মাহজাবিন নাফিসা

পৃথিবীর শিল্পচর্চার সবচেয়ে পুরোনো মাধ্যমগুলোর একটি ভাস্কর্য। এর মাধ্যমে কোনো ঘটনা, ব্যক্তি বা সময়কে আটকে দেওয়া যায়। হাজার বছর থেকেই মানুষ পাথর কেটে বানিয়েছে বিখ্যাত সব ভাস্কর্য। উদ্দেশ্য, মানুষের মনে সেই স্মৃতি জাগিয়ে রাখা।
ইতিহাসে দেখা যায়, যুদ্ধ, বিপ্লব, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা ধর্মীয় উগ্রবাদের সময় সবচেয়ে আগে আঘাত নেমে আসে এই ভাস্কর্যের ওপর। বিজয়ীরা অনেক সময় পরাজিতের স্মৃতি মুছে ফেলতে চায়, আবার কখনো একটি নতুন রাষ্ট্র বা নতুন রাজনৈতিক আদর্শ পুরোনো ক্ষমতার প্রতীক সরিয়ে নিজের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ভাস্কর্য ধ্বংসের এই প্রবণতা নতুন নয়। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিশ্বের নানা প্রান্তে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ ও প্রত্নসম্পদ ধ্বংস বা অপসারণের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। কোথাও এটি হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে, কোথাও রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে, আবার কোথাও ঔপনিবেশিক অতীতের প্রতীক সরিয়ে দেওয়ার আন্দোলনের অংশ হিসেবে।
কোনো শাসক বা শাসনব্যবস্থা পতনের পর তার মূর্তি ভেঙে ফেলা বা সরিয়ে দেওয়া মূলত প্রতীকী ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায়। এর মাধ্যমে নতুন শক্তি জানিয়ে দেয়, আগের যুগের অবসান ঘটেছে।
রোমান সাম্রাজ্যে এ ধরনের একটি ধারণা ছিল ‘ড্যামনাতিও মেমোরিয়ে’—অর্থাৎ কারও স্মৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা। যদিও সব ক্ষেত্রে ভাস্কর্য ধ্বংস করা হতো না, তবে অনেক সম্রাটের মূর্তি, নাম বা প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলার নজির রয়েছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে, ইতিহাসে স্মৃতি মুছে ফেলার এই ধারণাই পরবর্তী সময়ের বহু রাজনৈতিক প্রতীক ধ্বংসের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

বামিয়ানের বুদ্ধ: বিশ্বের সামনে এক সাংস্কৃতিক বিপর্যয়
২০০১ সালের মার্চে আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় অবস্থিত দুটি বিশাল বুদ্ধমূর্তি ডিনামাইট ও গোলাবর্ষণের মাধ্যমে ধ্বংস করে তালেবান।
ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শতকে পাহাড় কেটে নির্মিত এই দুটি মূর্তি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধমূর্তির মধ্যে অন্যতম। একটি ছিল প্রায় ৫৫ মিটার এবং অন্যটি প্রায় ৩৮ মিটার উঁচু।
তালেবানের তৎকালীন নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর এগুলোকে ইসলামবিরোধী মূর্তি বলে ঘোষণা করেন। এরপর আন্তর্জাতিক মহলের অনুরোধ উপেক্ষা করে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিস্ফোরক ব্যবহার করে মূর্তিগুলো ধ্বংস করা হয়।
ইউনেসকো এই ঘটনাকে মানবজাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে এক বড় আঘাত বলে উল্লেখ করে। পরে বামিয়ান উপত্যকাকে বিশ্ব ঐতিহ্য এবং বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আজও বুদ্ধমূর্তির শূন্য গহ্বর দুটি সেই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বহন করছে।
তালেবানের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম উদাহরণ তৈরি করে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ইউনেসকো, জাতিসংঘ এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আইএস পরিকল্পিতভাবে বহু প্রাচীন প্রত্নসম্পদ ধ্বংস করে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ইরাকের মসুল জাদুঘরে হামলা। ২০১৫ সালে আইএস একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে সদস্যদের হাতুড়ি, ড্রিল এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে শত শত প্রাচীন ভাস্কর্য ভেঙে ফেলতে দেখা যায়। পরে ইউনেসকো জানায়, ধ্বংস হওয়া অনেক নিদর্শন ছিল কয়েক হাজার বছরের পুরোনো।
একই সময়ে ইরাকের প্রাচীন অ্যাসিরীয় নগরী নিমরুদও বুলডোজার ও বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করা হয়। ইউনেসকোর মতে, এটি মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল ছিল।
এরপর হামলা হয় হাতরা শহরে। প্রায় দুই হাজার বছর পুরোনো এই নগরীও ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত ছিল। আইএস সেখানে অসংখ্য ভাস্কর্য, অলংকরণ ও স্থাপত্যের অংশ ভেঙে ফেলে।

পালমিরা: মরুভূমির শহরেও রক্ষা মেলেনি
সিরিয়ার ঐতিহাসিক শহর পালমিরাও আইএসের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, রোমান যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননগরী পালমিরা ১৯৮০ সাল থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়ে আসছিল।
২০১৫ সালে আইএস শহরটি দখল করার পর বালশামিন মন্দির, বেল মন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিজয়তোরণসহ একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়।
শুধু স্থাপনাই নয়, পালমিরার দীর্ঘদিনের প্রত্নতত্ত্ববিদ খালেদ আল-আসাদকেও হত্যা করে আইএস। ইউনেসকোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা তখন বলেন, এটি শুধু একজন মানুষকে হত্যা নয়, বরং সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ওপর আঘাত।

ইরাক যুদ্ধ ও সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্য
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে প্রবেশ করার পর বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকী ঘটনাগুলোর একটি ঘটে বাগদাদের ফিরদৌস স্কয়ারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর নথি, ব্রিটানিকা এবং একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বর্ণনা অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল মার্কিন মেরিনদের সহায়তায় সেখানে সাদ্দাম হোসেনের বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি ফেলে দেওয়া হয়।
টেলিভিশনের পর্দায় সেই দৃশ্যকে অনেকেই ইরাক যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের একটি অংশ বলেন, ঘটনাটি পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত জনতার উদ্যোগ ছিল না। সেখানে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এবং গণমাধ্যমে যে বিপুল জনসমাগম দেখা গিয়েছিল, বাস্তবে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
এই ঘটনার পর ইরাকজুড়ে সাদ্দাম হোসেনের বহু মূর্তি ও প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা হয়, যা বাথ পার্টির শাসনের অবসানের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ইরাক যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হলে প্রায়ই একটি দাবি শোনা যায়—যুক্তরাষ্ট্র নাকি ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান ধ্বংস করেছিল। কিন্তু প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া যায় না।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী, ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান আদৌ বাস্তবে ছিল কি না, তা নিয়েই এখনো গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এটি প্রাচীন বিশ্বের সাত আশ্চর্যের একটি হিসেবে পরিচিত হলেও এর অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটবাহিনী প্রাচীন ব্যাবিলন প্রত্নস্থলে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। ইউনেসকো, ব্রিটিশ মিউজিয়াম এবং প্রত্নতাত্ত্বিক জন কার্টিসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারী সামরিক যান চলাচল, হেলিকপ্টারের অবতরণ, মাটি খনন এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের কারণে প্রত্নস্থলটির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। পরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের সমালোচনার মুখে ওই ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং স্থানটি ইরাকি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান ধ্বংস হওয়ার দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তবে ইরাক যুদ্ধের সময় ব্যাবিলনের প্রত্নস্থল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রামাণ্য সূত্রগুলোর মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর: লেনিনের ভাস্কর্যের বিদায়
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এবং পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে ভ্লাদিমির লেনিনের ভাস্কর্য অপসারণ শুরু হয়। রয়টার্স ও বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি কেবল ভাস্কর্য সরানোর ঘটনা ছিল না, কমিউনিস্ট যুগের অবসান এবং নতুন রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রতীক হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় ইউক্রেনে। ২০১৩ সালের শেষ দিকে ইউরোমাইদান আন্দোলনের সময় থেকে দেশজুড়ে হাজার হাজার লেনিনের ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়। এই ধারাবাহিক ঘটনাকে ইউক্রেনীয় ভাষায় ‘লেনিনোপাদ’ বা ‘লেনিনের পতন’ বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের ‘ডিকমিউনাইজেশন আইন’ কার্যকর হওয়ার পর শুধু লেনিন নয়, সোভিয়েত যুগের বহু স্মৃতিস্তম্ভ, রাস্তার নাম ও সরকারি প্রতীকও পরিবর্তন করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা এবং সোভিয়েত অতীত থেকে দূরত্ব তৈরি করা।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর শুধু ইউক্রেন নয়, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও বুলগেরিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও কমিউনিস্ট শাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত বহু ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়।
একাডেমিক গবেষণা অনুযায়ী, কোথাও এসব মূর্তি জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়, আবার কোথাও জনপরিসর থেকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়। উদাহরণ হিসেবে হাঙ্গেরির মেমেন্টো পার্ক-এর কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে অপসারিত বহু কমিউনিস্ট যুগের ভাস্কর্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ইতিহাস মুছে ফেলা নয়, বরং ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণের পথও অনেক দেশ বেছে নিয়েছে।
ভাস্কর্য অপসারণের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ বা বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত নয়। একবিংশ শতকে উপনিবেশবাদ এবং বর্ণবৈষম্যের ইতিহাসকে নতুন করে মূল্যায়নের অংশ হিসেবেও বহু ভাস্কর্য সরানো হয়েছে।
২০১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নেতা সিসিল রোডস-এর মূর্তি অপসারণের দাবিতে ‘রোডস মাস্ট ফল’ আন্দোলন শুরু হয়। বিবিসি ও রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের যুক্তি ছিল—যাঁর সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনকভাবে তুলে ধরা উচিত নয়।
এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

ব্রিস্টলে এডওয়ার্ড কোলস্টনের ভাস্কর্য
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ ওঠে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল শহরে বিক্ষোভকারীরা সপ্তদশ শতকের দাসব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কোলস্টনের মূর্তি ভেঙে ফেলেননি, বরং টেনে নামিয়ে শহরের বন্দরসংলগ্ন পানিতে ফেলে দেন।
বিবিসি, রয়টার্স এবং ব্রিস্টল সিটি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, পরে মূর্তিটি উদ্ধার করে জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। এর গায়ে আন্দোলনের সময় লাগা দাগগুলোও ইচ্ছাকৃতভাবে রেখে দেওয়া হয়, যাতে ঘটনাটিও ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই গৃহযুদ্ধের সময়কার কনফেডারেট নেতাদের স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাউদার্ন পভার্টি ল সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে দেশজুড়ে শত শত কনফেডারেট ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্যফলক ও অন্যান্য প্রতীক জনপরিসর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এসব অপসারণের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের দাবি, কনফেডারেট প্রতীকগুলো দাসপ্রথা এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের ইতিহাসকে মহিমান্বিত করে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলেন, এগুলো সরিয়ে ফেললে ইতিহাস বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে যাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই বিতর্ক এখনো চলমান।
ইতিহাস বলছে, ভাস্কর্য ভাঙা বা অপসারণের কারণ এক নয়। কোথাও এটি ধর্মীয় উগ্রবাদের বহিঃপ্রকাশ, কোথাও যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, কোথাও রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রতীক, আবার কোথাও উপনিবেশবাদ বা বর্ণবাদের উত্তরাধিকার নিয়ে সমাজের নতুন মূল্যায়নের ফল।
ইউনেসকো বারবার সতর্ক করেছে, যুদ্ধের সময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা মানে শুধু একটি ভাস্কর্য বা স্থাপনা ধ্বংস করা নয়, মানবজাতির সম্মিলিত ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ওপর আঘাত হানা। অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন, কোনো ভাস্কর্য জনপরিসর থেকে সরিয়ে ফেললেই ইতিহাস মুছে যায় না। ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে দলিল, গবেষণা, জাদুঘর এবং মানুষের স্মৃতিতে।
তাই ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে জনপরিসরের প্রতীকও বদলে যায়। কিন্তু একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা যত সহজ, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিহাস, বিতর্ক এবং শিক্ষা মুছে ফেলা তত সহজ নয়।

পৃথিবীর শিল্পচর্চার সবচেয়ে পুরোনো মাধ্যমগুলোর একটি ভাস্কর্য। এর মাধ্যমে কোনো ঘটনা, ব্যক্তি বা সময়কে আটকে দেওয়া যায়। হাজার বছর থেকেই মানুষ পাথর কেটে বানিয়েছে বিখ্যাত সব ভাস্কর্য। উদ্দেশ্য, মানুষের মনে সেই স্মৃতি জাগিয়ে রাখা।
ইতিহাসে দেখা যায়, যুদ্ধ, বিপ্লব, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা ধর্মীয় উগ্রবাদের সময় সবচেয়ে আগে আঘাত নেমে আসে এই ভাস্কর্যের ওপর। বিজয়ীরা অনেক সময় পরাজিতের স্মৃতি মুছে ফেলতে চায়, আবার কখনো একটি নতুন রাষ্ট্র বা নতুন রাজনৈতিক আদর্শ পুরোনো ক্ষমতার প্রতীক সরিয়ে নিজের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ভাস্কর্য ধ্বংসের এই প্রবণতা নতুন নয়। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিশ্বের নানা প্রান্তে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ ও প্রত্নসম্পদ ধ্বংস বা অপসারণের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। কোথাও এটি হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে, কোথাও রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে, আবার কোথাও ঔপনিবেশিক অতীতের প্রতীক সরিয়ে দেওয়ার আন্দোলনের অংশ হিসেবে।
কোনো শাসক বা শাসনব্যবস্থা পতনের পর তার মূর্তি ভেঙে ফেলা বা সরিয়ে দেওয়া মূলত প্রতীকী ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায়। এর মাধ্যমে নতুন শক্তি জানিয়ে দেয়, আগের যুগের অবসান ঘটেছে।
রোমান সাম্রাজ্যে এ ধরনের একটি ধারণা ছিল ‘ড্যামনাতিও মেমোরিয়ে’—অর্থাৎ কারও স্মৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা। যদিও সব ক্ষেত্রে ভাস্কর্য ধ্বংস করা হতো না, তবে অনেক সম্রাটের মূর্তি, নাম বা প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলার নজির রয়েছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে, ইতিহাসে স্মৃতি মুছে ফেলার এই ধারণাই পরবর্তী সময়ের বহু রাজনৈতিক প্রতীক ধ্বংসের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

বামিয়ানের বুদ্ধ: বিশ্বের সামনে এক সাংস্কৃতিক বিপর্যয়
২০০১ সালের মার্চে আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় অবস্থিত দুটি বিশাল বুদ্ধমূর্তি ডিনামাইট ও গোলাবর্ষণের মাধ্যমে ধ্বংস করে তালেবান।
ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শতকে পাহাড় কেটে নির্মিত এই দুটি মূর্তি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধমূর্তির মধ্যে অন্যতম। একটি ছিল প্রায় ৫৫ মিটার এবং অন্যটি প্রায় ৩৮ মিটার উঁচু।
তালেবানের তৎকালীন নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর এগুলোকে ইসলামবিরোধী মূর্তি বলে ঘোষণা করেন। এরপর আন্তর্জাতিক মহলের অনুরোধ উপেক্ষা করে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিস্ফোরক ব্যবহার করে মূর্তিগুলো ধ্বংস করা হয়।
ইউনেসকো এই ঘটনাকে মানবজাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে এক বড় আঘাত বলে উল্লেখ করে। পরে বামিয়ান উপত্যকাকে বিশ্ব ঐতিহ্য এবং বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আজও বুদ্ধমূর্তির শূন্য গহ্বর দুটি সেই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বহন করছে।
তালেবানের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম উদাহরণ তৈরি করে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ইউনেসকো, জাতিসংঘ এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আইএস পরিকল্পিতভাবে বহু প্রাচীন প্রত্নসম্পদ ধ্বংস করে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ইরাকের মসুল জাদুঘরে হামলা। ২০১৫ সালে আইএস একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে সদস্যদের হাতুড়ি, ড্রিল এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে শত শত প্রাচীন ভাস্কর্য ভেঙে ফেলতে দেখা যায়। পরে ইউনেসকো জানায়, ধ্বংস হওয়া অনেক নিদর্শন ছিল কয়েক হাজার বছরের পুরোনো।
একই সময়ে ইরাকের প্রাচীন অ্যাসিরীয় নগরী নিমরুদও বুলডোজার ও বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করা হয়। ইউনেসকোর মতে, এটি মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল ছিল।
এরপর হামলা হয় হাতরা শহরে। প্রায় দুই হাজার বছর পুরোনো এই নগরীও ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত ছিল। আইএস সেখানে অসংখ্য ভাস্কর্য, অলংকরণ ও স্থাপত্যের অংশ ভেঙে ফেলে।

পালমিরা: মরুভূমির শহরেও রক্ষা মেলেনি
সিরিয়ার ঐতিহাসিক শহর পালমিরাও আইএসের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, রোমান যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননগরী পালমিরা ১৯৮০ সাল থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়ে আসছিল।
২০১৫ সালে আইএস শহরটি দখল করার পর বালশামিন মন্দির, বেল মন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিজয়তোরণসহ একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়।
শুধু স্থাপনাই নয়, পালমিরার দীর্ঘদিনের প্রত্নতত্ত্ববিদ খালেদ আল-আসাদকেও হত্যা করে আইএস। ইউনেসকোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা তখন বলেন, এটি শুধু একজন মানুষকে হত্যা নয়, বরং সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ওপর আঘাত।

ইরাক যুদ্ধ ও সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্য
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে প্রবেশ করার পর বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকী ঘটনাগুলোর একটি ঘটে বাগদাদের ফিরদৌস স্কয়ারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর নথি, ব্রিটানিকা এবং একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বর্ণনা অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল মার্কিন মেরিনদের সহায়তায় সেখানে সাদ্দাম হোসেনের বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি ফেলে দেওয়া হয়।
টেলিভিশনের পর্দায় সেই দৃশ্যকে অনেকেই ইরাক যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের একটি অংশ বলেন, ঘটনাটি পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত জনতার উদ্যোগ ছিল না। সেখানে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এবং গণমাধ্যমে যে বিপুল জনসমাগম দেখা গিয়েছিল, বাস্তবে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
এই ঘটনার পর ইরাকজুড়ে সাদ্দাম হোসেনের বহু মূর্তি ও প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা হয়, যা বাথ পার্টির শাসনের অবসানের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ইরাক যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হলে প্রায়ই একটি দাবি শোনা যায়—যুক্তরাষ্ট্র নাকি ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান ধ্বংস করেছিল। কিন্তু প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া যায় না।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী, ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান আদৌ বাস্তবে ছিল কি না, তা নিয়েই এখনো গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এটি প্রাচীন বিশ্বের সাত আশ্চর্যের একটি হিসেবে পরিচিত হলেও এর অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটবাহিনী প্রাচীন ব্যাবিলন প্রত্নস্থলে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। ইউনেসকো, ব্রিটিশ মিউজিয়াম এবং প্রত্নতাত্ত্বিক জন কার্টিসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারী সামরিক যান চলাচল, হেলিকপ্টারের অবতরণ, মাটি খনন এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের কারণে প্রত্নস্থলটির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। পরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের সমালোচনার মুখে ওই ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং স্থানটি ইরাকি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান ধ্বংস হওয়ার দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তবে ইরাক যুদ্ধের সময় ব্যাবিলনের প্রত্নস্থল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রামাণ্য সূত্রগুলোর মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর: লেনিনের ভাস্কর্যের বিদায়
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এবং পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে ভ্লাদিমির লেনিনের ভাস্কর্য অপসারণ শুরু হয়। রয়টার্স ও বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি কেবল ভাস্কর্য সরানোর ঘটনা ছিল না, কমিউনিস্ট যুগের অবসান এবং নতুন রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রতীক হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় ইউক্রেনে। ২০১৩ সালের শেষ দিকে ইউরোমাইদান আন্দোলনের সময় থেকে দেশজুড়ে হাজার হাজার লেনিনের ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়। এই ধারাবাহিক ঘটনাকে ইউক্রেনীয় ভাষায় ‘লেনিনোপাদ’ বা ‘লেনিনের পতন’ বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের ‘ডিকমিউনাইজেশন আইন’ কার্যকর হওয়ার পর শুধু লেনিন নয়, সোভিয়েত যুগের বহু স্মৃতিস্তম্ভ, রাস্তার নাম ও সরকারি প্রতীকও পরিবর্তন করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা এবং সোভিয়েত অতীত থেকে দূরত্ব তৈরি করা।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর শুধু ইউক্রেন নয়, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও বুলগেরিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও কমিউনিস্ট শাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত বহু ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়।
একাডেমিক গবেষণা অনুযায়ী, কোথাও এসব মূর্তি জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়, আবার কোথাও জনপরিসর থেকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়। উদাহরণ হিসেবে হাঙ্গেরির মেমেন্টো পার্ক-এর কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে অপসারিত বহু কমিউনিস্ট যুগের ভাস্কর্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ইতিহাস মুছে ফেলা নয়, বরং ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণের পথও অনেক দেশ বেছে নিয়েছে।
ভাস্কর্য অপসারণের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ বা বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত নয়। একবিংশ শতকে উপনিবেশবাদ এবং বর্ণবৈষম্যের ইতিহাসকে নতুন করে মূল্যায়নের অংশ হিসেবেও বহু ভাস্কর্য সরানো হয়েছে।
২০১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নেতা সিসিল রোডস-এর মূর্তি অপসারণের দাবিতে ‘রোডস মাস্ট ফল’ আন্দোলন শুরু হয়। বিবিসি ও রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের যুক্তি ছিল—যাঁর সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনকভাবে তুলে ধরা উচিত নয়।
এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

ব্রিস্টলে এডওয়ার্ড কোলস্টনের ভাস্কর্য
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ ওঠে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল শহরে বিক্ষোভকারীরা সপ্তদশ শতকের দাসব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কোলস্টনের মূর্তি ভেঙে ফেলেননি, বরং টেনে নামিয়ে শহরের বন্দরসংলগ্ন পানিতে ফেলে দেন।
বিবিসি, রয়টার্স এবং ব্রিস্টল সিটি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, পরে মূর্তিটি উদ্ধার করে জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। এর গায়ে আন্দোলনের সময় লাগা দাগগুলোও ইচ্ছাকৃতভাবে রেখে দেওয়া হয়, যাতে ঘটনাটিও ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই গৃহযুদ্ধের সময়কার কনফেডারেট নেতাদের স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাউদার্ন পভার্টি ল সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে দেশজুড়ে শত শত কনফেডারেট ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্যফলক ও অন্যান্য প্রতীক জনপরিসর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এসব অপসারণের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের দাবি, কনফেডারেট প্রতীকগুলো দাসপ্রথা এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের ইতিহাসকে মহিমান্বিত করে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলেন, এগুলো সরিয়ে ফেললে ইতিহাস বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে যাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই বিতর্ক এখনো চলমান।
ইতিহাস বলছে, ভাস্কর্য ভাঙা বা অপসারণের কারণ এক নয়। কোথাও এটি ধর্মীয় উগ্রবাদের বহিঃপ্রকাশ, কোথাও যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, কোথাও রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রতীক, আবার কোথাও উপনিবেশবাদ বা বর্ণবাদের উত্তরাধিকার নিয়ে সমাজের নতুন মূল্যায়নের ফল।
ইউনেসকো বারবার সতর্ক করেছে, যুদ্ধের সময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা মানে শুধু একটি ভাস্কর্য বা স্থাপনা ধ্বংস করা নয়, মানবজাতির সম্মিলিত ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ওপর আঘাত হানা। অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন, কোনো ভাস্কর্য জনপরিসর থেকে সরিয়ে ফেললেই ইতিহাস মুছে যায় না। ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে দলিল, গবেষণা, জাদুঘর এবং মানুষের স্মৃতিতে।
তাই ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে জনপরিসরের প্রতীকও বদলে যায়। কিন্তু একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা যত সহজ, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিহাস, বিতর্ক এবং শিক্ষা মুছে ফেলা তত সহজ নয়।
.png)

বিশ শতকের মার্কিন সাহিত্যে অন্যতম প্রভাববিস্তারকারী লেখক ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। আজ তাঁর জন্মদিন। এক জীবনে বহু ঘটনা, দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি।
১৮ ঘণ্টা আগে
১৯৮৬ সালের ২১শে জুলাই। আসামের করিমগঞ্জের বিক্ষোভ মিছিলে জড়ো হয়েছে প্রতিবাদী জনতা। সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস।
২১ ঘণ্টা আগে
ঢাকা ও কলকাতা—ভৌগোলিক মানচিত্রে কাঁটাতারের এপারে-ওপারে থাকা দুটি শহর। ভাষা এক, আবেগের টানও এক। কিন্তু সাহিত্যের অন্দরমহলে এই দুই বাংলার লেনদেনের সমীকরণটা সব সময় সমান রেখায় চলেনি। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের আলোচনা উঠলে একটি নাম সবার আগে, সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে ওঠে। তিনি হুমায়ূন আহমেদ।
২১ জুলাই ২০২৬
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এটা খ্রিষ্টপূর্ব যুগের খেলা। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের ধারণা, দাবা এই উপমহাদেশেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। আজ থেকে ১ হাজার ৫০০ বছর আগে এই অঞ্চলে ‘চতুরঙ্গ বা শতরঞ্জি’ খেলা হয়েছে, যা দাবা খেলারই অন্য নাম।
২০ জুলাই ২০২৬