গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন: যুক্তরাজ্যে বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০: ০৬
সুন্দরবন সংলগ্ন পশুর নদীর পাড়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: গার্ডিয়ান
সুন্দরবন সংলগ্ন পশুর নদীর পাড়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: গার্ডিয়ান

রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে আর্থিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট’ ব্যাপক মাত্রায় দূষণকারী উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ব্রিটিশ ব্যাংকটি আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের ৩ ব্যক্তির পক্ষে যুক্তরাজ্য সরকারের ‘অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্ট’-এ অভিযোগটি করা হয়েছে। এতে সহায়তা করেছে লন্ডনের কিংস কলেজের আইন অনুষদের আওতাধীন আইনি সহায়তা সংস্থা ‘কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিক’।

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, রামপাল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সেবা দেওয়ার আগে বার্কলেস ব্যাংক পরিবেশ ও মানবাধিকার সংক্রান্ত ঝুঁকি সঠিকভাবে খতিয়ে দেখেনি।

‘কিংস লিগ্যাল ক্লিনিক’-এর তথ্যমতে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম যৌথ অংশীদার ভারতের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি এনটিপিসি লিমিটেডকে ঋণ পেতে সহায়তা করেছে বার্কলেস। এছাড়া ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ‘এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’র (এক্সিম ব্যাংক ইন্ডিয়া) বন্ড বিক্রিতেও গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করেছে যুক্তরাজ্যের ব্যাংকটি। এই বন্ড বিক্রির টাকায় রামপাল প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেডকে অর্থায়ন করেছিল এক্সিম ব্যাংক-ইন্ডিয়া।

অভিযোগকারীদের মতে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত ধোঁয়া বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ তৈরি করতে ভূমিকা রাখবে। অথচ এই অঞ্চলটি এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেখানে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড় এবং বিভিন্ন তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে।

যুক্তরাজ্যের সরকারি দপ্তরে অভিযোগকারীদের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল। তিনি দাবি করেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আশপাশের শিল্পকারখানা থেকে আসা ভারী ধাতুর দূষণ নদী ও খালের মাধ্যমে সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ছে।

শরীফ বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পশুর নদীর ঠিক তীরে অবস্থিত, যা সুন্দরবনের জীবনরেখা। ফলে এই বনের স্বাস্থ্য এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।’

গত নভেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে ক্ষতিকর পারদ ও আর্সেনিকের উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল এই পশুর নদীতেই।

গার্ডিয়ানের ভাষ্যমতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিকল্পনা ও নির্মাণের সময় থেকেই ক্রমাগত বিরোধিতার মুখে পড়েছিল। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনেও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, এই প্রকল্পের বায়ু ও পানি দূষণ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিবেশ ও মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা ভেবে ফ্রান্সের কয়েকটি ব্যাংকসহ বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংক হিসেবে বার্কলেসের উচিত ছিল অর্থায়নের পরিণতির কথা চিন্তা করা।’ তার মতে, ‘আপনার সুনাম যত বেশি, পৃথিবী ও মানুষের প্রতি দায়ও তত বেশি। বার্কলেস একটি নামকরা সংস্থা, আর তাই তাদের দায়িত্বটাও অনেক বড়।’

শরীফ ছাড়াও অভিযোগকারীদের মধ্যে আছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ও রাজনীতিক অনিমেষ মণ্ডল এবং একই অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের ইউনিয়ন—দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম।

তাদের সহায়তা করা কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, ‘সুন্দরবনের গ্রামীণ মানুষরা পরিবেশ ও জলবায়ু সংকটের একদম সামনের সারিতে রয়েছেন। আমরা আশা করি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন এই সংকট বাড়িয়ে তোলা তেল ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে নতুন করে অর্থায়ন করার আগে একবার ভেবে দেখে।’

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ‘অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্ট’ অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে তদন্ত করা হবে কি না, তা যাচাই করে দেখবে। বার্কলেস ব্যাংক এবং মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বিআইএফপিসিএল (বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড)—কোনো পক্ষই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত