান অভিযানও চালায়। ১৯৯৫ ও ২০০০ সালে দেশজুড়ে হাম টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ওই কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেয় ভুটান সরকার। এসব অভিযানে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশু টিকা পায়।

২০০৬ সালে আরেকটি বড় হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান পরিচালিত হয়। এতে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের পাশাপাশি ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য, যাতে জন্মগত রুবেলা সিনড্রোমের ঝুঁকি কমানো যায়। এই ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে ভুটান দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় হাম নির্মূলকারী প্রথম দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

শ্রীলঙ্কা হাম নিয়ন্ত্রণ করেছে যেভাবে

শ্রীলঙ্কাতেও একসময় হাম ছিল একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে ধারাবাহিক টিকাদান কর্মসূচি ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটি পরিস্থিতি পাল্টে দেয়।

২০১৯ সালে ডব্লিউএইচও ঘোষণা দেয়, শ্রীলঙ্কা সফলভাবে হাম নির্মূল করেছে। দেশটিতে স্থানীয়ভাবে ছড়ানো হাম ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে বলে যাচাই করা হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীলঙ্কার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল উচ্চমাত্রার টিকাদান কর্মসূচি। দেশটিতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের দুই ডোজ হাম ও রুবেলা টিকা দেওয়া হয় এবং টিকাদানের হার দীর্ঘদিন ধরে ৯৫ শতাংশের বেশি বজায় রয়েছে।

এছাড়াও অনেক বড় আকারে গণটিকাদান কর্মসূচিও চালানো হয়, যাতে টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ২০১৪ সালে এমন একটি জাতীয় অভিযান পরিচালিত হয়, যা টিকাদানের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডিব্লিউএইচও বলছে, শ্রীলঙ্কায় স্থানীয়ভাবে ছড়ানো হাম ভাইরাসের শেষ সংক্রমণ শনাক্ত হয় ২০১৬ সালের মে মাসে। এরপর যে কয়েকটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, সেগুলো বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে ছড়িয়েছিল। তবে দ্রুতই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনে শ্রীলঙ্কা সরকার।

দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে হাম ও রুবেলা নির্মূলকে অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সদস্য দেশগুলোকে দুই ডোজ হাম টিকা ও অন্তত একটি রুবেলা টিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই কর্মসূচির ফলেই ভুটান, মালদ্বীপ, উত্তর কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং পূর্ব তিমুর এই পাঁচটি দেশ হাম নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে।

তবু চ্যালেঞ্জ আছে এখনো

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো দেশে হাম নির্মূল হলেও বাইরে থেকে ভাইরাস প্রবেশের ঝুঁকি সবসময় থাকে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও গণমানুষের অবাধ চলাচলের কারণে সংক্রমণ আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচি বজায় রাখা, শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি এবং জনসচেতনতা থাকলে হাম ও রুবেলার মতো মারাত্মক রোগও নির্মূল করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: ডব্লিউএইচওর ওয়েবসাইট, সায়েন্স ডিরেক্ট, ভুটানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট কাউন্সিল অব শ্রীলঙ্কার ওয়েবসাইট

সম্পর্কিত