মৃত্যুবার্ষিকী/ফ্রয়েডকে ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রেম-বিশেষজ্ঞ’ আখ্যা দিয়ে ১ লাখ ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিল হলিউড
স্ট্রিম ডেস্ক

‘আমি ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে আছি। আমার খাবারের অভাব নেই। আমি অনেক কিছু উপভোগ করেছি। আমার স্ত্রীর বন্ধুত্ব ও প্রেম পেয়েছি। সন্তানদের মুখ দেখেছি। তাদের বেড়ে ওঠা দেখেছি। সূর্যাস্ত ও বসন্তকালও দেখেছি। চারপাশের পরিবর্তন দেখেছি। এখন আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। মানুষ মরে যেতে চায় বলেই মারা যায়। সারা জীবনের লক্ষ্য হলো মৃত্যু।’
এক আলাপচারিতায় কথাগুলো বলছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড। মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। মানুষের অবচেতন মন, স্বপ্ন ও আচরণ নিয়ে তিনি নতুনভাবে ভাবার পথ তৈরি করেছিলেন। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস’ বইয়ে তিনি স্বপ্নকে মানুষের মানসিক জগত বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখান।
পরে বইটি মনোবিশ্লেষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে পরিচিত হয়। তবে শুরুতে বইটির সাড়া ছিল খুবই কম। প্রকাশের প্রথম ছয় বছরে মাত্র ৩৫১টি কপি বিক্রি হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পেতে সময় লাগে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত।

ফ্রয়েডের সব ধারণা অবশ্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাঁর বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, হয়েছে বিতর্কও। তবু আধুনিক মনোবিশ্লেষণের ইতিহাসে তাঁর প্রভাব এতটাই গভীর যে তাঁকে বাদ দিয়ে এই ধারার ইতিহাস লেখা কঠিন।
অন্যরকম চিকিৎসা
ফ্রয়েড চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করার পর সম্মোহন বা হিপনোসিস নিয়েও কাজ করেছিলেন। ১৮৮৬ সালে প্যারিস থেকে ভিয়েনায় ফিরে তিনি ব্যক্তিগত চিকিৎসা শুরু করেন এবং হিপনোসিস নিয়ে বক্তৃতাও দেন।
পরে ধীরে ধীরে তিনি মনোবিশ্লেষণের দিকে এগিয়ে যান। রোগীদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া তাঁর চিকিৎসাপদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
-5bc370.jpeg)
এই সময়েই বিখ্যাত কাউচটি তাঁর চিকিৎসাকক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই কাউচটি ফ্রয়েড নিজে কেনেননি। তাঁর একজন রোগী এটি উপহার দিয়েছিলেন। কাউচটির ওপর পারস্যের চাদরও ছিল। রোগীরা সেখানে শুয়ে তাঁদের মনের কথা বলতেন, আর ফ্রয়েড একটি চেয়ারে বসে নোট নিতেন। পরে এই কাউচই ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ পদ্ধতির অন্যতম পরিচিত প্রতীক হয়ে ওঠে।
‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রেম-বিশেষজ্ঞ’
১৯২৪ সালের মধ্যে ফ্রয়েডের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সময় হলিউডের বিখ্যাত প্রযোজক স্যামুয়েল গোল্ডউইন তাঁকে ১ লাখ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দেন। গোল্ডউইন ফ্রয়েডকে ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রেম-বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ইতিহাসের বিখ্যাত প্রেমের গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরির কাজে ফ্রয়েডের পরামর্শ নিতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁদের পরিকল্পনায় ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’র মতো বিখ্যাত প্রেমের গল্পও ছিল।
এত বড় অঙ্কের অর্থের প্রস্তাবও ফ্রয়েড গ্রহণ করেননি। শুধু তাই নয়, গোল্ডউইনের সঙ্গে দেখাও করতে চাননি তিনি। পরে ১৯২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
-d58b85.jpeg)
এর কয়েক মাস আগেও ফ্রয়েড বড় অঙ্কের অর্থের আরেকটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯২৪ সালে শিকাগো ট্রিবিউন-এর পক্ষ থেকে তাঁকে ২৫ হাজার ডলার বা তার বেশি অর্থের বিনিময়ে আলোচিত হত্যামামলার আসামি নাথান লিওপোল্ড ও রিচার্ড লোয়েবকে মনোবিশ্লেষণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই প্রস্তাবও ফ্রয়েড গ্রহণ করেননি।
নাৎসিদের টার্গেট ছিলেন ফ্রয়েড
পেশাগত জীবনের বাইরে ফ্রয়েডের ব্যক্তিজীবন নিয়েও আলোচনা কম ছিল না। ফ্রয়েড ইহুদি পরিবারে জন্মেছিলেন। তিনি ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না এবং নিজেকে একসময় ‘ধর্মহীন ইহুদি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এই ব্যক্তিগত অবস্থান তাঁকে নাৎসিদের নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে পারেনি। বরং ইহুদি পরিচয় ও মনোবিশ্লেষণের প্রতি নাৎসিদের বিরোধিতার কারণে তিনিও তাঁদের টার্গেটে পরিণত হন। ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা তাঁর বই পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনার পর ফ্রয়েড রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘মধ্যযুগে তারা আমাকে পুড়িয়ে দিত; এখন তাঁরা শুধু আমার বই পুড়িয়ে সন্তুষ্ট।’
শুধু বই পোড়ানোতেই থামেনি নাৎসিরা। ১৯৩৮ সালের মার্চে জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করার পর ফ্রয়েডের ভিয়েনার বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। এর কিছুদিন পর তাঁর মেয়ে আন্না ফ্রয়েডকে গেস্টাপো এক দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
-bd5f58.jpeg)
এরপর ভিয়েনায় থাকা আর নিরাপদ ছিল না। ফ্রয়েডের বন্ধু ও সাবেক রোগী প্রিন্সেস মারি বোনাপার্টসহ কয়েকজনের সহায়তায় তাঁর পরিবার অস্ট্রিয়া ছাড়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়। ১৯৩৮ সালের ৪ জুন ফ্রয়েড, তাঁর স্ত্রী মার্থা ও মেয়ে আন্না ভিয়েনা ছেড়ে প্রথমে প্যারিস যান, সেখান থেকে লন্ডনে পৌঁছান।
ফ্রয়েডের মৃত্যু সম্ভবত চিকিৎসকের সহায়তায় হয়েছিল
একেবারে তরুণ অবস্থাতেই ফ্রয়েড ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রথমে সিগারেট খেলেও পরে সিগারে আসক্ত হয়ে যান। কখনো দিনে ২০টির মতো সিগারও খেতেন। চিকিৎসকেরা তাঁকে বারবার ধূমপান কমাতে বা ছেড়ে দিতে বললেও ফ্রয়েড তা করেননি। বরং তিনি মনে করতেন, সিগার তাঁর কাজের ক্ষমতা বাড়াতে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে এর ফলও ভোগ করতে হয় তাঁকে।
১৯২৩ সালে ফ্রয়েডের মুখের ক্যানসার ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারে তাঁর চোয়ালের একটি বড় অংশ কেটে ফেলতে হয়। এরপর পরবর্তী ১৬ বছরে তাঁকে আরও ৩৩টি অস্ত্রোপচার করাতে হয়। মুখ ও চোয়ালের মধ্যে বড় কৃত্রিম অংশও বসানো হয়েছিল। এত কিছুর পরও তিনি ধূমপান ছাড়েননি।
১৯৩৯ সালের গ্রীষ্মে মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত সিগমুন্ড ফ্রয়েড খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। প্রচণ্ড ব্যথায় তাঁর দিন কাটছিল। ২১ সেপ্টেম্বর তিনি তাঁর বন্ধু ও চিকিৎসক ম্যাক্স শুরের হাত ধরে অতীতের এক প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে ফ্রয়েড বলেছিলেন, তাঁকে যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে কষ্ট দেওয়া না হয়। এরপর তিনি বলেন, ‘এখন এটা (জীবন) শুধু যন্ত্রণা, এর কোনো অর্থ নেই।”
-65fc9a.jpeg)
এরপর শুর ফ্রয়েডের মেয়ে আন্নার সঙ্গে কথা বলেন। ফ্রয়েডের ইচ্ছার কথা জানার পর শুর তাঁকে মরফিন দেন। পরের কয়েক দিন তাঁকে আরও কয়েকবার মরফিন দেওয়া হয়, যাতে তাঁর যন্ত্রণা কমে আসে। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ লন্ডনের বাড়িতে ফ্রয়েড মারা যান।
ফ্রয়েডের মৃত্যুকে চিকিৎসকের সহায়তায় স্বেচ্ছামৃত্যু বলা হয় কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনাও আছে। তবে তাঁর চিকিৎসক ম্যাক্স শুরের বর্ণনা অনুযায়ী, ফ্রয়েডের শেষ ইচ্ছা ছিল অপ্রয়োজনীয় কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া এবং শুর সেই ইচ্ছা অনুযায়ী মরফিন দিয়ে তাঁর যন্ত্রণা কমিয়েছিলেন।
মৃত্যুর পর চোরেরা তাঁর ভস্ম রাখা পাত্র চুরি করার চেষ্টা করেছিল
ফ্রয়েডের মৃত্যুর পর তাঁর ভস্ম প্রাচীন পাত্রে রাখা হয়। পাত্রটি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন বন্ধু মারি বোনাপার্ট। ১৯৫১ সালে ফ্রয়েডের স্ত্রী মার্থা মারা গেলে তাঁর ভস্মও একই পাত্রে রাখা হয়।
পরে পাত্রটি লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিন ক্রিমেটোরিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে লন্ডন পুলিশ জানায়, চোরেরা ফ্রয়েড ও তাঁর স্ত্রীর ভস্ম চুরি করার চেষ্টা করেছিল। চোরেরা ভস্ম নিয়ে যেতে না পারলেও প্রায় ২,৩০০ বছরের পুরোনো পাত্রটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
.png)







-40e58c.jpeg)