যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ‘গভীর সন্দেহ’, তবুও সমঝোতার পথে ইরান

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ১৭: ৫০
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘গভীর সন্দেহ’ রেখেই যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার পথে এগোচ্ছে ইরান। দেশটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা আব্বাস মোকতাদাই মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, আমাদের মূল নীতিই হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস। খবর আল জাজিরা

এমন মন্তব্যের মধ্যেই কাতার সফর শেষে তেহরানে ফিরেছেন ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে এ সফর করেন তিনি।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, সোমবার রাতে দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তেহরানের দাবি, এ হামলা ওয়াশিংটনের প্রতি তাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, পাল্টা অভিযানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী একটি মার্কিন এমকিউ–৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘আরাশ-এ কামানগির’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ধ্বংস হওয়া ড্রোনের ধ্বংসাবশেষও দেখানো হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সমুদ্রে মাইন পোঁতার চেষ্টারত ইরানি নৌযানে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা চালানো হয়েছে। তবে আইআরজিসির কমান্ডাররা বলেছেন, পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক আলোচনার সমীকরণ

বর্তমানে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত রূপ নিয়ে আলোচনা করছে। সম্ভাব্য এই সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় ইরান।

সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান বিদেশে আটকে থাকা কিছু অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। পাশাপাশি দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথও খুলে যেতে পারে।

সায়েন্সেস পো’র সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কির মতে, ইরানি নেতৃত্বের একাংশ আশঙ্কা করছে এই সমঝোতা কেবল সাময়িক বিরতি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা রাজনৈতিক আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, এই চুক্তিকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে তেহরানকে বোঝাতে হবে যে এটি কোনো আত্মসমর্পণ নয়, বরং দেশের স্বার্থ রক্ষা করে শান্তি ফিরিয়ে আনা।

তার মতে, এর অর্থ হতে পারে সীমিত পরিসরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালু রাখা, মজুত ভান্ডার তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তর না করা, কার্যকর নিষেধাজ্ঞা শিথিল নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ কাঠামো ধরে রাখা।

‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা নিছক ক্ষতি’

ইরানের মধ্যপন্থী রাজনীতিক থেকে শুরু করে কট্টর সামরিক গোষ্ঠী সব পক্ষই বলছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমন কোনো চুক্তিতে যাবে না, যা আত্মসমর্পণের সমান।

দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, 'আমরা পারমাণবিক অস্ত্র চাই না, অঞ্চলে অস্থিতিশীলতাও চাই না।'

তবে আইআরজিসির প্রভাবশালী মহাকাশ কমান্ডার মাজিদ মুসাভি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লেখেন, আমাদের শহীদ ইমাম বলেছিলেন, শত্রুর সঙ্গে আলোচনা নিছক ক্ষতি।

তিনি জানান, দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশই তিনি অনুসরণ করবেন। ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় মোজতবা বলেন, অঞ্চলের জাতি ও ভূখণ্ড আর মার্কিন ঘাঁটির ঢাল হবে না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ইসরায়েলের অস্তিত্ব থাকবে না।

খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডার আলি আবদুল্লাহিও ইরানি বাহিনীকে শত্রুর পরাজয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তেহরানে যুদ্ধকালে নিহত ইরানি নেতাদের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মার্কিনিরা খুব বেশি কথা বলে এবং মুহূর্তেই বক্তব্য বদলে ফেলে। আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা দেখাব।

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলঘদরও ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো পশ্চাদপসরণ হবে না।

চুক্তি নাকি কৌশলগত বিরতি

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, তেহরানের নেতারা শুধু একটি খারাপ চুক্তি নিয়েই চিন্তিত নন, বরং তারা এমন সমঝোতা নিয়েও ভয়ে আছেন যা ভবিষ্যতে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

তার ভাষায়, কট্টরপন্থীরা বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ধাপ এবং পারমাণবিক ছাড় নিয়ে যেকোনো আলোচনায় সতর্ক। কারণ, সামুদ্রিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতাকে তারা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের অন্যতম প্রধান দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

তিনি বলেন, তেহরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক এখন ‘আলোচনা করা হবে কি না’ তা থেকে সরে এসে ‘কী ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে’ সে প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে।

তার মতে, সম্ভাব্য সমঝোতা আপাতত একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির চেয়ে যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থাপনার কাঠামো বলেই বেশি মনে হচ্ছে। এর লক্ষ্য সময় কেনা, তাৎক্ষণিক যুদ্ধঝুঁকি কমানো, হরমুজ প্রণালির কিছু অংশ সচল করা এবং কঠিন পারমাণবিক প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখা।

হত্যাচেষ্টার আশঙ্কাও দেখছে তেহরান

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, সামরিক অভিযান আবার শুরু হলে শীর্ষ ইরানি নেতারা হত্যাচেষ্টার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক নিমা আকবারখানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, চলমান আলোচনার সময় যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে আমাদের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান জানতে পারে, তাহলে তারা নিজেদের স্বার্থ কিংবা পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীদের কথা বিবেচনা না করেই হামলা চালাবে।

আরেক বিশ্লেষক আলি সামাদজাদে দাবি করেন, সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি নেতাদের বের করে আনার জন্য ফাঁদও হতে পারে।

মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কেবল তাঁর নামে লিখিত বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি একটি গোপন নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন। সেখানে অনেক সরকারি কর্মকর্তারও প্রবেশাধিকার নেই। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এ কারণেই আলোচনা প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে।

গ্রায়েভস্কির মতে, আগামী কয়েক দিনে ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে অভ্যন্তরীণ সমর্থন নিশ্চিত করা। কারণ, কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া যেকোনো ছাড় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

তার মতে, পরবর্তী পারমাণবিক আলোচনা উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য কোনো বাস্তব কাঠামো তৈরি করতে পারলে তবেই এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।

সম্পর্কিত