গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কি ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংকট, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা

বাংলাদেশের একাডেমিয়া আজ এক অনাকাঙ্ক্ষিত নৈতিক সংকটের মুখোমুখি। গবেষণা-প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনোয় অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা বা শিক্ষকতা পেশায় গিয়ে জড়িয়ে পড়েন প্লেজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তির মতো একাডেমিক অপরাধে। দেশের এই গবেষণা সংস্কৃতি ও সমকালীন প্রবণতা নিয়ে নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে ধারাবাহিকভাবে লিখছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী। আজ পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব।

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কিংবা অনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা নতুন কোনো বিষয় না হলেও এই ধরনের অনৈতিক চর্চা একাডেমিক পরিসরে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আমরা সেই অনৈতিক চর্চা বারবার দেখতে পাই? বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে এবং বুঝতে হলে বাংলাদেশের একাডেমিক পরিসরে আমরা যে ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি , সেই সংস্কৃতি একজন শিক্ষককে কতটা শিক্ষক এবং কতটা গবেষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সহায়ক পরিবেশ দিতে পারছে, সেই বিষয়টি বুঝতে হবে।

আমাদের এখানে এমন এক ধরনের একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে শিক্ষকদের ওপর একাডেমিক প্রকাশনার চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু তাঁদের সেই চাপ বইবার যথাযথ সহায়ক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে না। ফলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে যেমন গলদ দৃশ্যমান, তেমনি গবেষণায় অনৈতিক প্রক্রিয়া বা চৌর্যবৃত্তির অবলম্বনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পুরো প্রেক্ষাপটটি বোঝার জন্য এখানে তিনটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

প্রথমত, আমাদের প্রায় সকল বিশ্বদ্যালয় যখন টিচিং বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা প্রদানই যখন মুখ্য, তখন গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনার চাপ কতটা যুক্তিযুক্ত সেটি আমরা কখনো ভেবে দেখিনি। এমনকি আমাদের নীতিনির্ধারকেরাও শিক্ষকদের পাঠদানের ও গবেষণার চাপের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কোনো সহায়ক ও যৌক্তিক দিক-নির্দেশনা তৈরি করতে পেরেছেন বলে আমাদের মনে পড়ে না। ফলে এখানে গবেষণার যথাযথ পরিবেশ তৈরি না করেই শিক্ষকদের ফেলে দেওয়া হচ্ছে প্রকাশনার ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতায়। যে কারণে আমরা খুব বেশি ইতিবাচক প্রভাব দেখি না।

আমাদের আগে নির্ধারণ করতে হবে আমরা কোন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় হতে চাই। কেউ কেউ বলছেন আগে আমাদের এখানে ‘প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়’ ছিল যা এখন আর দেখা যায় না। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, আদৌ কি এখানে এমন কোনো ‘আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়’ ছিল যাকে আমরা ‘প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে পারি? সে নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, শিক্ষকদের যাঁরা গবেষণা করতে চান না বা যাঁদের অন্যান্যদের মতো গবেষণার সেই মন বা চোখ নেই, যিনি কিনা কেবল শিক্ষকতা করতে চান বা পাঠদানেই মনোনিবেশ করতে চান তাঁর জন্য তেমন স্বাধীনতা কি আমাদের একাডেমিয়া দিচ্ছে বা দিতে পারছে? সেই জানাশোনা কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিরাজ করে? এই প্রশ্নগুলোও আমাদের করতে হবে। তা না হলে সঠিক সমাধান খুঁজে বের করা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু আমরা সেই প্রশ্ন কখনো করতে পারিনি। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার অতিমাত্রায় সময় দিতে বাধ্য করা অর্থাৎ যাকে আমরা বলি অযৌক্তিক টিচিং লোড। এটি বিশেষ করে দেখা যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বিষয়টি নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যথা নেই। সেই অযৌক্তিক টিচিং লোড নিয়েই তাঁদের কাছে প্রত্যাশা করা হয় বিশ্বমানের গবেষণা ও প্রকাশনা যা রীতিমতো হাস্যকর। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেন এক একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতিষ্ঠানের নিতান্তই কর্মচারী।

তৃতীয় বিষয় হলো গবেষণা এবং প্রকাশনা জগতের সাম্প্রতিক তর্ক-বিতর্ক এবং প্রতিযোগিতার পশ্চিমা অনুকরণ। আমাদের এখানে যে চর্চা দেখতে পাই সেটি মূলত পশ্চিমা বিশ্বের গবেষণা ইন্ডাস্ট্রির এক ধরনের ম্যানুফ্যাকচার্ড বিষয়। পশ্চিমা বিশ্বে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত সাম্প্রতিক প্রিন্ট ক্যাপিটালিজমের যুগে একভাবে প্রকাশনার সেই চর্চার এমন একটি বলয়ের মধ্যে প্রবেশ করেছে যে বলয় আমাদের মতো দেশে ফ্র্যাগমেন্টেড বা অসম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করেছে। আমরা অনেকটা ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দারের’ মতো করেই যেন এই প্রকাশনার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এই যুদ্ধে আমরা কেউ কেউ কিছুটা এগিয়ে গেলেও জাতিগতভাবে আমরা একদমই সেই নিধিরামের মতোই যেন যুদ্ধ করছি।

পশ্চিমা প্রেক্ষাপটে প্রকাশনার মান অর্জনের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যেমন গবেষণার তহবিল বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিতে হয়েছে ঠিক তেমনি রাষ্ট্রীয় পরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষকদের জন্য গবেষণার তহবিলের একটি প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছে; যে ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষক কিংবা গবেষক চেষ্টা করলে গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেখানে শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রীয় বার্ষিক বাজেটে জিডিপির বরাদ্দ প্রায় দুই শতাংশের কাছাকাছি যা কিনা ভারত ও নেপাল থেকে অনেক কম, সেখানে গবেষণার তহবিল খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। এতটা সীমিত সুযোগ সুবিধার মধ্য দিয়ে যে সকল শিক্ষকরা গবেষণা করেন এবং নিয়মিত প্রকাশনা করে থাকেন তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে খুব একটা প্রণোদনার ব্যবস্থা কিংবা তাঁদের কোনোভাবে প্রশংসিত করার কোনো কাঠামো আমরা দেখতে পাই না। যদিও আমরা দেখি যে, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের প্রকাশনার জন্য সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে; যা খুবই অপ্রতুল এবং নিয়মিত না।

যে সকল গবেষকদের আমরা লিখতে এবং গবেষণা করতে দেখি তারা মূলত একটা পর্যায়ে আত্মতৃপ্তির জায়গা থেকে গবেষণা করে থাকেন বলেই ধরে নেওয়া যায়। সেজন্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষণা এবং প্রকাশনার জন্য যে ধরনের সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন সেটি নিশ্চিত করা। সেটি না করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে গবেষণা এবং প্রকাশনার চাপ দেওয়া হচ্ছে তখন আসলে অনেকেই সেই চাপ নিতে পারছে না। এটিও গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির মতো অনৈতিক পদ্ধতি অনুসরণের একটি কারণ হতে পারে; যাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি যখন দেখা যায় তখন তার যথাযথ ব্যবস্থাপনা করার মতো প্রচেষ্টাও আমরা দেখতে পাই না। আবার সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এ ধরনের বিষয়গুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে কিনা সেটিও ভাবনার বিষয়। যখন আমরা দেখতে পাই গবেষণায় এই ধরনের অনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক পার পেয়ে যাযন এবং প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক পরিসরে যখন তাঁর কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা আমরা দেখতে পাই না, তখন আসলে সাধারণের মধ্যে যেমন হতাশা কাজ করে ঠিক তেমনি অন্যান্য শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যেও হতাশা তৈরি করে।

আবার যখন কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি কিংবা এ বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে যাচাই বাছাই করার প্রক্রিয়া দেখতে পাই তখন কোনো শিক্ষক যদি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই ধরনের অনৈতিক বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেন, তাহলে এর সঠিক সমাধান হবে না। এই ধরনের পক্ষপাতমূলক ঘটনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি ঘটে তাহলে একাডেমিক পরিসরে নৈতিকতার চর্চা কোনোভাবেই নিশ্চিত করা যাবে না। কেননা একটি অনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কখনোই একটি নৈতিক চর্চার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনা। এই বিষয়গুলো আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে দেখতে পাই। ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য কোনো ধরনের আন্তরিক প্রচেষ্টা আমরা রাষ্ট্রীয় পরিসর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে পরিগণ্য ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন বা ইউজিসির মধ্যে খুব একটা দেখতে পাইনি।

ব্যক্তিক পরিসরের অনৈতিক চর্চাকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর অভাব আমরা দেখি তখন সেটি শুধু আর ব্যক্তিক পরিসরের কিংবা শিক্ষকদের নৈতিকতার অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না; সেটি তখন প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার চর্চার দিকেও প্রশ্ন উত্থাপন করে। আর যখন এই ধরনের প্রশ্ন সামাজিক পরিসরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তখন সেটি হয়ে ওঠে জাতীয় ব্যর্থতার একটি চরম চিত্র।

ফলে অনৈতিক কার্যক্রমের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামো থাকা খুব জরুরি। যে ব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোর মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষক ও গবেষক সঠিক বিচার পাবে তা নিশ্চিত করা। তাই একাডেমিক সততা কেবল অনিয়ম থেকে বিরত থাকা নয় বরং কোনো একটা অনিয়ম কিংবা অনৈতিক ঘটনা ঘটলে সেটি কতটা নৈতিকতা এবং সততার সাথে মোকাবিলা করা হচ্ছে তার একটি শক্তিশালী কাঠামো থাকাও একাডেমিক সততার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। ফলে এখানে প্রতিষ্ঠানকেও একটি জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

এই ধরনের জরুরি বিষয়গুলো আমরা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে খুব বেশি একটা দেখতে পাই না; যা আমরা দেখতে পাই পশ্চিমা দেশগুলোতে। ফলে সেখানে কোনো শিক্ষক কিংবা গবেষককে এই ধরনের অনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে জড়িয়ে যাওয়ার আগে তাঁকে অনেক বেশি ভাবতে হয়।

আমরা জানি, শিক্ষক কিংবা গবেষকদের মধ্যকার চৌর্যবৃত্তির মতো অনৈতিক চর্চা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বিষয় নয়। এটিকে একাডেমিক জগতের নৈতিকতার স্খলন হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু সেই নৈতিকতার স্থলন যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘটতে দেখি, সেই বিষয়টি তখন আর কেবলমাত্র ব্যক্তিক পর্যায়ের নৈতিকতার বিষয় থাকে না। তখন আমাদের কাছে কেবলমাত্র একজন শিক্ষক কেন এই ধরনের নৈতিকতার চর্চা করতে পারে না কেবলমাত্র সেই প্রশ্ন করাটাই পর্যাপ্ত নয়। আমাদের তখন অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে। কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই অনৈতিক চর্চার যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে পারছে না, সেই প্রশ্ন না থাকার কারণে ধীরে ধীরে গবেষক কিংবা শিক্ষকদের মধ্যকার এই ধরনের নৈতিক অনৈতিক চর্চাগুলো একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গণ্য হয়ে পড়ছে যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

  • বুলবুল সিদ্দিকী: নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ চায়না রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত