ভাসানীর লংমার্চ ৫০ বছর পরেও যে কারণে প্রাসঙ্গিক

ফারাক্কা লংমার্চ শুরুর আগে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীতে সমাবেশে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ফারাক্কা বাঁধের কমিশনিং অনুষ্ঠানে পূর্বনির্ধারিত প্রতিনিধি হয়েও তৎকালীন বাকশাল সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেই অনুষ্ঠানে শেষতক যাননি। কারণ তৎকালীন সরকার ১৮ এপ্রিলে দেওয়া একটি সাময়িক অনুমোদনের ভিত্তিতে ২১ এপ্রিলেই ভারতের ফারাক্কা বাঁধ কমিশনিংয়ের সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে শেষ মুহূর্তে তাঁর ভারত সফর বাতিল করেছিল।

জানা যায়, সে সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেন এবং ভারত সরকারের কৃষি ও সেচমন্ত্রী বাবু জগজিবান রাম ওরফে ‘বাবুজি’ এই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে খুব ‘অবাক’ ও ‘অখুশি’ হয়েছিলেন। কারণ শেখ মুজিব শাসনামলের বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে এমন ঠান্ডা আচরণ করতে পারে তা ছিল তাদের জন্য কল্পনাতীত। বলে রাখা ভালো, বাবুজি ছিলেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

সেরনিয়াবাতের সেই সফর শেষ মুহূর্তে কেন বাতিল করা হয়েছিল, এই প্রশ্নের উত্তর যদি খোঁজা হয়, তাহলে শেখ মুজিব সরকারের করুণ আশাভঙ্গ থেকে ইন্দিরার ভারতের নিদারুণ বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে আমরা পৌঁছে যাব ইতিহাসের ‘মহামিছিলের মহানায়ক’ মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে।

ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে এক ঐতিহাসিক লং মার্চের মাধ্যমে বাংলাদেশের ফারাক্কা বাঁধ বিরোধিতাকে যেকোনো শাসনামলের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছেন। তিনি স্থাপন করেছেন ফারাক্কা বাঁধ বিরোধিতায় বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি; যে ঐক্য আজ পঞ্চাশ বছর পরের বাংলাদেশেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

১৯৭৪ সালের ১২-১৬ মে শেখ মুজিব দিল্লি সফর করেন। সেই সময়েই তাঁকে জানানো হয়, বছরের শেষ দিকে ফারাক্কা বাঁধ কমিশনিং করা হবে। ১৬ মে এক যৌথ ঘোষণায় দুই সরকার প্রধান মুজিব-ইন্দিরা জানান, গঙ্গায় প্রাপ্ত পানি প্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নয়, তাই পানিবণ্টনের আগে প্রবাহ বৃদ্ধি করতে হবে বলে সরকারদ্বয় সম্মত হয়েছে।

পানি প্রবাহ বাড়ানোর উপায় বের করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় ১৯৭২ সালের মৈত্রীচুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনকে। আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা যার কাজ, কিন্তু ৭২-এ প্রতিষ্ঠার পর কমিশন এই প্রথম গঙ্গা-ফারাক্কা-পদ্মার পানি প্রশ্নে অন্তর্ভুক্ত হলো। এতদিন গঙ্গা অববাহিকার পানি ও ফারাক্কার প্রশ্নটি কমিশনের বদলে দুই সরকার প্রধাণের জন্য নির্ধারিত ছিল।

শেষমেশ ঘোষণা করা হয় যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে সমস্যা সমাধান করা হবে; যেখানে দুই দেশের স্বার্থই বজায় থাকবে।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের জুন থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত যৌথ নদী কমিশনের মোট পাঁচটি সভা হয়। কিন্তু পানি প্রবাহ বাড়ানোর উপায় নিয়ে কোনো মতৈক্যে পৌঁছানো যায়নি। বাংলাদেশ গঙ্গা অববাহিকার উজানের দেশ হিসেবে ভারত ও নেপালে জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব করে কিন্তু ভারত তাতে রাজি হয়নি। বরং তারা ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা সংযোগ করার কথা বলে কিন্তু বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়নি। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লীতে এক মন্ত্রী-পর্যায়ের বৈঠকেও পানি প্রবাহ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সম্মতিতে আসা যায়নি।

১৯৭৫ সালের ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল ঢাকায় মন্ত্রী-পর্যায়ের বৈঠকে ভারত প্রস্তাব করে, ন্যায্যভাবে পানি বণ্টনের আলোচনাটি ১৯৭৪ সালের যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী চলতে থাকুক, পাশাপাশি তারা ফারাক্কা বাঁধের জন্য ইতিমধ্যে নির্মাণ সম্পন্ন করা ফিডার ক্যানেল বা সংযোগ খালের পরীক্ষামূলক যাচাই করতে চায়। উল্লেখ্য, ১৯৭০ সাল নাগাদ মূল ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হলেও এই সংযোগ খাল নির্মিত না হওয়ায় তখন ভারত বাঁধটিকে সক্রিয় করতে পারেনি।

১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ‘সরল বিশ্বাসে’ ভারতের প্রস্তাবকে অনুমোদন দেয়। অনুমোদন অনুযায়ী ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মোট ৪১ দিনের প্রতি দশ দিন ব্যবধানে ভারত ১১০০০ থেকে ১৬০০০ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে, আর বাদবাকি ৩৯০০০ থেকে ৪৪০০০ কিউসেক পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত করবে। বাংলাদেশের এই অনুমোদন ছিল সেই সংযোগ খালের মাত্র ৪১ দিনের পরীক্ষামূলক যাচাইয়ের জন্য।

কিন্তু যখন এই সাময়িক অনুমোদনকে ব্যবহার করে ২১ এপ্রিলেই ফারাক্কা বাঁধ কমিশনিং করা হয় তখন শেখ মুজিব সরকারের পাশাপাশি গোটা বাংলাদেশ বুঝতে পারে, বন্ধুত্বের বাতাবরণে ভারত সরকার আসলে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ভারতের এই বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষুদ্ধ হয়ে তৎকালীন সরকার ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ফারাক্কা বাঁধের কমিশনিং অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ভারত সফর প্রত্যাহার করে।

ফারাক্কায় গঙ্গার ওপর বাঁধ। ছবি: সংগৃহীত
ফারাক্কায় গঙ্গার ওপর বাঁধ। ছবি: সংগৃহীত

১৯৫১ সালে যখন ভারতীয় পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের সীমান্তের প্রায় ১৮ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের মালদা-মুর্শিদাবাদের মনহরপুরে গঙ্গা মোহনায় ফারাক্কা বাঁধের পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়, তখনই প্রতিবাদ জানিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। বাঁধ বিষয়ে যেকোনো পরিকল্পনায় পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে পরামর্শের দাবি তুলেছিল। কারণ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের জনজীবন, কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রাণ-ভোমরা গঙ্গা যা সময়ের আবর্তে ভাগীরথী খাত ছেড়ে এই ভাটির দেশে পদ্মা হয়েছে।

১৯৬১ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে জানায় যে বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়েছে, যদিও এতদিন ভারত বিষয়টিকে কেবল একটি বিবেচনাধীন বিষয় বলে অবহিত করে এসেছে। ১৯৫৮ সালে তারা এক সরকারি নোটে বাঁধ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও আজকের বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের প্রেক্ষিতে পাকিস্তান পরিণত হয় ভারতের চিরশত্রুতে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এই অঞ্চলের প্রতি এক আপাত বন্ধুত্বের আবরণ তৈরি করে। অথচ পানির ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কোনো সিদ্ধান্তে আসার বদলে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তৎকালীন সরকার হয়ত সেরনিয়াবতের সফর বাতিল করে শেষ মুহূর্তে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু ভাসানী এই প্রতীকী প্রতিবাদকে জীবনের অন্তিম পর্বেও একটি জাতীয় ঐক্যে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন।

কেউ কেউ ধারণা করেন, সেরনিয়াবাতের সফর বাতিলের পরামর্শ শেখ মুজিবকে ভাসানীই দিয়েছিলেন। যদিও বর্তমান লেখায় তথ্যটি যাচাই করা যায়নি, কিন্তু ১৯৭৫ সালের এপ্রিল থেকেই ভাসানী ফারাক্কা বিরোধিতায় সরব ছিলেন।

১৯৭৬ সালের শুরু থেকেই প্রায় ৯৫ বছর বয়সী মাওলানী ভাসানী অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সে অবস্থাতেই হাসপাতাল থেকে খোঁজ করেন তখন তথ্য দপ্তরে কর্মরত শামস-উল হুদাকে, উদ্দেশ্য ফারাক্কা নিয়ে তাঁর বিবৃতি প্রকাশে ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে যেন জিয়াউর রহমানের সরকার কোনো বাধা তৈরি না করে।

ভাসানী বলেন, ‘দেখ আমি ফারাক্কার ব্যাপারে জেহাদ ঘোষণা করেছি। আমি চাই, তোমরা সবাই আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবে। যদি সাহায্য করতে না চাও, তবে ইন্দিরার কাছে চিঠি লেখ যাতে করে ঠিকমতো পানি সাপ্লাই করে। তা না হলে আমি হাজার হাজার লোক নিয়ে ফারাক্কা ভেঙে ফেলব।’

অর্থাৎ আপামর মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়ার তাঁর এই বাসনা হাসপাতালের রুগ্ন বিছানায়ও তিনি লালন করেছেন যা উঠে এসেছে শামস-উল হুদার ‘মজলুম জননেতার সাথে আড়াই ঘণ্টা’ নামক স্মৃতিকথায়।

ভাসানী শামস-উল হুদাকে বলেন, ‘শোন, ভারতকে বলো বেশি টেরিবেরি না করে ফারাক্কার পানি ছাড়তে। আমার মেজাজ গরম হলে ফারাক্কায় গিয়ে পানি ছেড়ে দিব। আমাদেরকে নিয়ে খেলা নয়। বৃটিশ শার্দুল পালিয়ে গেছে, আর এসব কোন ছাড়। আমি এখনও দিনে শত শত জনসভা করতে পারি ইনশা-আল্লাহ।’

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভাসানী যে প্রত্যয় ও বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন শামস-উল হুদার কাছে তা বাংলাদেশ আজ পঞ্চাশ বছর পরও লালন করছে। পানির অধিকারের প্রশ্নে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়ার মতো সার্বভৌম বাসনায় তিনি যে বাংলাদেশকে চিরজাগ্রত করতে চেয়েছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় মার্চ থেকেই পানির ন্যায্য হিস্যা না দিলে ফারাক্কা অভিমুখে মহামিছিলের জন্য জনমত তৈরির চেষ্টায়, কিংবা ১৮ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই তাঁর লংমার্চের ঘোষণায়।

এই ঐতিহাসিক লংমার্চের জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন ১৬ মে তথা ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা যৌথ বিবৃতির দিনটিকে। অর্থাৎ মহামিছিল শুরুর দিনটিকেও তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতীকী প্রতিবাদে রূপ দিলেন। শুধু তাই নয়, লং মার্চ শুরুর আগে ইন্দিরাকে চিঠি লেখেন—

‘ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করুন এবং নিজেই এমন একটি সমাধান বের করুন, যা বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তা না হলে, আমি আপনার পূর্বপুরুষদের এবং মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে শেখা সংগ্রামের পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হব।’

১৬ মে ১৯৭৬ সালের সকালে মজলুম জননেতার নেতৃত্বে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হয় ফারাক্কা বাঁধ ভাঙারি সার্বভৌম বাসনার মহামিছিল। প্রায় ত্রিশ মাইল হেঁটে চাপাইনবাবগঞ্জে শেষ হয় সেই মহামিছিলের প্রথম দিন। ১৭ মে চাঁপাই থেকে কানসাট, মনকশা, শিবগঞ্জ হয়ে আবার কানসাটে এসে শেষ হয় বাঁধ ভাঙা বাসনার মহামিছিল।

আর এভাবেই ফারাক্কার উদ্বোধন বয়কটের মতো প্রতীকী বিরোধিতাকে বাঁধ ভাঙার মতো সার্বভৌম বাসনায় রূপ দিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। মৃত্যুর মাত্র মাসকয়েক আগে প্রতিষ্ঠা করলেন ভারতের সঙ্গে আন্তসীমান্ত সকল নদীতে বাংলাদেশের পানির অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। মহামিছিলের পঞ্চাশ বছর পরেও সেই ঐক্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়, হয়ত আরও পঞ্চাশ পরেও তাই থাকবে।

তথ্যসূত্র: হাসান আব্দুল কাইয়ূম সম্পাদিত 'মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী’, বিআইএসএস জার্নালে ইফতেখারুজ্জামানের লেখা ‘দ্য গঙ্গা ওয়াটার শেয়ারিং ইস্যু’ ও পুনম পান্ডের লেখা ‘রিভিজিটিং দ্য পলিটিক্স অব দ্য গঙ্গা ওয়াটার ডিসপিউট বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ’

সম্পর্কিত